কবিতার খাতা
- 30 mins
কিছু একটা পুড়ছে – নবারুণ ভট্টাচার্য।
কিছু একটা পুড়ছে
আড়ালে, বেরেতে, তোষকের তলায়, শ্মশানে
কিছু একটা পুড়েছেই
আমি ধোঁয়ার গন্ধ পাচ্ছি
বিড়ি ধরিয়েছে কেউ
কেউ উবু হয়ে ফুঁ দিচ্ছে উনুনে
কেউ চিতায় তুলে দিয়েছে
আন্ত্রিক রোগে মৃত শীর্ণতম শিশু
ওলট পালট খাচ্ছে জ্বলন্ত পাখি
কোথাও গ্যাসের সিলিণ্ডার ফেটেছে
কোথাও কয়লাখনিতে, বাজির কারখানায় আগুন
কিছু একটা পুড়ছে
চার কোনা ধরে গেছে
জ্বলন্ত মশারি নেমে আসছে ঘুমের মধ্যে
কিছু একটা পুড়ছে
ক্ষুধায় পুড়ছে নাড়ি, অন্ত্রেরা
ভালোবাসায় পুড়ছে যুবক
পুড়ছে কামনার শরীর, তুষ, মবিলে ভেজানো তুলো
কিছু একটা পুড়ছেই
হল্কা এসে লাগছে আঁচের
ইমারত, মূল্যবোধ, টাঙানো বিশাল ছবি
প্রতিশ্রুতি, টেলিভিশন, দুপ্তপ্রাপ্য বই
কিছু একটা পুড়ছে
আমি হাতড়ে হাতড়ে দেখছি কী পুড়ছে
কিছু একটা পুড়ছে
কী ছুঁয়ে হাতে ফোস্কা পড়ছে
কিছু একটা পুড়ছে, গনগন করছে
চুপ করে পুড়ছে, মুখ বুজে পুড়ছে
ঝড় যদি ওঠে তাহলে কিন্তু দপ করে জ্বলে উঠবে
কিছু একটা পুড়ছে বলছি
দমকলের গাড়ি, নাভিকুণ্ডল, সূর্য
কিছু একটা পুড়ছে
প্রকাশ্যে, চোখের ওপর
মানুষের মধ্যে
স্বদেশ!
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। নবারুন ভট্টাচার্যের কবিতা।
কিছু একটা পুড়ছে – নবারুণ ভট্টাচার্য | নবারুণ ভট্টাচার্যের প্রতিবাদী কবিতা | আড়ালে ও প্রকাশ্যে চলা ধ্বংসের চিত্র | ‘ক্ষুধায় পুড়ছে নাড়ি, ভালোবাসায় যুবক’ ও ‘স্বদেশ!’ বলে চূড়ান্ত আঘাত
কিছু একটা পুড়ছে: নবারুণ ভট্টাচার্যের ধ্বংস ও প্রতিবাদের অসাধারণ কাব্য, ‘আড়ালে, বেরেতে, তোষকের তলায়, শ্মশানে’ পোড়ার তালিকা, ‘ইমারত, মূল্যবোধ, প্রতিশ্রুতি, টেলিভিশন’ সব পোড়ার বর্ণনা, ‘ঝড় যদি ওঠে তাহলে দপ করে জ্বলে উঠবে’ বলে হুঁশিয়ারি, ও ‘স্বদেশ!’ বলে চূড়ান্ত আঘাতের অমর সৃষ্টি
