কবিতার প্রারম্ভেই এক তীব্র সংকোচ এবং ভালোবাসার এক পরম পবিত্র রূপ ফুটে ওঠে। প্রিয়তমাকে স্পর্শ করার এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা থাকা সত্ত্বেও কবি কতবার যে নিজের হাত গুটিয়ে নিয়েছেন, কিংবা মনের গহীন কোণে জমে থাকা ভালোবাসার কথাগুলো মুখে এনেও কতবার যে শেষ পর্যন্ত বলা হয়নি—তা এই জাগতিক পৃথিবীর কেউ জানে না। এই নীরব দ্বিধা, এই না-বলা কথা আর অন্তরের তীব্র দহনের একমাত্র নীরব সাক্ষী হলেন কবির ‘ঈশ্বর’। ভালোবাসাকে হারানোর ভয় এবং প্রিয় মানুষের প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধাবোধ থেকেই এই অব্যক্ত নীরবতার জন্ম।
কবিতার মধ্যভাগে এক নিবিড়, নিঃসঙ্গ ও পরাবাস্তব প্রতীক্ষার চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। প্রিয়তমার হাতের মৃদু কড়া নাড়ার একটুখানি শব্দ শোনার জন্য কবি দরজার সাথে নিজের কান দুটিকে যেন এক অবিনাশী চুম্বকখণ্ডের মতো গেঁথে রেখেছিলেন। কবি রাতের পর রাত জেগে নির্জন মধ্যরাতে এক জাদুকরী দৃশ্যের কল্পনা করেছেন—যেখানে প্রিয়তমা হঠাৎ এসে গভীর অভিমানে ডেকে বলবে, ‘এই যে ওঠো, আমি এসেছি।’ আর সেই অলৌকিক ডাক শুনে কবি এক পরম উল্লাসে ও উন্মাদনায় নিজের সমস্ত অস্তিত্বকে তার উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দেবেন। এই যে মনের ভেতরে একা একা কাল্পনিক সুখের মায়াজাল বোনা এবং এক অসম্ভব মিলনের আশায় পথ চেয়ে থাকা—তার আকুলতা কতখানি তীব্র ছিল, তা কেবল কবির অন্তর্যামী ঈশ্বরই অনুভবোচ্ছল চোখে দেখেছেন।
শেষাংশে এসে কবিতাটি এক পরম আত্মত্যাগ, ক্ষয় এবং জীবন দর্শনে রূপ নেয়। কবি এক চরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে স্বীকার করেছেন যে, এই ভালোবাসার তীব্র বিরহ ও প্রতীক্ষায় তাঁর মাথার চুল পেকেছে, এই অবদমিত আবেগের দহনে তাঁর শরীরে তপ্ত জ্বর এসেছে এবং সময়ের অমোঘ নিয়মে তাঁর জীবনের শেষ পরিণতি বা মৃত্যুও ঘটবে কেবলই সেই প্রিয়তমার বিরহে। জীবনের সমস্ত ক্ষয় ও বিনাশকে কবি পরম আনন্দে বরণ করে নিয়েছেন। কবি এক দৃঢ় ও কালজয়ী প্রত্যয়ে বিশ্বাস করেন যে—আজ প্রিয়তমা তাঁর এই নীরব ভালোবাসা না বুঝলেও, ঈশ্বরের মতো কোনো এক দূরবর্তী দিনে সেও ঠিক জানতে ও অনুভব করতে পারবে যে, এই পৃথিবীতে কবির জন্মই হয়েছিল কেবল তার জন্য, শুধুই তার জন্য। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে প্রেমের এই যে চূড়ান্ত জয়গান এবং এক শাশ্বত সার্থকতা—তার মাঝেই কবিতাটি এক গভীর ও নিমগ্ন সৌন্দর্যে পূর্ণতা লাভ করে।
