জীবনের অর্জনের প্রতীক হিসেবে দেওয়ালে টাঙানো সমাবর্তনের ছবিটিও কবির দৃষ্টিতে এক ধরণের ধার করা গৌরব। যে পোশাক পরে ছবিটি তোলা হয়েছিল, তা যেমন ভাড়ায় পাওয়া, তেমনি জীবনের অনেক সুখও হয়তো সময়ের কাছে কেবল ধার নেওয়া। সমাবর্তনের ছবির মতোই মানুষের ‘সুখী গৃহকোণ’ দেওয়ালে শোভা পায় ঠিকই, কিন্তু প্রস্থানের দিন এলে সবকিছু ফেলে রেখেই নিঃস্ব হাতে চলে যেতে হয়। মালিকানার এই মিথ্যা অহংকারকে ত্যাগ করার জন্যই কবি আহ্বান জানিয়েছেন আঁচলের গিট খুলে সব জাগতিক বন্ধন রেখে আসতে। কাঁটাতারের ঘেরাটোপে আটকে থাকা এই বৈষয়িক জীবন থেকে মুক্তি পেয়ে কবি এক অবারিত সত্তার দিকে যাত্রা করতে চান। এই কৃত্রিম জগত ছেড়ে তিনি সেই শাশ্বত ঠিকানায় ফেরার কথা বলেছেন, যেখানে মালিকানা কখনো কেড়ে নেওয়া যায় না। মানুষের তৈরি সম্পদের সীমানা ছাড়িয়ে তিনি সেই আদিম ও অকৃত্রিম আশ্রয়ের দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
শরতের নীল আকাশ আর রাতের অগণিত নক্ষত্ররাজিই হলো মানুষের প্রকৃত সম্পদ, যা কখনো ভাড়ায় পাওয়া যায় না। জাগতিক জীবনের বহু বেদনা আর দহনের মধ্য দিয়ে মানুষ আসলে এই প্রকৃতির ঋণ শোধ করে এবং তার ওপর নিজের স্থায়ী স্বত্বাধিকার লাভ করে। ভোররাতে চালের ওপর বৃষ্টির নূপুরধ্বনি যে সুর তোলে, তার ওপর মানুষের যে অধিকার, তা কোনো দলিল বা অর্থ দিয়ে কেনা সম্ভব নয়। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এখানে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, বৈষয়িক সম্পদের ভিড়ে আমরা যা নিজের বলে আঁকড়ে ধরি তা আসলে আমাদের নয়; বরং প্রকৃতির সাথে আমাদের যে নাড়ির টান এবং আত্মিক সংযোগ, সেখানেই লুকিয়ে আছে মানুষের আসল মালিকানা। এই কবিতাটি আমাদের শেখায় পার্থিব মায়া কাটিয়ে আত্মার স্বাধীনতার পথে হাঁটতে, যেখানে নীল আকাশ আর বৃষ্টির গানই জীবনের একমাত্র এবং চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরা দেয়। এই বোধটিই জীবনের শেষ গন্তব্য হওয়া উচিত।
স্বত্বাধিকার – সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় | সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের নাগরিক কবিতা | ভাড়া করা সংসার ও মালিকানার প্রশ্ন | ‘তুই এসবের মালকিন নোস’ ও ‘বহু বেদনায় শোধ করেছিস এসবের ঋণ, চল তার স্বত্বাধিকার নিবি’
স্বত্বাধিকার: সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের নাগরিক জীবনের ভাড়া করা সংসার ও প্রকৃত মালিকানার অসাধারণ কাব্য, ‘এই ঘর আসবাব ক্রকারি কাটলারি, ওই ড্রাইভওয়েতে সিলভার গ্রে সুজুকির গাড়ি’ সবই ভাড়া, ‘তুই এসবের মালকিন নোস’ বলে চূড়ান্ত স্বীকারোক্তি, ভাড়া করা খাট-পালঙ্ক-ঠান্ডার মেশিন থেকে ভাড়া করা সুখ-গৃহকোণ, সমাবর্তনের ছবিও ভাড়া, ‘তুই যার মালিক নোস তা আঁচলের গিট খুলে রেখে আয়’ বলে সব ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান, ও ‘বহু বেদনায় শোধ করেছিস এসবের ঋণ, চল তার স্বত্বাধিকার নিবি’ বলে চূড়ান্ত ঘোষণার অমর সৃষ্টি
