চিরকুট – মহাদেব সাহা।

হঠাৎ সেদিন হাতে পেয়ে চিরকুট
নিমিষে সময় হয়ে গেলো যেন লুট;
পার হয়ে বহু বছরের ব্যবধান
কানে ভেসে এলো হারানো দিনের গান।

মনে পড়ে গেলো তোমার প্রথম খাম
আদ্যক্ষরে লেখা ছিলো শুধু নাম,
একটি গোলাপ আঁকা ছিলো এককোণে
র-ফলাবিহীন প্রিয় লেখা পড়ে মনে;

খুব সাধারণ খাতার কাগজে লেখা
লুকিয়ে পড়েছি, হয়নি সেভাবে দেখা
তবু মনে আছে কোথায় কী ছিলো তাতে,
এতোদিন পর চিরকুট পেয়ে হাতে
আবার হঠাৎ কেঁপে ওঠে যেন বুক
নিজেই তখন লুকাই নিজের মুখ;

এই বয়সেও একখানি চিরকুট
তোলে শিহরন, কম্পিত করপুট।

আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। মহাদেব সাহার কবিতা।

কবিতার কথা –

মহাদেব সাহার ‘চিরকুট’ কবিতাটি স্মৃতিকাতরতা, হারানো ভালোবাসার সুদূর সুর এবং বয়সের ভার পেরিয়ে হৃদয়ের সুপ্ত আবেগের অমলিন পুনঃজাগরণের এক অত্যন্ত আবেগঘন ও স্নিগ্ধ কাব্যালേഖ। কবি মহাদেব সাহার স্বাতন্ত্র্যসূচক সহজ-সরল বয়ান ও গীতিময় ছন্দের বুননে এখানে ফুটে উঠেছে কীভাবে প্রাত্যহিক জীবনের চেনা বৃত্তে হঠাৎ ভেসে আসা একটি সামান্য বার্তা অতীতের সমস্ত রুদ্ধ দরজা একলহমায় খুলে দিতে পারে।

কবিতার প্রথমাংশে হঠাৎ একটি চিরকুট হাতে পাওয়ার মধ্য দিয়ে স্মৃতির মহাসমুদ্রে তলিয়ে যাওয়ার চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। দীর্ঘ বহু বছরের জমতে থাকা ব্যবধান ও বয়সের বাধ্যবাধকতা এক নিমেষে অদৃশ্য হয়ে যায়—সময় যেন তার স্বাভাবিক গতি হারিয়ে অতীতের কাছে ‘লুট’ হয়ে যায়। বহু দিন আগে হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর যে সুর মন থেকে মিলিয়ে গিয়েছিল, সেই হারানো গান যেন আচমকা আবার কানে ভেসে আসে।

কবিতার মধ্যভাগে প্রথম ভালোবাসার সেই অতি সূক্ষ্ম ও গোপনীয়তার স্মৃতিগুলো পরম নিবিড়তায় জেগে ওঠে। প্রথাগত খামের কোণে আঁকা একটি ছোট গোলাপ, প্রিয় মানুষের নামের বদলে কেবল আদ্যক্ষর লেখা, আর র-ফলাবিহীন সেই বিশেষ ডাকনামটি—যা স্মৃতির অ্যালবামে এখনো উজ্জ্বল। সাধারণ খাতার পাতায় লেখা সেই বার্তাটি সেদিন হয়তো চরম দ্বিধা ও ভয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তে হয়েছিল, চোখ ভরে দেখা বা প্রাণভরে স্পর্শ করা হয়নি। কিন্তু জীবনের এতগুলো বসন্ত পার হয়ে এসেও সেই খামের ভাঁজ ও বার্তার কোথায় কী লেখা ছিল, তার সামান্যতম স্মৃতিও ম্লান হয়নি।

কবিতার শেষাংশে এসে কাব্যভাবনা এক পরম স্পর্শকাতর অনুভূতির চূড়ায় পৌঁছায়। জীবনের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় বয়স বাড়লেও, স্মৃতির চিরকুটটি হাতে পাওয়া মাত্রই পরিণত হৃদয়ে সেই তারুণ্যের প্রথম শিহরন ও থরথর কাঁপন জেগে ওঠে। আবেগের আবেশে বুক কেঁপে ওঠে, প্রথাগত লজ্জায় নিজের মুখ নিজেই লুকানোর ইচ্ছে জাগে এবং কাঁপতে থাকে বৃদ্ধ বা প্রৌঢ় করপুট। কবি মহাদেব সাহা এখানে অতি সাধারণ এক চিরকুটের রূপকে দেখিয়েছেন যে, খাঁটি ভালোবাসা বা স্মৃতি সময় ও বয়সের কাছে কখনো বুড়িয়ে যায় না; অনুভূতির সামান্য ছোঁয়ায় তা অনাদিকাল ধরে হৃদয়ে চিরসবুজ হয়ে বেঁচে থাকে।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x