শুধু তোমার জন্য – নির্মলেন্দু গুণ | নির্মলেন্দু গুণের কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা | প্রেম, ঈশ্বর ও নিবেদনের অসাধারণ কাব্যভাষা
শুধু তোমার জন্য: নির্মলেন্দু গুণের স্পর্শে হাত গুটিয়ে নেওয়া, ভালোবাসার কথা না বলা, দরোজায় কর্ণযুগল গেঁথে রাখা, ওঠো আমি এসেছি বলা, চুল পেকেছে-জ্বর এসেছে-মৃত্যু হবে ও জন্মেছিলাম তোমার জন্য — এই অসাধারণ নিবেদনের কাব্যভাষা
নির্মলেন্দু গুণের “শুধু তোমার জন্য” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য, গভীর ও আত্মনিবেদনের সৃষ্টি। “তোমাকে স্পর্শ করতে গিয়েও কতবার যে আমি / গুটিয়ে নিয়েছি হাত, সে–কথা আমার ঈশ্বর জানেন। / তোমাকে আমার ভালোবাসার কথা বলতে গিয়েও / কতবার যে বলিনি, সে–কথা আমার ঈশ্বর জানেন।” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে স্পর্শ করতে গিয়ে হাত গুটিয়ে নেওয়া, ভালোবাসার কথা না বলা, দরোজার সঙ্গে কর্ণযুগল চুম্বকখণ্ডের মতো গেঁথে রাখা, মধ্যরাতে প্রিয়জনের ‘এই যে ওঠো, আমি এসেছি’ বলার কল্পনা, সেই উল্লাসে নিজেকে ছুঁড়ে দেওয়ার দৃশ্য মনে-মনে কল্পনা, ঈশ্বরের কাছে সবকিছু জানা, চুল পেকেছে-জ্বর এসেছে-মৃত্যু হবে সব কিছু প্রিয়জনের জন্য, এবং শেষ পর্যন্ত ঈশ্বরের মতো একদিন প্রিয়জনও জানবে যে তিনি জন্মেছিলেন প্রিয়জনের জন্য, শুধুই প্রিয়জনের জন্য — এই সব মিলিয়ে এক প্রেম, নিবেদন, ঈশ্বরের সাক্ষী ও আত্মোৎসর্গের গভীর ও বহুমাত্রিক কাব্যচিত্র। নির্মলেন্দু গুণ (জন্ম ১৯৪৫) আধুনিক বাংলা কবিতার এক গুরুত্বপূর্ণ পুরুষ। তিনি প্রেম, নারীমন, একাকীত্ব ও আত্মবিশ্লেষণের কবি হিসেবে পরিচিত। “শুধু তোমার জন্য” তাঁর সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি প্রিয়জনের জন্য সবকিছু নিবেদন করেছেন, এবং ঈশ্বরকে সাক্ষী রেখেছেন।
নির্মলেন্দু গুণ: প্রেম, নিবেদন ও ঈশ্বরের সাক্ষীর কবি
নির্মলেন্দু গুণ ১৯৪৫ সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক। তাঁর কবিতায় প্রেম, নারী, ঈর্ষা, হত্যা, আত্মহত্যা, রহস্য ও আত্মবিশ্লেষণ গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি সহজ-সরল ভাষায় জটিল মনস্তত্ত্ব ও রহস্য প্রকাশে সিদ্ধহস্ত।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’, ‘বিষাদ বারান্দা’, ‘রক্তকলম’, ‘অমর একুশে’ প্রভৃতি।
নির্মলেন্দু গুণের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো — প্রেমের অকথ্য বেদনা ও নিবেদন, স্পর্শ ও ভালোবাসার কথা না বলার দ্বন্দ্ব, ‘ঈশ্বর জানেন’ পুনরাবৃত্তি, দরোজায় কর্ণযুগল গেঁথে রাখার চিত্রকল্প, মধ্যরাতে প্রিয়জনের আসার কল্পনা, ‘জন্মেছিলাম তোমার জন্য, শুধুই তোমার জন্য’ — এই চূড়ান্ত ঘোষণা, এবং সহজ-সরল ভাষায় গভীর আবেগ ও নিবেদন প্রকাশের দক্ষতা। ‘শুধু তোমার জন্য’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি প্রিয়জনের জন্য চুল পেকেছে, জ্বর এসেছে, মৃত্যু হবে, এবং জন্মেছিলাম — সবকিছু নিবেদন করেছেন।