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের “স্বত্বাধিকার” বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য, নাগরিক ও দার্শনিক সৃষ্টি। “তোকে কেউ হয়তো কখনো বলেছে ‘এইতো এই সবই তোমার, এই ঘর আসবাব ক্রকারি কাটলারি, ওই যে ড্রাইভওয়েতে সিলভার গ্রে সুজুকির গাড়ি'” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে ভাড়া করা সংসার ও মালিকানার চিরন্তন প্রশ্ন; ‘এসব আশ্বাসের অন্তমিল ঠিকঠিক মেলেনি, ছন্দ ভেঙে গেছে’ বলে বাস্তবের কঠিন সত্য; ‘এখন তুই বুঝতে পারিস তুই এসবের মালকিন নোস’ বলে চূড়ান্ত স্বীকারোক্তি; ‘ভাড়াতে এসেছে খাট পালঙ্ক ঠান্ডার মেশিন, ঘর খালি করে দেবার দিন ভাড়া করা সংসারও খালি করে দিতে হবে’ বলে সব কিছুর অস্থায়িত্ব; ‘এই নগর রোজ তোকে বলে সুযোগ সুবিধা পরিষেবা’ কিন্তু ‘কখনো এ নগর তোর হয়, কখনো এ তোর নয়—কিছুতেই হয় না’; ‘সমাবর্তনের ছবিও ভাড়াতেই পাওয়া যায়’; ‘সুখী গৃহকোণও তাই, সুখও বোধকরি—ভাড়াতে এসেছে’; ‘তুই যার মালিক নোস তা আঁচলের গিট খুলে রেখে আয়’ বলে সব ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান; ‘কাঁটাতার ঘেরা তোর কাছে রাখা ছিল, তার কেটে এইবার যাই চল’ বলে বাধা ভাঙার কথা; ‘যেখানে শরতের নীলাকাশ-রাতের নক্ষত্রবীথি, এসবের কোন কিছুই ভাড়াতে আনিসনি তুই, তুই মালকিন এসবেরই’ বলে প্রকৃত মালিকানার কথা; ‘বহু বেদনায় শোধ করেছিস এসবের ঋণ, চল তার স্বত্বাধিকার নিবি’ বলে চূড়ান্ত ঘোষণা; এবং ‘ভোর রাতে চালের উপর বেজে উঠলে বৃষ্টির নূপুর’ বলে শেষ প্রতিশ্রুতির অসাধারণ কাব্যচিত্র। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (১৯৩৩-২০২০) একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি। তিনি নাগরিক জীবন, নিঃসঙ্গতা, অস্তিত্বের সংকট ও আধুনিক সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে লিখেছেন। তাঁর কবিতায় সহজ-সরল ভাষায় গভীর ব্যঞ্জনা ও দার্শনিক উপলব্ধি ফুটে উঠেছে। “স্বত্বাধিকার” সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি ভাড়া করা সংসারের মালিকানা প্রশ্নে চিরন্তন সত্য উদঘাটন করেছেন।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়: নাগরিক জীবন ও অস্তিত্বের কবি
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ১৯৩৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন বিশিষ্ট আধুনিক বাঙালি কবি। তিনি নাগরিক জীবন, নিঃসঙ্গতা, অস্তিত্বের সংকট, আধুনিক সম্পর্কের জটিলতা ও ভাড়া করা সংসারের মালিকানা প্রশ্ন নিয়ে লিখেছেন। তাঁর কবিতায় সহজ-সরল ভাষায় গভীর ব্যঞ্জনা ও দার্শনিক উপলব্ধি ফুটে উঠেছে।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘কৃপা করো ছুটি দাও’, ‘দুর্বোধ্য বনপথে’, ‘অন্য নামে ডাকো’, ‘স্বত্বাধিকার’, ‘নির্বাচিত কবিতা’ ইত্যাদি। তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের নাগরিক কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ভাড়া করা সংসারের মালিকানা প্রশ্ন, ‘তুই এসবের মালকিন নোস’ বলে স্বীকারোক্তি, ‘ঘর খালি করে দেবার দিন ভাড়া করা সংসারও খালি করে দিতে হবে’ বলে অস্থায়িত্বের সত্য, ‘কখনো এ নগর তোর হয়, কখনো এ তোর নয়’ বলে অনিশ্চয়তা, ‘সমাবর্তনের ছবিও ভাড়া’ বলে শিক্ষার মালিকানাহীনতা, ‘সুখী গৃহকোণও ভাড়াতে এসেছে’ বলে সুখের অস্থায়িত্ব, ‘তুই যার মালিক নোস তা আঁচলের গিট খুলে রেখে আয়’ বলে সব ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান, এবং ‘বহু বেদনায় শোধ করেছিস এসবের ঋণ, চল তার স্বত্বাধিকার নিবি’ বলে প্রকৃত মালিকানার দাবি। ‘স্বত্বাধিকার’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি ভাড়া করা সংসার ছেড়ে প্রকৃত মালিকানার সন্ধানে যাত্রা শুরু করেছেন।
স্বত্বাধিকার: শিরোনামের তাৎপর্য ও কবিতার পটভূমি
শিরোনাম ‘স্বত্বাধিকার’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘স্বত্বাধিকার’ মানে মালিকানা, অধিকার। কবি এখানে জিজ্ঞাসা করছেন — তোর কীসের উপর সত্যিকারের মালিকানা আছে? সবকিছুই ভাড়া — ঘর, আসবাব, গাড়ি, সুখ, সুযোগ, এমনকি সমাবর্তনের ছবিও ভাড়া। তাহলে তোর সত্যিকারের স্বত্বাধিকার কী? উত্তর — শরতের নীলাকাশ, রাতের নক্ষত্রবীথি, বৃষ্টির নূপুর — এসবেরই তুই মালকিন।
কবিতাটি নাগরিক জীবনের ভাড়া করা সংসারের পটভূমিতে রচিত। কবি একজন নারীকে (তোকে) সম্বোধন করে বলছেন — তুই এসবের মালকিন নোস। সব ভাড়া।
কবি শুরুতে বলছেন — তোকে কেউ হয়তো কখনো বলেছে ‘এইতো এই সবই তোমার, এই ঘর আসবাব ক্রকারি কাটলারি, ওই যে ড্রাইভওয়েতে সিলভার গ্রে সুজুকির গাড়ি।’ এসব আশ্বাসের অন্তমিল ঠিকঠিক মেলেনি, ছন্দ ভেঙে গেছে — তাই যায়। এখন তুই বুঝতে পারিস তুই এসবের মালকিন নোস।
ভাড়াতে এসেছে খাট পালঙ্ক ঠান্ডার মেশিন, ঘর খালি করে দেবার দিন ভাড়া করা সংসারও খালি করে দিয়ে যেতে হবে।
এই নগর রোজ তোকে বলে এই নাও সুযোগ সুবিধা পরিষেবা, এর রাতকে দিন করা আলো, এর স্কুল ছুটির গেটে বাবা-মা দাঁড়িয়ে থাকে, তোমারও ছিল। তবু এ নগরে দিনকে কালো করে কত যে আঁধার ঘনায়। কখনো এ নগর তোর হয়, কখনো এ তোর নয় — কিছুতেই হয় না। সমস্ত মায়ার মালিক তুই নোস।
তোর দেওয়ালে গাউন পড়া হুড মাথায় সমাবর্তনের ছবি, সেই বেশভূষা ভাড়াতেই পাওয়া যায়, ছবি হয়ে রয়েছে কয়েক দশক। তবু তুই তার মালিক নোস। সুখী গৃহকোণও তাই, সুখও বোধকরি — ভাড়াতে এসেছে — আছে। সমাবর্তনের ছবির মতন থাকে দেওয়ালে, সংসারে তারপর যাবার তারিখ এলে চলে যায়।
তুই যার মালিক নোস তা আঁচলের গিট খুলে রেখে আয়। কাঁটাতার ঘেরা তোর কাছে রাখা ছিল, তার কেটে এইবার যাই চল, বেঁকে যায় দুর্বার তরঙ্গিনী জল।
