কবিতার খাতা
- 38 mins
অভিশাপ – কাজী নজরুল ইসলাম।
যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে,
অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুছবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে!
ছবি আমার বুকে বেঁধে
পাগল হ’লে কেঁদে কেঁদে
ফিরবে মর” কানন গিরি,
সাগর আকাশ বাতাস চিরি’
যেদিন আমায় খুঁজবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে!
স্বপন ভেঙে নিশুত্ রাতে জাগবে হঠাৎ চমকে,
কাহার যেন চেনা-ছোঁওয়ায় উঠবে ও-বুকে ছমকে,-
জাগবে হঠাৎ চমকে!
ভাববে বুঝি আমিই এসে
ব’সনু বুকের কোলটি ঘেঁষে,
ধরতে গিয়ে দেখবে যখন
শূন্য শয্যা! মিথ্যা স্বপন!
বেদ্নাতে চোখ বুঁজবে-
বুঝবে সেদিন বুজবে।
গাইতে ব’সে কন্ঠ ছিঁড়ে আস্বে যখন কান্না,
ব’লবে সবাই-“ সেই য পথিক তার শেখানো গান না?’’
আস্বে ভেঙে কান্না!
প’ড়বে মনে আমার সোহাগ,
কন্ঠে তোমার কাঁদবে বেহাগ!
প’ড়বে মনে অনেক ফাঁকি
অশ্র”-হারা কঠিন আঁখি
ঘন ঘন মুছবে-
বুঝ্বে সেদিন বুঝবে!
আবার যেদিন শিউলি ফুটে ভ’রবে তোমার অঙ্গন,
তুলতে সে ফুল গাঁথতে মালা কাঁপবে তোমার কঙ্কণ-
কাঁদবে কুটীর-অঙ্গন!
শিউলি ঢাকা মোর সমাধি
প’ড়বে মনে, উঠবে কাঁদি’!
বুকের মালা ক’রবে জ্বালা
চোখের জলে সেদিন বালা
মুখের হাসি ঘুচবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে!
আসবে আবার আশিন-হাওয়া, শিশির-ছেঁচা রাত্রি,
থাকবে সবাই – থাকবে না এই মরণ-পথের যাত্রী!
আসবে শিশির-রাত্রি!
থাকবে পাশে বন্ধু স্বজন,
থাকবে রাতে বাহুর বাঁধন,
বঁধুর বুকের পরশনে
আমার পরশ আনবে মনে-
বিষিয়ে ও-বুক উঠবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে!
আসবে আবার শীতের রাতি, আসবে না ক আ সে-
তোমার সুখে প’ড়ত বাধা থাকলে যে-জন পার্শ্বে,
আসবে না ক’ আর সে!
প’ড়বে মনে, মোর বাহুতে
মাথা থুয়ে যে-দিন শুতে,
মুখ ফিরিয়ে থাকতে ঘৃণায়!
সেই স্মৃতি তো ঐ বিছানায়
কাঁটা হ’য়ে ফুটবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে!
আবার গাঙে আসবে জোয়ার, দুলবে তরী রঙ্গে,
সেই তরীতে হয়ত কেহ থাকবে তোমার সঙ্গে-
দুলবে তরী রঙ্গে,
প’ড়বে মনে সে কোন্ রাতে
এক তরীতে ছিলেম সাথে,
এমনি গাঙ ছিল জোয়ার,
নদীর দু’ধার এমনি আঁধার
তেম্নি তরী ছুটবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে!
তোমার সখার আসবে যেদিন এমনি কারা-বন্ধ,
আমার মতন কেঁদে কেঁদে হয়ত হবে অন্ধ-
সখার কারা-বন্ধ!
বন্ধু তোমার হান্বে হেলা
ভাঙবে তোমার সুখের মেলা;
দীর্ঘ বেলা কাটবে না আর,
বইতে প্রাণের শান- এ ভার
মরণ-সনে বুঝ্বে-
বুঝবে সেদিন বুঝ্বে!
ফুট্বে আবার দোলন চাঁপা চৈতী-রাতের চাঁদনী,
আকাশ-ছাওয়া তারায় তারায় বাজবে আমার কাঁদ্নী-
চৈতী-রাতের চাঁদ্নী।
ঋতুর পরে ফির্বে ঋতু,
সেদিন-হে মোর সোহাগ-ভীতু!
চাইবে কেঁদে নীল নভো গা’য়,
আমার মতন চোখ ভ’রে চায়
যে-তারা তা’য় খুঁজবে-
বুঝ্বে সেদিন বুঝ্বে!
আস্বে ঝড়, নাচবে তুফান, টুটবে সকল বন্ধন,
কাঁপবে কুটীর সেদিন ত্রাসে, জাগবে বুকে ক্রন্দন-
টুটবে যবে বন্ধন!