শুধু তোমার জন্য: শিরোনামের তাৎপর্য ও কবিতার পটভূমি
শিরোনাম ‘শুধু তোমার জন্য’ অত্যন্ত তাৎপর্পূর্ণ ও সরল। ‘শুধু তোমার জন্য’ — অর্থাৎ কবির সবকিছু — স্পর্শ না করা, কথা না বলা, চুল পাকা, জ্বর, মৃত্যু, এমনকি জন্ম — সবই প্রিয়জনের জন্য। এটি একটি চরম নিবেদনের কবিতা।
কবি শুরুতে বলছেন — তোমাকে স্পর্শ করতে গিয়েও কতবার যে আমি গুটিয়ে নিয়েছি হাত, সে-কথা আমার ঈশ্বর জানেন। তোমাকে আমার ভালোবাসার কথা বলতে গিয়েও কতবার যে বলিনি, সে-কথা আমার ঈশ্বর জানেন।
তোমার হাতের মৃদু কড়া-নাড়ার শব্দ শুনবার জন্য দরোজার সঙ্গে চুম্বকখণ্ডের মতো আমার কর্ণযুগলকে গেঁথে রেখেছিলাম। কোনো নির্জন মধ্যরাতে তুমি এসে ভেবে বলবে : ‘এই যে ওঠো, আমি এসেছি, আ–মি।’ আর আমি এ-কী শুনলাম, এ-কী শুনলাম, এমৎ উল্লাসে নিজেকে ছুঁড়ে দিচ্ছি তোমার উদ্দেশ্যে—ঠিক এরকম একটি দৃশ্যের কথা কতবার যে আমি মনে-মনে কল্পনা করেছি, সে-কথা শুধু আমার ঈশ্বর জানেন।
আমার ঈশ্বর জানেন, আমার চুল পেকেছে তোমার জন্য, আমার ঈশ্বর জানেন, আমার জ্বর এসেছে তোমার জন্য, আমার ঈশ্বর জানেন, আমার মৃত্যু হবে তোমার জন্য। তারপর ঐ ঈশ্বরের মতো কোনো-একদিন তুমিও জানবে, আমি জন্মেছিলাম তোমার জন্য, শুধুই তোমার জন্য।
শুধু তোমার জন্য: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: স্পর্শ করতে গিয়ে হাত গুটিয়ে নেওয়া, ভালোবাসার কথা না বলা — ঈশ্বর জানেন
“তোমাকে স্পর্শ করতে গিয়েও কতবার যে আমি / গুটিয়ে নিয়েছি হাত, সে–কথা আমার ঈশ্বর জানেন। / তোমাকে আমার ভালোবাসার কথা বলতে গিয়েও / কতবার যে বলিনি, সে–কথা আমার ঈশ্বর জানেন।”
প্রথম স্তবকে অকথ্য প্রেমের দ্বন্দ্ব। ‘স্পর্শ করতে গিয়ে হাত গুটিয়ে নেওয়া’ — ভয়, সংকোচ, লজ্জা, অথবা অসম্মানের ভয়। ‘ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে বলা না’ — অভিব্যক্তির ব্যর্থতা। ‘ঈশ্বর জানেন’ — একমাত্র ঈশ্বরই সাক্ষী।
দ্বিতীয় স্তবক: দরোজায় কর্ণযুগল চুম্বকখণ্ডের মতো গেঁথে রাখা, মধ্যরাতে প্রিয়জনের আসার কল্পনা, উল্লাসে নিজেকে ছুঁড়ে দেওয়ার দৃশ্য মনে-মনে কল্পনা
