কবিতার খাতা
বর্ষাতি – রুদ্র গোস্বামী।
তুই গুটিয়ে রেখেছিস বর্ষাতি
ফিরতি রাস্তা গলি সব শুনশান
এ পাড়াতে বৃষ্টি এলে আজও
আমি ভিজিয়ে রাখি তোর ডাকনাম।
আমি ভিজিয়ে রাখি তোর ডাকনাম
ফিরতি রাস্তার স্মৃতি সব টুকটাক
একদিন ফিরে এসে দেখে যাস
তোর গিফটকার্ড যত্নে আছে
ঠিকঠাক।
তোর গিফটকার্ড যত্নে আছে
ঠিকঠাক।
আছে শহরের ধুলো ধোঁয়া গল্প
তোর রুমালে জল আঁকা
টিপসই।
এত যত্নে কে রাখত বল তো
এত যত্নে কে রাখত বল তো
তোর অভিমান তর্ক লেগপুল
ঝগড়া পেরিয়ে গেলে পিছুডাক
তোর অন্যায় আব্দার
ঠিকভুল
তোর অন্যায় আব্দার
ঠিকভুল পিছুটান
পিছুডাক গল্প
তোর রুমালে জল আঁকা
টিপসই
এত যত্নে কে রাখবে বল তো
এত যত্নে কে রাখবে বল তো।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। রুদ্র গোস্বামীর কবিতা।
কবিতার কথা-
কবি রুদ্র গোস্বামীর ‘বর্ষাতি’ কবিতাটি অতীত যাপন, বিচ্ছেদের পর একাকীত্ব, স্মৃতির অবিচ্ছদ্য নস্টালজিয়া এবং প্রিয় মানুষের রেখে যাওয়া টুকরো অনুষঙ্গগুলোকে পরম মমতায় আগলে রাখার এক সুরময় ও মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান। কবিতার গঠনটি এক অদ্ভুত বৃত্তাকার আবর্তনে তৈরি, যেখানে কিছু আবেগঘন পঙ্ক্তি বারবার ঘুরেফিরে এসে বিরহের তীব্রতাকে আরও গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে। ‘বর্ষাতি’ বা রেইনকোট এখানে কেবল বৃষ্টি থেকে বাঁচার পোশাক নয়, বরং তা প্রিয় মানুষের নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া বা আড়াল করে নেওয়ার এক নীরব রূপক।
কবিতার প্রারম্ভেই এক নিঃসঙ্গ নাগরিক ও স্মৃতিকাতর আবহের সৃষ্টি হয়। প্রিয়তমা আজ কবির জীবন থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে, ঠিক যেমন বর্ষা শেষে মানুষ তার বর্ষাতি বা রেইনকোট গুটিয়ে একপাশে রেখে দেয়। সে চলে যাওয়ার পর ফেরার চেনা রাস্তা আর গলিগুলো আজ একদম জনমানবহীন, নিস্তব্ধ ও শুনশান। কিন্তু কবির হৃদয় আজও সেই অতীতেই থমকে আছে। এই চেনা শহরে আজও যখন নতুন করে বৃষ্টি নামে, তখন কবি চেনা বৃষ্টির জলে নিজে ভেজার চেয়ে বেশি পরম যত্নে ভিজিয়ে রাখেন প্রিয়তমার সেই মায়াবী ‘ডাকনাম’। মানুষের নাম যখন স্মৃতির মেঘে ভিজে ওঠে, তখন বিচ্ছেদের কষ্টগুলো আরও বেশি সজীব হয়ে ওঠে।
কবিতার মধ্যভাগে এক নিবিড় অধিকারবোধ এবং ভালোবাসার উপহার ও স্মৃতিচিহ্নগুলোকে আগলে রাখার এক নিখাদ চিত্র ফুটে ওঠে। কবি ফেলে আসা রাস্তার সেই টুকটাক স্মৃতি আর প্রিয়তমার দেওয়া উপহার বা গিফটকার্ডগুলো আজও অবিকল আগের মতোই যত্ন করে সাজিয়ে রেখেছেন। কবি এক গভীর অভিমানে প্রিয়তমাকে আহ্বান জানিয়ে বলেন, সে যেন অন্তত একদিনের জন্য হলেও ফিরে এসে দেখে যায় যে তার দেওয়া স্মৃতিগুলো কতখানি অক্ষত আছে। এই ইট-পাথরের শহরের ধুলো, ধোঁয়া আর চেনা গল্পের ভিড়ে আজও মিশে আছে প্রিয়তমার ব্যবহৃত রুমাল আর তাতে লেগে থাকা তার ভেজা জলের টিপসই। কবি নিজেকে প্রশ্ন করেন, এই স্বার্থপর পৃথিবীতে এতখানি নিপুণ যত্নে আর কে তাকে মনে রাখত!
শেষাংশে এসে কবিতাটি এক পরম আর্তি, ব্যাকুলতা এবং এক অপরিবর্তনীয় সত্যে গিয়ে থিতু হয়। কবির মনে পড়ে প্রিয়তমার সেই ছোটখাটো অভিমান, কারণে-অকারণে করা তর্ক, মিষ্টি লেগপুলিং বা ক্ষ্যাপানো এবং সমস্ত রাগ-ঝগড়া পেরিয়ে যাওয়ার পর মনের ভেতরের সেই অবাধ্য পিছুডাক। ভালোবাসার মানুষের করা সমস্ত অন্যায় আবদার, তার জীবনের সব ঠিকভুল, সমস্ত পিছুটান আর গল্পগুলোকে কবি নিজের অস্তিত্বের অংশ করে নিয়েছেন। কবিতার শেষ চরণে এক বুক হাহাকার আর তীব্র আত্মবিশ্বাস নিয়ে কবি যখন বারবার উচ্চারণ করেন—”এত যত্নে কে রাখবে বল তো”—তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে, প্রিয়তমা দূরে চলে গেলেও কবির চেয়ে বেশি নিখাদ ও পবিত্র মমতায় এই পৃথিবীতে তাকে আর কেউ ভালোবাসেনি এবং বাসবেও না। এই অন্তহীন অপেক্ষা আর অব্যক্ত ভালোবাসার মাঝেই কবিতাটি পূর্ণতা লাভ করে।