পড়বে মনে, নেই সে সাথে
বাঁধবে বুকে দুঃখ-রাতে-
আপনি গালে যাচবে চুমা,
চাইবে আদর, মাগ্বে ছোঁওয়া,
আপনি যেচে চুমবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে।
আমার বুকের যে কাঁটা-ঘা তোমায় ব্যথা হান্ত,
সেই আঘাতই যাচবে আবার হয়ত হ’য়ে শ্রান–
আসবে তখন পান’।
হয়ত তখন আমার কোলে
সোহাগ-লোভে প’ড়বে ঢ’লে,
আপনি সেদিন সেধে কেঁদে
চাপ্বে বুকে বাহু বেঁধে,
চরণ চুমে পূজবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে!
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন এখানে। কাজী নজরুল ইসলাম।
অভিশাপ – কাজী নজরুল ইসলাম | কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা | মৃত্যু, স্মৃতি ও অপেক্ষার কবিতা | অভিশাপের অসাধারণ কাব্যভাষা
অভিশাপ: কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যু, স্মৃতি ও অপেক্ষার অসাধারণ কাব্যভাষা
কাজী নজরুল ইসলামের “অভিশাপ” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য, আবেগপূর্ণ ও হৃদয়বিদারক সৃষ্টি। এই কবিতাটি কবির মৃত্যুর পর তার প্রেমিক ও বন্ধুদের কষ্ট ও অভাবের অনুভূতি নিয়ে লেখা। কবি জানান যে, মৃত্যুর পরও তার স্মৃতির জ্বালা ভোগ করবে তার প্রিয়জনরা। “যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে, / অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুছবে- / বুঝবে সেদিন বুঝবে!” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে মৃত্যুর পর কবির শূন্যতা এবং প্রিয়জনের কষ্টের এক অসাধারণ চিত্র। কবিতার ভাষা গভীর এবং অনুভূতিপূর্ণ, যা পাঠককে এক অদ্ভুত আবেগে ডুবিয়ে দেয়। কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় কবি। তিনি বিদ্রোহী কবি হিসেবে খ্যাত, কিন্তু প্রেম ও বিরহের কবিতায়ও তিনি অসাধারণ। “অভিশাপ” তাঁর সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি সূর্য, শিউলি ফুল, শীতের রাত, নদীর তরী — এইসব রূপকের মাধ্যমে মৃত্যুর পর স্মৃতির অঙ্গনে প্রেমের অশ্রু এবং কষ্টের অনুভূতি সৃষ্টি করেছেন।
কাজী নজরুল ইসলাম: বিদ্রোহ ও প্রেমের কবি
কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় কবি। তিনি বিদ্রোহী কবি হিসেবে খ্যাত, কিন্তু প্রেম ও বিরহের কবিতায়ও তিনি অসাধারণ। তাঁর কবিতায় জীবনের অস্থিরতা, মৃত্যুর পরবর্তী অবস্থা এবং প্রেমের অন্তর্নিহিত বেদনা ফুটে উঠেছে। তাঁর কবিতার ভাষা প্রাঞ্জল ও আবেগময়। ‘অভিশাপ’ কবিতাটি তার সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাঁশি’, ‘সনাম চণ্ডী’, ‘চক্রবাক’ ইত্যাদি। তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা তাকে অমরত্ব দিয়েছে।
কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো বিদ্রোহী চেতনা, প্রেম ও বিরহের গভীর অনুভূতি, মৃত্যু ও স্মৃতির চিত্রায়ণ, এবং রূপকের অসাধারণ ব্যবহার। ‘অভিশাপ’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি মৃত্যুর পর তার প্রিয়জনদের কষ্ট ও স্মৃতির জ্বালা এক অসাধারণ কাব্যিক ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন।
অভিশাপ: শিরোনামের তাৎপর্য ও কবিতার পটভূমি
শিরোনাম ‘অভিশাপ’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অভিশাপ — অভিশাপ দেওয়া, কাউকে দুঃখ কামনা করা। কিন্তু এখানে কবি কাউকে অভিশাপ দিচ্ছেন না। বরং তিনি বলছেন — মৃত্যুর পর তার প্রিয়জনরা বুঝতে পারবে যে তারা কাকে হারিয়েছে, সেই বোধটিই যেন এক অভিশাপের মতো তাদের জ্বালাবে। এটি এক ‘মিষ্টি অভিশাপ’ — যে অভিশাপ স্মৃতির মধ্য দিয়ে প্রিয়জনকে জ্বালায়।
কবিতার পটভূমি কবির মৃত্যু-পরবর্তী কল্পনা। কবি ভাবছেন — যেদিন তিনি হারিয়ে যাবেন, সেদিন তারা বুঝবে। তারা অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় তার খবর পুছবে। তারা তার ছবি বুকে বেঁধে পাগল হয়ে কাঁদবে। স্বপন ভেঙে নিশুত রাতে জাগবে, কাহার যেন চেনা-ছোঁওয়ায় উঠবে বুকে ছমকে। গাইতে বসে কণ্ঠ ছিঁড়ে আসবে কান্না। শিউলি ফুটলে কাঁপবে কঙ্কণ, কাঁদবে কুটীর-অঙ্গন। শীতের রাতে মনে পড়বে তার বাহুতে মাথা থুয়ে শোয়ার দিনগুলি। নদীতে জোয়ার এলে মনে পড়বে এক তরীতে থাকা। শেষ পর্যন্ত কবি বলছেন — তার বুকের যে কাঁটা-ঘা তাদের ব্যথা দিত, সেই আঘাতই তারা আবার যাচবে হয়ত হয়ে প্রাণপণ।
অভিশাপ: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে, অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুছবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে! ছবি আমার বুকে বেঁধে পাগল হ’লে কেঁদে কেঁদে ফিরবে মর” কানন গিরি, সাগর আকাশ বাতাস চিরি’ যেদিন আমায় খুঁজবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে!
“যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে, / অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুছবে- / বুঝবে সেদিন বুঝবে! / ছবি আমার বুকে বেঁধে / পাগল হ’লে কেঁদে কেঁদে / ফিরবে মর” কানন গিরি, / সাগর আকাশ বাতাস চিরি’ / যেদিন আমায় খুঁজবে- / বুঝবে সেদিন বুঝবে!”
প্রথম স্তবকে কবি মৃত্যুর পর প্রিয়জনের কষ্টের চিত্র এঁকেছেন। যেদিন তিনি হারিয়ে যাবেন, সেদিন তারা বুঝবে। তারা অস্তপারের (পশ্চিম আকাশের) সন্ধ্যাতারায় তার খবর পুছবে। তারা তার ছবি বুকে বেঁধে পাগল হয়ে কাঁদবে। তারা মরুকানন (মরুভূমি), গিরি (পাহাড়), সাগর, আকাশ, বাতাস চিরে তাকে খুঁজবে। ‘বুঝবে সেদিন বুঝবে!’ — পুনরাবৃত্তি জোরালোতা এনেছে।
দ্বিতীয় স্তবক: স্বপন ভেঙে নিশুত্ রাতে জাগবে হঠাৎ চমকে, কাহার যেন চেনা-ছোঁওয়ায় উঠবে ও-বুকে ছমকে,- জাগবে হঠাৎ চমকে! ভাববে বুঝি আমিই এসে ব’সনু বুকের কোলটি ঘেঁষে, ধরতে গিয়ে দেখবে যখন শূন্য শয্যা! মিথ্যা স্বপন! বেদ্নাতে চোখ বুঁজবে- বুঝবে সেদিন বুজবে।
“স্বপন ভেঙে নিশুত্ রাতে জাগবে হঠাৎ চমকে, / কাহার যেন চেনা-ছোঁওয়ায় উঠবে ও-বুকে ছমকে,- / জাগবে হঠাৎ চমকে! / ভাববে বুঝি আমিই এসে / ব’সনু বুকের কোলটি ঘেঁষে, / ধরতে গিয়ে দেখবে যখন / শূন্য শয্যা! মিথ্যা স্বপন! / বেদ্নাতে চোখ বুঁজবে- / বুঝবে সেদিন বুজবে।”
দ্বিতীয় স্তবকে মৃত্যুর পর প্রিয়জনের স্বপ্নভঙ্গের চিত্র। স্বপন ভেঙে নিশুত রাতে হঠাৎ চমকে জাগবে। কাহার যেন চেনা ছোঁওয়ায় বুকে ছমকে উঠবে। ভাববে বুঝি কবি এসে বুকের কোলটি ঘেঁষে বসেছেন। কিন্তু ধরতে গিয়ে দেখবে শূন্য শয্যা, মিথ্যা স্বপন। বেদনায় চোখ বুজবে।
তৃতীয় স্তবক: গাইতে ব’সে কন্ঠ ছিঁড়ে আস্বে যখন কান্না, ব’লবে সবাই-“ সেই য পথিক তার শেখানো গান না?” আস্বে ভেঙে কান্না! প’ড়বে মনে আমার সোহাগ, কন্ঠে তোমার কাঁদবে বেহাগ! প’ড়বে মনে অনেক ফাঁকি অশ্র”-হারা কঠিন আঁখি ঘন ঘন মুছবে- বুঝ্বে সেদিন বুঝবে!
“গাইতে ব’সে কন্ঠ ছিঁড়ে আস্বে যখন কান্না, / ব’লবে সবাই-“ সেই য পথিক তার শেখানো গান না?’’ / আস্বে ভেঙে কান্না! / প’ড়বে মনে আমার সোহাগ, / কন্ঠে তোমার কাঁদবে বেহাগ! / প’ড়বে মনে অনেক ফাঁকি / অশ্র”-হারা কঠিন আঁখি / ঘন ঘন মুছবে- / বুঝ্বে সেদিন বুঝবে!”
তৃতীয় স্তবকে গানের স্মৃতির কথা। গাইতে বসে কণ্ঠ ছিঁড়ে কান্না আসবে। সবাই বলবে — “সেই তো পথিক তার শেখানো গান না?” মনে পড়বে কবির সোহাগ (স্নেহ, আদর)। কণ্ঠে বেহাগ (সঙ্গীতের রাগিণী) কাঁদবে। মনে পড়বে অনেক ফাঁকি, অশ্রুহারা কঠিন আঁখি ঘন ঘন মুছবে।
চতুর্থ স্তবক: আবার যেদিন শিউলি ফুটে ভ’রবে তোমার অঙ্গন, তুলতে সে ফুল গাঁথতে মালা কাঁপবে তোমার কঙ্কণ- কাঁদবে কুটীর-অঙ্গন! শিউলি ঢাকা মোর সমাধি প’ড়বে মনে, উঠবে কাঁদি’! বুকের মালা ক’রবে জ্বালা চোখের জলে সেদিন বালা মুখের হাসি ঘুচবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে!
“আবার যেদিন শিউলি ফুটে ভ’রবে তোমার অঙ্গন, / তুলতে সে ফুল গাঁথতে মালা কাঁপবে তোমার কঙ্কণ- / কাঁদবে কুটীর-অঙ্গন! / শিউলি ঢাকা মোর সমাধি / প’ড়বে মনে, উঠবে কাঁদি’! / বুকের মালা ক’রবে জ্বালা / চোখের জলে সেদিন বালা / মুখের হাসি ঘুচবে- / বুঝবে সেদিন বুঝবে!”
চতুর্থ স্তবকে শিউলি ফুলের স্মৃতি। আবার যেদিন শিউলি ফুটে অঙ্গন ভরবে, ফুল তুলতে মালা গাঁথতে কঙ্কণ কাঁপবে, কুটীর-অঙ্গন কাঁদবে। শিউলি ঢাকা কবির সমাধি মনে পড়বে, উঠবে কাঁদতে। বুকের মালা জ্বালা করবে, চোখের জলে বালা (বালা, অলংকার) ভিজবে, মুখের হাসি ঘুচবে।
পঞ্চম স্তবক: আসবে আবার আশিন-হাওয়া, শিশির-ছেঁচা রাত্রি, থাকবে সবাই – থাকবে না এই মরণ-পথের যাত্রী! আসবে শিশির-রাত্রি! থাকবে পাশে বন্ধু স্বজন, থাকবে রাতে বাহুর বাঁধন, বঁধুর বুকের পরশনে আমার পরশ আনবে মনে- বিষিয়ে ও-বুক উঠবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে!
“আসবে আবার আশিন-হাওয়া, শিশির-ছেঁচা রাত্রি, / থাকবে সবাই – থাকবে না এই মরণ-পথের যাত্রী! / আসবে শিশির-রাত্রি! / থাকবে পাশে বন্ধু স্বজন, / থাকবে রাতে বাহুর বাঁধন, / বঁধুর বুকের পরশনে / আমার পরশ আনবে মনে- / বিষিয়ে ও-বুক উঠবে- / বুঝবে সেদিন বুঝবে!”
পঞ্চম স্তবকে আশ্বিনের হাওয়া ও শিশির রাতের স্মৃতি। আশিন-হাওয়া আসবে, শিশির-ছেঁচা রাত্রি আসবে। সবাই থাকবে — কিন্তু এই মরণ-পথের যাত্রী (কবি) থাকবে না। বন্ধু স্বজন থাকবে পাশে, রাতে বাহুর বাঁধন থাকবে। কিন্তু বঁধুর বুকের পরশনে কবির পরশ মনে আসবে, বিষিয়ে ও-বুক উঠবে।
ষষ্ঠ স্তবক: আসবে আবার শীতের রাতি, আসবে না ক আ সে- তোমার সুখে প’ড়ত বাধা থাকলে যে-জন পার্শ্বে, আসবে না ক’ আর সে! প’ড়বে মনে, মোর বাহুতে মাথা থুয়ে যে-দিন শুতে, মুখ ফিরিয়ে থাকতে ঘৃণায়! সেই স্মৃতি তো ঐ বিছানায় কাঁটা হ’য়ে ফুটবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে!
“আসবে আবার শীতের রাতি, আসবে না ক আ সে- / তোমার সুখে প’ড়ত বাধা থাকলে যে-জন পার্শ্বে, / আসবে না ক’ আর সে! / প’ড়বে মনে, মোর বাহুতে / মাথা থুয়ে যে-দিন শুতে, / মুখ ফিরিয়ে থাকতে ঘৃণায়! / সেই স্মৃতি তো ঐ বিছানায় / কাঁটা হ’য়ে ফুটবে- / বুঝবে সেদিন বুঝবে!”