“তোমার হাতের মৃদু কড়া-নাড়ার শব্দ শুনবার জন্য / দরোজার সঙ্গে চুম্বকখণ্ডের মতো আমার কর্ণযুগলকে / গেঁথে রেখেছিলাম। কোনো নির্জন মধ্যরাতে তুমি এসে / ভেবে বলবে : ‘এই যে ওঠো, আমি এসেছি, আ–মি।’ / আর আমি এ–কী শুনলাম, এ–কী শুনলাম, এমৎ উল্লাসে / নিজেকে ছুঁড়ে দিচ্ছি তোমার উদ্দেশ্যে–ঠিক এরকম / একটি দৃশ্যের কথা কতবার যে আমি মনে-মনে / কল্পনা করেছি, সে-কথা শুধু আমার ঈশ্বর জানেন।”
দ্বিতীয় স্তবকে অপেক্ষা ও কল্পনা। ‘দরোজার সঙ্গে চুম্বকখণ্ডের মতো কর্ণযুগল গেঁথে রাখা’ — চুম্বকের মতো কান দরোজায় লাগিয়ে রাখা, প্রিয়জনের ডাক শোনার জন্য। ‘মধ্যরাতে প্রিয়জনের আসা ও ‘এই যে ওঠো’ বলা’ — রোমান্টিক কল্পনা। ‘উল্লাসে নিজেকে ছুঁড়ে দেওয়া’ — উত্তেজনা ও উন্মাদনা। ‘ঈশ্বর জানেন’ — কল্পনার সাক্ষী।
তৃতীয় স্তবক: চুল পেকেছে-জ্বর এসেছে-মৃত্যু হবে — সব তোমার জন্য, জন্ম ছিলাম তোমার জন্য
“আমার ঈশ্বর জানেন, আমার চুল পেকেছে তোমার জন্য, / আমার ঈশ্বর জানেন, আমার জ্বর এসেছে তোমার জন্য, / আমার ঈশ্বর জানেন, আমার মৃত্যু হবে তোমার জন্য। / তারপর ঐ ঈশ্বরের মতো কোনো-একদিন তুমিও জানবে, / আমি জন্মেছিলাম তোমার জন্য, শুধুই তোমার জন্য।”
তৃতীয় স্তবকে চূড়ান্ত নিবেদন। ‘চুল পেকেছে’ — বার্ধক্য, সময়ের ক্ষয়। ‘জ্বর এসেছে’ — শারীরিক কষ্ট, অসুস্থতা। ‘মৃত্যু হবে’ — জীবনের শেষ। সবই ‘তোমার জন্য’। ‘ঈশ্বরের মতো তুমিও জানবে’ — প্রিয়জনও একদিন ঈশ্বরের মতো জানবে। ‘জন্মেছিলাম তোমার জন্য, শুধুই তোমার জন্য’ — পুরো জীবন প্রিয়জনের জন্য নিবেদিত।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি তিনটি স্তবকে বিভক্ত। প্রথম স্তবক ৪ লাইন, দ্বিতীয় ৮ লাইন, তৃতীয় ৫ লাইন। মুক্তছন্দ, গদ্যকাব্যের ধাঁচে লেখা। ভাষা সরল, প্রাঞ্জল, আবেগঘন ও নিবেদনময়।
প্রতীক ব্যবহারে অসাধারণ। ‘স্পর্শ করতে গিয়ে হাত গুটিয়ে নেওয়া’ — ভয়, সংকোচ, অসম্মানের ভয়। ‘ভালোবাসার কথা না বলা’ — অভিব্যক্তির ব্যর্থতা। ‘ঈশ্বর জানেন’ — সর্বজ্ঞ সাক্ষী। ‘চুম্বকখণ্ডের মতো কর্ণযুগল দরোজায় গেঁথে রাখা’ — প্রিয়জনের ডাক শোনার জন্য অস্থির অপেক্ষা। ‘মধ্যরাতে প্রিয়জনের আসা’ — রোমান্টিক স্বপ্ন। ‘উল্লাসে নিজেকে ছুঁড়ে দেওয়া’ — উন্মাদনা ও আত্মসমর্পণ। ‘চুল পেকেছে, জ্বর এসেছে, মৃত্যু হবে’ — জীবনের সব কষ্ট প্রিয়জনের জন্য। ‘ঈশ্বরের মতো তুমিও জানবে’ — প্রিয়জনও সর্বজ্ঞ হবে। ‘জন্মেছিলাম তোমার জন্য, শুধুই তোমার জন্য’ — চূড়ান্ত নিবেদন।
পুনরাবৃত্তি কৌশল — ‘ঈশ্বর জানেন’ — প্রথম স্তবকে দুইবার, দ্বিতীয় স্তবকে একবার, তৃতীয় স্তবকে তিনবার (মোট ৬ বার)। ‘তোমার জন্য’ — তৃতীয় স্তবকে ৫ বার, শেষে ‘শুধুই তোমার জন্য’।
