চলে যাবার আগে-আরণ্যক বসু।

(আর কিছু না চাই—
যেন আকাশখানা পাই
আর পালিয়ে যাবার মাঠ ।
–বাউল/ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর )

আজ একটু তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরছে কিশোর বাউল ক্ষ্যাপা ভোলানাথ।

এমন শেষের অঘ্রাণে , দুপুর গড়ালেই,
চারটে পাঁচের লোকাল শোনে তার চিকন গলা — খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন,
ও মন রে, খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন……

হুড়ুম দুড়ুম করে পাঁচটা নাগাদ গ্রামের ইস্টিশানে নামলেই ,
নাবাল জমির আলপথে তাকে হাতছানিতে ডাকে হেমন্ত বুড়ি।
হাত পেতে কিছুই চায় না, শুধু ছেঁড়া শাড়ির রুখুশুখু আঁচল মেলে বলে–ও বাউল,
আবার তো সেই এক বছর বাদে দেখা হবে গো ,
মনে করে রেখে দিস কিন্তু —
ঝরাপাতার চিঠি,
একখণ্ড সুগন্ধি পাটালি,
গোবিন্দভোগ পায়েসের তলানিটুকু,
ভরা শীতের কাঁথা,
আম-পলাশের প্রথম মুকুল,
বৈশাখী ঝড়ের হাওয়া,
কালিদাসের মেঘদূত,
তানসেনের মল্লার,
প্রথম স্থলপদ্মের লাজুক হাসি,
শিউলি-উঠোনে গাঁয়ের উমার পায়ের ছাপ,
কাশফুলের দোলায় ডিঙি নৌকোর দোল…

আমি আবার আসব রে।
বড়োবেলা ছোট হলে,
গা শিরশির করলেই ,
এই নাবাল আলের ধারেই আমাকে দেখতে পাবি , ঠিক এসে গেছি।

চোদ্দ-শাক,চোদ্দ-পিদিমে ভালোবাসায় বাঁচিয়ে রাখিস
সুধা-শামিমার সাইকেল,ইস্কুলের পথ।
আর ,লাঙল কাঁধে আজান-কীর্তনের শান্ত মুখগুলো।

ও বাউল,শোন —
বুকের মধ্যে ভালোবাসা বসত করে রে,
সেখানে যেন রক্তপাত কেউ না ঘটায়…

যা রে ছেলে ,ঘরের পথে ফিরে যা।
আমি আরও দু’দন্ড না হয় এই দিগন্তময় মাঠের আলে
নিজের ফেলে যাওয়া ছায়াটাকে পৌষ পাবনের গল্প শোনাই।

সন্ধে নামছে ।
ওই দ্যাখ , মাথার ওপরে জ্বলজ্বল করছে সন্ধ্যাতারা ।

চলে যাবার আগে , শেষ অঘ্রাণের মাঠে মাঠে শুনি তোর গান —
খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন ,
ও মন আমার ,খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন…

আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। আরণ্যক বসু।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x