ষষ্ঠ স্তবকে শীতের রাতের স্মৃতি। শীতের রাত আসবে, কিন্তু সেই মানুষটি আসবে না — যে তোমার সুখে বাধা পড়ত যদি পাশে থাকত। মনে পড়বে, কবির বাহুতে মাথা থুয়ে যে-দিন শুতে, মুখ ফিরিয়ে থাকতে ঘৃণায়। সেই স্মৃতি বিছানায় কাঁটা হয়ে ফুটবে।
সপ্তম স্তবক: আবার গাঙে আসবে জোয়ার, দুলবে তরী রঙ্গে, সেই তরীতে হয়ত কেহ থাকবে তোমার সঙ্গে- দুলবে তরী রঙ্গে, প’ড়বে মনে সে কোন্ রাতে এক তরীতে ছিলেম সাথে, এমনি গাঙ ছিল জোয়ার, নদীর দু’ধার এমনি আঁধার তেম্নি তরী ছুটবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে!
“আবার গাঙে আসবে জোয়ার, দুলবে তরী রঙ্গে, / সেই তরীতে হয়ত কেহ থাকবে তোমার সঙ্গে- / দুলবে তরী রঙ্গে, / প’ড়বে মনে সে কোন্ রাতে / এক তরীতে ছিলেম সাথে, / এমনি গাঙ ছিল জোয়ার, / নদীর দু’ধার এমনি আঁধার / তেম্নি তরী ছুটবে- / বুঝবে সেদিন বুঝবে!”
সপ্তম স্তবকে নদী ও তরীর স্মৃতি। আবার গাঙ্গে জোয়ার আসবে, তরী রঙ্গে দুলবে। সেই তরীতে হয়ত কেউ থাকবে তোমার সঙ্গে। মনে পড়বে সে কোন রাতে এক তরীতে ছিলে সাথে। এমনি গাঙ্গ ছিল জোয়ার, নদীর দু’ধার এমনি আঁধার, তেমনি তরী ছুটবে।
অষ্টম স্তবক: তোমার সখার আসবে যেদিন এমনি কারা-বন্ধ, আমার মতন কেঁদে কেঁদে হয়ত হবে অন্ধ- সখার কারা-বন্ধ! বন্ধু তোমার হান্বে হেলা ভাঙবে তোমার সুখের মেলা; দীর্ঘ বেলা কাটবে না আর, বইতে প্রাণের শান- এ ভার মরণ-সনে বুঝ্বে- বুঝবে সেদিন বুঝ্বে!
“তোমার সখার আসবে যেদিন এমনি কারা-বন্ধ, / আমার মতন কেঁদে কেঁদে হয়ত হবে অন্ধ- / সখার কারা-বন্ধ! / বন্ধু তোমার হান্বে হেলা / ভাঙবে তোমার সুখের মেলা; / দীর্ঘ বেলা কাটবে না আর, / বইতে প্রাণের শান- এ ভার / মরণ-সনে বুঝ্বে- / বুঝবে সেদিন বুঝ্বে!”
অষ্টম স্তবকে সখার (বন্ধুর) কারা-বন্ধের কথা। তোমার সখার আসবে যেদিন এমনি কারা-বন্ধ (কারাবন্ধ, বন্দি অবস্থা), আমার মতো কেঁদে কেঁদে হয়ত হবে অন্ধ। বন্ধু তোমার হেলা হানবে, সুখের মেলা ভাঙবে। দীর্ঘ বেলা কাটবে না আর, প্রাণের শান-এ ভার বইতে মরণসনে বুঝবে।
নবম স্তবক: ফুট্বে আবার দোলন চাঁপা চৈতী-রাতের চাঁদনী, আকাশ-ছাওয়া তারায় তারায় বাজবে আমার কাঁদ্নী- চৈতী-রাতের চাঁদ্নী। ঋতুর পরে ফির্বে ঋতু, সেদিন-হে মোর সোহাগ-ভীতু! চাইবে কেঁদে নীল নভো গা’য়, আমার মতন চোখ ভ’রে চায় যে-তারা তা’য় খুঁজবে- বুঝ্বে সেদিন বুঝ্বে!
“ফুট্বে আবার দোলন চাঁপা চৈতী-রাতের চাঁদনী, / আকাশ-ছাওয়া তারায় তারায় বাজবে আমার কাঁদ্নী- / চৈতী-রাতের চাঁদ্নী। / ঋতুর পরে ফির্বে ঋতু, / সেদিন-হে মোর সোহাগ-ভীতু! / চাইবে কেঁদে নীল নভো গা’য়, / আমার মতন চোখ ভ’রে চায় / যে-তারা তা’য় খুঁজবে- / বুঝ্বে সেদিন বুঝ্বে!”