শেষের ‘আমি জন্মেছিলাম তোমার জন্য, শুধুই তোমার জন্য’ — একটি চমৎকার ও নিবেদনপূর্ণ সমাপ্তি।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“শুধু তোমার জন্য” নির্মলেন্দু গুণের এক অসাধারণ সৃষ্টি। তিনি এখানে প্রিয়জনকে স্পর্শ করতে না পারা, ভালোবাসার কথা না বলা, দরোজায় কান পেতে রাখা, মধ্যরাতে প্রিয়জনের আসার কল্পনা, উল্লাসে নিজেকে ছুঁড়ে দেওয়ার দৃশ্য মনে-মনে কল্পনা, চুল পেকেছে-জ্বর এসেছে-মৃত্যু হবে সব প্রিয়জনের জন্য, এবং শেষ পর্যন্ত জন্মেছিলাম প্রিয়জনের জন্য — এই সব মিলিয়ে এক প্রেম, নিবেদন ও আত্মোৎসর্গের চিত্র এঁকেছেন।
প্রথম স্তবকে — অকথ্য প্রেম ও ঈশ্বরের সাক্ষী। দ্বিতীয় স্তবকে — অপেক্ষা ও কল্পনা। তৃতীয় স্তবকে — জীবনের সব কষ্ট ও জন্ম নিবেদন।
এই কবিতা আমাদের শেখায় — প্রেমে স্পর্শ ও কথা বলা সহজ নয়। অনেকে প্রিয়জনকে স্পর্শ করতে গিয়ে হাত গুটিয়ে নেয়, ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে থেমে যায়। তারা অপেক্ষা করে, কল্পনা করে, আর ঈশ্বরকে সাক্ষী রাখে। তারা প্রিয়জনের জন্য চুল পাকে, জ্বর আসে, মৃত্যু হয়, এমনকি জন্মও হয় প্রিয়জনের জন্য। শেষ পর্যন্ত প্রিয়জনও ঈশ্বরের মতো জানবে — তিনি জন্মেছিলেন শুধু প্রিয়জনের জন্য। এটি এক চরম নিবেদন ও প্রেমের অসীমতা।
নির্মলেন্দু গুণের কবিতায় প্রেম, নিবেদন ও ঈশ্বরের সাক্ষী
নির্মলেন্দু গুণের কবিতায় প্রেম ও নিবেদন একটি পুনরাবৃত্ত বিষয়। তিনি ‘শুধু তোমার জন্য’ কবিতায় ‘ঈশ্বর জানেন’ পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে প্রেমের গোপনীয়তা ও গভীরতা প্রকাশ করেছেন। তিনি প্রিয়জনের জন্য চুল পাকা, জ্বর, মৃত্যু ও জন্ম — সবকিছু নিবেদন করেছেন।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের পাঠ্যক্রমে নির্মলেন্দু গুণের ‘শুধু তোমার জন্য’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের অকথ্য প্রেম, নিবেদন, ঈশ্বরের সাক্ষী, চুম্বকখণ্ডের প্রতীক, এবং সহজ-সরল ভাষায় গভীর আবেগ প্রকাশের কৌশল সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে।
শুধু তোমার জন্য সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: ‘শুধু তোমার জন্য’ কবিতাটির লেখক কে?
এই কবিতাটির লেখক নির্মলেন্দু গুণ (জন্ম ১৯৪৫)। তিনি বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।
প্রশ্ন ২: ‘স্পর্শ করতে গিয়ে হাত গুটিয়ে নেওয়া’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
প্রিয়জনকে স্পর্শ করতে গিয়েও ভয়, সংকোচ, অথবা অসম্মানের ভয়ে হাত গুটিয়ে নেওয়া। প্রেমের অকথ্য বেদনা।
প্রশ্ন ৩: ‘ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে বলা না’ — কী বোঝায়?
