কবিতার খাতা
রবীন্দ্রনাথ – জীবনানন্দ দাশ।
আজ এই পৃথিবীতে অনেকেই কথা ভাবে।
তবুও অনেক বেশী লোক আজ শতাব্দী-সন্ধির অসময়ে
পাপী ও তাপীর শব বহনের কাজে উচাটন
হয়ে অমৃত হবে সাগরের বালি,পাতালের কালি ক্ষয়ে?
কোথাও প্রান্তরে পথে ফুল,পাখি,ঘাসের ভিতরে
সময় নিজেকে ফাকি না দিয়ে হয়তো নিখিল চালাতেছে;
আড়াই চালের মতো রক্তের চঞ্চল তাল
সেখানে দু’এক মোড় খুলে,স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
নিমিষে আহ্নিকগতি উতরোল হয়ে উঠে ম্যামথের
‘পরে,…মানুষের।
কবি ও নিকট লোকের মতো,বড়ো এক প্রিয়……
অন্ধ মরুতে কবে ফা হিয়ান সূর্যের সোনা দেখেছিল……
বিশদ প্রসঙ্গে আজ ততোধিকভাবে স্মরণীয়।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। জীবনানন্দ দাশের কবিতা।
কবিতার কথা –
জীবনানন্দ দাশের ‘রবীন্দ্রনাথ’ কবিতাটি প্রচলিত স্তুতি বা বন্দনার বাইরে দাঁড়িয়ে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার আধুনিক শ্রদ্ধার্ঘ্য। জীবনানন্দ তাঁর এই কবিতায় রবীন্দ্রনাথকে কেবল একজন ব্যক্তি-কবি হিসেবে দেখেননি, বরং তাঁকে দেখেছেন এক অবিনশ্বর আলোকবর্তিকা এবং কালজয়ী চেতনার প্রতীক হিসেবে, যা বিশ শতকের চরম সংকট ও ‘শতাব্দী-সন্ধির অসময়ে’ মানবজাতিকে পথ দেখাতে পারে।
কবিতার প্রথম স্তবকে কবি সমকালীন পৃথিবীর এক রূঢ় বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন। আজকের এই ক্ষয়িষ্ণু পৃথিবীতে সুগভীর ও কল্যাণকর কথা ভাবার মানুষের সংখ্যা খুবই কম। অধিকাংশ মানুষই এই যুগসন্ধিক্ষণের অস্থিরতায় ‘পাপী ও তাপীর শব বহনের কাজে উচাটন’—অর্থাৎ তারা হিংসা, যুদ্ধ এবং আত্মবিনাশের এক অন্ধ স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়েছে। এই পাপ আর তাপের ক্ষয়ে জাগতিক সব মহৎ অর্জন যেন ‘সাগরের বালি’ আর ‘পাতালের কালি’র মতো হারিয়ে যাচ্ছে।
দ্বিতীয় স্তবকে জীবনানন্দ তাঁর চিরচেনা নিসর্গ ও অন্তহীন সময়ের দর্শনে ফিরে গেছেন। মানুষের তৈরি সমাজ যতই কলুষিত হোক না কেন, প্রকৃতির আদিম ও অকৃত্রিম নিয়মে ‘ফুল, পাখি, ঘাসের ভিতরে’ সময় কোনো ফাঁকি না দিয়ে বিশ্বচরাচরকে সচল রেখেছে। দাবা খেলার ‘আড়াই চালের মতো’ মানুষের রক্তের ভেতরে যে চঞ্চলতা, হিংসা আর কূটকৌশলের খেলা চলে, প্রকৃতির অমোঘ শান্ত সান্নিধ্যে এসে তার ‘দু’এক মোড় খুলে’ তা আবার স্বাভাবিক ও শান্ত হয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন প্রকৃতির সেই শান্ত ও শাশ্বত রূপের শ্রেষ্ঠ উপাসক।
কবিতার শেষাংশে কবি এক পরাবাস্তব ও ঐতিহাসিক ক্যানভাস তৈরি করেছেন। সময়ের আবর্তনে মানুষের সভ্যতা ম্যামথের মতোই প্রাচীন ও উতরোল গতি ধারণ করেছে। এই অন্ধ ও বিভ্রান্ত মানবসভ্যতার ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথ হলেন ‘বড়ো এক প্রিয়’ এবং অতি নিকটজন। কবি এখানে চীনা পরিব্রাজক ‘ফা হিয়েন’-এর এক চমৎকার রূপক ব্যবহার করেছেন। প্রাচীনকালে তপ্ত, অন্ধকার ও দুর্গম মরুভূমি পাড়ি দিয়ে ফা হিয়েন যেভাবে ‘সূর্যের সোনা’ বা আলোর দিশা দেখেছিলেন, আজকের এই আধুনিক সভ্যতার ‘অন্ধ মরুতে’ রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি ও দর্শন ঠিক ততটাই বিশদ এবং প্রাসঙ্গিকভাবে স্মরণীয়। তিনি আমাদের এই বন্ধ্যা সময়ে আলোর সেই আদি উৎস।
সৃষ্টির সার্থকতা লৌকিক হাততালিতে নয়, বরং স্রষ্টার নিজের মানসিক মুক্তি এবং অস্তিত্বের তাদিগে—যা এই কবিতায় রবীন্দ্রনাথের কালজয়ী সত্তাকে এক যুগযন্ত্রণা ও মহাজাগতিক চেতনার পটভূমিতে স্থাপন করে অনন্য এক রূপ দান করেছে।