সেইখানে যাই, যেখানে শরতের নীলাকাশ-রাতের নক্ষত্রবীথি। এসবের কোন কিছুই ভাড়াতে আনিসনি তুই, তুই মালকিন এসবেরই। বহু বেদনায় শোধ করেছিস এসবের ঋণ। চল তার স্বত্বাধিকার নিবি।
ভোর রাতে চালের উপর বেজে উঠলে বৃষ্টির নূপুর।
স্বত্বাধিকার: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: ‘এই সবই তোমার’ আশ্বাস ও ‘মালকিন নোস’ স্বীকারোক্তি
“তোকে كেউ হয়তো كখনো বলেছে / ‘এইতো এই সবই তোমার, / এই ঘর আসবাব ক্রকারি কাটলারি, / ওই যে ড্রাইভওয়েতে সিলভার গ্রে সুজুকির গাড়ি।’ / এসব আশ্বাসের অন্তমিল ঠিকঠিক মেলেনি / ছন্দ ভেঙে গেছে – তাই যায় / এখন تুই বুঝতে পারিস / تুই এসবের مالكين نوس”
প্রথম স্তবকে বাহ্যিক আশ্বাস ও বাস্তবের বৈপরীত্য। ‘এই সবই তোমার’ — কেউ বলেছিল। কিন্তু ‘এসব আশ্বাসের অন্তমিল ঠিকঠিক মেলেনি, ছন্দ ভেঙে গেছে’ — সব মিথ্যে প্রমাণিত হয়েছে। ‘এখন তুই বুঝতে পারিস তুই এসবের মালকিন নোস’ — তুই এসবের মালিক নও।
দ্বিতীয় স্তবক: ভাড়া করা আসবাব ও খালি করে দেওয়ার দিন
“ভাড়াতে এসেছে খাট পালঙ্ক ঠান্ডার মেশিন / ঘর খালি করে دেবার দিন / ভাড়া করা সংসারও খালি করে দিয়ে যেতে হবে”
দ্বিতীয় স্তবকে ভাড়া করা সংসারের অস্থায়িত্ব। ‘ভাড়াতে এসেছে খাট পালঙ্ক ঠান্ডার মেশিন’ — সব আসবাব ভাড়া। ‘ঘর খালি করে দেবার দিন’ — যেদিন ঘর খালি করতে হবে। ‘ভাড়া করা সংসারও খালি করে দিয়ে যেতে হবে’ — সংসারও ভাড়া, খালি করে যেতে হবে।
তৃতীয় স্তবক: নগরের সুযোগ-সুবিধা ও আঁধার ঘনানো
“এই নগর رোজ تোকে বলে / এই نাও সুযোগ সুবিধা পরিষেবা / এর রাতকে দিন করা আলো / এর স্কুল ছুটির গেটে বাবা-মা দাঁড়িয়ে থাকে / তোমারও ছিল / تবু এ নগরে দিনকে কালো করে / كت যে আঁধার ঘনায় / كখনো এ নগর তোর হয় / كখনো এ তোর نয় – কিছুতেই হয় না / সমস্ত মায়ার مالك تুই نوس”
তৃতীয় স্তবকে নগরের দ্বৈত চরিত্র। ‘নগর রোজ তোকে বলে নাও সুযোগ সুবিধা পরিষেবা’ — নগর সব দেয়। কিন্তু ‘তবু এ নগরে দিনকে কালো করে কত যে আঁধার ঘনায়’ — অন্ধকারও কম নয়। ‘কখনো এ নগর তোর হয়, কখনো এ তোর নয় — কিছুতেই হয় না’ — নগর কখনো পুরোপুরি নিজের হয় না। ‘সমস্ত মায়ার মালিক তুই নোস’ — সব মায়ার মালিক তুই নও।
চতুর্থ স্তবক: সমাবর্তনের ছবি ও সুখও ভাড়া
“তোর দেওয়ালে গাউن পড়া هود مাথায় / সমাবর্তনের ছবি / সেই বেশভূষা ভাড়াতেই পাওয়া যায় / ছবি হয়ে রয়েছে كয়েক دশক / تবু تুই তার مالك نوس / সুখী گৃহকোণও তাই, সুখও বোধকরি – / ভাড়াতে এসেছে – আছে / সমাবর্তনের ছবির মতن থাকে দেওয়ালে, / সংসারে তারপর যাবার তারিখ এলে چলে যায়”
চতুর্থ স্তবকে সমাবর্তনের ছবি ও সুখের ভাড়া প্রকৃতি। ‘সমাবর্তনের ছবি’ — ডিগ্রির ছবি। ‘সেই বেশভূষা ভাড়াতেই পাওয়া যায়’ — পোশাকও ভাড়া। ‘ছবি হয়ে রয়েছে কয়েক দশক’ — ছবি আছে, কিন্তু মালিকানা নেই। ‘সুখী গৃহকোণও তাই, সুখও বোধকরি — ভাড়াতে এসেছে’ — সুখও ভাড়া। ‘সংসারে তারপর যাবার তারিখ এলে চলে যায়’ — সব চলে যায়।
পঞ্চম ও ষষ্ঠ স্তবক: আঁচলের গিট খুলে রাখা ও কাঁটাতার কেটে যাওয়া
“تুই যার مالك نوس / তা আঁচলের گিট খুলে রেখে আয় / কাঁটাতার ঘেরা তোর কাছে রাখা ছিল / তার كেটে এইবার যাই চল / بেঁকে যায় দুর্বার তরঙ্গিনী জল”
পঞ্চম ও ষষ্ঠ স্তবকে সব ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান। ‘তুই যার মালিক নোস তা আঁচলের গিট খুলে রেখে আয়’ — যার মালিক নও, তা আঁচলের গিট খুলে রেখে দাও। ‘কাঁটাতার ঘেরা তোর কাছে রাখা ছিল, তার কেটে এইবার যাই চল’ — বাধা কাটিয়ে যাত্রা শুরু। ‘বেঁকে যায় দুর্বার তরঙ্গিনী জল’ — জলরাশি বেঁকে যায়।
সপ্তম ও অষ্টম স্তবক: নীলাকাশ ও নক্ষত্রবীথির মালকিন — স্বত্বাধিকার নেওয়া
“সেইখানে যাই / যেখানে শরতের নীলাকাশ-রাতের نক্ষত্রবীথি / এসবের কোন কিছুই ভাড়াতে আনিসনি تুই / تুই مالكين এসবেরই / বহু بেদনায় شোধ করেছিস এসবের ঋণ / চল তার স্বত্বাধিকার نিবি / ভোর রাতে চালের উপর বেজে উঠলে بৃষ্টির نূপুর”
সপ্তম ও অষ্টম স্তবকে প্রকৃত মালিকানার দাবি। ‘সেইখানে যাই যেখানে শরতের নীলাকাশ-রাতের নক্ষত্রবীথি’ — আকাশ ও তারার দেশে। ‘এসবের কোন কিছুই ভাড়াতে আনিসনি তুই’ — এসব ভাড়া নয়। ‘তুই মালকিন এসবেরই’ — এসবের তুই মালকিন। ‘বহু বেদনায় শোধ করেছিস এসবের ঋণ’ — অনেক কষ্ট দিয়ে ঋণ শোধ করেছিস। ‘চল তার স্বত্বাধিকার নিবি’ — এখন তার স্বত্বাধিকার নিতে হবে। ‘ভোর রাতে চালের উপর বেজে উঠলে বৃষ্টির নূপুর’ — বৃষ্টির নূপুর শব্দ হবে।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি গদ্যছন্দে রচিত। লাইন ছোট-বড় মিশ্রিত। ‘এই সবই তোমার’ — ব্যঙ্গাত্মক। ‘মালকিন নোস’ — বাংলা ও ইংরেজি মিশ্রিত বাক্য। ‘ভাড়াতে এসেছে’ — পুনরাবৃত্তি। ‘কখনো এ নগর তোর হয়, কখনো এ তোর নয়’ — দ্বান্দ্বিকতা। ‘সমস্ত মায়ার মালকিন নোস’ — চূড়ান্ত স্বীকারোক্তি। ‘আঁচলের গিট খুলে রেখে আয়’ — চমৎকার চিত্রকল্প। ‘দুর্বার তরঙ্গিনী জল’ — শক্তিশালী প্রতীক। ‘বৃষ্টির নূপুর’ — চমৎকার উপমা।
প্রতীক ব্যবহার অত্যন্ত শক্তিশালী। ‘ঘর আসবাব ক্রকারি কাটলারি, গাড়ি’ — ভাড়া করা সংসারের প্রতীক। ‘ছন্দ ভেঙে যাওয়া’ — আশ্বাসের ব্যর্থতার প্রতীক। ‘মালকিন নোস’ — মালিকানাহীনতার প্রতীক। ‘খাট পালঙ্ক ঠান্ডার মেশিন’ — ভাড়া করা আসবাবের প্রতীক। ‘ঘর খালি করে দেওয়া’ — শেষ পর্যন্ত সব ছেড়ে যাওয়ার প্রতীক। ‘নগরের সুযোগ-সুবিধা’ — আধুনিক সভ্যতার প্রতীক। ‘দিনকে কালো করে আঁধার ঘনানো’ — অন্ধকারের প্রতীক। ‘কখনো তোর হয়, কখনো তোর নয়’ — অনিশ্চয়তার প্রতীক। ‘সমাবর্তনের ছবি’ — শিক্ষা ও ডিগ্রির প্রতীক, যা ভাড়া। ‘সুখও ভাড়া’ — সুখের অস্থায়িত্বের প্রতীক। ‘আঁচলের গিট খুলে রাখা’ — সব ছেড়ে যাওয়ার প্রতীক। ‘কাঁটাতার কেটে যাওয়া’ — বাধা ভাঙার প্রতীক। ‘দুর্বার তরঙ্গিনী জল’ — অপ্রতিরোধ্য শক্তির প্রতীক। ‘শরতের নীলাকাশ-রাতের নক্ষত্রবীথি’ — প্রকৃত মালিকানার প্রতীক, চিরন্তন সৌন্দর্যের প্রতীক। ‘বহু বেদনায় শোধ করা ঋণ’ — কষ্টের মূল্য দেওয়ার প্রতীক। ‘স্বত্বাধিকার নেওয়া’ — প্রকৃত অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতীক। ‘বৃষ্টির নূপুর’ — নতুন জীবনের আগমনীর প্রতীক।
পুনরাবৃত্তি শৈলী অত্যন্ত কার্যকর। ‘মালকিন নোস’ — তিনবার। ‘ভাড়াতে এসেছে’ — তিনবার। ‘কখনো’ — তিনবার।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“স্বত্বাধিকার” সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের এক অসাধারণ সৃষ্টি। তিনি এখানে ভাড়া করা সংসারের মালিকানা প্রশ্নে চিরন্তন সত্য উদঘাটন করেছেন।
প্রথম স্তবকে — ‘এই সবই তোমার’ আশ্বাস ও ‘মালকিন নোস’ স্বীকারোক্তি। দ্বিতীয় স্তবকে — ভাড়া করা আসবাব ও খালি করে দেওয়ার দিন। তৃতীয় স্তবকে — নগরের সুযোগ-সুবিধা ও আঁধার ঘনানো। চতুর্থ স্তবকে — সমাবর্তনের ছবি ও সুখও ভাড়া। পঞ্চম ও ষষ্ঠ স্তবকে — আঁচলের গিট খুলে রাখা ও কাঁটাতার কেটে যাওয়া। সপ্তম ও অষ্টম স্তবকে — নীলাকাশ ও নক্ষত্রবীথির মালকিন — স্বত্বাধিকার নেওয়া।
এই কবিতা আমাদের শেখায় — এই ঘর-আসবাব-গাড়ি সব ভাড়া; ‘মালকিন নোস’ — তুই এসবের মালিক নও; ভাড়া করা সংসার খালি করে দিতে হবে; নগর সুযোগ দেয়, কিন্তু আঁধারও দেয়; কখনো নগর তোর হয়, কখনো হয় না; সমাবর্তনের ছবিও ভাড়া; সুখও ভাড়া; ‘তুই যার মালিক নোস তা আঁচলের গিট খুলে রেখে আয়’; কাঁটাতার কেটে যাই চল; ‘যেখানে শরতের নীলাকাশ-রাতের নক্ষত্রবীথি’ — সেখানেই তোর আসল মালিকানা; ‘বহু বেদনায় শোধ করেছিস এসবের ঋণ, চল তার স্বত্বাধিকার নিবি’; আর ভোর রাতে চালের উপর বেজে উঠবে বৃষ্টির নূপুর।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় ভাড়া করা সংসার ও মালিকানার প্রশ্ন
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় ভাড়া করা সংসার ও মালিকানার প্রশ্ন একটি পুনরাবৃত্ত বিষয়। তিনি ‘স্বত্বাধিকার’ কবিতায় নাগরিক জীবনের ভাড়া করা সংসার ছেড়ে প্রকৃত মালিকানার সন্ধানে যাত্রার অসাধারণ কাব্যিক চিত্র এঁকেছেন। তিনি দেখিয়েছেন — কীভাবে ‘এই সবই তোমার’ আশ্বাস মিথ্যে; কীভাবে ‘তুই এসবের মালকিন নোস’; কীভাবে ‘ভাড়া করা সংসার খালি করে দিতে হবে’; কীভাবে ‘নগর কখনো তোর হয়, কখনো হয় না’; কীভাবে ‘সমাবর্তনের ছবিও ভাড়া’; কীভাবে ‘সুখও ভাড়া’; কীভাবে ‘আঁচলের গিট খুলে রেখে আয়’; কীভাবে ‘কাঁটাতার কেটে যাই চল’; আর কীভাবে ‘শরতের নীলাকাশ-রাতের নক্ষত্রবীথি’র মালকিন হয়ে ‘স্বত্বাধিকার নিতে হবে’।