নবারুণ ভট্টাচার্যের “কিছু একটা পুড়ছে” বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য, তীব্র ও প্রতিবাদী সৃষ্টি। “কিছু একটা পুড়ছে” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে আড়ালে ও প্রকাশ্যে চলা ধ্বংসের চিত্র; ‘আড়ালে, বেরেতে, তোষকের তলায়, শ্মশানে’ পোড়ার বিভিন্ন স্থান; ‘বিড়ি ধরিয়েছে কেউ, কেউ উবু হয়ে ফুঁ দিচ্ছে উনুনে, কেউ চিতায় তুলে দিয়েছে আন্ত্রিক রোগে মৃত শীর্ণতম শিশু’ বলে মৃত্যু ও দাহের চিত্র; ‘ওলট পালট খাচ্ছে জ্বলন্ত পাখি’ বলে করুণ চিত্র; ‘গ্যাসের সিলিণ্ডার ফেটেছে, কয়লাখনিতে, বাজির কারখানায় আগুন’ বলে দুর্ঘটনা ও ধ্বংস; ‘চার কোনা ধরে গেছে, জ্বলন্ত মশারি নেমে আসছে ঘুমের মধ্যে’ বলে ব্যক্তিগত বিপর্যয়; ‘ক্ষুধায় পুড়ছে নাড়ি, অন্ত্রেরা, ভালোবাসায় পুড়ছে যুবক, পুড়ছে কামনার শরীর, তুষ, মবিলে ভেজানো তুলো’ বলে বিভিন্ন মাত্রার পোড়া; ‘ইমারত, মূল্যবোধ, টাঙানো বিশাল ছবি, প্রতিশ্রুতি, টেলিভিশন, দুপ্তপ্রাপ্য বই’ — সবই পুড়ছে; ‘হাতড়ে হাতড়ে দেখছি কী পুড়ছে, কী ছুঁয়ে হাতে ফোস্কা পড়ছে’ বলে বেদনার স্বীকারোক্তি; ‘ঝড় যদি ওঠে তাহলে দপ করে জ্বলে উঠবে’ বলে হুঁশিয়ারি; এবং শেষ পর্যন্ত ‘স্বদেশ!’ বলে চূড়ান্ত আঘাতের অসাধারণ কাব্যচিত্র। নবারুণ ভট্টাচার্য (১৯৪৮-২০১৪) একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি ও ঔপন্যাসিক। তিনি বাস্তববাদী, প্রতিবাদী ও সামাজিক সচেতনতামূলক কবিতার জন্য পরিচিত। “কিছু একটা পুড়ছে” সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি সমাজের নানা স্তরে চলা ধ্বংসের এক চমৎকার চিত্র এঁকেছেন।
নবারুণ ভট্টাচার্য: ধ্বংস ও প্রতিবাদের কবি
নবারুণ ভট্টাচার্য ১৯৪৮ সালের ২৩ জুন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন বিশিষ্ট বাঙালি কবি ও ঔপন্যাসিক ছিলেন। তিনি বাস্তববাদী, প্রতিবাদী ও সামাজিক সচেতনতামূলক কবিতার জন্য পরিচিত। তাঁর রচনায় দূর্নীতি, যুদ্ধ, সহিংসতা, নিপীড়ন, ক্ষুধা, ভালোবাসার বিকার ও মানুষের সংগ্রাম গভীরভাবে ফুটে উঠেছে।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘কিছু একটা পুড়ছে’, ‘ডানাওলা কবিতা’, ‘নির্বাচিত কবিতা’, ‘অন্য নামে ডাকো’ ইত্যাদি। তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
নবারুণ ভট্টাচার্যের প্রতিবাদী কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘কিছু একটা পুড়ছে’ পঙ্ক্তির পুনরাবৃত্তি, পোড়ার নানা স্থান ও কারণের তালিকা, ‘আড়ালে ও প্রকাশ্যে’ পোড়ার চিত্র, ‘ক্ষুধায় নাড়ি পোড়া’, ‘ভালোবাসায় যুবক পোড়া’, ‘ইমারত, মূল্যবোধ, প্রতিশ্রুতি, টেলিভিশন’ পোড়ার ব্যঙ্গাত্মক চিত্র, ‘হাতড়ে হাতড়ে ফোস্কা পড়া’, ‘ঝড় উঠলে দপ করে জ্বলে ওঠার’ হুঁশিয়ারি, এবং ‘স্বদেশ’ বলে শেষ আঘাত। ‘কিছু একটা পুড়ছে’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি সমাজের নানা স্তরে ধ্বংসের চিত্র তুলে ধরেছেন।
কিছু একটা পুড়ছে: শিরোনামের তাৎপর্য ও কবিতার পটভূমি
শিরোনাম ‘কিছু একটা পুড়ছে’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘কিছু একটা’ — অনির্দিষ্ট, কিন্তু যা পুড়ছে তা স্পষ্ট নয়। পুরো কবিতায় ‘কিছু একটা পুড়ছে’ পঙ্ক্তিটি বারবার পুনরাবৃত্তি হয়েছে, যেন একটি মন্ত্র।
কবিতাটি ধ্বংস ও পোড়ার চিত্রের পটভূমিতে রচিত। শ্মশান থেকে শুরু করে ক্ষুধা, ভালোবাসা, কামনা, মূল্যবোধ, টেলিভিশন — সব কিছু পুড়ছে।
কবি শুরুতে বলছেন — কিছু একটা পুড়ছে, আড়ালে, বেরেতে, তোষকের তলায়, শ্মশানে। কিছু একটা পুড়েছেই। আমি ধোঁয়ার গন্ধ পাচ্ছি। বিড়ি ধরিয়েছে কেউ। কেউ উবু হয়ে ফুঁ দিচ্ছে উনুনে। কেউ চিতায় তুলে দিয়েছে আন্ত্রিক রোগে মৃত শীর্ণতম শিশু। ওলট পালট খাচ্ছে জ্বলন্ত পাখি। কোথাও গ্যাসের সিলিণ্ডার ফেটেছে। কোথাও কয়লাখনিতে, বাজির কারখানায় আগুন। কিছু একটা পুড়ছে, চার কোনা ধরে গেছে। জ্বলন্ত মশারি নেমে আসছে ঘুমের মধ্যে। কিছু একটা পুড়ছে। ক্ষুধায় পুড়ছে নাড়ি, অন্ত্রেরা। ভালোবাসায় পুড়ছে যুবক। পুড়ছে কামনার শরীর, তুষ, মবিলে ভেজানো তুলো। কিছু একটা পুড়ছেই। হল্কা এসে লাগছে আঁচের। ইমারত, মূল্যবোধ, টাঙানো বিশাল ছবি, প্রতিশ্রুতি, টেলিভিশন, দুপ্তপ্রাপ্য বই। কিছু একটা পুড়ছে। আমি হাতড়ে হাতড়ে দেখছি কী পুড়ছে। কিছু একটা পুড়ছে। কী ছুঁয়ে হাতে ফোস্কা পড়ছে। কিছু একটা পুড়ছে, গনগন করছে। চুপ করে পুড়ছে, মুখ বুজে পুড়ছে। ঝড় যদি ওঠে তাহলে কিন্তু দপ করে জ্বলে উঠবে। কিছু একটা পুড়ছে বলছি। দমকলের গাড়ি, নাভিকুণ্ডল, সূর্য। কিছু একটা পুড়ছে। প্রকাশ্যে, চোখের ওপর, মানুষের মধ্যে, স্বদেশ!
