কবিতার খাতা
আরো একজন – সৈয়দ শামসুল হক।
যেখানেই যাও তুমি, যেখানেই যাও
সঙ্গে যায় আরো একজন;
যদিও অদূরে তবু তার দূরত্ব ভীষণ।
যেখানেই দৃষ্টি দাও, যেখানেই দাও
দৃষ্টি দেয় আরো একজন;
যদিও সুনীল তবু সেখানেই মেঘের গড়ন।
যাকেই যে কথা বলো, যাকেই যে কথা
শুনে যায় আরো একজন;
যদিও নিশ্চুপ তবু অবিরাম পদ্মার ভাঙন।
যেখানেই রাখো হাত, যেখানেই রাখো
রাখে হাত আরো একজন;
যদিও নিশ্চল তবু দ্রুত তার শিরায় স্পন্দন।
যখন শয্যায় তুমি, যখন শয্যায়
পাশে আছে আরো একজন;
যদিও ঘনিষ্ঠ তবু ঘুম কেড়ে নিয়েছে কখন।
তুমি কি দেখেছো তাকে ? চেনো তাকে ?
সচকিত মাঝে মাঝে তাই ?
তোমার সম্মুখে তবে আমি এসে আবার দাঁড়াই ?
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। সৈয়দ শামসুল হকের কবিতা।
কবিতার কথা –
সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের ‘আরো একজন’ কবিতাটি মানুষের অবচেতন মন, স্মৃতির অবিচ্ছদ্য ছায়া, অবদমিত অতীত এবং এক পরম মনস্তাত্ত্বিক দ্বৈততার এক অনবদ্য কাব্যিক আখ্যান। কবি এখানে এক অদ্ভুত রহস্যময় ও অদৃশ্য সত্তার উপস্থিতি ফুটিয়ে তুলেছেন, যা মানুষের প্রতিটি পদক্ষেপে, দৃষ্টিতে, কথায় এবং একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তেও ছায়ার মতো লেগে থাকে। এই ‘আরো একজন’ আসলে বাইরের কেউ নয়; এটি মানুষের নিজেরই কোনো ফেলে আসা অতীত, কোনো তীব্র অপরাধবোধ, কোনো চিরন্তন প্রেম কিংবা অবচেতন মনের এক অলৌকিক আয়না।
কবিতার প্রারম্ভেই মানুষের জীবনের এক চিরন্তন বন্দিত্বের রূপ ফুটে ওঠে। মানুষ জাগতিকভাবে যেখানেই যাক না কেন, তার সাথে সবসময় অলক্ষ্যে হেঁটে চলে আরও একজন। সে হয়তো চোখের সামনে থাকে না, থাকে একটু অদূরে, অথচ তার সাথে মনের বা স্মৃতির দূরত্বটা যেন ভীষণ ও দুর্লঙ্ঘ্য। মানুষ যখনই কোনো সুন্দর প্রকৃতির দিকে বা কোনো স্বপ্নের দিকে দৃষ্টিপাত করে, তখন সেই অদৃশ্য সত্তাটিও সেখানে চোখ রাখে। ফলে আকাশের সেই ‘সুনীল’ বা মেঘহীন নীল রঙের মাঝেও হঠাৎ করেই এক বিষাদময় মেঘের গড়ন তৈরি হয়। অর্থাৎ, অতীত স্মৃতি বা ভেতরের সেই মানুষটি বর্তমানের সুন্দর মুহূর্তকেও এক লহমায় এক অদ্ভুত মায়ায় আচ্ছন্ন করে ফেলে।
কবিতার মধ্যভাগে এই অদৃশ্য সত্তার নীরব অথচ শক্তিশালী প্রভাবের চিত্র চিত্রিত হয়েছে। মানুষ যখনই অন্য কাউকে কোনো গোপন বা সাধারণ কথা বলে, তখন সেই না-বলা কথাটি নিশ্চুপে শুনে নেয় ভেতরের সেই আরও একজন। সে বাইরে থেকে পুরোপুরি নিশ্চুপ বা নীরব থাকে, কিন্তু তার সেই নীরবতার ভেতরে চলতে থাকে এক প্রলয়ঙ্করী তোলপাড়—যাকে কবি তুলনা করেছেন ‘পদ্মার ভাঙন’-এর সাথে। আবার মানুষ যখনই স্পর্শের আশায় কোথাও হাত রাখে, তখন সেখানেও আলতো করে হাত রাখে সেই অবিনাশী ছায়াটি। সে নিথর বা নিশ্চল হয়ে থাকলেও, স্মৃতির সেই তীব্র দহনে তার ভেতরের রক্তে ও শিরায় শিরায় এক দ্রুত স্পন্দন বা ছটফটানি টের পাওয়া যায়।
পরবর্তী অংশে কবিতাটি মানুষের জীবনের সবচেয়ে গোপন ও ব্যক্তিগত শয্যার কোণে এসে এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক রূপ ধারণ করে। মানুষ যখন রাতের অন্ধকারে বিছানায় বা শয্যায় যায়, তখন তার খুব কাছে, একেবারে ঘনিষ্ঠ হয়ে পাশে শুয়ে থাকে সেই আরও একজন। সে এতখানি ঘনিষ্ঠ ও পরম আপন হওয়া সত্ত্বেও, তার সেই নীরব উপস্থিতি মানুষের চোখের ঘুম কখন যে কেড়ে নিয়ে তাকে এক গভীর অনিদ্রা আর ভাবনার অতল সাগরে ছুঁড়ে দেয়, মানুষ তা টেরও পায় না। এই শয্যা এবং ঘুম কেড়ে নেওয়া মূলত মানুষের ভেতরের এক তীব্র একাকীত্ব ও স্মৃতির অন্তহীন দহনকে স্পষ্ট করে।
শেষ চরণে এসে কবিতাটি এক চমৎকার নাটকীয় মোড় ও চরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে স্তব্ধ হয়ে যায়। কবি সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন—তুমি কি কখনো সেই অদৃশ্য সত্তাকে দেখেছো? তাকে কি চেনো? আর সেই কারণেই কি চেনা জীবনের মাঝেও মাঝে মাঝে তুমি হঠাৎ ‘সচকিত’ বা চমকে ওঠো? এই চেনা-অচেনার গোলকধাঁধা ভাঙতে কবিতার শেষ পঙ্ক্তিতে কবি নিজেই এক অলৌকিক অবয়ব নিয়ে হাজির হন। কবি বলেন—”তোমার সম্মুখে তবে আমি এসে আবার দাঁড়াই?” এই শেষ চরণের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এতক্ষণ ধরে ছায়ার মতো পিছু নেওয়া, ঘুম কেড়ে নেওয়া এবং পদ্মার মতো ভাঙন তোলা সেই ‘আরো একজন’ আসলে কবি নিজেই, কিংবা কবির সেই অবিনাশী প্রেম—যা প্রিয়তমার পুরো অস্তিত্বকে চিরকালের জন্য আচ্ছন্ন করে রেখেছে। এই চরম মনস্তাত্ত্বিক আত্মোপলব্ধির মাঝেই কবিতাটি পূর্ণতা লাভ করে।