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পাঠ্যক্রমে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘স্বত্বাধিকার’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের নাগরিক জীবন, ভাড়া করা সংসারের অস্থায়িত্ব, মালিকানার প্রশ্ন, আধুনিক সভ্যতার দ্বৈত চরিত্র, এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের দার্শনিক কাব্যভাষা সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে। বিশেষ করে ‘এই সবই তোমার’ আশ্বাস, ‘মালকিন নোস’, ‘ভাড়া করা সংসার খালি করে দিতে হবে’, ‘কখনো এ নগর তোর হয়, কখনো এ তোর নয়’, ‘সমাবর্তনের ছবিও ভাড়া’, ‘সুখও ভাড়া’, ‘আঁচলের গিট খুলে রেখে আয়’, ‘কাঁটাতার কেটে যাই চল’, ‘শরতের নীলাকাশ-রাতের নক্ষত্রবীথি’, ‘বহু বেদনায় শোধ করেছিস এসবের ঋণ’, ‘চল তার স্বত্বাধিকার নিবি’, এবং ‘বৃষ্টির নূপুর’ — এসব বিষয় শিক্ষার্থীদের কাব্যবোধ, নাগরিক চেতনা ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
স্বত্বাধিকার সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: স্বত্বাধিকার কবিতাটির রচয়িতা কে?
এই কবিতাটির রচয়িতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (১৯৩৩-২০২০)। তিনি একজন বিশিষ্ট আধুনিক বাঙালি কবি। তিনি নাগরিক জীবন, নিঃসঙ্গতা, অস্তিত্বের সংকট, আধুনিক সম্পর্কের জটিলতা ও ভাড়া করা সংসারের মালিকানা প্রশ্ন নিয়ে লিখেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘কৃপা করো ছুটি দাও’, ‘দুর্বোধ্য বনপথে’, ‘অন্য নামে ডাকো’, ‘স্বত্বাধিকার’, ‘নির্বাচিত কবিতা’ ইত্যাদি।
প্রশ্ন ২: ‘এই সবই তোমার’ আশ্বাস ও ‘মালকিন নোস’ — এই বৈপরীত্যের তাৎপর্য কী?
কেউ হয়তো বলেছিল ‘এই সবই তোমার’ — ঘর, আসবাব, গাড়ি সব। কিন্তু বাস্তবে ‘তুই এসবের মালকিন নোস’ — তুই এসবের মালিক নও। সব ভাড়া। এটি বাহ্যিক আশ্বাস ও বাস্তবের চরম বৈপরীত্য।
প্রশ্ন ৩: ‘ভাড়া করা সংসারও খালি করে দিয়ে যেতে হবে’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
ঘর ভাড়া, আসবাব ভাড়া, সুখ ভাড়া — সব শেষ পর্যন্ত ফিরিয়ে দিতে হবে। ‘খালি করে দিয়ে যেতে হবে’ — মৃত্যুর আগে সব ছেড়ে যেতে হবে। এটি অস্থায়িত্বের চরম সত্য।
প্রশ্ন ৪: ‘কখনো এ নগর তোর হয়, কখনো এ তোর নয় — কিছুতেই হয় না’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
নগর কখনো পুরোপুরি নিজের হয় না। কিছু সময় মনে হয় নগর আমার, আবার মনে হয় নগর আমার নয়। নাগরিক জীবনের এই অনিশ্চয়তা ও বিচ্ছিন্নতার চিত্র।
প্রশ্ন ৫: ‘সমাবর্তনের ছবিও ভাড়াতেই পাওয়া যায়’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
সমাবর্তনের পোশাক ভাড়া, ডিগ্রি সার্টিফিকেটও এক অর্থে ভাড়া — যা দিয়ে যায়। শিক্ষা, ডিগ্রি, পোশাক — সবই অস্থায়ী।
প্রশ্ন ৬: ‘সুখী গৃহকোণও তাই, সুখও বোধকরি — ভাড়াতে এসেছে’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
সুখও ভাড়া! সুখ চিরস্থায়ী নয়, কিছুদিনের জন্য আসে, তারপর চলে যায়। এটি সুখের অস্থায়িত্বের চরম স্বীকারোক্তি।
প্রশ্ন ৭: ‘তুই যার মালিক নোস তা আঁচলের গিট খুলে রেখে আয়’ — লাইনটির সৌন্দর্য কী?
‘আঁচলের গিট’ — শাড়ির আঁচলের গিঁট। যার মালিক নও, তা আঁচলের গিট খুলে রেখে দাও। এটি সব ছেড়ে যাওয়ার এক চমৎকার ও নারীবাচক চিত্রকল্প।
প্রশ্ন ৮: ‘কাঁটাতার ঘেরা তোর কাছে রাখা ছিল, তার কেটে এইবার যাই চল’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
‘কাঁটাতার ঘেরা’ — বন্দিত্বের প্রতীক। এখন সেই কাঁটাতার কেটে বেরিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে। এটি মুক্তি ও স্বাধীনতার আহ্বান।
প্রশ্ন ৯: ‘বহু বেদনায় শোধ করেছিস এসবের ঋণ, চল তার স্বত্বাধিকার নিবি’ — লাইনটির চূড়ান্ত বার্তা কী?
কবি বলছেন — তুই অনেক কষ্ট দিয়ে সব কিছুর ঋণ শোধ করেছিস। এখন আসল স্বত্বাধিকার নিতে হবে — যেখানে শরতের নীলাকাশ, রাতের নক্ষত্রবীথি — সেখানেই তোর আসল মালিকানা।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
কবিতাটি আমাদের শেখায় — এই ঘর-আসবাব-গাড়ি সব ভাড়া; ‘মালকিন নোস’ — তুই এসবের মালিক নও; ভাড়া করা সংসার খালি করে দিতে হবে; নগর সুযোগ দেয়, কিন্তু আঁধারও দেয়; কখনো নগর তোর হয়, কখনো হয় না; সমাবর্তনের ছবিও ভাড়া; সুখও ভাড়া; ‘তুই যার মালিক নোস তা আঁচলের গিট খুলে রেখে আয়’; কাঁটাতার কেটে যাই চল; ‘যেখানে শরতের নীলাকাশ-রাতের নক্ষত্রবীথি’ — সেখানেই তোর আসল মালিকানা; ‘বহু বেদনায় শোধ করেছিস এসবের ঋণ, চল তার স্বত্বাধিকার নিবি’; আর ভোর রাতে চালের উপর বেজে উঠবে বৃষ্টির নূপুর। এই কবিতাটি আজকের দিনে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক — ভোগবাদী সমাজে মালিকানার ভ্রম, সুখের অস্থায়িত্ব, নগরজীবনের বিচ্ছিন্নতা, এবং প্রকৃত স্বত্বাধিকারের সন্ধান — সবকিছুই চিরন্তন ও সময়োপযোগী বিষয়।
ট্যাগস: স্বত্বাধিকার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের নাগরিক কবিতা, মালকিন নোস, ভাড়া করা সংসার, সমাবর্তনের ছবি ভাড়া, আঁচলের গিট, কাঁটাতার কাটা, শরতের নীলাকাশ, বৃষ্টির নূপুর
© Kobitarkhata.com – কবি: সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় | কবিতার প্রথম লাইন: “তোকে কেউ হয়তো কখনো বলেছে ‘এইতো এই সবই তোমার, এই ঘর আসবাব ক্রকারি কাটলারি, ওই যে ড্রাইভওয়েতে সিলভার গ্রে সুজুকির গাড়ি’” | ভাড়া করা সংসার ও প্রকৃত মালিকানার অমর কবিতা বিশ্লেষণ | সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের নাগরিক কাব্যধারার অসাধারণ নিদর্শন