প্রেম প্রকাশের ব্যর্থতা, ভয়, অথবা সময়ের অপেক্ষা।
প্রশ্ন ৪: ‘ঈশ্বর জানেন’ — পুনরাবৃত্তির তাৎপর্য কী?
‘ঈশ্বর জানেন’ পুনরাবৃত্তি প্রেমের গোপনীয়তা ও গভীরতা প্রকাশ করে। একমাত্র ঈশ্বরই স্পর্শ না করা, কথা না বলা, কল্পনা — সবকিছুর সাক্ষী।
প্রশ্ন ৫: ‘চুম্বকখণ্ডের মতো কর্ণযুগল দরোজায় গেঁথে রাখা’ — কী বোঝায়?
প্রিয়জনের ডাক শোনার জন্য অস্থির অপেক্ষা। চুম্বকের মতো কান দরোজায় লাগিয়ে রাখা — প্রেমের তীব্র আকাঙ্ক্ষা।
প্রশ্ন ৬: ‘মধ্যরাতে প্রিয়জনের ‘এই যে ওঠো, আমি এসেছি’ বলা’ — কী বোঝায়?
প্রেমের সবচেয়ে রোমান্টিক কল্পনা — প্রিয়জন রাতে এসে ডাকবে, আর তিনি উল্লাসে নিজেকে ছুঁড়ে দেবেন।
প্রশ্ন ৭: ‘চুল পেকেছে তোমার জন্য, জ্বর এসেছে তোমার জন্য, মৃত্যু হবে তোমার জন্য’ — কী বোঝায়?
জীবনের সব কষ্ট — বার্ধক্য, অসুস্থতা, মৃত্যু — সব প্রিয়জনের জন্য নিবেদিত।
প্রশ্ন ৮: ‘ঈশ্বরের মতো তুমিও জানবে’ — কী বোঝায়?
প্রিয়জনও একদিন সর্বজ্ঞ হবে, ঈশ্বরের মতো সব জানবে — কবির সব নিবেদন সম্পর্কে।
প্রশ্ন ৯: ‘আমি জন্মেছিলাম তোমার জন্য, শুধুই তোমার জন্য’ — শেষ লাইনের তাৎপর্য কী?
এটি চূড়ান্ত নিবেদন ও প্রেমের চরম ঘোষণা। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সব কিছু প্রিয়জনের জন্য।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
কবিতাটি আমাদের শেখায় — প্রেমে স্পর্শ ও কথা বলা সহজ নয়। অনেকে প্রিয়জনকে স্পর্শ করতে গিয়ে হাত গুটিয়ে নেয়, ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে থেমে যায়। তারা অপেক্ষা করে, কল্পনা করে, আর ঈশ্বরকে সাক্ষী রাখে। তারা প্রিয়জনের জন্য চুল পাকে, জ্বর আসে, মৃত্যু হয়, এমনকি জন্মও হয় প্রিয়জনের জন্য। শেষ পর্যন্ত প্রিয়জনও ঈশ্বরের মতো জানবে — তিনি জন্মেছিলেন শুধু প্রিয়জনের জন্য। এটি এক চরম নিবেদন ও প্রেমের অসীমতা।
ট্যাগস: শুধু তোমার জন্য, নির্মলেন্দু গুণ, নির্মলেন্দু গুণের কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, প্রেম ও নিবেদন, ঈশ্বর জানেন, চুম্বকখণ্ড, চুল পেকেছে, জ্বর এসেছে, মৃত্যু হবে, জন্মেছিলাম তোমার জন্য, বাংলা কবিতা বিশ্লেষণ
© Kobitarkhata.com – কবি: নির্মলেন্দু গুণ | কবিতার প্রথম লাইন: “তোমাকে স্পর্শ করতে গিয়েও কতবার যে আমি / গুটিয়ে নিয়েছি হাত, সে–কথা আমার ঈশ্বর জানেন। / তোমাকে আমার ভালোবাসার কথা বলতে গিয়েও / কতবার যে বলিনি, সে–কথা আমার ঈশ্বর জানেন।” | প্রেম, ঈশ্বর ও নিবেদনের অসাধারণ কাব্যভাষা | আধুনিক বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন