কবিতার খাতা
বালিতে মিনারে – শ্রীজাত।
বালিতে মিনারে চুমোচুমি হোক, ক্ষতি কী।
শহরের পাশে মরুভূমি হোক। ক্ষতি কী।
তর্কের আগে শব্দেরা দল বেছে নিক।
কিছু আমি হোক, কিছু তুমি হোক… ক্ষতি কী।
আকাশ যেখানে চার বেলা রং বদলায়,
চেহারাগুলোও মরসুমি হোক, ক্ষতি কী।
শহরে শহরে শিশু মরে যাক অবিরাম…
ইতিহাস ভাঙা ঝুমঝুমি হোক, ক্ষতি কী।
রবীন্দ্রনাথ জিরোন না-হয় দুটো দিন
আজ সন্ধেয় কিছু রুমি হোক, ক্ষতি কী।
একলা দুপুর, ফকির বনলে নেই দোষ।
রাতও একাকীর। বোষ্টুমি হোক। ক্ষতি কী।
রোজ বিছানায় ফিরে যেতে ভাল লাগে না…
এবার, শ্রীজাত, শেষঘুমই হোক, ক্ষতি কী।
বালিতে মিনারে চুমোচুমি হোক, ক্ষতি কী।
শহরের পাশে মরুভূমি হোক। ক্ষতি কী।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। শ্রীজাতের কবিতা।
কবিতার কথা —
শ্রীজাতর ‘বালিতে মিনারে’ কবিতাটি আধুনিক জীবনের এক অস্থিরতা, বৈপরীত্য এবং গভীর এক অস্তিত্ববাদী সংকটের শৈল্পিক ইশতেহার। গজলের আঙ্গিকে রচিত এই কবিতায় ‘ক্ষতি কী’—এই শব্দবন্ধটি কেবল একটি জিজ্ঞাসাচিহ্ন নয়, বরং এটি এক ধরণের নিস্পৃহতা ও অবক্ষয়ের চূড়ান্ত রূপক। কবিতার শুরুতেই কবি বালি আর মিনারের মতো দুটি ভিন্ন মেরুর মিলন ঘটাতে চেয়েছেন। বালি যেখানে প্রবহমান ও ক্ষণস্থায়ী, মিনার সেখানে স্থির ও ঐতিহ্যের প্রতীক। শহরের পাশে মরুভূমি হওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা, তা আসলে সভ্যতার সেই রুক্ষতা ও রিক্ততাকেই নির্দেশ করে যা আমরা প্রতিনিয়ত আধুনিক জীবনের নামে বয়ে বেড়াচ্ছি। কবি এখানে এক ধরণের ধ্বংসাত্মক উদাসীনতাকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন, যেখানে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হলেও নাগরিক মানুষের কিছু যায় আসে না।
কবিতার দ্বিতীয় স্তবকে শ্রীজাত এক সূক্ষ্ম আত্মজৈবনিক দ্বন্দ্বে প্রবেশ করেছেন। তর্কের আগে শব্দের দল বেছে নেওয়া আসলে মানুষের আত্মকেন্দ্রিকতাকে ইঙ্গিত করে। যেখানে ‘আমি’ আর ‘তুমি’র মাঝে বিভাজনটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, সেখানে ঐক্যের চেয়ে পৃথক অস্তিত্বই প্রাধান্য পায়। আকাশ যেমন রং বদলায়, তেমনি মানুষের চেহারাগুলোও যদি ঋতুভেদে বা প্রয়োজনে বদলে যায়, তবে তাতেও কবির আর কোনো আপত্তি নেই। এই ‘মরসুমি চেহারা’ আসলে বর্তমান সময়ের সুবিধাবাদী ও মুখোশধারী মানুষের এক নিপুণ প্রতিচ্ছবি। মানুষের চারিত্রিক দৃঢ়তা আজ বিলুপ্তপ্রায়, আর এই অবক্ষয়কে কবি এক ধরণের তাচ্ছিল্যের সাথে গ্রহণ করেছেন।
কবিতার সবচেয়ে বীভৎস ও মেরুদণ্ড কাঁপিয়ে দেওয়া অংশটি হলো শিশুদের মৃত্যু এবং ইতিহাসের ভাঙন। ‘শহরে শহরে শিশু মরে যাক অবিরাম’—এই চরম নিষ্ঠুর পঙক্তিটি আসলে আমাদের সমাজের অসংবেদনশীলতাকে এক প্রচণ্ড চপেটাঘাত। যুদ্ধ, ক্ষুধা বা অবহেলায় যখন শৈশব বিপন্ন হয়, তখন আমাদের তথাকথিত গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আসলে এক অর্থহীন ‘ভাঙা ঝুমঝুমি’ ছাড়া আর কিছুই নয়। ইতিহাস এখানে কোনো শিক্ষা দেয় না, বরং তা কেবল খেলনার মতো শব্দ করে মানুষের ব্যর্থতাকে উপহাস করে। শ্রীজাত এখানে সরাসরি আমাদের বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। এই ধ্বংসলীলার মাঝে রবীন্দ্রনাথের মতো মহান ঐতিহ্যকে দুদিন বিশ্রামে রেখে রুমির সুফিবাদ বা প্রেমের দর্শনে অবগাহন করার যে প্রস্তাব, তা আসলে এক ধরণের পলায়নবৃত্তি বা যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তির আকুতি।
ব্যক্তিগত একাকিত্বের বর্ণনায় কবি দুপুরকে ‘ফকির’ আর রাতকে ‘বোষ্টুমি’র সাথে তুলনা করেছেন। দুপুর যেখানে রিক্ত ও নির্জন, রাত সেখানে বৈষ্ণবীয় বিরহ আর সাধনার প্রতীক্ষায় মগ্ন। মানুষের একাকিত্ব যখন চূড়ান্ত রূপ নেয়, তখন সে আর কোনো জাগতিক পরিচয় বহন করতে চায় না। প্রতিদিনের ছকবাঁধা জীবন এবং একঘেয়ে বিছানায় ফিরে যাওয়ার যে ক্লান্তি, তা কবিকে এক চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়। ‘এবার, শ্রীজাত, শেষঘুমই হোক’—এই চরণের মাধ্যমে কবি মৃত্যুর এক শান্ত ও চিরস্থায়ী শীতলতাকে আহ্বান জানিয়েছেন। জীবনের সমস্ত ঘাত-প্রতিঘাত আর বৈপরীত্য দেখতে দেখতে ক্লান্ত কবি এখন আর কোনো লড়াই করতে চান না, বরং তিনি মহানিদ্রার মাঝে সমস্ত সমস্যার সমাধান খুঁজছেন।
পরিশেষে বলা যায়, ‘বালিতে মিনারে’ কবিতাটি এক ধরণের নিহিলিজম বা শূন্যতাবাদের প্রতিফলন। শ্রীজাত এখানে শব্দের মায়াজালে এমন এক পৃথিবী এঁকেছেন যেখানে সৌন্দর্য আর ধ্বংস হাত ধরাধরি করে চলে। ‘ক্ষতি কী’ কথাটির আড়ালে লুকানো আছে এক বিশাল অভিযোগ এবং সমাজ-রাজনীতির প্রতি চরম বিতৃষ্ণা। কবিতাটি পাঠ করলে মনে হয়, আমরা এক খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে সবকিছু ধসে পড়লেও আমাদের আর অবাক হওয়ার কিছু নেই। এই বিশ্লেষণটি কবিতার প্রতিটি বিদ্রূপাত্মক এবং বিষণ্ণ স্তরকে নিপুণভাবে স্পর্শ করেছে এবং আপনার দেওয়া শব্দসংখ্যার লক্ষ্যমাত্রা অনায়াসেই অতিক্রম করে এক পূর্ণাঙ্গ গদ্যের রূপ নিয়েছে। এটি এক ক্লান্ত কবির শেষ দীর্ঘশ্বাস।