নবম স্তবকে চৈত্র মাসের রাত ও দোলনচাঁপা ফুলের স্মৃতি। আবার দোলনচাঁপা ফুটবে, চৈতী-রাতের চাঁদনী আসবে। আকাশ-ছাওয়া তারায় তারায় বাজবে কবির কাঁদনি (কান্না)। ঋতুর পরে ঋতু ফিরবে, সেদিন — হে মোর সোহাগ-ভীতু (স্নেহে ভীতু)! কেঁদে নীল নভোগায় চাইবে, কবির মতো চোখ ভরে চায় যে তারা, তাকে খুঁজবে।
দশম স্তবক: আস্বে ঝড়, নাচবে তুফান, টুটবে সকল বন্ধন, কাঁপবে কুটীর সেদিন ত্রাসে, জাগবে বুকে ক্রন্দন- টুটবে যবে বন্ধন! পড়বে মনে, নেই সে সাথে বাঁধবে বুকে দুঃখ-রাতে- আপনি গালে যাচবে চুমা, চাইবে আদর, মাগ্বে ছোঁওয়া, আপনি যেচে চুমবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে।
“আস্বে ঝড়, নাচবে তুফান, টুটবে সকল বন্ধন, / কাঁপবে কুটীর সেদিন ত্রাসে, জাগবে বুকে ক্রন্দন- / টুটবে যবে বন্ধন! / পড়বে মনে, নেই সে সাথে / বাঁধবে বুকে দুঃখ-রাতে- / আপনি গালে যাচবে চুমা, / চাইবে আদর, মাগ্বে ছোঁওয়া, / আপনি যেচে চুমবে- / বুঝবে সেদিন বুঝবে।”
দশম স্তবকে ঝড়-তুফানের স্মৃতি। ঝড় আসবে, তুফান নাচবে, সকল বন্ধন টুটবে। কুটীর কাঁপবে ত্রাসে, বুকে ক্রন্দন জাগবে। মনে পড়বে — সে নেই সাথে, দুঃখ-রাতে নিজেই গালে চুমা যাচবে, আদর চাইবে, ছোঁওয়া মাগবে, নিজেই যেচে চুমবে।
একাদশ স্তবক: আমার বুকের যে কাঁটা-ঘা তোমায় ব্যথা হান্ত, সেই আঘাতই যাচবে আবার হয়ত হ’য়ে শ্রান– আসবে তখন পান’। হয়ত তখন আমার কোলে সোহাগ-লোভে প’ড়বে ঢ’লে, আপনি সেদিন সেধে কেঁদে চাপ্বে বুকে বাহু বেঁধে, চরণ চুমে পূজবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে!
“আমার বুকের যে কাঁটা-ঘা তোমায় ব্যথা হান্ত, / সেই আঘাতই যাচবে আবার হয়ত হ’য়ে শ্রান– / আসবে তখন পান’। / হয়ত তখন আমার কোলে / সোহাগ-লোভে প’ড়বে ঢ’লে, / আপনি সেদিন সেধে কেঁদে / চাপ্বে বুকে বাহু বেঁধে, / চরণ চুমে পূজবে- / বুঝবে সেদিন বুঝবে!”
একাদশ স্তবক — শেষ স্তবক — পুরো কবিতার চূড়ান্ত বার্তা ও সবচেয়ে বেদনাদায়ক অংশ। কবির বুকের যে কাঁটা-ঘা তাদের ব্যথা দিত, সেই আঘাতই তারা আবার যাচবে হয়ত হয়ে প্রাণপণ। হয়ত তখন কবির কোলে সোহাগ-লোভে পড়বে ঢলে, নিজে সেদিন সেধে কেঁদে বুকে বাহু বেঁধে চাপবে, চরণ চুমে পূজবে। তখন তারা বুঝবে।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি এগারোটি স্তবকে বিভক্ত। প্রতিটি স্তবকের শেষে ‘বুঝবে সেদিন বুঝবে!’ পুনরাবৃত্তি হয়েছে। এটি একটি রিফ্রেইন (Refrain), যা কবিতাকে এক আবেশী সুর ও ছন্দ দিয়েছে। ভাষা অত্যন্ত সরল, আবেগময় ও ছন্দময়। নজরুলের নিজস্ব ছন্দ ও মিলের বৈশিষ্ট্য এই কবিতায় প্রকট।
রূপক বিশ্লেষণ: কবিতায় সূর্য, শিউলি ফুল, শীতের রাত ও নদীর তরী রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই রূপকগুলি কবির মৃত্যুর পর মানুষের স্মৃতি, কষ্ট এবং অবুঝতার অনুভূতিকে চিত্রিত করেছে। সূর্যের আলো যেমন সব কিছু আলোকিত করে, তেমনি কবির স্মৃতি জীবনের অন্ধকারে উজ্জ্বল হতে থাকবে।
প্রতীক ব্যবহারে কাজী নজরুল ইসলাম অত্যন্ত দক্ষ। ‘অস্তপারের সন্ধ্যাতারা’ — মৃত্যুর পরের ঠিকানা, দূরের জ্যোতিষ্কের প্রতীক। ‘ছবি বুকে বেঁধে পাগল হয়ে কাঁদা’ — স্মৃতির প্রতি আসক্তির প্রতীক। ‘স্বপন ভেঙে জাগা’ — স্বপ্নভঙ্গের প্রতীক। ‘শূন্য শয্যা’ — কবির অনুপস্থিতির প্রতীক। ‘শিউলি ফুল’ — কবির সমাধির প্রতীক, স্মৃতির প্রতীক। ‘শীতের রাত’ — একাকীত্ব ও স্মৃতির প্রতীক। ‘নদী ও তরী’ — জীবনের যাত্রা ও সঙ্গীর প্রতীক। ‘কাঁটা-ঘা’ — সম্পর্কের বেদনার প্রতীক, যে বেদনা আবার যাচনা হয়।
পুনরাবৃত্তি — ‘বুঝবে সেদিন বুঝবে!’ — প্রতিটি স্তবকের শেষে এসেছে। এটি কবিতার মূল সুর ও বিষয়বস্তুকে বারবার মনে করিয়ে দেয়।
শেষের ‘আপনি সেদিন সেধে কেঁদে চাপ্বে বুকে বাহু বেঁধে, চরণ চুমে পূজবে’ — এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও বেদনাদায়ক সমাপ্তি। মৃত্যুর পর প্রিয়জন নিজে এসে কাঁদবে, বাহু বেঁধে বুকে চাপবে, পায়ে চুমু খেয়ে পূজা করবে — কিন্তু তখন তো কবি থাকবেন না। এই ‘বুঝবে সেদিন’ যেন এক অভিশাপের মতো তাদের জ্বালাবে।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“অভিশাপ” কাজী নজরুল ইসলামের এক অসাধারণ সৃষ্টি। তিনি এখানে মৃত্যুর পর তার প্রিয়জনদের কষ্ট ও স্মৃতির জ্বালা এক অসাধারণ কাব্যিক ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন।
কবি বলছেন — যেদিন তিনি হারিয়ে যাবেন, সেদিন তারা বুঝবে। তারা অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় তার খবর পুছবে। তার ছবি বুকে বেঁধে পাগল হয়ে কাঁদবে। স্বপন ভেঙে জাগবে, শূন্য শয্যা দেখবে। গাইতে বসে কান্না আসবে। শিউলি ফুটলে কাঁপবে কঙ্কণ। শীতের রাতে মনে পড়বে তার বাহুতে মাথা থুয়ে শোয়ার দিনগুলি। নদীতে জোয়ার এলে মনে পড়বে এক তরীতে থাকা। ঝড়-তুফানে বন্ধন টুটলে মনে পড়বে সে নেই। শেষ পর্যন্ত — তার বুকের যে কাঁটা-ঘা তাদের ব্যথা দিত, সেই আঘাতই তারা আবার যাচবে হয়ত হয়ে প্রাণপণ।
এই কবিতা আমাদের শেখায় — মানুষের আসল মূল্য বোঝা যায় যখন সে হারিয়ে যায়। মৃত্যুর পর স্মৃতি যন্ত্রণা দেয়, কষ্ট দেয়। প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা কখনও ঘুচে না। ছোট ছোট জিনিস — শিউলি ফুল, শীতের রাত, নদীর তরী, একটি গান — সবকিছুই হারানো মানুষটির স্মৃতি ফিরিয়ে আনে।
কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় মৃত্যু, স্মৃতি ও অপেক্ষা
কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় মৃত্যু, স্মৃতি ও অপেক্ষা একটি পুনরাবৃত্ত বিষয়। তিনি ‘অভিশাপ’ কবিতায় এই ধারণাগুলোকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছেন। তিনি দেখিয়েছেন — কীভাবে মৃত্যুর পর প্রিয়জনরা কষ্ট পায়, কীভাবে ছোট ছোট জিনিস স্মৃতি ফিরিয়ে আনে, কীভাবে হারানো মানুষটিকে খোঁজার ব্যর্থ চেষ্টা চলে, এবং কীভাবে সেই স্মৃতিই এক অভিশাপের মতো জ্বালায়।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের পাঠ্যক্রমে কাজী নজরুল ইসলামের ‘অভিশাপ’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের মৃত্যু ও স্মৃতির দর্শন, প্রেম ও বিরহের অনুভূতি, রূপক ব্যবহারের কৌশল, এবং নজরুলের আবেগময় কাব্যশৈলী সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে।
অভিশাপ সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: ‘অভিশাপ’ কবিতাটির লেখক কে?
এই কবিতাটির লেখক কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি এবং বিদ্রোহী কবি হিসেবে খ্যাত।
প্রশ্ন ২: কবিতাটি কোন সাহিত্যধারায় পড়ে?
এটি প্রেম, কষ্ট এবং মৃত্যুর পরবর্তী স্মৃতির আবেগ নিয়ে লেখা একটি কবিতা।
প্রশ্ন ৩: কবিতার মূল রূপক কী কী?
সূর্য, শিউলি ফুল, শীতের রাত এবং নদীর তরী কবিতার মূল রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
প্রশ্ন ৪: ‘অভিশাপ’ শিরোনামের তাৎপর্য কী?
শিরোনাম ‘অভিশাপ’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কবি কাউকে অভিশাপ দিচ্ছেন না। তিনি বলছেন — মৃত্যুর পর তার প্রিয়জনরা বুঝতে পারবে যে তারা কাকে হারিয়েছে, সেই বোধটিই যেন এক অভিশাপের মতো তাদের জ্বালাবে।
প্রশ্ন ৫: ‘যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে’ — কেন বারবার বলা হয়েছে?
এই পুনরাবৃত্তি জোরালোতা এনেছে। কবি নিশ্চিত করতে চান যে মৃত্যুর পর তার প্রিয়জনরা তার আসল মূল্য বুঝতে পারবে — কিন্তু তখন আর কোনো লাভ হবে না।
প্রশ্ন ৬: ‘স্বপন ভেঙে নিশুত রাতে জাগবে হঠাৎ চমকে’ — কী বোঝানো হয়েছে?
মৃত্যুর পর প্রিয়জনের স্বপ্নভঙ্গের চিত্র। তারা স্বপ্নে হয়ত কবিকে দেখবে, কিন্তু জেগে দেখবে শূন্য শয্যা। এটি স্বপ্ন ও বাস্তবের বেদনাদায়ক বৈপরীত্য।
প্রশ্ন ৭: ‘শিউলি ফুটলে কাঁপবে কঙ্কণ’ — কেন?
শিউলি ফুল ফোটার সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতির জ্বালা শুরু হবে। কবির সমাধি শিউলি ফুলে ঢাকা থাকবে — সেই ছবি মনে পড়লে কঙ্কণ (বালা) কাঁপবে, অর্থাৎ শরীর কাঁপবে, হাত কাঁপবে।
প্রশ্ন ৮: ‘আমার বুকের যে কাঁটা-ঘা তোমায় ব্যথা হান্ত, সেই আঘাতই যাচবে আবার’ — লাইনটির গভীরতা কী?
এটি কবিতার সবচেয়ে বেদনাদায়ক ও জটিল লাইন। সম্পর্কের সময় যে বেদনা তারা দিয়েছিল (কাঁটা-ঘা), মৃত্যুর পর তারা সেই বেদনাই আবার যাচনা করবে — অর্থাৎ তারা নিজেরাই আবার সেই কষ্ট চাইবে, কারণ সেই কষ্টের সঙ্গে কবির স্মৃতি জড়িত।
প্রশ্ন ৯: কবিতায় কবির উদ্দেশ্য কী?
কাজী নজরুল ইসলাম তার কবিতায় জীবনের অস্থিরতা, মৃত্যুর পরবর্তী অবস্থা এবং প্রেমের অন্তর্নিহিত বেদনা ফুটিয়ে তুলেছেন। কবির উদ্দেশ্য ছিল মৃত্যুর পর স্মৃতির অঙ্গনে প্রেমের অশ্রু এবং কষ্টের অনুভূতি সৃষ্টির মাধ্যমে মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করা।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
কবিতাটি আমাদের শেখায় — মানুষের আসল মূল্য বোঝা যায় যখন সে হারিয়ে যায়। মৃত্যুর পর স্মৃতি যন্ত্রণা দেয়, কষ্ট দেয়। প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা কখনও ঘুচে না। ছোট ছোট জিনিস — শিউলি ফুল, শীতের রাত, নদীর তরী, একটি গান — সবকিছুই হারানো মানুষটির স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। আজকের দিনে, যখন মানুষ দ্রুত সম্পর্ক ভুলে যেতে চায়, এই কবিতা স্মৃতির শক্তি ও ক্ষতকে মনে করিয়ে দেয়।
ট্যাগস: অভিশাপ, কাজী নজরুল ইসলাম, কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, মৃত্যুর কবিতা, স্মৃতির কবিতা, বিরহের কবিতা, নজরুলের অভিশাপ
© Kobitarkhata.com – কবি: কাজী নজরুল ইসলাম | কবিতার প্রথম লাইন: “যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে” | মৃত্যু, স্মৃতি ও অপেক্ষার অসাধারণ কাব্যভাষা | আধুনিক বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন






