কবিতার খাতা
- 26 mins
মেয়েটা – নবনীতা দেবসেন।
দুঃখ তাকে তাড়া করেছিল
মেয়েটা ছুটতে, ছুটতে, ছুটতে
কী আর করে? হাতের চিরুনিটাই
ছুঁড়ে মারলো দুঃখকে—
আর অমনি চিরুনির
একশো দাঁত থেকে
গজিয়ে উঠলো হাজার হাজার বৃক্ষ
শ্বাপদসংকুল সঘন অরণ্য, বাঘের ডাকে,
ছম্ ছম্ অন্ধকারে,
কোথায় হারিয়ে গেল
দুঃখ—
ভয় তাড়া করেছিল তাকে
মেয়েটা, ছুটতে, ছুটতে, ছুটতে
কী করে? মুঠোর ছোট্ট আতরের শিশিটাই
ছুঁড়ে মারলো ভয়কে—
আর অমনি সেই আতর ফুঁসে উঠলো
ফেঁপে উঠলো ফেনিল ঘূর্ণিতে, প্রখর কলরোলে
যোজন যোজন ব্যেপে, হিংস্র গেরুয়া স্রোতের
তোড়ে কোথায় ভাসিয়ে নিয়ে গেল
ভয়কে—
প্রেম যেদিন ওকে তাড়া করল
মেয়েটার হাতে কিছুই ছিল না
ছুটতে, ছুটতে, ছুটতে, কী করে?
শেষে বুক থেকে উপড়ে নিয়ে হৃদয়টাকেই
ছুঁড়ে দিল প্রেমের দিকে,
আর অমনি
শ্যামল এক শৈলশ্রেণী হয়ে মাথা তুলল
সেই একমুঠো হৃদয়
ঝরনায়, গুহায়, চড়াইতে, উতরাইতে
রহস্যময়
তার খাদে, তার উপত্যকায়
প্রতিধ্বনি কাঁপছে
ঝোড়ো বাতাসের, জলপ্রপাতের—
তার ঢালুতে ছায়া, আর
চুড়োতে ঝল্-সাচ্ছেন
চাঁদ সূয্যি
সেই ঝলমলে, ভরভর্তি হৃদয়টাই
বুঝি এগোতে দিলে না
তার প্রেমিকের ভীতু
প্রেমকে,
আহা
এবার ওকে তাড়া করেছে ক্লান্তি
হাত খালি, বুক খালি,
ছুটতে, ছুটতে, ছুটতে, কী করে?
এবারে মেয়েটা পিছন দিকে
ছুঁড়ে মারলো শুধু দীর্ঘশ্বাস—
আর অমনি
সেই নিশ্বাসের হলকায় ফস্ করে
জ্বলে উঠল তার সমস্ত অতীত
দশদিশিতে দাউ দাউ ছড়িয়ে পড়ল
উড়ন্ত পুড়ন্ত বালির মরুভূমি
এখন মেয়েটা নিশ্চিন্ত হয়ে ছুটছে,
দুই হাত মাথার ওপরে তোলা—
যাক্,
এবার তাকে তাড়া করেছে, তার
গন্তব্যটাই॥
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। নবনীতা দেবসেন।
মেয়েটা – নবনীতা দেবসেন | মেয়েটা কবিতা নবনীতা দেবসেন | নবনীতা দেবসেনের কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা
মেয়েটা: নবনীতা দেবসেনের নারীচেতনা ও আত্মশক্তির অসাধারণ কাব্যভাষা
নবনীতা দেবসেনের “মেয়েটা” একটি অনন্য সৃষ্টি, যা নারীর দুঃখ, ভয়, প্রেম ও ক্লান্তির বিরুদ্ধে লড়াই এবং আত্মশক্তির এক গভীর কাব্যিক অন্বেষণ। “দুঃখ তাকে তাড়া করেছিল / মেয়েটা ছুটতে, ছুটতে, ছুটতে / কী আর করে? হাতের চিরুনিটাই / ছুঁড়ে মারলো দুঃখকে” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক গভীর চেতনা — নারী তার দুঃখ, ভয়, প্রেমকে অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত নিজের গন্তব্যে পৌঁছে যায়। নবনীতা দেবসেন বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তাঁর কবিতায় নারীচেতনা, আত্মশক্তি, মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা ও আধুনিকতার অসাধারণ প্রকাশ ঘটে। “মেয়েটা” তাঁর একটি বহুপঠিত কবিতা যা নারীর আত্মজয়ের কাহিনীকে চিরুনি, আতর, হৃদয় ও দীর্ঘশ্বাসের অসাধারণ প্রতীকায়নে ফুটিয়ে তুলেছে।
নবনীতা দেবসেন: নারীচেতনার আধুনিক কবি
নবনীতা দেবসেন (জন্ম: ১৯৩৮) বাংলা সাহিত্যের একজন বিশিষ্ট কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। তিনি শান্তিনিকেতনে জন্মগ্রহণ করেন এবং তাঁর কবিতায় নারীচেতনা, মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা, আধুনিকতা ও অস্তিত্ববাদের অসাধারণ প্রকাশ ঘটে। তিনি সহজ-সরল ভাষায় জটিল অনুভূতি ও নারীর অন্তর্দ্বন্দ্ব ফুটিয়ে তোলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কবিতার মধ্যে রয়েছে ‘মেয়েটা’, ‘নারী’, ‘অস্তিত্ব’ প্রভৃতি। নবনীতা দেবসেনের কবিতা পাঠককে ভাবায়, আন্দোলিত করে এবং নিজের অন্তরের সন্ধানে নিয়ে যায়। তিনি বাংলা কবিতায় এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত।
মেয়েটা কবিতার বিস্তারিত বিশ্লেষণ
কবিতার শিরোনামের তাৎপর্য
“মেয়েটা” শিরোনামটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি একটি সাধারণ, পরিচিত শিরোনাম — ‘মেয়েটা’ মানে যে কোনো মেয়ে, প্রতিটি মেয়ে। শিরোনামেই কবি ইঙ্গিত দিয়েছেন — এই কবিতা প্রতিটি নারীর গল্প, প্রতিটি নারীর লড়াই, প্রতিটি নারীর আত্মজয়ের কাহিনী।
প্রথম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“দুঃখ তাকে তাড়া করেছিল / মেয়েটা ছুটতে, ছুটতে, ছুটতে / কী আর করে? হাতের চিরুনিটাই / ছুঁড়ে মারলো দুঃখকে— / আর অমনি চিরুনির / একশো দাঁত থেকে / গজিয়ে উঠলো হাজার হাজার বৃক্ষ / শ্বাপদসংকুল সঘন অরণ্য, বাঘের ডাকে, / ছম্ ছম্ অন্ধকারে, / কোথায় হারিয়ে গেল / দুঃখ—” প্রথম স্তবকে কবি দুঃখের বিরুদ্ধে মেয়েটার লড়াই দেখিয়েছেন। তিনি বলেছেন — দুঃখ তাকে তাড়া করেছিল, সে ছুটতে থাকে। হাতের চিরুনিটা ছুঁড়ে মারলো দুঃখকে। আর সেই চিরুনির একশো দাঁত থেকে গজিয়ে উঠলো হাজার হাজার বৃক্ষ, ঘন অরণ্য — যেখানে হারিয়ে গেল দুঃখ।
‘দুঃখ তাকে তাড়া করেছিল’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
দুঃখ যেন এক শত্রুর মতো মেয়েটাকে তাড়া করে। নারীর জীবন জুড়ে দুঃখের উপস্থিতি — পারিবারিক, সামাজিক, ব্যক্তিগত — সব রকমের দুঃখ তাকে পিছু নেয়।
‘মেয়েটা ছুটতে, ছুটতে, ছুটতে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
মেয়েটা পালাতে চায়, বাঁচতে চায়। কিন্তু ছুটতে ছুটতে সে বুঝতে পারে — পালানো সমাধান নয়।
‘কী আর করে? হাতের চিরুনিটাই ছুঁড়ে মারলো দুঃখকে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
তার কাছে যা ছিল — একটি সাধারণ চিরুনি, সেটাই সে অস্ত্র বানিয়ে ফেলে। এটি নারীর অসহায় অবস্থা ও তার মধ্যেই লুকিয়ে থাকা শক্তির প্রতীক।
‘আর অমনি চিরুনির একশো দাঁত থেকে গজিয়ে উঠলো হাজার হাজার বৃক্ষ’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
ছুঁড়ে দেওয়া চিরুনির প্রতিটি দাঁত থেকে গজিয়ে ওঠে হাজার হাজার বৃক্ষ। একটি সাধারণ জিনিসও যখন নারীর প্রতিরোধের অস্ত্র হয়, তখন তা বিশাল রূপ নেয়।
‘কোথায় হারিয়ে গেল দুঃখ’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
দুঃখ সেই অরণ্যে হারিয়ে যায়। অর্থাৎ নারী যখন প্রতিরোধ করে, তখন তার দুঃখ আর তাকে তাড়া করতে পারে না — সে দুঃখকে জয় করে ফেলে।
দ্বিতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“ভয় তাড়া করেছিল তাকে / মেয়েটা, ছুটতে, ছুটতে, ছুটতে / কী করে? মুঠোর ছোট্ট আতরের শিশিটাই / ছুঁড়ে মারলো ভয়কে— / আর অমনি সেই আতর ফুঁসে উঠলো / ফেঁপে উঠলো ফেনিল ঘূর্ণিতে, প্রখর কলরোলে / যোজন যোজন ব্যেপে, হিংস্র গেরুয়া স্রোতের / তোড়ে কোথায় ভাসিয়ে নিয়ে গেল / ভয়কে—” দ্বিতীয় স্তবকে কবি ভয়ের বিরুদ্ধে মেয়েটার লড়াই দেখিয়েছেন। তিনি বলেছেন — ভয় তাকে তাড়া করেছিল, সে ছুটতে থাকে। তার মুঠোর ছোট্ট আতরের শিশিটা ছুঁড়ে মারলো ভয়কে। আর সেই আতর ফুঁসে উঠলো, ফেনিল ঘূর্ণিতে ভয়কে ভাসিয়ে নিয়ে গেল।
‘ভয় তাড়া করেছিল তাকে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
দুঃখের পর এখন ভয় তাকে তাড়া করে। নারীর জীবনে ভয়ের শেষ নেই — ভয় সামাজিক, ভয় পারিবারিক, ভয় অজানার, ভয় ব্যর্থতার।
‘মুঠোর ছোট্ট আতরের শিশিটাই ছুঁড়ে মারলো ভয়কে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
আতর — সৌন্দর্যের প্রতীক, নারীর নিজস্বতার প্রতীক। সেই সৌন্দর্যকেই সে অস্ত্র বানিয়ে ছুঁড়ে মারে ভয়ের দিকে।
‘সেই আতর ফুঁসে উঠলো ফেঁপে উঠলো ফেনিল ঘূর্ণিতে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
আতর রূপান্তরিত হয় — ফুঁসে ওঠে, ফেঁপে ওঠে, বিশাল রূপ নেয়। নারীর সৌন্দর্য ও আত্মশক্তি যখন প্রতিরোধে রূপ নেয়, তখন তা ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
‘ভাসিয়ে নিয়ে গেল ভয়কে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
সেই শক্তিশালী স্রোত ভয়কে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। নারী যখন নিজের সত্তাকে নিয়ে প্রতিরোধ করে, তখন তার ভয় চলে যায়।
তৃতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“প্রেম যেদিন ওকে তাড়া করল / মেয়েটার হাতে কিছুই ছিল না / ছুটতে, ছুটতে, ছুটতে, কী করে? / শেষে বুক থেকে উপড়ে নিয়ে হৃদয়টাকেই / ছুঁড়ে দিল প্রেমের দিকে, / আর অমনি / শ্যামল এক শৈলশ্রেণী হয়ে মাথা তুলল / সেই একমুঠো হৃদয় / ঝরনায়, গুহায়, চড়াইতে, উতরাইতে / রহস্যময় / তার খাদে, তার উপত্যকায় / প্রতিধ্বনি কাঁপছে / ঝোড়ো বাতাসের, জলপ্রপাতের— / তার ঢালুতে ছায়া, আর / চুড়োতে ঝল্-সাচ্ছেন / চাঁদ সূয্যি / সেই ঝলমলে, ভরভর্তি হৃদয়টাই / বুঝি এগোতে দিলে না / তার প্রেমিকের ভীতু / প্রেমকে, / আহা” তৃতীয় স্তবকে কবি প্রেমের বিরুদ্ধে মেয়েটার লড়াই দেখিয়েছেন। তিনি বলেছেন — প্রেম যখন তাকে তাড়া করল, তার হাতে কিছুই ছিল না। শেষে বুক থেকে হৃদয় উপড়ে নিয়ে ছুঁড়ে দিল প্রেমের দিকে। আর সেই হৃদয় শ্যামল এক শৈলশ্রেণী হয়ে মাথা তুলল — যেখানে চাঁদ-সূর্য ঝলমল করে। সেই বিশাল হৃদয়ের সামনে প্রেমিকের ভীতু প্রেম এগোতে পারে না।
‘প্রেম যেদিন ওকে তাড়া করল’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
দুঃখ ও ভয়ের পর এখন প্রেম তাকে তাড়া করে। কিন্তু এই প্রেম কি সত্যিকারের? নাকি আরেক বিপদ?
‘মেয়েটার হাতে কিছুই ছিল না’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
দুঃখের বিরুদ্ধে ছিল চিরুনি, ভয়ের বিরুদ্ধে ছিল আতর — কিন্তু প্রেমের বিরুদ্ধে তার হাতে কিছুই নেই। প্রেম তাকে অসহায় করে দেয়।
‘শেষে বুক থেকে উপড়ে নিয়ে হৃদয়টাকেই ছুঁড়ে দিল প্রেমের দিকে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
যখন আর কিছুই ছিল না, তখন সে নিজের হৃদয়কেই অস্ত্র বানায়। নিজের ভালোবাসাকেই সে ছুঁড়ে মারে প্রেমের দিকে।
‘শ্যামল এক শৈলশ্রেণী হয়ে মাথা তুলল সেই একমুঠো হৃদয়’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
সেই হৃদয় শ্যামল শৈলশ্রেণীতে পরিণত হয় — বিশাল, সুন্দর, রহস্যময়। নারীর ভালোবাসা এত বিশাল যে তা পর্বতের মতো মহিমান্বিত।
‘সেই ঝলমলে, ভরভর্তি হৃদয়টাই বুঝি এগোতে দিলে না তার প্রেমিকের ভীতু প্রেমকে, / আহা’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
এই অংশটি কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী ও মর্মস্পর্শী অংশ। নারীর ভালোবাসা এত বিশাল, এত খাঁটি, এত ঝলমলে যে তার সামনে প্রেমিকের ভীতু, ছোট্ট প্রেম এগোতে পারে না। ‘আহা’ — এই একটি শব্দে মিশে আছে করুণা, বেদনা ও হতাশা।
চতুর্থ স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“এবার ওকে তাড়া করেছে ক্লান্তি / হাত খালি, বুক খালি, / ছুটতে, ছুটতে, ছুটতে, কী করে? / এবারে মেয়েটা পিছন দিকে / ছুঁড়ে মারলো শুধু দীর্ঘশ্বাস— / আর অমনি / সেই নিশ্বাসের হলকায় ফস্ করে / জ্বলে উঠল তার সমস্ত অতীত / দশদিশিতে দাউ দাউ ছড়িয়ে পড়ল / উড়ন্ত পুড়ন্ত বালির মরুভূমি” চতুর্থ স্তবকে কবি ক্লান্তির বিরুদ্ধে মেয়েটার লড়াই দেখিয়েছেন। তিনি বলেছেন — এবার ক্লান্তি তাকে তাড়া করে। তার হাত খালি, বুক খালি। সে পিছন দিকে ছুঁড়ে মারে শুধু দীর্ঘশ্বাস। আর সেই নিশ্বাসের হলকায় জ্বলে ওঠে তার সমস্ত অতীত — দাউ দাউ করে ছড়িয়ে পড়ে মরুভূমি।
‘এবার ওকে তাড়া করেছে ক্লান্তি’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
দুঃখ, ভয়, প্রেমের পর এখন ক্লান্তি তাকে তাড়া করে। লড়াই করতে করতে সে ক্লান্ত, নিঃস্ব।
‘হাত খালি, বুক খালি’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
আগের লড়াইগুলোতে সে সব ছুঁড়ে মেরেছে। এখন তার আর কিছুই নেই — হাতও খালি, বুকও খালি।
‘এবারে মেয়েটা পিছন দিকে ছুঁড়ে মারলো শুধু দীর্ঘশ্বাস’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
তার কাছে এখন শুধু দীর্ঘশ্বাস — ক্লান্তির নিশ্বাস, হতাশার নিশ্বাস। সেটাই সে ছুঁড়ে মারে। কিন্তু লক্ষ্য করুন — সে পিছন দিকে ছুঁড়ে মারে। এগিয়ে নয়, পিছনে।
‘সেই নিশ্বাসের হলকায় ফস্ করে জ্বলে উঠল তার সমস্ত অতীত’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
সেই দীর্ঘশ্বাসের তাপে জ্বলে ওঠে তার সমস্ত অতীত — তার সব লড়াই, সব বেদনা, সব অভিজ্ঞতা।
‘দশদিশিতে দাউ দাউ ছড়িয়ে পড়ল উড়ন্ত পুড়ন্ত বালির মরুভূমি’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
অতীত জ্বলে পুড়ে মরুভূমি হয়ে যায়। কিন্তু এই মরুভূমি উড়ন্ত, পুড়ন্ত — ধ্বংসের প্রতীক।
পঞ্চম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“এখন মেয়েটা নিশ্চিন্ত হয়ে ছুটছে, / দুই হাত মাথার ওপরে তোলা— / যাক্, / এবার তাকে তাড়া করেছে, তার / গন্তব্যটাই॥” পঞ্চম স্তবকে কবি মেয়েটার চূড়ান্ত জয় দেখিয়েছেন। তিনি বলেছেন — এখন মেয়েটা নিশ্চিন্ত হয়ে ছুটছে, দুই হাত মাথার ওপরে তোলা। এবার তাকে তাড়া করেছে তার গন্তব্যই।
‘এখন মেয়েটা নিশ্চিন্ত হয়ে ছুটছে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
আগে সে ভয়ে, আতঙ্কে ছুটত। এখন সে নিশ্চিন্ত — কারণ সে সব বাধা জয় করে ফেলেছে।
‘দুই হাত মাথার ওপরে তোলা’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
এটি বিজয়ের ভঙ্গি। তার হাতে আর কিছু নেই — কিন্তু তার দরকারও নেই। সে জিতে গেছে।
‘এবার তাকে তাড়া করেছে, তার গন্তব্যটাই’ — শেষ পঙ্ক্তির তাৎপর্য
এটি কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ। আগে তাকে তাড়া করত দুঃখ, ভয়, প্রেম, ক্লান্তি — সব নেতিবাচক শক্তি। এখন তাকে তাড়া করছে তার গন্তব্য — ইতিবাচক শক্তি। সে আর পলায়নপর নয়, সে এখন তার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলেছে। গন্তব্যই এখন তার পিছু নিয়েছে — মানে সে তার লক্ষ্যে পৌঁছেই যাবে।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য
“মেয়েটা” কবিতাটি নারীচেতনা ও আত্মশক্তির এক অসাধারণ চিত্র। কবি প্রথমে দুঃখের বিরুদ্ধে লড়াই দেখিয়েছেন — চিরুনি ছুঁড়ে দুঃখকে হারিয়ে ফেলা। তারপর ভয়ের বিরুদ্ধে লড়াই — আতর ছুঁড়ে ভয়কে ভাসিয়ে দেওয়া। তারপর প্রেমের বিরুদ্ধে লড়াই — হৃদয় ছুঁড়ে প্রেমিকের ভীতু প্রেমকে হার মানানো। তারপর ক্লান্তির বিরুদ্ধে লড়াই — দীর্ঘশ্বাস ছুঁড়ে অতীতকে পুড়িয়ে ফেলা। শেষে তিনি নিশ্চিন্ত — কারণ এবার তাকে তাড়া করেছে তার গন্তব্য। এই কবিতা প্রতিটি নারীকে বলে — তুমি পারবে, তুমি জিতবে, শেষ পর্যন্ত তোমার গন্তব্যই তোমাকে তাড়া করবে।
মেয়েটা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: মেয়েটা কবিতার লেখক কে?
মেয়েটা কবিতার লেখক নবনীতা দেবসেন। তিনি বাংলা সাহিত্যের একজন বিশিষ্ট কবি, ঔপন্যাসিক ও প্রাবন্ধিক। তাঁর কবিতায় নারীচেতনা, মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা ও আধুনিকতার অসাধারণ প্রকাশ ঘটে।
প্রশ্ন ২: মেয়েটা কবিতার মূল বিষয়বস্তু কী?
মেয়েটা কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো নারীর দুঃখ, ভয়, প্রেম ও ক্লান্তির বিরুদ্ধে লড়াই এবং শেষ পর্যন্ত আত্মজয়। কবি চিরুনি, আতর, হৃদয় ও দীর্ঘশ্বাসের প্রতীকায়নের মাধ্যমে নারীর আত্মশক্তিকে ফুটিয়ে তুলেছেন। শেষে তিনি বলেছেন — এবার তাকে তাড়া করেছে তার গন্তব্যটাই।
প্রশ্ন ৩: ‘সেই ঝলমলে, ভরভর্তি হৃদয়টাই বুঝি এগোতে দিলে না তার প্রেমিকের ভীতু প্রেমকে, আহা’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
এই অংশটি কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী ও মর্মস্পর্শী অংশ। নারীর ভালোবাসা এত বিশাল, এত খাঁটি, এত ঝলমলে যে তার সামনে প্রেমিকের ভীতু, ছোট্ট প্রেম এগোতে পারে না। ‘আহা’ — এই একটি শব্দে মিশে আছে করুণা, বেদনা ও হতাশা।
প্রশ্ন ৪: ‘এবার মেয়েটা নিশ্চিন্ত হয়ে ছুটছে, দুই হাত মাথার ওপরে তোলা’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
এটি বিজয়ের ভঙ্গি। আগে সে ভয়ে, আতঙ্কে ছুটত। এখন সে নিশ্চিন্ত — কারণ সে সব বাধা জয় করে ফেলেছে। তার হাতে আর কিছু নেই — কিন্তু তার দরকারও নেই। সে জিতে গেছে।
প্রশ্ন ৫: ‘এবার তাকে তাড়া করেছে, তার গন্তব্যটাই’ — শেষ পঙ্ক্তির তাৎপর্য কী?
এটি কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ। আগে তাকে তাড়া করত দুঃখ, ভয়, প্রেম, ক্লান্তি — সব নেতিবাচক শক্তি। এখন তাকে তাড়া করছে তার গন্তব্য — ইতিবাচক শক্তি। সে আর পলায়নপর নয়, সে এখন তার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলেছে। গন্তব্যই এখন তার পিছু নিয়েছে — মানে সে তার লক্ষ্যে পৌঁছেই যাবে।
প্রশ্ন ৬: নবনীতা দেবসেন সম্পর্কে সংক্ষেপে বলুন।
নবনীতা দেবসেন (জন্ম: ১৯৩৮) বাংলা সাহিত্যের একজন বিশিষ্ট কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। তিনি শান্তিনিকেতনে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কবিতার মধ্যে রয়েছে ‘মেয়েটা’, ‘নারী’, ‘অস্তিত্ব’ প্রভৃতি। তাঁর কবিতায় নারীচেতনা, মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা ও আধুনিকতার অসাধারণ প্রকাশ ঘটে।
ট্যাগস: মেয়েটা, নবনীতা দেবসেন, নবনীতা দেবসেনের কবিতা, মেয়েটা কবিতা নবনীতা দেবসেন, আধুনিক বাংলা কবিতা, নারীচেতনার কবিতা, আত্মশক্তির কবিতা, নারীর লড়াই





