কবিতার খাতা
রবীন্দ্রনাথ – আল মাহমুদ।
“এ কেমন অন্ধকার বঙ্গদেশ উত্থান রহিত
নৈশব্দের মন্ত্রে যেন ডালে আর পাখিও বসে না।
নদীগুলো দুঃখময়, নির্পতগ মাটিতে জন্মায়
কেবল ব্যাঙের ছাতা, অন্যকোন শ্যামলতা নেই।
বুঝি না, রবীন্দ্রনাথ কী ভেবে যে বাংলাদেশে ফের
বৃক্ষ হয়ে জন্মাবার অসম্ভব বাসনা রাখতেন।
গাছ নেই নদী নেই অপুষ্পক সময় বইছে
পুনর্জন্ম নেই আর, জন্মের বিরুদ্ধে সবাই
শুনুন, রবীন্দ্রনাথ আপনার সমস্ত কবিতা
আমি যদি পুঁতে রেখে দিনরাত পানি ঢালতে থাকি
নিশ্চিত বিশ্বাস এই, একটিও উদ্ভিদ হবে না
আপনার বাংলাদেশ এ রকম নিষ্ফলা, ঠাকুর!
অবিশ্বস্ত হাওয়া আছে, নেই কোন শব্দের দ্যোতনা,
দু’একটা পাখি শুধু অশত্থের ডালে বসে আজও
সঙ্গীতের ধ্বনি নিয়ে ভয়ে ভয়ে বাক্যালাপ করে;
বৃষ্টিহীন বোশেখের নিঃশব্দ পঁচিশ তারিখে।”
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। আল মাহমুদের কবিতা।
কবিতার কথা –
আল মাহমুদের ‘রবীন্দ্রনাথ’ কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের দুই ভিন্ন সময়ের দুই প্রধান কবির এক কাল্পনিক অথচ তীব্র সংলাপের মতো। এখানে কবি আল মাহমুদ আধুনিক বাংলাদেশের এক রুক্ষ, প্রাণহীন এবং সাংস্কৃতিক বন্ধ্যাত্বের চিত্র তুলে ধরেছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই বিখ্যাত আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে, যেখানে রবীন্দ্রনাথ এই বাংলায় বারবার ফিরে আসার বাসনা করেছিলেন। কবিতার শুরুতে এক ভয়াবহ অন্ধকারের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, যেখানে বঙ্গদেশ যেন তার মেরুদণ্ড হারিয়ে ফেলেছে এবং কোনো এক নীরবতার মন্ত্রে চারপাশ নিথর হয়ে আছে। কবি অত্যন্ত ক্ষোভ এবং বেদনার সাথে লক্ষ্য করেছেন যে, এখনকার বাংলার প্রকৃতিতে আর সেই চিরচেনা মাধুর্য নেই; নদীগুলো আজ দুঃখের আধার, আর উর্বর মাটিতে শ্যামলতার বদলে কেবল আগাছা বা ব্যাঙের ছাতা জন্মায়। এই চিত্রকল্পের মাধ্যমে কবি মূলত একটি জাতির নৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়কে ফুটিয়ে তুলেছেন। যেখানে প্রাণচাঞ্চল্য থাকার কথা ছিল, সেখানে আজ কেবল স্থবিরতা। কবির ভাষায় এটি এমন এক ‘নিস্পতগ’ বা পতঙ্গহীন ভূমি, যেখানে প্রাণের কোনো স্পন্দন নেই। রবীন্দ্রনাথের সেই ‘সোনার বাংলা’ আজ কবির চোখে এক শ্রীহীন এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন জনপদ, যেখানে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মগুলোও যেন থমকে দাঁড়িয়েছে।
দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে কবি সরাসরি রবীন্দ্রনাথের পুনর্জন্মের বাসনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কবিতায় বারবার ব্যক্ত করেছিলেন যে, তিনি যদি পুনরায় জন্ম নেন, তবে যেন এই বাংলার কোনো বৃক্ষ বা লতারূপে ফিরে আসেন। আল মাহমুদ এই আকাঙ্ক্ষাকে ‘অসম্ভব বাসনা’ বলে অভিহিত করেছেন। কবির মতে, বর্তমান বাংলাদেশ আর সেই বৃক্ষলতায় শোভিত সবুজ ভূমি নেই; এখানে বইছে ‘অপুষ্পক সময়’, যা কোনো ফুল ফোটাতে জানে না। এই সময়ের মানুষ এবং সমাজ যেন সৃষ্টির বিরুদ্ধে, জন্মের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। কবির এই হাহাকার কেবল পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, বরং মানুষের সৃজনশীলতা এবং ভালোবাসার অভাবকেই ইঙ্গিত করে। কবি এতটাই নিরাশ যে তিনি রবীন্দ্রনাথকে সোজাসুজি জানিয়ে দিচ্ছেন যে, তাঁর সমস্ত কবিতা যদি যত্ন করে মাটিতে পুঁতে রাখা হয় এবং সেখানে দিনরাত পানি ঢালা হয়, তবুও সেখান থেকে কোনো প্রাণের অঙ্কুরোদগম হবে না। কারণ, এই মাটি এখন ‘নিষ্ফলা’। রবীন্দ্রনাথের শব্দমালা বা দর্শনকে ধারণ করার মতো সেই উর্বরতা বর্তমান বাংলাদেশের নেই। ‘ঠাকুর’ সম্বোধনের মধ্য দিয়ে এখানে যেমন এক ধরণের গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশিত হয়েছে, তেমনি এক গভীর অভিমান এবং অভিযোগও মূর্ত হয়েছে যে, যে দেশ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ এত স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা আজ এক বন্ধ্যা ভূমিতে পরিণত হয়েছে।
শেষ অংশে কবি বর্তমান সময়ের এক ভয়ার্ত এবং অবিশ্বস্ত পরিবেশের বর্ণনা দিয়েছেন। বাতাসের ওপর মানুষের আর বিশ্বাস নেই, শব্দের সেই পুরনো দ্যোতনা বা গভীরতা আজ হারিয়ে গেছে। দু-একটা পাখি আজও অশত্থের ডালে বসে ঠিকই, কিন্তু তারা গান গায় না, বরং এক ধরণের আতঙ্ক আর সংশয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে বাক্যালাপ করে। সঙ্গীতের সেই মুক্ত প্রবাহ আজ ভয়ের সংস্কৃতির নিচে চাপা পড়ে গেছে। কবিতার শেষ পংক্তিটি অত্যন্ত প্রতীকী—‘বৃষ্টিহীন বোশেখের নিঃশব্দ পঁচিশ তারিখে’। পঁচিশে বৈশাখ রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন, যা সাধারণত উৎসব আর আনন্দের দিন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কবির চোখে সেই দিনটি আজ শুষ্ক, বৃষ্টিহীন এবং নিস্তব্ধ। উৎসবের বদলে সেখানে এক ধরণের গুমোট নীরবতা বিরাজ করছে। আল মাহমুদ এখানে বোঝাতে চেয়েছেন যে, রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন পালিত হলেও তাঁর আদর্শ বা সেই প্রাণবন্ত বাংলার চেতনা আজ মৃত। এই দীর্ঘ বিশ্লেষণে এটি স্পষ্ট হয় যে, কবিতাটি মূলত রবীন্দ্র-চেতনার সাথে আধুনিক বাংলাদেশের এক বিরাট বিচ্ছেদকে নির্দেশ করে। এটি একটি জাতির আত্মিক সংকটের দলিল, যেখানে স্রষ্টা এবং সৃষ্টির মধ্যে কোনো সংযোগ অবশিষ্ট নেই। কবি এখানে এক চরম হতাশা থেকে রবীন্দ্রনাথকে বলছেন যে, এই নিষ্ফলা বঙ্গদেশে তাঁর প্রত্যাবর্তনের বাসনা এখন কেবলই এক অলীক স্বপ্ন মাত্র। এভাবে আল মাহমুদ তাঁর শক্তিশালী শব্দশৈলীর মাধ্যমে এক রূঢ় বাস্তবতাকে রবীন্দ্রনাথের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন।






