কবিতার খাতা
কালো মেয়ের জন্যে পংক্তিমালা – শামসুর রাহমান।
আমার নামধাম তোমার জানার দরকার নেই, কালো মেয়ে।
আমি শাদা কি কালো, হলদে কি বাদামি,
সবুজ কি বেগুনি
তাতে কী এসে যায়? ধ’রে নাও, আমার কোনো বর্ণ নেই,
আমি গোত্রহীন। বলা যায়, আমি শুধু একটি কণ্ঠস্বর,
যা মিশে থাকে ঘন কালো অরণ্যের লতাপাতায়,
ঝিলের টোল-খাওয়া পানিতে হরিণের মুখ রাখার ভঙ্গিমায়,
উটের গলার ঘণ্টাধ্বনিতে। এই কণ্ঠস্বর বয়ে যায় বিষুব রেখায়,
উত্তর মেরুতে, বঙ্গোপসাগরের তরঙ্গে তরঙ্গে
আর আফ্রিকার অজস্র জেব্রার খুরধ্বনিময় প্রান্তরে।
কালো মেয়ে, তুমি যতই কালো হও,
তোমার সত্তায় আমি দেখেছি
গীর্জার মোমবাতির আলোর মতো আভা,
সে আভাকে প্রণতি জানায় এই কণ্ঠস্বর।
তুমি যখন প্রথম চোখ মিলেছিলে,
কালো মেয়ে, স্বপ্নালোকিত কাঠের কেবিনে,
তখন তোমার মুখের দিকে ঝুঁকেছিলো একটি কালো মুখ।
যে-স্তন তোমার শিরায় শিরায় বইয়ে দিয়েছিল জীবনের ধারা, কালো সেই স্তন।
তোমার দোলনা দুলিয়েছিল যে-হাত, সে-হাত কালো,
তোমার জন্য রুটি বানিয়েছিল যে-হাত, সে-হাত কালো,
তোমার হাতে প্রথম কাঠের পুতুল তুলে দিয়েছিল
যে-হাত বড় স্নেহার্দ্র, বড় কালো সে হাত।
কালো মেয়ে, তুমি দারিদ্রের গহ্বরে হামাগুড়ি দিয়ে
মিথ্যার মতো শাদার উৎপীড়নে ধুঁকে ধুঁকে লাঞ্ছনার
অট্টহাসি শুনে বঞ্চনার শত খানাখন্দ পেরিয়ে
গায়ে উপহাসের কাদা মেখে, গা ঝারা দিয়ে
জ্যোৎস্নার চন্দনলিপ্ত হরিণীর মতো এসে দাঁড়িয়েছো যৌবনের চুড়ায়।
তোমার বর কে ওরা ঘরছাড়া করেছে,
ওর কালো মখমলের মতো কণ্ঠস্বর ওরা স্তব্ধ করে দিয়েছে,
তোমার কানে কোনোদিন আর গুঞ্জরিত হবে না তার তারা-ঝলসিত গান।
কিন্তু, কালো মেয়ে, তরমুজের মতো তোমার উদরে
মাসের পর মাস বেড়ে উঠছে ওর সন্তান।
যেদিন তোমার দু’জনের সন্তান ওর অস্তিত্ব ঘোষণা করবে প্রথমবার,
সেদিন সূর্যোদয় গালিচা বিছিয়ে দেবে তার উদ্দেশে,
গান গেয়ে উঠবে রঙবেরঙের পাখি, গাছাপালা করতালিতে মুখর ক’রে তুলবে দশদিক।
তোমার কোল-আলো-করা ছেলে বেড়ে উঠবে
শত্রুর বন্দুকের ছায়ায় বছরের পর বছর, রাত গভীর হ’লে স্বাধীনতার
দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে স্যাক্সফোনে সে তুলবে তোমার পূর্বপুরুষদের যন্ত্রণার সুর;
তোমার ক্রুশবিদ্ধ মর্যাদার ক্ষতগুলো ধুয়ে সেখানে ফোটাবে সে প্রসন্ন অর্কিড,
সে তার জোরালো কালো হাতে মুছিয়ে দেবে আফ্রিকার কালো হীরের মতো চোখ থেকে গড়িয়ে-পড়া অশ্রুজল।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। শামসুর রাহমান।
কালো মেয়ের জন্যে পংক্তিমালা – শামসুর রাহমান | কালো মেয়ের জন্যে পংক্তিমালা কবিতা শামসুর রাহমান | শামসুর রাহমানের কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা | নারীর কবিতা | বর্ণবাদ বিরোধী কবিতা | কালো মেয়ের গৌরব
কালো মেয়ের জন্যে পংক্তিমালা: শামসুর রাহমানের বর্ণবাদ, নারী-গৌরব ও মানবতার অসাধারণ কাব্যভাষা
শামসুর রাহমানের “কালো মেয়ের জন্যে পংক্তিমালা” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য ও শক্তিশালী মানবতাবাদী কবিতা। “আমার নামধাম তোমার জানার দরকার নেই, কালো মেয়ে। / আমি শাদা কি কালো, হলদে কি বাদামি, / সবুজ কি বেগুনি / তাতে কী এসে যায়? ধ’রে নাও, আমার কোনো বর্ণ নেই, / আমি গোত্রহীন।” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে বর্ণহীন কণ্ঠস্বরের দৃষ্টিতে কালো মেয়ের সৌন্দর্য, তার মাতৃত্ব, তার দারিদ্র্য-লাঞ্ছনার গল্প, এবং তার গর্ভের সন্তানের মাধ্যমে আগামী প্রজন্মের মুক্তির সম্ভাবনার এক গভীর ও বহুমাত্রিক কাব্যচিত্র। শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬) ছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃত। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় নিজস্ব ভাষাভঙ্গি ও বিষয়বৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত। “কালো মেয়ের জন্যে পংক্তিমালা” তাঁর সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি বর্ণহীন এক কণ্ঠস্বর হয়ে কালো মেয়ের গৌরব, তার মাতৃত্বের মহিমা, এবং তার গর্ভের সন্তানের মাধ্যমে মুক্তির সম্ভাবনাকে গভীর ভালোবাসায় ফুটিয়ে তুলেছেন।
শামসুর রাহমান: আধুনিক বাংলা কবিতার পুরোধা ও জাতীয় কবি
শামসুর রাহমান ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি কবিতা চর্চা শুরু করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম পুরোধা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ (১৯৬০), ‘রৌদ্র করোটিতে’ (১৯৬৩), ‘বিপুল বায়ুতে পারে’ (১৯৬৯), ‘আসাদের শার্ট’ (১৯৭০), ‘বাংলা আমার বাংলা’ (১৯৭২), ‘স্বপ্ন ও অন্যান্য’ (১৯৭৮), ‘আমার প্রেমের কবিতা’ (১৯৮৫), ‘কালো মেয়ের জন্যে পংক্তিমালা’ (১৯৯০) সহ আরও অসংখ্য গ্রন্থ। তিনি ২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন।
শামসুর রাহমানের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো প্রেম ও রাজনীতির অনন্য মিশ্রণ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার গভীর উপলব্ধি, প্রতীক ব্যবহারের দক্ষতা, এবং সরল-প্রাঞ্জল ভাষায় গভীর অর্থ সৃষ্টির ক্ষমতা। ‘কালো মেয়ের জন্যে পংক্তিমালা’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি আফ্রিকার কালো মেয়ের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সংহতি প্রকাশ করেছেন।
কালো মেয়ের জন্যে পংক্তিমালা: শিরোনামের তাৎপর্য ও কবিতার পটভূমি
শিরোনাম ‘কালো মেয়ের জন্যে পংক্তিমালা’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘পংক্তিমালা’ — পঙ্ক্তির মালা, অর্থাৎ কবিতার একটি সিরিজ, একটি শ্রদ্ধার্ঘ্য। ‘কালো মেয়ের জন্যে’ — আফ্রিকার কালো নারীদের উদ্দেশে উৎসর্গিত এই কবিতা। কবি এখানে বর্ণহীন এক কণ্ঠস্বর হয়ে কালো মেয়ের গৌরব, তার মাতৃত্ব, তার দারিদ্র্য-লাঞ্ছনা, তার পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য, এবং তার গর্ভের সন্তানের মাধ্যমে আগামী প্রজন্মের মুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে লিখেছেন।