কিছু একটা পুড়ছে: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ (সংক্ষিপ্ত আকারে)
প্রথম স্তবক: আড়ালে পোড়া ও ধোঁয়ার গন্ধ
“কিছু একটা পুড়ছে / آڑালে, بেরেতে, তোষকের তলায়, ش্মশানে / কিছু একটা পুড়েছেই / আমি ধোঁয়ার গন্ধ পাচ্ছি”
প্রথম স্তবকে আড়ালে পোড়ার চিত্র। ‘আড়ালে, বেরেতে, তোষকের তলায়, শ্মশানে’ — গোপন ও প্রকাশ্য স্থান। ‘কিছু একটা পুড়েছেই’ — নিশ্চয়তা। ‘ধোঁয়ার গন্ধ পাচ্ছি’ — ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য প্রমাণ।
দ্বিতীয় স্তবক: আগুন জ্বালানো ও মৃত শিশু দাহ
“بিড়ি ধরিয়েছে كেউ / كেউ উবু হয়ে فুঁ দিচ্ছে উনুনে / كেউ چিতায় তুলে دিয়েছে / আন্ত্রিক রোগে مৃত শীর্ণতম শিশু”
দ্বিতীয় স্তবকে আগুন জ্বালানোর নানা দৃশ্য। কেউ বিড়ি ধরিয়েছে, কেউ উনুনে ফুঁ দিচ্ছে, কেউ চিতায় তুলে দিয়েছে আন্ত্রিক রোগে মৃত শীর্ণতম শিশু — চরম করুণ চিত্র।
তৃতীয় ও চতুর্থ স্তবক: পাখি পোড়া, গ্যাস সিলিণ্ডার বিস্ফোরণ, কয়লাখনি ও বাজির কারখানায় আগুন
“ওলট পালট খাচ্ছে ج্বলন্ত পাখি / কোথাও گ্যাসের সিলিণ্ডার فেটেছে / কোথাও كয়লাখনিতে, باجির কারখানায় আগুন”
তৃতীয় ও চতুর্থ স্তবকে প্রকৃতি ও শিল্পের ধ্বংস। জ্বলন্ত পাখি ওলট পালট করছে। গ্যাস সিলিণ্ডার ফেটেছে, কয়লাখনিতে ও বাজির কারখানায় আগুন।
পঞ্চম ও ষষ্ঠ স্তবক: চার কোনা ধরা ও জ্বলন্ত মশারি ঘুমে নেমে আসা
“কিছু একটা পুড়ছে / চار كونا ধরে গেছে / ج্বলন্ত مশারি نেমে আসছে ঘুমের মধ্যে”
পঞ্চম ও ষষ্ঠ স্তবকে আগুনের প্রসার। ‘চার কোনা ধরে গেছে’ — সর্বত্র আগুন। ‘জ্বলন্ত মশারি ঘুমের মধ্যে নেমে আসছে’ — অচেতন অবস্থায়ও বিপর্যয়।
সপ্তম ও অষ্টম স্তবক: ক্ষুধায় নাড়ি, ভালোবাসায় যুবক, কামনার শরীর পোড়া
“كিছু একটা পুড়ছে / ক্ষুধায় পুড়ছে ناڑی, অন্ত্রেরا / ভালোবাসায় পুড়ছে যুবক / পুড়ছে كامনার শরীর, توش, মবিলে ভেজানো তুলো”
সপ্তম ও অষ্টম স্তবকে দৈহিক ও আবেগীয় পোড়া। ক্ষুধায় নাড়ি-অন্ত্র পুড়ছে, ভালোবাসায় যুবক পুড়ছে, কামনার শরীর, তুষ, মবিলে ভেজানো তুলো পুড়ছে।
নবম, দশম ও একাদশ স্তবক: ইমারত, মূল্যবোধ, প্রতিশ্রুতি, টেলিভিশন পোড়া
“ইমারত, মূল্যবোধ, টাঙানো বিশাল ছবি / প্রতিশ্রুতি, টেলিভিশন, دوপ্তপ্রাপ্য বই”
নবম, দশম ও একাদশ স্তবকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান পোড়া। ইমারত, মূল্যবোধ, ছবি, প্রতিশ্রুতি, টেলিভিশন, বই — সব পুড়ছে।
দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ স্তবক: হাতড়ে দেখা ও ফোস্কা পড়া
“আমি হাতড়ে হাতড়ে দেখছি কী পুড়ছে / কিছু একটা পুড়ছে / কী ছুঁয়ে هাতে فوسكا পড়ছে”
দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ স্তবকে কবির নিজের অংশগ্রহণ। হাতড়ে হাতড়ে দেখছেন কী পুড়ছে। ছুঁয়ে হাতে ফোস্কা পড়ছে — বাস্তবের স্পর্শে ব্যথা।
চতুর্দশ ও পঞ্চদশ স্তবক: চুপ করে ও মুখ বুজে পোড়া — ঝড় উঠলে দপ করে জ্বলে ওঠার হুঁশিয়ারি
“কিছু একটা পুড়ছে, گنگন করছে / চুپ করে পুড়ছে, মুখ বুজে পুড়ছে / ঝড় যদি ওঠে তাহলে কিন্তু دپ করে জ্বলে উঠবে”
চতুর্দশ ও পঞ্চদশ স্তবকে পোড়ার বিভিন্ন ধরন ও হুঁশিয়ারি। ‘গনগন করে’, ‘চুপ করে’, ‘মুখ বুজে’ পোড়া। ‘ঝড় যদি ওঠে তাহলে দপ করে জ্বলে উঠবে’ — সময় এলে বিপ্লব হবে।
ষোড়শ ও সপ্তদশ স্তবক: দমকলের গাড়ি, নাভিকুণ্ডল, সূর্য পোড়া
“কিছু একটা পুড়ছে বলছি / دমকলের গাড়ি, نাভিকুণ্ডل, سূর্য”
ষোড়শ ও সপ্তদশ স্তবকে আরও পোড়ার তালিকা। দমকলের গাড়ি (যা আগুন নেভায়), নাভিকুণ্ডল (যোগাসন), সূর্য — সবই পুড়ছে।
অষ্টাদশ ও শেষ স্তবক: প্রকাশ্যে, মানুষের মধ্যে, স্বদেশ!
“কিছু একটা পুড়ছে / প্রকাশ্যে, چোখের ওপর / মানুষের মধ্যে / স্বদেশ!”
অষ্টাদশ ও শেষ স্তবকে চূড়ান্ত আঘাত। ‘প্রকাশ্যে, চোখের ওপর, মানুষের মধ্যে’ — সবাই দেখছে। আর শেষ শব্দ — ‘স্বদেশ!’ — নিজের দেশ পুড়ছে।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি গদ্যছন্দে রচিত। ‘কিছু একটা পুড়ছে’ পঙ্ক্তিটি অন্তত দশবার পুনরাবৃত্তি — একটি মন্ত্র বা অভিশাপের মতো। ‘আড়ালে, বেরেতে, তোষকের তলায়, শ্মশানে’ — স্থানের তালিকা। ‘ক্ষুধায় নাড়ি, ভালোবাসায় যুবক, কামনার শরীর’ — পোড়ার কারণের তালিকা। ‘ইমারত, মূল্যবোধ, প্রতিশ্রুতি, টেলিভিশন’ — পোড়া বস্তুর তালিকা। ‘গনগন করে, চুপ করে, মুখ বুজে’ — পোড়ার ধরনের তালিকা। ‘ঝড় উঠলে দপ করে জ্বলে উঠবে’ — হুঁশিয়ারি। ‘স্বদেশ’ — শেষ শব্দ।
প্রতীক ব্যবহার অত্যন্ত শক্তিশালী। ‘আড়ালে পোড়া’ — গোপন অত্যাচারের প্রতীক। ‘শ্মশান’ — মৃত্যুর প্রতীক। ‘মৃত শিশু’ — নিরপরাধের মৃত্যুর প্রতীক। ‘জ্বলন্ত পাখি’ — প্রকৃতির ধ্বংসের প্রতীক। ‘গ্যাস সিলিণ্ডার, কয়লাখনি, বাজির কারখানা’ — শিল্প দুর্ঘটনার প্রতীক। ‘জ্বলন্ত মশারি’ — ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের প্রতীক। ‘ক্ষুধায় নাড়ি পোড়া’ — দারিদ্র্যের প্রতীক। ‘ভালোবাসায় যুবক পোড়া’ — প্রেমের বেদনার প্রতীক। ‘কামনার শরীর পোড়া’ — যৌনতার প্রতীক। ‘ইমারত, মূল্যবোধ, প্রতিশ্রুতি, টেলিভিশন, বই’ — সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ধ্বংসের প্রতীক। ‘হাতে ফোস্কা পড়া’ — প্রত্যক্ষ বেদনার প্রতীক। ‘ঝড় উঠলে দপ করে জ্বলে ওঠা’ — বিপ্লবের প্রতীক। ‘দমকলের গাড়ি পোড়া’ — সাহায্যের ব্যবস্থাও ধ্বংস। ‘নাভিকুণ্ডল পোড়া’ — আধ্যাত্মিকতার ধ্বংস। ‘সূর্য পোড়া’ — প্রকৃতিরও ধ্বংস। ‘স্বদেশ’ — চূড়ান্ত আঘাত, নিজের দেশ পোড়ার প্রতীক।
পুনরাবৃত্তি শৈলী অত্যন্ত কার্যকর। ‘কিছু একটা পুড়ছে’ — দশবার।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“কিছু একটা পুড়ছে” নবারুণ ভট্টাচার্যের এক অসাধারণ সৃষ্টি। তিনি এখানে সমাজের নানা স্তরে চলা ধ্বংস ও পোড়ার এক চমৎকার কাব্যিক চিত্র এঁকেছেন।
প্রথম স্তবকে — আড়ালে পোড়া ও ধোঁয়ার গন্ধ। দ্বিতীয় স্তবকে — আগুন জ্বালানো ও মৃত শিশু দাহ। তৃতীয় ও চতুর্থ স্তবকে — পাখি পোড়া, গ্যাস সিলিণ্ডার বিস্ফোরণ, কয়লাখনি ও বাজির কারখানায় আগুন। পঞ্চম ও ষষ্ঠ স্তবকে — চার কোনা ধরা ও জ্বলন্ত মশারি ঘুমে নেমে আসা। সপ্তম ও অষ্টম স্তবকে — ক্ষুধায় নাড়ি, ভালোবাসায় যুবক, কামনার শরীর পোড়া। নবম, দশম ও একাদশ স্তবকে — ইমারত, মূল্যবোধ, প্রতিশ্রুতি, টেলিভিশন পোড়া। দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ স্তবকে — হাতড়ে দেখা ও ফোস্কা পড়া। চতুর্দশ ও পঞ্চদশ স্তবকে — চুপ করে ও মুখ বুজে পোড়া — ঝড় উঠলে দপ করে জ্বলে ওঠার হুঁশিয়ারি। ষোড়শ ও সপ্তদশ স্তবকে — দমকলের গাড়ি, নাভিকুণ্ডল, সূর্য পোড়া। অষ্টাদশ ও শেষ স্তবকে — প্রকাশ্যে, মানুষের মধ্যে, স্বদেশ!
এই কবিতা আমাদের শেখায় — সব কিছু পুড়ছে; আড়ালে ও প্রকাশ্যে; শ্মশান থেকে ঘুম পর্যন্ত; ক্ষুধা থেকে ভালোবাসা পর্যন্ত; কামনা থেকে মূল্যবোধ পর্যন্ত; প্রতিশ্রুতি থেকে টেলিভিশন পর্যন্ত; দমকলের গাড়ি থেকে সূর্য পর্যন্ত; আর ‘স্বদেশ’ — নিজের দেশও পুড়ছে। ‘ঝড় উঠলে দপ করে জ্বলে উঠবে’ — একদিন প্রতিরোধ জ্বলে উঠবে।
নবারুণ ভট্টাচার্যের কবিতায় ধ্বংসের চিত্র ও বিপ্লবের হুঁশিয়ারি
নবারুণ ভট্টাচার্যের কবিতায় ধ্বংসের চিত্র ও বিপ্লবের হুঁশিয়ারি একটি পুনরাবৃত্ত বিষয়। তিনি ‘কিছু একটা পুড়ছে’ কবিতায় সমাজের নানা স্তরে ধ্বংসের চমৎকার কাব্যিক চিত্র এঁকেছেন। তিনি দেখিয়েছেন — কীভাবে ‘আড়ালে, বেরেতে, তোষকের তলায়, শ্মশানে’ পোড়ে; কীভাবে ‘ক্ষুধায় নাড়ি, ভালোবাসায় যুবক, কামনার শরীর’ পোড়ে; কীভাবে ‘ইমারত, মূল্যবোধ, প্রতিশ্রুতি, টেলিভিশন’ পোড়ে; কীভাবে ‘চুপ করে, মুখ বুজে’ পোড়ে; আর কীভাবে ‘ঝড় উঠলে দপ করে জ্বলে উঠবে’ — তখন প্রতিরোধ জ্বলে উঠবে; আর শেষ পর্যন্ত ‘স্বদেশ’ পোড়ে।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পাঠ্যক্রমে নবারুণ ভট্টাচার্যের ‘কিছু একটা পুড়ছে’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের ধ্বংসের চিত্র, সামাজিক বাস্তবতা, দারিদ্র্য, ক্ষুধা, ভালোবাসার বিকার, মূল্যবোধের পতন, এবং নবারুণ ভট্টাচার্যের তীব্র প্রতিবাদী কাব্যভাষা সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে। বিশেষ করে ‘কিছু একটা পুড়ছে’ পুনরাবৃত্তি, ‘আড়ালে, বেরেতে, তোষকের তলায়, শ্মশানে’, ‘ক্ষুধায় পুড়ছে নাড়ি’, ‘ভালোবাসায় পুড়ছে যুবক’, ‘ইমারত, মূল্যবোধ, প্রতিশ্রুতি, টেলিভিশন’, ‘চুপ করে পুড়ছে, মুখ বুজে পুড়ছে’, ‘ঝড় যদি ওঠে তাহলে দপ করে জ্বলে উঠবে’, এবং ‘স্বদেশ!’ — এসব বিষয় শিক্ষার্থীদের কাব্যবোধ, সামাজিক সচেতনতা ও প্রতিবাদী চেতনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কিছু একটা পুড়ছে সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: কিছু একটা পুড়ছে কবিতাটির রচয়িতা কে?
এই কবিতাটির রচয়িতা নবারুণ ভট্টাচার্য (১৯৪৮-২০১৪)। তিনি একজন বিশিষ্ট বাঙালি কবি ও ঔপন্যাসিক ছিলেন। তিনি বাস্তববাদী, প্রতিবাদী ও সামাজিক সচেতনতামূলক কবিতার জন্য পরিচিত। তাঁর রচনায় দূর্নীতি, যুদ্ধ, সহিংসতা, নিপীড়ন, ক্ষুধা, ভালোবাসার বিকার ও মানুষের সংগ্রাম গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘কিছু একটা পুড়ছে’, ‘ডানাওলা কবিতা’, ‘নির্বাচিত কবিতা’, ‘অন্য নামে ডাকো’ ইত্যাদি।
প্রশ্ন ২: ‘আড়ালে, বেরেতে, তোষকের তলায়, শ্মশানে’ — স্থানগুলোর তাৎপর্য কী?
‘আড়ালে’ — গোপনে, ‘বেরেতে’ — বারান্দায়, ‘তোষকের তলায়’ — ঘরের ভেতর, ‘শ্মশানে’ — মৃত্যুর স্থানে। অর্থাৎ সর্বত্র আগুন লেগেছে — গোপনে ও প্রকাশ্যে, ঘরে ও শ্মশানে।
প্রশ্ন 3: ‘ক্ষুধায় পুড়ছে নাড়ি, অন্ত্রেরা’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
ক্ষুধার জ্বালায় পেটের নাড়ি-অন্ত্র পুড়ছে। এটি দারিদ্র্য ও অনাহারের ভয়াবহ বাস্তব চিত্র।
প্রশ্ন ৪: ‘ভালোবাসায় পুড়ছে যুবক’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
যুবক প্রেমের আগুনে পুড়ছে। এটি প্রেমের তীব্র বেদনা ও আবেগের প্রতীক।
প্রশ্ন ৫: ‘ইমারত, মূল্যবোধ, টাঙানো বিশাল ছবি, প্রতিশ্রুতি, টেলিভিশন, দুপ্তপ্রাপ্য বই’ — কেন এসব পোড়ার তালিকায়?
এসব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। মূল্যবোধ, প্রতিশ্রুতি, টেলিভিশন, বই — সব ধ্বংস হচ্ছে। এটি সমাজের চরম পতনের প্রতীক।
প্রশ্ন ৬: ‘কী ছুঁয়ে হাতে ফোস্কা পড়ছে’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
কবি নিজের হাতে জ্বলন্ত বস্তু ছুঁয়ে ফোস্কা পাচ্ছেন। তিনি বাস্তবের স্পর্শে ব্যথা পাচ্ছেন — এটি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার প্রতীক।
প্রশ্ন ৭: ‘চুপ করে পুড়ছে, মুখ বুজে পুড়ছে’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
নীরবে, নিঃশব্দে ধ্বংস চলছে। প্রতিবাদ নেই, চিৎকার নেই — সব চুপচাপ ধ্বংস হচ্ছে।
প্রশ্ন ৮: ‘ঝড় যদি ওঠে তাহলে দপ করে জ্বলে উঠবে’ — লাইনটির হুঁশিয়ারি কী?
এখন চুপচাপ পোড়া চলছে। কিন্তু একদিন ঝড় উঠলে সব ‘দপ করে’ জ্বলে উঠবে। এটি বিপ্লবের হুঁশিয়ারি।
প্রশ্ন ৯: ‘দমকলের গাড়ি, নাভিকুণ্ডল, সূর্য’ — কেন এসব পোড়ে?
দমকলের গাড়ি আগুন নেভায় — সেটাও পুড়ছে। নাভিকুণ্ডল (যোগাসন) আধ্যাত্মিকতার প্রতীক — সেটাও পুড়ছে। সূর্য প্রকৃতির প্রতীক — সেটাও পুড়ছে। অর্থাৎ সব কিছু ধ্বংস হচ্ছে।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
কবিতাটি আমাদের শেখায় — সব কিছু পুড়ছে; আড়ালে ও প্রকাশ্যে; শ্মশান থেকে ঘুম পর্যন্ত; ক্ষুধা থেকে ভালোবাসা পর্যন্ত; কামনা থেকে মূল্যবোধ পর্যন্ত; প্রতিশ্রুতি থেকে টেলিভিশন পর্যন্ত; দমকলের গাড়ি থেকে সূর্য পর্যন্ত; আর ‘স্বদেশ’ — নিজের দেশও পুড়ছে। ‘ঝড় উঠলে দপ করে জ্বলে উঠবে’ — একদিন প্রতিরোধ জ্বলে উঠবে। এই কবিতাটি আজকের দিনে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক — দারিদ্র্য, মূল্যবোধের পতন, ক্ষুধা, ভালোবাসার বিকার, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ধ্বংস — সবকিছুই চিরন্তন ও সময়োপযোগী বিষয়।
ট্যাগস: কিছু একটা পুড়ছে, নবারুণ ভট্টাচার্য, নবারুণ ভট্টাচার্যের প্রতিবাদী কবিতা, ক্ষুধায় নাড়ি পোড়া, ঝড় উঠলে দপ করে জ্বলে উঠবে, স্বদেশ
© Kobitarkhata.com – কবি: নবারুণ ভট্টাচার্য | কবিতার প্রথম লাইন: “কিছু একটা পুড়ছে” | ধ্বংস ও প্রতিবাদের অমর কবিতা বিশ্লেষণ | নবারুণ ভট্টাচার্যের প্রতিবাদী কাব্যধারার অসাধারণ নিদর্শন






