কবিতার খাতা
কাবো ভার্দে – সুবোধ সরকার।
যখন আফ্রিকা উঠে দাঁড়ায়,গরিব উঠে দাঁড়ায়
চাঁদ যেখানেই থাকুক তখন মনে হয়
পুরুলিয়া থেকে অশোক হেমব্রম
আমেরিকার এম.আই.টি ক্র্যাক করেছে।
এই নামে একটা দেশ আছে আমি কখনো শুনিনি।
সারা পৃথিবীর ইন্টারনেটে এখন
একটাই নাম কোটি কোটি আঙুল টাইপ করে চলেছে কাবো ভার্দে
কাবো কাবো কাবো আফ্রিকা আফ্রিকা আফ্রিকা।
একদিন এই তোমরা, এই তোমরা,এই তোমরা
আফ্রিকায় এসেছিলে, বলেছিলে চোখ বন্ধ কর্।
ওরা চোখ বন্ধ করেছিল। দুশো বছর বাদে ওরা
যখন চোখ খুলল, দেখল দেশটা ওরা নিয়ে গেছে।
আর হাতে হাতে রেখে গেছে বাইবেল।
কালো মানুষের জন্য আমরা কত কি না করি!
গান করি কবিতা লিখি নাটক লিখি রাস্তায় নামি।
‘কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি’ সুচিত্রা মিত্রের কন্ঠে শুনে
আমাদের চোখে জল আসে।
কিন্তু রবিবারের পাত্রপাত্রীর বিজ্ঞাপনে চোখ রাখুন
ওটাও একটা আফ্রিকা।
আজ পর্যন্ত একটি ছেলেও কি আমেরিকা থেকে
আফ্রিকার মেয়ে বিয়ে করে বাড়ি এসে বলেছে
মা, তোমার জন্য রানি নিয়ে এলাম?
কয়েকটা দ্বীপ,কয়েকটা আগ্নেয়গিরি ,
৫ লক্ষ কালো মানুষ, রডোডেনড্রন,আর একটা ফুটবল এই নিয়ে একটা দেশ।
চারপাশে ভয়াবহ আটলান্টিকের ঢেউ
ঢেউয়ের ওপর উঠে একটা ফুটবল সারা পৃথিবীকে বলছে :
আমরা আসছি আমরা আসছি আমরা আসছি
সমস্ত কলোনি থেকে আমরা আসছি
মার খাওয়া দেশ থেকে আমরা আসছি
পৃথিবীর সমস্ত বাঁকুড়া পুরুলিয়া থেকে আমরা আসছি।
আমরা আমেরিকা নিয়ে নেব।
বড়লোকের মিয়ামিতে আমরা পারলাম না ।
আমরা হেরে গেলাম।
আমরা ২০০ বছর ধরে হেরে আসছি।
কেউ আমাদের এক থালা ভাত এগিয়ে দেয়নি
কেউ একটা রুটির টুকরো ছেড়ে দেয়নি।
মিয়ামি আসার মতো পয়সা ছিল না আমাদের।
কাবো ভার্দে, তুমি হারোনি।তুমি যদি মহাকাব্যের নায়ক না-হও
তাহলে বৃথা লেখা হয়েছিল ইলিয়াড
বৃথা লেখা হয়েছিল মহাভারত
তুমি সেই বীর যার রথের চাকা বসে গিয়েছিল।
আত্মঘাতী গোল সেই রথের চাকা
যা ঢুকে গেলে আর ফেরানো যায় না।
চার বছর বাদে আমরা আবার আসবো
২০০ বছর আমরা অপেক্ষা করেছি।
আমাদের থেকে গরিবের থেকে হে পৃথিবী প্রণতি গ্রহণ করো।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। সুবোধ সরকারের কবিতা।
কবিতার খাতা –
আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম ধারালো ও সমাজসচেতন কবি সুবোধ সরকারের ‘কাবো ভার্দে’ কবিতাটি তৃতীয় বিশ্বের প্রান্তিক মানুষের জেগে ওঠার এক বারুদঠাসা মহাকাব্যিক দলিল। ফুটবলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই কবিতাটি মূলত ক্রীড়াঙ্গনের সীমানা পেরিয়ে বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদের ইতিহাস, বর্ণবাদ এবং শত শত বছর ধরে শোষিত-নিপীড়িত কালো ও গরিব মানুষের তীব্র প্রতিবাদের এক অবিনাশী মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান।
কবিতার প্রারম্ভেই কবি এক পরম আত্মবিশ্বাসের জয়ধ্বনি উচ্চারণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, যখন আফ্রিকা তথা পৃথিবীর কোনো অবহেলিত প্রান্তিক বা গরিব মানুষ নিজের যোগ্যতায় উঠে দাঁড়ায়, তখন সেই সাফল্য কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় আটকে থাকে না। আফ্রিকার এক অখ্যাত কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের বা দেশের সেই উত্থানকে কবি তুলনা করেছেন আমাদের চেনা পশ্চিমবঙ্গের প্রান্তিক জেলা পুরুলিয়ার এক সাঁওতাল তরুণ ‘অশোক হেমব্রম’-এর আমেরিকার বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠান এম.আই.টি (M.IT) ক্র্যাক করার অলৌকিক সাফল্যের সাথে। ‘কাবো ভার্দে’ (Cabo Verde) নামের যে ছোট দ্বীপরাষ্ট্রটির কথা পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ কখনো শোনেনি, আজ ফুটবল মাঠের বীরত্বে সারা পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ ইন্টারনেটের সার্চবারে সেই অবহেলিত নাম আর ‘আফ্রিকা’ শব্দটিকে পরম বিস্ময়ে টাইপ করে চলেছে।
কবিতার মধ্যভাগে কবি উপনিবেশবাদের সেই ক্রূর ও শোষণের ইতিহাসকে চরম চাবুক মেরেছেন। শ্বেতাঙ্গ কলোনিয়াল শাসকরা যখন আফ্রিকায় এসেছিল, তখন তারা আফ্রিকাবাসীকে বলেছিল ‘চোখ বন্ধ করো’ অর্থাৎ বিশ্বাসের ছলে তারা ঈশ্বরের বাণী প্রচার করেছিল। সরল আফ্রিকাবাসী চোখ বন্ধ করে যখন দুশো বছর পর তা খুলল, দেখল শ্বেতাঙ্গরা তাদের দেশের সোনা, হিরে ও সমস্ত সম্পদ লুটে নিয়ে দেশটাই কেড়ে নিয়েছে, আর তাদের সান্ত্বনা পুরস্কার হিসেবে হাত দিয়ে গেছে একটি করে ‘বাইবেল’। কবি এখানে শ্বেতাঙ্গদের সেই ঐতিহাসিক ও মেকি সভ্যতার মুখোশ উন্মোচন করেছেন।
একই সাথে কবি আমাদের তথাকথিত প্রগতিশীল সমাজের ভেতরের সুপ্ত বর্ণবাদ ও ভণ্ডামিকে তীব্র আক্রমণ করেছেন। আমরা মুখে প্রগতিশীলতার বুলি আওড়াই, কালো মানুষের জন্য কবিতা-গান-নাটক লিখি, সুচিত্রা মিত্রের কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের ‘কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি’ শুনে আমাদের চোখ দিয়ে আবেগ মিশ্রিত জল আসে। কিন্তু আমাদের বাস্তব জীবনের কুৎসিত রূপটি প্রকাশ পায় যখন আমরা রবিবারের খবরের কাগজের পাত্র-পাত্রীর বিজ্ঞাপনে কেবল ‘ফর্সা’ ও ‘সুশ্রী’ খোঁজার মরিয়া চেষ্টা দেখি—কবি একেই বলেছেন “ওটাও একটা আফ্রিকা”। আজ পর্যন্ত কোনো শ্বেতাঙ্গ বা ধনী দেশের আধুনিক ছেলেও আফ্রিকার কোনো কালো মেয়েকে ভালোবেসে ঘরে তুলে এনে বলতে পারেনি—”মা, তোমার জন্য রানি নিয়ে এলাম”।
পরবর্তী অংশে কবিতার মূল চরিত্র ও উদ্দীপনা জেগে ওঠে। মাত্র কয়েকটা দ্বীপ, কিছু জীবন্ত আগ্নেয়গিরি, পাঁচ লক্ষ কালো মানুষ, রডোডেনড্রন ফুল আর একটা ফুটবল—এই নিয়েই গড়ে উঠেছে ‘কাবো ভার্দে’। চারপাশে আটলান্টিক মহাসাগরের ভয়ংকর ও উত্তাল ঢেউকে পায়ে মাড়িয়ে তাদের পায়ের একটিমাত্র ফুটবল আজ সারা বিশ্বকে কাঁপিয়ে ঘোষণা করছে—”আমরা আসছি”। এই ‘আমরা’ কেবল কাবো ভার্দে নয়, এরা হলো পৃথিবীর সমস্ত মার খাওয়া দেশ, সমস্ত কলোনি এবং শোষিত-বঞ্চিত ‘বাঁকুড়া-পুরুলিয়া’র প্রতিনিধি। তারা আজ ধনী ও শ্বেতাঙ্গদের অহংকারের সাম্রাজ্য ‘আমেরিকা’ বা তাদের আধিপত্যকে কেড়ে নিতে আসছে।
শেষাংশে এসে কবিতাটি এক চরম ট্র্যাজিক কিন্তু অবিনাশী রূপ লাভ করে। বড়লোকদের শহর মিয়ামির মাঠে হয়তো কাবো ভার্দে শেষ পর্যন্ত জিততে পারেনি, এক চরম আত্মঘাতী গোলের শিকার হয়ে তারা হেরে গেছে। কিন্তু কবি এই হারকে পরাজয় হিসেবে মানতে নারাজ। দুশো বছর ধরে ক্ষুধার্ত, এক থালা ভাত কিংবা একটা রুটির টুকরো না পাওয়া এই দলটির মায়ামি আসার মতো নূন্যতম পয়সাটুকুও ছিল না। তাই কাবো ভার্দে যদি আজ এই অসম লড়াইয়ের মহাকাব্যের নায়ক না হয়, তবে পৃথিবীর ‘ইলিয়াড’ কিংবা ‘মহাভারত’ লেখাটাই বৃথা ছিল। তারা হলো মহাভারতের সেই সূর্যপুত্র কর্ণের মতো বীর, যার রথের চাকা নিয়তির চরম পরিহাসে মাটিতে বসে গিয়েছিল।
একটি মাত্র আত্মঘাতী গোল হয়তো তাদের রথের চাকা থামিয়ে দিয়েছে, কিন্তু তাদের ভেতরের আগুনকে নেভাতে পারেনি। কবি অত্যন্ত স্পর্ধার সাথে ঘোষণা করেন—এই পরাজয় শেষ নয়, আরও দুশো বছর অপেক্ষা করা এই কালো ও গরিব মানুষগুলো চার বছর পর আবার বুক চিতিয়ে ফিরে আসবে। বিশ্ব সভ্যতার মূল কারিগর এই বঞ্চিত গরিবদের পক্ষ থেকে পৃথিবীর বুকে এক পরম ও দ্রোহী ‘প্রণতি’ বা নমস্কার জানিয়েই কবিতাটি এক বৈপ্লবিক পূর্ণতা লাভ করে।