কবি শুরুতে বলছেন — তার নামধাম জানার দরকার নেই, কালো মেয়ে। তিনি শাদা কি কালো, হলদে কি বাদামি, সবুজ কি বেগুনি — তাতে কী এসে যায়? ধরে নাও, তাঁর কোনো বর্ণ নেই, তিনি গোত্রহীন। তিনি শুধু একটি কণ্ঠস্বর, যা মিশে থাকে ঘন কালো অরণ্যের লতাপাতায়, ঝিলের টোল-খাওয়া পানিতে হরিণের মুখ রাখার ভঙ্গিমায়, উটের গলার ঘণ্টাধ্বনিতে। এই কণ্ঠস্বর বয়ে যায় বিষুব রেখায়, উত্তর মেরুতে, বঙ্গোপসাগরের তরঙ্গে তরঙ্গে, আফ্রিকার অজস্র জেব্রার খুরধ্বনিময় প্রান্তরে।
কালো মেয়ে, তিনি বলছেন — তুমি যতই কালো হও, তোমার সত্তায় আমি দেখেছি গীর্জার মোমবাতির আলোর মতো আভা। সে আভাকে প্রণতি জানায় এই কণ্ঠস্বর। তুমি যখন প্রথম চোখ মিলেছিলে, কালো মেয়ে, স্বপ্নালোকিত কাঠের কেবিনে, তখন তোমার মুখের দিকে ঝুঁকেছিলো একটি কালো মুখ। যে-স্তন তোমার শিরায় শিরায় বইয়ে দিয়েছিল জীবনের ধারা, কালো সেই স্তন। তোমার দোলনা দুলিয়েছিল যে-হাত, সে-হাত কালো। তোমার জন্য রুটি বানিয়েছিল যে-হাত, সে-হাত কালো। তোমার হাতে প্রথম কাঠের পুতুল তুলে দিয়েছিল যে-হাত বড় স্নেহার্দ্র, বড় কালো সে হাত।
কালো মেয়ে, তুমি দারিদ্রের গহ্বরে হামাগুড়ি দিয়ে, মিথ্যার মতো শাদার উৎপীড়নে ধুঁকে ধুঁকে, লাঞ্ছনার অট্টহাসি শুনে, বঞ্চনার শত খানাখন্দ পেরিয়ে, গায়ে উপহাসের কাদা মেখে, গা ঝারা দিয়ে, জ্যোৎস্নার চন্দনলিপ্ত হরিণীর মতো এসে দাঁড়িয়েছো যৌবনের চুড়ায়। তোমার বর কে ওরা ঘরছাড়া করেছে, ওর কালো মখমলের মতো কণ্ঠস্বর ওরা স্তব্ধ করে দিয়েছে। তোমার কানে কোনোদিন আর গুঞ্জরিত হবে না তার তারা-ঝলসিত গান। কিন্তু, কালো মেয়ে, তরমুজের মতো তোমার উদরে মাসের পর মাস বেড়ে উঠছে ওর সন্তান।
যেদিন তোমার দু’জনের সন্তান ওর অস্তিত্ব ঘোষণা করবে প্রথমবার, সেদিন সূর্যোদয় গালিচা বিছিয়ে দেবে তার উদ্দেশে, গান গেয়ে উঠবে রঙবেরঙের পাখি, গাছাপালা করতালিতে মুখর করে তুলবে দশদিক। তোমার কোল-আলো-করা ছেলে বেড়ে উঠবে শত্রুর বন্দুকের ছায়ায় বছরের পর বছর। রাত গভীর হলে স্বাধীনতার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে স্যাক্সফোনে সে তুলবে তোমার পূর্বপুরুষদের যন্ত্রণার সুর। তোমার ক্রুশবিদ্ধ মর্যাদার ক্ষতগুলো ধুয়ে সেখানে ফোটাবে সে প্রসন্ন অর্কিড। সে তার জোরালো কালো হাতে মুছিয়ে দেবে আফ্রিকার কালো হীরের মতো চোখ থেকে গড়িয়ে-পড়া অশ্রুজল।
কালো মেয়ের জন্যে পংক্তিমালা: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: বর্ণহীন কণ্ঠস্বরের পরিচয়
“আমার নামধাম তোমার জানার দরকার নেই, কালো মেয়ে। / আমি শাদা কি কালো, হলদে কি বাদামি, / সবুজ কি বেগুনি / তাতে কী এসে যায়? ধ’রে নাও, আমার কোনো বর্ণ নেই, / আমি গোত্রহীন। বলা যায়, আমি শুধু একটি কণ্ঠস্বর, / যা মিশে থাকে ঘন কালো অরণ্যের লতাপাতায়, / ঝিলের টোল-খাওয়া পানিতে হরিণের মুখ রাখার ভঙ্গিমায়, / উটের গলার ঘণ্টাধ্বনিতে। এই কণ্ঠস্বর বয়ে যায় বিষুব রেখায়, / উত্তর মেরুতে, বঙ্গোপসাগরের তরঙ্গে তরঙ্গে / আর আফ্রিকার অজস্র জেব্রার খুরধ্বনিময় প্রান্তরে।”
প্রথম স্তবকে কবি নিজের পরিচয় দিচ্ছেন। ‘আমার নামধাম তোমার জানার দরকার নেই, কালো মেয়ে’ — তাঁর পরিচয় জানার দরকার নেই। ‘আমি শাদা কি কালো, হলদে কি বাদামি, সবুজ কি বেগুনি তাতে কী এসে যায়? ধরে নাও, আমার কোনো বর্ণ নেই, আমি গোত্রহীন’ — তাঁর কোনো বর্ণ নেই, তিনি গোত্রহীন। ‘বলা যায়, আমি শুধু একটি কণ্ঠস্বর’ — তিনি শুধু একটি কণ্ঠস্বর। ‘যা মিশে থাকে ঘন কালো অরণ্যের লতাপাতায়, ঝিলের টোল-খাওয়া পানিতে হরিণের মুখ রাখার ভঙ্গিমায়, উটের গলার ঘণ্টাধ্বনিতে’ — এই কণ্ঠস্বর প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকে। ‘এই কণ্ঠস্বর বয়ে যায় বিষুব রেখায়, উত্তর মেরুতে, বঙ্গোপসাগরের তরঙ্গে তরঙ্গে আর আফ্রিকার অজস্র জেব্রার খুরধ্বনিময় প্রান্তরে’ — এই কণ্ঠস্বর সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছে।
দ্বিতীয় স্তবক: কালো মেয়ের সত্তায় আভা
“কালো মেয়ে, তুমি যতই কালো হও, / তোমার সত্তায় আমি দেখেছি / গীর্জার মোমবাতির আলোর মতো আভা, / সে আভাকে প্রণতি জানায় এই কণ্ঠস্বর। / তুমি যখন প্রথম চোখ মিলেছিলে, / কালো মেয়ে, স্বপ্নালোকিত কাঠের কেবিনে, / তখন তোমার মুখের দিকে ঝুঁকেছিলো একটি কালো মুখ।”
দ্বিতীয় স্তবকে কবি কালো মেয়ের সত্তায় আভা দেখছেন। ‘কালো মেয়ে, তুমি যতই কালো হও, তোমার সত্তায় আমি দেখেছি গীর্জার মোমবাতির আলোর মতো আভা’ — কালো হওয়া সত্ত্বেও, তার সত্তায় গীর্জার মোমবাতির আলোর মতো আভা আছে। ‘সে আভাকে প্রণতি জানায় এই কণ্ঠস্বর’ — সেই আভাকে প্রণতি জানায় এই কণ্ঠস্বর। ‘তুমি যখন প্রথম চোখ মিলেছিলে, কালো মেয়ে, স্বপ্নালোকিত কাঠের কেবিনে, তখন তোমার মুখের দিকে ঝুঁকেছিলো একটি কালো মুখ’ — প্রথম চোখ মিলানোর সময় একটি কালো মুখ তার মুখের দিকে ঝুঁকেছিল।
তৃতীয় স্তবক: কালো মাতৃত্ব ও পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য
“যে-স্তন তোমার শিরায় শিরায় বইয়ে দিয়েছিল জীবনের ধারা, কালো সেই স্তন। / তোমার দোলনা দুলিয়েছিল যে-হাত, সে-হাত কালো, / তোমার জন্য রুটি বানিয়েছিল যে-হাত, সে-হাত কালো, / তোমার হাতে প্রথম কাঠের পুতুল তুলে দিয়েছিল / যে-হাত বড় স্নেহার্দ্র, বড় কালো সে হাত।”
তৃতীয় স্তবকে কবি কালো মাতৃত্ব ও পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যের কথা বলছেন। ‘যে-স্তন তোমার শিরায় শিরায় বইয়ে দিয়েছিল জীবনের ধারা, কালো সেই স্তন’ — মায়ের স্তন কালো। ‘তোমার দোলনা দুলিয়েছিল যে-হাত, সে-হাত কালো’ — মায়ের হাত কালো। ‘তোমার জন্য রুটি বানিয়েছিল যে-হাত, সে-হাত কালো’ — মায়ের হাত কালো। ‘তোমার হাতে প্রথম কাঠের পুতুল তুলে দিয়েছিল যে-হাত বড় স্নেহার্দ্র, বড় কালো সে হাত’ — বাবার হাত কালো। এটি কালো নারীর পূর্বপুরুষের কালো সত্তার গৌরবের চিত্র।
চতুর্থ স্তবক: দারিদ্র্য, লাঞ্ছনা ও যৌবনের চূড়ায় পৌঁছানো
“কালো মেয়ে, তুমি দারিদ্রের গহ্বরে হামাগুড়ি দিয়ে / মিথ্যার মতো শাদার উৎপীড়নে ধুঁকে ধুঁকে লাঞ্ছনার / অট্টহাসি শুনে বঞ্চনার শত খানাখন্দ পেরিয়ে / গায়ে উপহাসের কাদা মেখে, গা ঝারা দিয়ে / জ্যোৎস্নার চন্দনলিপ্ত হরিণীর মতো এসে দাঁড়িয়েছো যৌবনের চুড়ায়।”
চতুর্থ স্তবকে কবি কালো মেয়ের কষ্টের পথ ও যৌবনের চূড়ায় পৌঁছানোর কথা বলছেন। ‘কালো মেয়ে, তুমি দারিদ্রের গহ্বরে হামাগুড়ি দিয়ে’ — দারিদ্র্যের গহ্বরে হামাগুড়ি দিয়ে। ‘মিথ্যার মতো শাদার উৎপীড়নে ধুঁকে ধুঁকে’ — শাদা (গোরার) উৎপীড়নে (নির্যাতনে) ধুঁকে ধুঁকে। ‘লাঞ্ছনার অট্টহাসি শুনে’ — লাঞ্ছনার অট্টহাসি শুনে। ‘বঞ্চনার শত খানাখন্দ পেরিয়ে’ — বঞ্চনার শত খানাখন্দ পেরিয়ে। ‘গায়ে উপহাসের কাদা মেখে, গা ঝারা দিয়ে’ — গায়ে উপহাসের কাদা মেখে, গা ঝাড়া দিয়ে। ‘জ্যোৎস্নার চন্দনলিপ্ত হরিণীর মতো এসে দাঁড়িয়েছো যৌবনের চুড়ায়’ — জ্যোৎস্নার চন্দনলিপ্ত হরিণীর মতো এসে দাঁড়িয়েছো যৌবনের চুড়ায়।
পঞ্চম স্তবক: বরের নির্বাসন ও গর্ভের সন্তান
“তোমার বর কে ওরা ঘরছাড়া করেছে, / ওর কালো মখমলের মতো কণ্ঠস্বর ওরা স্তব্ধ করে দিয়েছে, / তোমার কানে কোনোদিন আর গুঞ্জরিত হবে না তার তারা-ঝলসিত গান। / কিন্তু, কালো মেয়ে, তরমুজের মতো তোমার উদরে / মাসের পর মাস বেড়ে উঠছে ওর সন্তান।”
পঞ্চম স্তবকে কবি বরের নির্বাসন ও গর্ভের সন্তানের কথা বলছেন। ‘তোমার বর কে ওরা ঘরছাড়া করেছে’ — তোমার স্বামীকে তারা ঘরছাড়া করেছে। ‘ওর কালো মখমলের মতো কণ্ঠস্বর ওরা স্তব্ধ করে দিয়েছে’ — তার কালো মখমলের মতো কণ্ঠস্বর তারা স্তব্ধ করে দিয়েছে। ‘তোমার কানে কোনোদিন আর গুঞ্জরিত হবে না তার তারা-ঝলসিত গান’ — তার তারা-ঝলসিত গান আর গুঞ্জরিত হবে না। ‘কিন্তু, কালো মেয়ে, তরমুজের মতো তোমার উদরে মাসের পর মাস বেড়ে উঠছে ওর সন্তান’ — কিন্তু তরমুজের মতো তোমার উদরে মাসের পর মাস বেড়ে উঠছে ওর সন্তান। এটি গর্ভের সন্তানের মাধ্যমে আগামী প্রজন্মের সম্ভাবনার চিত্র।
ষষ্ঠ স্তবক: সন্তানের আগমন ও মুক্তির সম্ভাবনা
“যেদিন তোমার দু’জনের সন্তান ওর অস্তিত্ব ঘোষণা করবে প্রথমবার, / সেদিন সূর্যোদয় গালিচা বিছিয়ে দেবে তার উদ্দেশে, / গান গেয়ে উঠবে রঙবেরঙের পাখি, গাছাপালা করতালিতে মুখর ক’রে তুলবে দশদিক।”
ষষ্ঠ স্তবকে কবি সন্তানের আগমনের কথা বলছেন। ‘যেদিন তোমার দু’জনের সন্তান ওর অস্তিত্ব ঘোষণা করবে প্রথমবার’ — যেদিন সন্তান প্রথম অস্তিত্ব ঘোষণা করবে। ‘সেদিন সূর্যোদয় গালিচা বিছিয়ে দেবে তার উদ্দেশে’ — সূর্যোদয় গালিচা বিছিয়ে দেবে তার উদ্দেশে। ‘গান গেয়ে উঠবে রঙবেরঙের পাখি, গাছাপালা করতালিতে মুখর করে তুলবে দশদিক’ — রঙবেরঙের পাখি গান গেয়ে উঠবে, গাছপালা করতালিতে মুখর করে তুলবে দশদিক।
সপ্তম স্তবক: ছেলের বেড়ে ওঠা ও মুক্তির সংগ্রাম
“তোমার কোল-আলো-করা ছেলে বেড়ে উঠবে / শত্রুর বন্দুকের ছায়ায় বছরের পর বছর, রাত গভীর হ’লে স্বাধীনতার / দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে স্যাক্সফোনে সে তুলবে তোমার পূর্বপুরুষদের যন্ত্রণার সুর; / তোমার ক্রুশবিদ্ধ মর্যাদার ক্ষতগুলো ধুয়ে সেখানে ফোটাবে সে প্রসন্ন অর্কিড, / সে তার জোরালো কালো হাতে মুছিয়ে দেবে আফ্রিকার কালো হীরের মতো চোখ থেকে গড়িয়ে-পড়া অশ্রুজল।”
সপ্তম স্তবকে কবি ছেলের বেড়ে ওঠা ও মুক্তির সংগ্রামের কথা বলছেন। ‘তোমার কোল-আলো-করা ছেলে বেড়ে উঠবে শত্রুর বন্দুকের ছায়ায় বছরের পর বছর’ — ছেলে শত্রুর বন্দুকের ছায়ায় বেড়ে উঠবে। ‘রাত গভীর হলে স্বাধীনতার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে স্যাক্সফোনে সে তুলবে তোমার পূর্বপুরুষদের যন্ত্রণার সুর’ — রাত গভীর হলে স্বাধীনতার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে স্যাক্সফোনে পূর্বপুরুষদের যন্ত্রণার সুর তুলবে। ‘তোমার ক্রুশবিদ্ধ মর্যাদার ক্ষতগুলো ধুয়ে সেখানে ফোটাবে সে প্রসন্ন অর্কিড’ — মায়ের ক্রুশবিদ্ধ মর্যাদার ক্ষতগুলো ধুয়ে সেখানে প্রসন্ন অর্কিড ফোটাবে। ‘সে তার জোরালো কালো হাতে মুছিয়ে দেবে আফ্রিকার কালো হীরের মতো চোখ থেকে গড়িয়ে-পড়া অশ্রুজল’ — সে তার জোরালো কালো হাতে মুছিয়ে দেবে আফ্রিকার কালো হীরের মতো চোখ থেকে গড়িয়ে-পড়া অশ্রুজল।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি সাতটি স্তবকে বিভক্ত। প্রথম স্তবকে বর্ণহীন কণ্ঠস্বরের পরিচয়, দ্বিতীয় স্তবকে কালো মেয়ের সত্তায় আভা, তৃতীয় স্তবকে কালো মাতৃত্ব ও পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য, চতুর্থ স্তবকে দারিদ্র্য, লাঞ্ছনা ও যৌবনের চূড়ায় পৌঁছানো, পঞ্চম স্তবকে বরের নির্বাসন ও গর্ভের সন্তান, ষষ্ঠ স্তবকে সন্তানের আগমন, সপ্তম স্তবকে ছেলের বেড়ে ওঠা ও মুক্তির সংগ্রাম।
ভাষা সরল, প্রাঞ্জল, কিন্তু গভীর আবেগে পরিপূর্ণ। তিনি ব্যবহার করেছেন — ‘ঘন কালো অরণ্যের লতাপাতা’, ‘ঝিলের টোল-খাওয়া পানিতে হরিণের মুখ রাখার ভঙ্গিমা’, ‘উটের গলার ঘণ্টাধ্বনি’, ‘বিষুব রেখা’, ‘উত্তর মেরু’, ‘বঙ্গোপসাগরের তরঙ্গ’, ‘আফ্রিকার জেব্রার খুরধ্বনি’, ‘গীর্জার মোমবাতির আলো’, ‘স্বপ্নালোকিত কাঠের কেবিন’, ‘কালো স্তন’, ‘কালো হাত’, ‘দারিদ্রের গহ্বর’, ‘শাদার উৎপীড়ন’, ‘লাঞ্ছনার অট্টহাসি’, ‘জ্যোৎস্নার চন্দনলিপ্ত হরিণী’, ‘কালো মখমলের কণ্ঠস্বর’, ‘তারা-ঝলসিত গান’, ‘তরমুজের মতো উদর’, ‘সূর্যোদয়ের গালিচা’, ‘কোল-আলো-করা ছেলে’, ‘স্বাধীনতার দোরগোড়া’, ‘ক্রুশবিদ্ধ মর্যাদা’, ‘প্রসন্ন অর্কিড’, ‘কালো হীরের মতো চোখ’।
প্রতীক ব্যবহারে তিনি দক্ষ। ‘কালো অরণ্য’ — আফ্রিকা। ‘হরিণের মুখ রাখার ভঙ্গিমা’ — প্রকৃতির সৌন্দর্য। ‘গীর্জার মোমবাতির আলো’ — পবিত্রতা, আভিজাত্য। ‘কালো স্তন, কালো হাত’ — মাতৃত্ব, পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য। ‘দারিদ্রের গহ্বর’ — দারিদ্র্যের গভীরতা। ‘শাদার উৎপীড়ন’ — গোরাদের নির্যাতন। ‘জ্যোৎস্নার চন্দনলিপ্ত হরিণী’ — সৌন্দর্য ও পবিত্রতা। ‘তরমুজের মতো উদর’ — গর্ভাবস্থার সৌন্দর্য। ‘সূর্যোদয়ের গালিচা’ — নতুন দিনের আগমন। ‘স্বাধীনতার দোরগোড়া’ — মুক্তির সম্ভাবনা। ‘ক্রুশবিদ্ধ মর্যাদা’ — নির্যাতিত নারীর মর্যাদা। ‘কালো হীরের মতো চোখ’ — কালো নারীর সৌন্দর্য ও মূল্য।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“কালো মেয়ের জন্যে পংক্তিমালা” শামসুর রাহমানের এক অসাধারণ সৃষ্টি। কবি বর্ণহীন এক কণ্ঠস্বর হয়ে কালো মেয়ের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সংহতি প্রকাশ করেছেন। তিনি বলছেন — তাঁর কোনো বর্ণ নেই, তিনি গোত্রহীন। তিনি শুধু একটি কণ্ঠস্বর, যা প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকে, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছে। কালো মেয়ে, তুমি যতই কালো হও, তোমার সত্তায় গীর্জার মোমবাতির আলোর মতো আভা আছে। সেই আভাকে প্রণতি জানায় এই কণ্ঠস্বর।
তোমার মায়ের স্তন কালো, তোমার দোলনা দুলিয়েছিল কালো হাত, তোমার জন্য রুটি বানিয়েছিল কালো হাত, তোমার হাতে প্রথম কাঠের পুতুল তুলে দিয়েছিল কালো স্নেহার্দ্র হাত। তুমি দারিদ্র্যের গহ্বরে হামাগুড়ি দিয়ে, গোরাদের নির্যাতনে ধুঁকে ধুঁকে, লাঞ্ছনার অট্টহাসি শুনে, বঞ্চনার খানাখন্দ পেরিয়ে, গায়ে উপহাসের কাদা মেখে, জ্যোৎস্নার চন্দনলিপ্ত হরিণীর মতো এসে দাঁড়িয়েছো যৌবনের চুড়ায়। তোমার বরকে ঘরছাড়া করা হয়েছে, তার কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছে, তার গান আর গুঞ্জরিত হবে না। কিন্তু তরমুজের মতো তোমার উদরে মাসের পর মাস বেড়ে উঠছে ওর সন্তান।
যেদিন সন্তান অস্তিত্ব ঘোষণা করবে, সেদিন সূর্যোদয় গালিচা বিছিয়ে দেবে, রঙবেরঙের পাখি গান গেয়ে উঠবে, গাছপালা করতালিতে মুখর করে তুলবে দশদিক। তোমার কোল-আলো-করা ছেলে শত্রুর বন্দুকের ছায়ায় বেড়ে উঠবে। রাত গভীর হলে স্বাধীনতার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে স্যাক্সফোনে পূর্বপুরুষদের যন্ত্রণার সুর তুলবে। তোমার ক্রুশবিদ্ধ মর্যাদার ক্ষতগুলো ধুয়ে প্রসন্ন অর্কিড ফোটাবে। সে তার জোরালো কালো হাতে মুছিয়ে দেবে আফ্রিকার কালো হীরের মতো চোখ থেকে অশ্রুজল।
এই কবিতা আমাদের শেখায় — কালো হওয়া কোনো কলঙ্ক নয়, কালো মেয়ের সত্তায় আছে গীর্জার মোমবাতির আলোর মতো আভা। কালো মাতৃত্ব, কালো হাত, কালো স্নেহ — সব কিছু মহিমান্বিত। দারিদ্র্য, লাঞ্ছনা, বঞ্চনা, নির্যাতন — সব কিছু পেরিয়ে কালো মেয়ে এসে দাঁড়িয়েছে যৌবনের চুড়ায়। তার গর্ভের সন্তানই হবে মুক্তির দূত, যে শত্রুর বন্দুকের ছায়ায় বেড়ে উঠেও পূর্বপুরুষের যন্ত্রণার সুর তুলবে, মায়ের ক্ষত ধুয়ে অর্কিড ফোটাবে, আফ্রিকার কালো চোখের অশ্রু মুছিয়ে দেবে। এটি আফ্রিকার কালো মেয়ের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও মুক্তির সম্ভাবনার এক অসাধারণ কাব্যচিত্র।
শামসুর রাহমানের কবিতায় বর্ণবাদ, মানবতা ও মুক্তি
শামসুর রাহমানের কবিতায় বর্ণবাদ, মানবতা ও মুক্তি একটি পুনরাবৃত্ত বিষয়। তিনি ‘কালো মেয়ের জন্যে পংক্তিমালা’ কবিতায় আফ্রিকার কালো নারীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সংহতি প্রকাশ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন — কালো হওয়া কোনো কলঙ্ক নয়, কালো মেয়ের সত্তায় আছে পবিত্রতা ও সৌন্দর্য। তার পূর্বপুরুষের কালো হাত, কালো স্তন — সব কিছু মহিমান্বিত।
তাঁর কবিতায় ‘কালো মেয়ে’ একটি কেন্দ্রীয় প্রতীক — যা নির্যাতিত, লাঞ্ছিত, কিন্তু অদম্য। তার গর্ভের সন্তানই হবে মুক্তির দূত।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের উচ্চতর পাঠ্যক্রমে শামসুর রাহমানের ‘কালো মেয়ের জন্যে পংক্তিমালা’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের বর্ণবাদ বিরোধী চেতনা, মানবতা, নারী-গৌরব, এবং আধুনিক বাংলা কবিতার ধারা সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে।
কালো মেয়ের জন্যে পংক্তিমালা সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: কালো মেয়ের জন্যে পংক্তিমালা কবিতাটির লেখক কে?
এই কবিতাটির লেখক শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬)। তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃত। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’, ‘রৌদ্র করোটিতে’, ‘বিপুল বায়ুতে পারে’, ‘আসাদের শার্ট’, ‘বাংলা আমার বাংলা’, ‘কালো মেয়ের জন্যে পংক্তিমালা’।
প্রশ্ন ২: ‘আমার কোনো বর্ণ নেই, আমি গোত্রহীন’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
কবি বলছেন — তাঁর কোনো বর্ণ নেই, তিনি গোত্রহীন। তিনি শুধু একটি কণ্ঠস্বর। এটি বর্ণহীন মানবতার কণ্ঠস্বর — যা কালো-শাদা, হলদে-বাদামি সব ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে।
প্রশ্ন ৩: ‘কালো মেয়ে, তুমি যতই কালো হও, / তোমার সত্তায় আমি দেখেছি / গীর্জার মোমবাতির আলোর মতো আভা’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
কালো হওয়া সত্ত্বেও, কালো মেয়ের সত্তায় গীর্জার মোমবাতির আলোর মতো পবিত্র আভা আছে। এটি কালো নারীর সৌন্দর্য ও পবিত্রতার ঘোষণা।
প্রশ্ন ৪: ‘যে-স্তন তোমার শিরায় শিরায় বইয়ে দিয়েছিল জীবনের ধারা, কালো সেই স্তন’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
মায়ের স্তন কালো — যে স্তন তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে, জীবনের ধারা দিয়েছে। এটি কালো মাতৃত্বের মহিমার চিত্র।
প্রশ্ন ৫: ‘তোমার দোলনা দুলিয়েছিল যে-হাত, সে-হাত কালো’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
মায়ের হাত কালো — যে হাত তাঁকে দোলনা দুলিয়ে বড় করেছে। এটি কালো মাতৃত্বের স্নেহের চিত্র।
প্রশ্ন ৬: ‘মিথ্যার মতো শাদার উৎপীড়নে ধুঁকে ধুঁকে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
শাদা (গোরাদের) উৎপীড়নে (নির্যাতনে) ধুঁকে ধুঁকে। এটি গোরাদের দ্বারা কালোদের ওপর নির্যাতনের চিত্র।
প্রশ্ন ৭: ‘জ্যোৎস্নার চন্দনলিপ্ত হরিণীর মতো এসে দাঁড়িয়েছো যৌবনের চুড়ায়’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
সব কষ্ট পেরিয়ে, উপহাসের কাদা মেখে, গা ঝাড়া দিয়ে, জ্যোৎস্নার চন্দনলিপ্ত হরিণীর মতো এসে দাঁড়িয়েছো যৌবনের চুড়ায়। এটি কালো মেয়ের সৌন্দর্য ও বিজয়ের চিত্র।
প্রশ্ন ৮: ‘তরমুজের মতো তোমার উদরে / মাসের পর মাস বেড়ে উঠছে ওর সন্তান’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
বর নির্বাসিত, তার কণ্ঠস্বর স্তব্ধ, কিন্তু তার সন্তান কালো মেয়ের উদরে বেড়ে উঠছে। এটি আগামী প্রজন্মের সম্ভাবনার চিত্র।
প্রশ্ন ৯: ‘সে তার জোরালো কালো হাতে মুছিয়ে দেবে আফ্রিকার কালো হীরের মতো চোখ থেকে গড়িয়ে-পড়া অশ্রুজল’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
ছেলে তার জোরালো কালো হাতে মুছিয়ে দেবে আফ্রিকার কালো হীরের মতো চোখ থেকে অশ্রুজল। এটি আগামী প্রজন্মের মুক্তির সম্ভাবনার চিত্র।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
কবিতাটি আমাদের শেখায় — কালো হওয়া কোনো কলঙ্ক নয়, কালো মেয়ের সত্তায় আছে গীর্জার মোমবাতির আলোর মতো আভা। কালো মাতৃত্ব, কালো হাত, কালো স্নেহ — সব কিছু মহিমান্বিত। দারিদ্র্য, লাঞ্ছনা, বঞ্চনা, নির্যাতন — সব কিছু পেরিয়ে কালো মেয়ে এসে দাঁড়িয়েছে যৌবনের চুড়ায়। তার গর্ভের সন্তানই হবে মুক্তির দূত, যে শত্রুর বন্দুকের ছায়ায় বেড়ে উঠেও পূর্বপুরুষের যন্ত্রণার সুর তুলবে, মায়ের ক্ষত ধুয়ে অর্কিড ফোটাবে, আফ্রিকার কালো চোখের অশ্রু মুছিয়ে দেবে। এটি আফ্রিকার কালো মেয়ের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও মুক্তির সম্ভাবনার এক অসাধারণ কাব্যচিত্র।
ট্যাগস: কালো মেয়ের জন্যে পংক্তিমালা, শামসুর রাহমান, শামসুর রাহমানের কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, নারীর কবিতা, বর্ণবাদ বিরোধী কবিতা, আফ্রিকার কবিতা, কালো মেয়ের গৌরব, বাংলা কবিতা বিশ্লেষণ
© Kobitarkhata.com – কবি: শামসুর রাহমান | কবিতার প্রথম লাইন: “আমার নামধাম তোমার জানার দরকার নেই, কালো মেয়ে। / আমি শাদা কি কালো, হলদে কি বাদামি, / সবুজ কি বেগুনি / তাতে কী এসে যায়? ধ’রে নাও, আমার কোনো বর্ণ নেই” | বর্ণবাদ ও নারী-গৌরবের কবিতা বিশ্লেষণ | আধুনিক বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন





