কবিতার খাতা
কথামানবী – সুবোধ সরকার।
তুমি এসেছিলে ঝিনুক কুড়োতে সেদিন
ঝিনুক কুড়োতে কুড়োতে পেয়েছ মুক্ত
মুর্মুকে তুমি করতে চেয়েছ রানিমা
ভালবেসে তুমি হয়েছিলে অভিযুক্ত।
কার হাতে তুমি রেখে গেছ কথামানবী
কাকে দিয়ে গেছ তোমার ‘ মাছের চাবুক’?
তোমার মেয়েরা লেলিহান হয়ে উঠছে
মেয়েগুলো আজ লড়াই লাস্যে বাঁচুক।
একজন কবি তোমাকে বলতো ডাইনি
সে কথা কিন্তু কোন ভাবে ভুলে যাইনি।
বাবা-ই বোঝে না তার মেয়েটির কান্না
মেধার চাইতে ভালবাসে তার রান্না।
মেয়েরাই আজও এই পৃথিবীর কাজল
মেয়েরাই আজও দুঃখ মোছার আঁচল
কোন হাওয়া লেগে তোমার আবির উড়ত
ভালবেসে আজও হতে হয় অভিযুক্ত।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। সুবোধ সরকারের কবিতা।
কবিতার খাতা –
আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রতিবাদী ও সমাজমনস্ক কবি সুবোধ সরকারের ‘কথামানবী’ কবিতাটি নারীর চিরন্তন আত্মত্যাগ, সামাজিক বঞ্চনা, পিতৃতান্ত্রিক সমাজের বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি এবং তার বিপরীতে আধুনিক নারীর জেগে ওঠার এক বলিষ্ঠ মনস্তাত্ত্বিক ও নারীবাদী আখ্যান। কবি এখানে ‘কথামানবী’ রূপকের আড়ালে এমন এক অবিনাশী নারীসত্তাকে আবাহন করেছেন, যে যুগে যুগে সমাজকে অকাতরে ভালোবেসেও কেবল অবহেলা, লাঞ্ছনা আর অপরাধের অপবাদ পেয়েছে।
কবিতার প্রারম্ভেই নারীর আজীবন সাধনা এবং তার বিনিময়ে পাওয়া সামাজিক লাঞ্ছনার এক নিখুঁত চিত্র ফুটে উঠেছে। কোনো এক অতীতে এক মায়াবী নারী এই জীবনের সৈকতে এসেছিল কেবল সামান্য ঝিনুক কুড়াতে। কিন্তু তার সেই সরল সাধনায় সে একসময় পেয়ে যায় পরম মূল্যবান এক ‘মুক্তো’—যা মূলত তার ভেতরের জ্ঞান, মেধা ও ভালোবাসার প্রতীক। সে তার সেই অর্জিত সম্পদ দিয়ে সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত, অন্ত্যজ বা ‘মুর্মু’ (আদিবাসী বা প্রান্তিক মানুষ)-দের মর্যাদা দিয়ে ‘রানিমা’ করতে চেয়েছিল। অর্থাৎ, সে সমাজকে আলোর পথ দেখাতে চেয়েছিল। কিন্তু এই পুরুষতান্ত্রিক ও রক্ষণশীল সমাজ তার সেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসাকে ভালো চোখে দেখেনি; বরং সমাজকে আলোর পথ দেখানোর অপরাধে তাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে ‘অভিযুক্ত’ করা হয়েছে।
কবিতার মধ্যভাগে কবিতাটি এক চরম বিদ্রোহ ও রূপান্তরের দিকে মোড় নেয়। কবি প্রশ্ন তুলেছেন—হে কথামানবী, তুমি আজ কার জিম্মায় রেখে গেছ তোমার সেই অবিনাশী কথা ও আদর্শকে? কাকে দিয়ে গেছ তোমার সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ‘মাছের চাবুক’? নারী আজ আর কেবল ঘরের কোণে মুখ বুজে কাঁদার পাত্রী নয়। কথামানবীর রেখে যাওয়া সেই চাবুক আর প্রতিবাদের মন্ত্র নিয়ে আজকের মেয়েরা ‘লেলিহান’ বা আগুনের শিখার মতো তীব্র হয়ে উঠছে। তারা আজ কেবল পুরুষের দয়ায় নয়, বরং নিজেদের অধিকারের ‘লড়াই’ আর জীবনের নিজস্ব ‘লাস্য’ বা আনন্দের মেলবন্ধনে স্বমহিমায় বাঁচতে শিখেছে।
পরবর্তী স্তবকে কবি সমাজের এক নির্মম ভণ্ডামি ও সংকীর্ণ মানসিকতাকে উন্মোচন করেছেন। কবি ক্ষোভের সাথে মনে করিয়ে দেন—এই সমাজেরই কোনো এক তথাকথিত নামী ‘কবি’ বা বুদ্ধিজীবী একসময় স্বাধীনচেতা ও প্রতিভাবান নারীকে ‘ডাইনি’ বলে কুৎসিত গালি দিয়েছিল; কবি সেই অন্যায়ের কথা আজও ভুলে যাননি। শুধু বাইরের সমাজই নয়, ঘরের ভেতরের চিরন্তন পিতৃতন্ত্রও নারীর মেধার মূল্যায়ন করতে জানে না। একজন জন্মদাতা বাবাও অনেক সময় তার নিজের কন্যার ভেতরের সুপ্ত কান্না বা মেধার কদর বোঝেন না; তিনি বরং মেয়ের বুদ্ধিমত্তা বা উচ্চশিক্ষার চেয়ে তার হাতের ‘রান্না’ ভালো হওয়াটাকেই বেশি ভালোবাসেন ও অগ্রাধিকার দেন।
শেষাংশে এসে কবিতাটি নারীর চিরন্তন মহিমা ও বাস্তবতার এক নির্মম চক্রে এসে থিতু হয়। কবি সশ্রদ্ধচিত্তে স্বীকার করেছেন যে—নারীরাই আজও এই ধূসর পৃথিবীর চোখ জুড়ানো ‘কাজল’ এবং তারাই আজ অব্দি মানুষের সমস্ত ক্লান্তি ও দুঃখ মুছে দেওয়ার পরম নিরাপদ ‘আঁচল’। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, কোন বসন্তের হাওয়া লেগে যে নারীর ভেতরের সেই রঙিন ‘আবির’ বা স্বপ্নগুলো আকাশে উড়ত, সমাজ তাকে কখনোই জানতে চায়নি। সৃষ্টির আদি থেকে আজ পর্যন্ত নিঃস্বার্থভাবে সমাজ ও মানুষকে ভালোবেসেও নারীকে বারবার কপালে জুটল কেবলই ‘অভিযুক্ত’ হওয়ার নির্মম তিলক। নারীর এই চিরন্তন অধিকারের লড়াই এবং বঞ্চনার আবর্তের মাঝেই কবিতাটি এক গভীর অনুতাপে শেষ হয়।






