কবিতার খাতা
- 27 mins
ডাক – শ্রীজাত।
ভাষা আমার শরীর। যেমন আকাশ মাটি জলও —
তারও আছে শিকড়, তুমি ফুলের কথাই বলো।
‘অ’ বললে তাই অহং বুঝি, ‘আ’ বললে তাই আদর
আমার ভাষায় বসত করে অজস্র বেরাদর।
সবাই মিলে চড়ুইভাতির বর্ণমালা খুলি,
সেখানে কেউ ওঠায় যদি শাসনে অঙ্গুলি
শেখায়, কে কী বলবে এবং বলবে না কোন কথা,
আমার ভাষায় চার অক্ষরে তৈরি নীরবতা
ভাঙতে পারে তখন। জেনো চড়তে পারে গলা।
খোঁপায় শোভা পেলেও সে তো প্রতিবাদের পলাশ —
পথে লুটোয় ইচ্ছেমতো, দিগন্তে তার আভা….
কেউ বলে সুস্বাগতম আর কেউ বলে মারহাবা
এসব ছাড়াও অন্য কথা বলে যে নিন্দুকে
দেখছে না সে ভাষার রেখা, নাগরিকের মুখে?
দেখছে না সে, ভাতের কাছে হার মেনেছে মানুষ?
আবহমান খিদের সামনে ভাষাও নতজানু….
সেই ভাষাতেই ডাকছি তোমায়, ভাতের কাছে এসো
স্পর্শে এবার বরণ করি, সব অভিমান শেষ হোক।
থাকুক কেবল মনের কথা, পড়ন্ত বিশ্রামে
ভিজিয়ে দিক বর্ণমালা, বৃষ্টি যেমন নামে —
তোমার চোখের বানান করি, ভুল হলে তাও বলো
ভাষায় জাগুক এই পৃথিবীর ঘুমন্ত অঞ্চলও
বিস্তৃত সেই উপত্যকার দু’চারটে অক্ষরে
তোমায় যেন ডাকতে পারি, একুশজন্ম পরে!
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। শ্রীজাত।
ডাক – শ্রীজাত | ডাক কবিতা | শ্রীজাতর কবিতা | বাংলা কবিতা | ভাষার কবিতা
ডাক: শ্রীজাতর ভাষা, অস্তিত্ব ও প্রেমের অসাধারণ কাব্যভাষা
শ্রীজাতর “ডাক” কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের একটি অনন্য সৃষ্টি, যা ভাষা, অস্তিত্ব, প্রেম ও প্রতিবাদের এক গভীর কাব্যিক অন্বেষণ। “ভাষা আমার শরীর। যেমন আকাশ মাটি জলও — / তারও আছে শিকড়, তুমি ফুলের কথাই বলো।” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক গভীর দর্শন — ভাষা শুধু কথা বলার মাধ্যম নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের অংশ, আমাদের শরীরের মতোই। শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায় (জন্ম: ১৯৭৫) বাংলা কবিতার একজন জনপ্রিয় কবি, গীতিকার ও চিত্রনাট্যকার। তাঁর কবিতায় ভাষা, প্রেম, নাগরিক জীবন, সম্পর্কের জটিলতা ও মানবিক অনুভূতির গভীর প্রকাশ ঘটে। “ডাক” তাঁর একটি বহুপঠিত কবিতা যা ভাষার গভীর তাৎপর্য ও ভাষার ওপর আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
শ্রীজাত: ভাষার কবি
শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায় (জন্ম: ১৯৭৫) বাংলা কবিতার একজন জনপ্রিয় কবি, গীতিকার ও চিত্রনাট্যকার। তিনি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন এবং স্কটিশ চার্চ কলেজে পড়াশোনা করেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘উড়ন্ত সব জোকার’ (২০০২) তাঁকে খ্যাতি এনে দেয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘অভিজ্ঞান’, ‘সব কাঠখড় পুড়িয়ে ফেলব’, ‘আমি কার কথা ভাবি’, ‘কথা দিয়ো ফিরে এসো’, ‘ভুল বসন্তের কবিতা’ প্রভৃতি। তাঁর কবিতায় ভাষা, প্রেম, নাগরিক জীবন, সম্পর্কের জটিলতা ও মানবিক অনুভূতির গভীর প্রকাশ ঘটে। তিনি সহজ-সরল ভাষায় জটিল অনুভূতি ফুটিয়ে তোলেন। “ডাক” তাঁর একটি বহুপঠিত কবিতা যা ভাষার গভীর তাৎপর্য ও ভাষার ওপর আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
ডাক কবিতার বিস্তারিত বিশ্লেষণ
কবিতার শিরোনামের তাৎপর্য
“ডাক” শিরোনামটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ডাক মানে আহ্বান, ডাক মানে কণ্ঠস্বর, ডাক মানে চিৎকার। কবি এখানে কীসের ডাক দিচ্ছেন? ভাষার ডাক? প্রিয়তমার ডাক? প্রতিবাদের ডাক? কবিতার শেষে তিনি বলেছেন — “তোমায় যেন ডাকতে পারি, একুশজন্ম পরে!” — অর্থাৎ এই কবিতাটি এক ডাক, এক আহ্বান। শিরোনামেই কবি ইঙ্গিত দিয়েছেন — এটি একটি আহ্বান, একটি ডাক।
প্রথম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“ভাষা আমার শরীর। যেমন আকাশ মাটি জলও — / তারও আছে শিকড়, তুমি ফুলের কথাই বলো।” প্রথম স্তবকে কবি ভাষাকে তাঁর শরীর বলে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন — ভাষা আমার শরীর, যেমন আকাশ, মাটি, জলও শরীর। ভাষারও আছে শিকড়, তুমি ফুলের কথাই বলো। অর্থাৎ ভাষা কেবল বিমূর্ত নয়, এটি বাস্তব, এটি আমাদের অস্তিত্বের সাথে মিশে আছে। ভাষারও শিকড় আছে, যেমন ফুলের শিকড় আছে।
‘ভাষা আমার শরীর’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘ভাষা আমার শরীর’ — এই পঙ্ক্তিটি কবিতার কেন্দ্রীয় দর্শন। ভাষা কেবল কথা বলার মাধ্যম নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের অংশ। আমাদের চিন্তা, আমাদের অনুভূতি, আমাদের পরিচয় — সবকিছু ভাষার মাধ্যমে গঠিত। ভাষা ছাড়া আমরা অসম্পূর্ণ। তাই ভাষা আমাদের শরীরের মতোই অবিচ্ছেদ্য।
আকাশ, মাটি, জলের উপমার তাৎপর্য
আকাশ, মাটি, জল — প্রকৃতির মৌলিক উপাদান। এগুলো যেমন আমাদের চারপাশে, আমাদের অস্তিত্বের জন্য অপরিহার্য, ভাষাও তেমনি। ভাষা ছাড়া আমরা বাঁচতে পারি না।
দ্বিতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“‘অ’ বললে তাই অহং বুঝি, ‘আ’ বললে তাই আদর / আমার ভাষায় বসত করে অজস্র বেরাদর।” দ্বিতীয় স্তবকে কবি বাংলা ভাষার সূক্ষ্মতা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন — ‘অ’ বললে তাই অহং বুঝি, ‘আ’ বললে তাই আদর। আমার ভাষায় বসত করে অজস্র বেরাদর (ভাই-বন্ধু)। অর্থাৎ বাংলা ভাষার প্রতিটি ধ্বনি, প্রতিটি অক্ষরের নিজস্ব অর্থ ও তাৎপর্য আছে।
‘অ’ ও ‘আ’-র তাৎপর্য
‘অ’ ও ‘আ’ বাংলা বর্ণমালার প্রথম দুটি স্বরবর্ণ। ‘অ’ দিয়ে শুরু হয় অহং (অহংকার), ‘আ’ দিয়ে শুরু হয় আদর। এই সামান্য পরিবর্তনেই অর্থের ব্যাপক পরিবর্তন। বাংলা ভাষার এই সূক্ষ্মতা কবি তুলে ধরেছেন।
বেরাদরের তাৎপর্য
বেরাদর — ভাই, বন্ধু, সহযোগী। বাংলা ভাষায় অজস্র বেরাদর বসত করে — অর্থাৎ ভাষার মধ্যে অনেক সম্পর্ক, অনেক ভাবনা, অনেক অনুভূতি লুকিয়ে আছে।
তৃতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“সবাই মিলে চড়ুইভাতির বর্ণমালা খুলি, / সেখানে কেউ ওঠায় যদি শাসনে অঙ্গুলি / শেখায়, কে কী বলবে এবং বলবে না কোন কথা, / আমার ভাষায় চার অক্ষরে তৈরি নীরবতা / ভাঙতে পারে তখন।” তৃতীয় স্তবকে কবি ভাষার ওপর নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — সবাই মিলে চড়ুইভাতির বর্ণমালা খুলি। সেখানে কেউ যদি শাসনে অঙ্গুলি ওঠায় — কে কী বলবে এবং বলবে না কোন কথা, তা শেখায় — তখন আমার ভাষায় চার অক্ষরে তৈরি নীরবতা ভাঙতে পারে।
চড়ুইভাতির বর্ণমালার তাৎপর্য
চড়ুইভাতি — আনন্দের মিলন, সবাই মিলে খাওয়া-দাওয়া। এখানে ‘চড়ুইভাতির বর্ণমালা’ বলতে সম্ভবত ভাষার স্বতঃস্ফূর্ত ব্যবহার, আনন্দময় প্রয়োগ বোঝানো হয়েছে।
শাসনে অঙ্গুলি ওঠানোর তাৎপর্য
শাসনে অঙ্গুলি ওঠানো — নিয়ন্ত্রণ করা, শেখানো কে কী বলবে, কী বলবে না। এটি ভাষার ওপর সেন্সরশিপ, ভাষার স্বাধীনতা খর্ব করার প্রতীক।
চার অক্ষরে তৈরি নীরবতার তাৎপর্য
‘চার অক্ষরে তৈরি নীরবতা’ — সম্ভবত বাংলায় ‘চার অক্ষর’ বলে একটি বাগধারা আছে, যা গালি বা অশ্লীলতা বোঝায়। কিন্তু এখানে সম্ভবত অন্য অর্থ। চার অক্ষর — বাংলা বর্ণমালার চারটি অক্ষর? নাকি ‘নীরবতা’ শব্দটি চার অক্ষরে লেখা? এটি রহস্যময়। তবে কবি বলতে চান — ভাষার ওপর নিয়ন্ত্রণ এলেই নীরবতা তৈরি হয়, কিন্তু সেই নীরবতা ভাঙতে পারে।
চতুর্থ স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“জেনো চড়তে পারে গলা। / খোঁপায় শোভা পেলেও সে তো প্রতিবাদের পলাশ — / পথে লুটোয় ইচ্ছেমতো, দিগন্তে তার আভা…. / কেউ বলে সুস্বাগতম আর কেউ বলে মারহাবা” চতুর্থ স্তবকে কবি প্রতিবাদের ভাষার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — জেনো চড়তে পারে গলা। খোঁপায় শোভা পেলেও সে তো প্রতিবাদের পলাশ। পথে লুটোয় ইচ্ছেমতো, দিগন্তে তার আভা। কেউ বলে সুস্বাগতম, আর কেউ বলে মারহাবা।
গলা চড়ার তাৎপর্য
গলা চড়া — সোচ্চার হওয়া, প্রতিবাদ করা। ভাষার ওপর আক্রমণ এলে গলা চড়তে পারে, প্রতিবাদ আসতে পারে।
প্রতিবাদের পলাশের তাৎপর্য
পলাশ ফুল লাল, বসন্তের প্রতীক, ভালোবাসার প্রতীক, কিন্তু এখানে প্রতিবাদের পলাশ বলা হয়েছে। খোঁপায় শোভা পেলেও (সাজানো অবস্থায়) সে আসলে প্রতিবাদ। পথে লুটোয় ইচ্ছেমতো, দিগন্তে তার আভা — অর্থাৎ প্রতিবাদ সবখানে ছড়িয়ে পড়ে।
সুস্বাগতম ও মারহাবার তাৎপর্য
সুস্বাগতম বাংলা/সংস্কৃত শব্দ, মারহাবা আরবি/ফারসি শব্দ। দুই ভাষার মানুষ একই ভাষায় কথা বলে? নাকি দুই সংস্কৃতির সম্মিলন? কবি সম্ভবত বাংলা ভাষার বহুমাত্রিকতা নির্দেশ করেছেন।
পঞ্চম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“এসব ছাড়াও অন্য কথা বলে যে নিন্দুকে / দেখছে না সে ভাষার রেখা, নাগরিকের মুখে? / দেখছে না সে, ভাতের কাছে হার মেনেছে মানুষ? / আবহমান খিদের সামনে ভাষাও নতজানু….” পঞ্চম স্তবকে কবি ভাষার সীমাবদ্ধতার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — এসব ছাড়াও অন্য কথা বলে যে নিন্দুকে (সমালোচক) দেখছে না সে ভাষার রেখা, নাগরিকের মুখে? দেখছে না সে, ভাতের কাছে হার মেনেছে মানুষ? আবহমান খিদের সামনে ভাষাও নতজানু।
নিন্দুকের তাৎপর্য
নিন্দুক — সমালোচক, যে ভাষার সৌন্দর্য দেখে না, যে ভাষার গভীরতা বুঝে না। সে দেখছে না ভাষার রেখা, নাগরিকের মুখে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের মুখেও ভাষার সৌন্দর্য আছে, যা নিন্দুক দেখতে পায় না।
ভাতের কাছে মানুষ হেরে যাওয়ার তাৎপর্য
ভাতের কাছে মানুষ হেরে গেছে — অর্থাৎ ক্ষুধার কাছে মানুষ পরাজিত। ক্ষুধা এত শক্তিশালী যে মানুষ তার জন্য সব কিছু করতে পারে। ভাষাও তখন নতজানু হয় ক্ষুধার সামনে। এটি একটি বাস্তব সত্য — ক্ষুধার্ত মানুষ ভাষার সৌন্দর্য নিয়ে ভাবে না, সে ভাবে খাবার নিয়ে।
ষষ্ঠ স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“সেই ভাষাতেই ডাকছি তোমায়, ভাতের কাছে এসো / স্পর্শে এবার বরণ করি, সব অভিমান শেষ হোক।” ষষ্ঠ স্তবকে কবি প্রিয়তমাকে ডাকছেন। তিনি বলেছেন — সেই ভাষাতেই ডাকছি তোমায়, ভাতের কাছে এসো। স্পর্শে এবার বরণ করি, সব অভিমান শেষ হোক।
‘সেই ভাষাতেই ডাকছি তোমায়’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘সেই ভাষা’ — যে ভাষা নতজানু হয়, যে ভাষা সীমাবদ্ধ, কিন্তু সেই ভাষাতেই তিনি প্রিয়তমাকে ডাকছেন। কারণ এই ভাষাই তাঁর একমাত্র পরিচয়, একমাত্র মাধ্যম।
ভাতের কাছে আসার তাৎপর্য
ভাতের কাছে আসা — বাস্তবের কাছে আসা, ক্ষুধার কাছে আসা, মৌলিক প্রয়োজনের কাছে আসা। কবি প্রিয়তমাকে সেই মৌলিক সত্যের কাছে আসতে বলছেন, সব অভিমান শেষ করতে বলছেন।
সপ্তম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“থাকুক কেবল মনের কথা, পড়ন্ত বিশ্রামে / ভিজিয়ে দিক বর্ণমালা, বৃষ্টি যেমন নামে — / তোমার চোখের বানান করি, ভুল হলে তাও বলো / ভাষায় জাগুক এই পৃথিবীর ঘুমন্ত অঞ্চলও” সপ্তম স্তবকে কবি ভাষার স্বপ্ন দেখেছেন। তিনি বলেছেন — থাকুক কেবল মনের কথা, পড়ন্ত বিশ্রামে ভিজিয়ে দিক বর্ণমালা, বৃষ্টি যেমন নামে। তোমার চোখের বানান করি, ভুল হলে তাও বলো। ভাষায় জাগুক এই পৃথিবীর ঘুমন্ত অঞ্চলও।
বর্ণমালা ভিজিয়ে দেওয়ার তাৎপর্য
বৃষ্টি যেমন মাটি ভিজিয়ে দেয়, তেমনি বর্ণমালা যেন মন ভিজিয়ে দেয়। এটি ভাষার সজীবতা, ভাষার শক্তির প্রতীক।
চোখের বানান করার তাৎপর্য
তোমার চোখের বানান করি — অর্থাৎ প্রিয়তমার চোখকে ভাষায় প্রকাশ করতে চান। ভুল হলে বলতে বলেন। এটি প্রেম ও ভাষার মেলবন্ধন।
ঘুমন্ত অঞ্চল জাগানোর তাৎপর্য
ভাষায় জাগুক এই পৃথিবীর ঘুমন্ত অঞ্চলও — অর্থাৎ ভাষার শক্তি সব জায়গায় পৌঁছুক, সবাইকে জাগিয়ে তুলুক।
অষ্টম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“বিস্তৃত সেই উপত্যকার দু’চারটে অক্ষরে / তোমায় যেন ডাকতে পারি, একুশজন্ম পরে!” অষ্টম স্তবকে কবি শেষ ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন — বিস্তৃত সেই উপত্যকার দু’চারটে অক্ষরে তোমায় যেন ডাকতে পারি, একুশজন্ম পরে!
উপত্যকার অক্ষরের তাৎপর্য
উপত্যকা — বিস্তৃত অঞ্চল। সেই বিস্তৃত উপত্যকার দু’চারটে অক্ষর — অর্থাৎ ভাষার সামান্য অংশ দিয়েও তিনি প্রিয়তমাকে ডাকতে চান।
একুশজন্ম পরে — শেষ পঙ্ক্তির তাৎপর্য
একুশজন্ম পরে — অনেক জন্ম পরে, চিরকাল। তিনি চান চিরকাল প্রিয়তমাকে ডাকতে। ‘একুশ’ সংখ্যাটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ — একুশে ফেব্রুয়ারি, ভাষা আন্দোলন, বাংলা ভাষার অহংকার। একুশজন্ম পরে মানে চিরকাল, অনন্তকাল।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য
“ডাক” কবিতাটি ভাষা, প্রেম ও অস্তিত্বের এক অসাধারণ সম্মিলন। কবি ভাষাকে তাঁর শরীর বলে ঘোষণা করেছেন। তিনি বাংলা ভাষার সূক্ষ্মতা, তার বৈচিত্র্য, তার শক্তি বর্ণনা করেছেন। তিনি ভাষার ওপর নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছেন, প্রতিবাদের ভাষার কথা বলেছেন। তিনি ভাষার সীমাবদ্ধতার কথা বলেছেন — ক্ষুধার কাছে ভাষা নতজানু। কিন্তু সেই ভাষাতেই তিনি প্রিয়তমাকে ডাকছেন, তাকে ভাতের কাছে আসতে বলছেন। তিনি চান বর্ণমালা ভিজিয়ে দিক মনের মাটি, তিনি চান প্রিয়তমার চোখের বানান করতে। শেষে তিনি চান — বিস্তৃত উপত্যকার দু’চারটে অক্ষরে তিনি যেন প্রিয়তমাকে ডাকতে পারেন একুশজন্ম পরে। এটি ভাষার চিরন্তনতা, প্রেমের চিরন্তনতার এক অসাধারণ উচ্চারণ।
ডাক কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: ডাক কবিতার লেখক কে?
ডাক কবিতার লেখক শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায় (জন্ম: ১৯৭৫)। তিনি বাংলা কবিতার একজন জনপ্রিয় কবি, গীতিকার ও চিত্রনাট্যকার। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘উড়ন্ত সব জোকার’ (২০০২) তাঁকে খ্যাতি এনে দেয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘অভিজ্ঞান’, ‘সব কাঠখড় পুড়িয়ে ফেলব’, ‘আমি কার কথা ভাবি’, ‘কথা দিয়ো ফিরে এসো’ প্রভৃতি।
প্রশ্ন ২: ডাক কবিতার মূল বিষয়বস্তু কী?
ডাক কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো ভাষা, প্রেম ও অস্তিত্বের অন্বেষণ। কবি ভাষাকে তাঁর শরীর বলে ঘোষণা করেছেন। তিনি বাংলা ভাষার সূক্ষ্মতা, বৈচিত্র্য ও শক্তি বর্ণনা করেছেন। ভাষার ওপর নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিবাদের কথা বলেছেন। শেষে তিনি প্রিয়তমাকে ডাকছেন তাঁর ভাষায়, চিরকাল ডাকতে চান।
প্রশ্ন ৩: ‘ভাষা আমার শরীর’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘ভাষা আমার শরীর’ — এই পঙ্ক্তিটি কবিতার কেন্দ্রীয় দর্শন। ভাষা কেবল কথা বলার মাধ্যম নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের অংশ। আমাদের চিন্তা, আমাদের অনুভূতি, আমাদের পরিচয় — সবকিছু ভাষার মাধ্যমে গঠিত। ভাষা ছাড়া আমরা অসম্পূর্ণ। তাই ভাষা আমাদের শরীরের মতোই অবিচ্ছেদ্য।
প্রশ্ন ৪: ‘আমার ভাষায় চার অক্ষরে তৈরি নীরবতা / ভাঙতে পারে তখন’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘আমার ভাষায় চার অক্ষরে তৈরি নীরবতা / ভাঙতে পারে তখন’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি ভাষার ওপর নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছেন। কেউ যদি শেখায় কে কী বলবে, কী বলবে না — তখন ভাষায় নীরবতা তৈরি হয়। কিন্তু সেই নীরবতা ভাঙতে পারে, প্রতিবাদ আসতে পারে।
প্রশ্ন ৫: ‘খোঁপায় শোভা পেলেও সে তো প্রতিবাদের পলাশ’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘খোঁপায় শোভা পেলেও সে তো প্রতিবাদের পলাশ’ — পলাশ ফুল লাল, বসন্তের প্রতীক। কিন্তু এখানে প্রতিবাদের পলাশ বলা হয়েছে। খোঁপায় শোভা পেলেও (সাজানো অবস্থায়) সে আসলে প্রতিবাদ। পথে লুটোয় ইচ্ছেমতো, দিগন্তে তার আভা — অর্থাৎ প্রতিবাদ সবখানে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রশ্ন ৬: ‘আবহমান খিদের সামনে ভাষাও নতজানু’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘আবহমান খিদের সামনে ভাষাও নতজানু’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি ভাষার সীমাবদ্ধতার কথা বলেছেন। ক্ষুধা এত শক্তিশালী যে মানুষ তার জন্য সব কিছু করতে পারে। ভাষাও তখন নতজানু হয় ক্ষুধার সামনে। ক্ষুধার্ত মানুষ ভাষার সৌন্দর্য নিয়ে ভাবে না, সে ভাবে খাবার নিয়ে।
প্রশ্ন ৭: ‘একুশজন্ম পরে’ — শেষ পঙ্ক্তির তাৎপর্য কী?
‘একুশজন্ম পরে’ — এই পঙ্ক্তিটি কবিতার শেষ ও সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ। একুশজন্ম পরে মানে অনেক জন্ম পরে, চিরকাল। তিনি চান চিরকাল প্রিয়তমাকে ডাকতে। ‘একুশ’ সংখ্যাটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ — একুশে ফেব্রুয়ারি, ভাষা আন্দোলন, বাংলা ভাষার অহংকার। একুশজন্ম পরে মানে চিরকাল, অনন্তকাল।
প্রশ্ন ৮: শ্রীজাত সম্পর্কে সংক্ষেপে বলুন।
শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায় (জন্ম: ১৯৭৫) বাংলা কবিতার একজন জনপ্রিয় কবি, গীতিকার ও চিত্রনাট্যকার। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘উড়ন্ত সব জোকার’ (২০০২) তাঁকে খ্যাতি এনে দেয়। তাঁর কবিতায় ভাষা, প্রেম, নাগরিক জীবন, সম্পর্কের জটিলতা ও মানবিক অনুভূতির গভীর প্রকাশ ঘটে।
ট্যাগস: ডাক, শ্রীজাত, শ্রীজাতর কবিতা, ডাক কবিতা, বাংলা কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, ভাষার কবিতা, একুশে ফেব্রুয়ারির কবিতা






