পরীক্ষা শেষ, এবার হাতে মাসখানেকের ছুটি
বাবা বললেন মাকে ডেকে, “এবার চলো উঠি।”
আমি বললাম, “না না, বাপি, উটি অনেক দূর
এবার চলো সেই যেখানে আকাশ-সমুদ্দুর!”
“কোথায় সেটি!” বাবা বললেন, “বল না দেখি খুঁজে।”
আমি বললাম, “বলতে পারি এক্ষুনি চোখ বুজে
হাওড়া থেকে লোকাল ট্রেনে মেচেদা নামলাম
সেখান থেকে বাস যাচ্ছে সিঁদুরটিয়া গ্রাম।”
বাবা বললেন, “ও হো, সেতোর ছোটো পিসির বাড়ি!”
আমি বললাম, “এই ছুটিতে সেখানে যেতে পারি।”
বাবা তখন মাকে ডাকলেন, “কই গো, এসো, শোনো—
দোলার বাড়ি লম্বা ছুটির মানে নেই তো কোনো
ওরাই যাক না দু’-ভাইবোনে, আসুক ঘুরেটুরে
ওদের নিতে ডেকে পাঠাই টুকাই-কুঙ্কুরে!”
বোন বলল, “নদী পেরোনো? হাঁটু-ভরতি কাদা ?
আমার যেতে ইচ্ছে তো নেই, যাক না একা দাদা।
ওরা যখন ছুটবে মাঠে বিল্টু ও বন্ধুতে
আমি তখন থাকব ডুবে ফেলুদা-শঙ্কুতে!”
অনেক টানাপোড়েন শেষে ট্রেনের পরে বাসে
নেমেই দেখি হলদি জলে মেঘরা ভেসে আসে।
একটু পরে তাকিয়ে আমি মেঘগুলোকে খুঁজি
ও মা, ওই তো, রঙে-রঙে দোল খেলেছে বুঝি !
লঙ্কাজবার ঝোপটা গেল অন্ধকারে ছেয়ে
ছড়া পড়ছে জোনাকপোকার ছোট্ট ছেলেমেয়ে।
সকালবেলা ছুট পাঁইপাঁই মস্ত বড়ো মাঠ
মাঠ পেরিয়ে বনে গিয়েই ভূতের ভয়ে কাঠ।
রোদ-বৃষ্টি রামধনু আর জ্যোৎস্না লুটোপুটি
দেখতে দেখতে ফুরিয়ে এল মস্ত বড়ো ছুটি।
সেদিন একা ভাবছি বসে সরু আলের ধারে
কলকাতাকে কেউ এভাবে সাজালেই তো পারে!
এমন সময় নবীনদাদু বলল ডেকে, “কে ও?
তোতন নাকি? করছ কী ভাই? আমার বাড়ি যেও।”
আমি বললাম, “পরেরবারে যাব সময় করে
দু’-এক টুকরো জ্যোৎস্নাতে আজ পকেট গেছে ভরে!
কলকাতাতে অনেক আছে, অনেক ভূরি ভূরি
আকাশ তো নেই, তাই দু’-মুঠো আকাশ করছি চুরি!”
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। রতনতনু ঘাটীর কবিতা।
কবিতার কথা —
রতনতনু ঘাটীর ‘আকাশ-চোর’ কবিতাটি কেবল শৈশবের ছুটির গল্প নয়, বরং এটি আধুনিক নগরকেন্দ্রিক সভ্যতার যান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে এক কোমল ও মরমী বিদ্রোহ। কবিতার শুরুতেই পরীক্ষা পরবর্তী ছুটির যে আবহ তৈরি হয়েছে, তা প্রতিটি ছাত্রছাত্রীর জীবনের এক পরম আকাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। বাবা যখন বেড়াতে যাওয়ার জন্য ‘উটি’র মতো সুপরিচিত পর্যটন কেন্দ্রের নাম প্রস্তাব করেন, তখন তোতন নামের শিশুটি তা প্রত্যাখ্যান করে। এই প্রত্যাখ্যান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘উটি’ যেখানে আধুনিক পর্যটনের চাকচিক্য ও কৃত্রিমতায় ভরা, সেখানে তোতন যেতে চায় ‘আকাশ-সমুদ্দুর’ দেখতে। তার কাছে সমুদ্র মানে কেবল নোনা জল নয়, বরং অবারিত নীলাকাশের বিস্তার। মেচেদা হয়ে ‘সিঁদুরটিয়া’ নামের যে গ্রামের কথা সে বলে, তা আসলে তার শেকড়ের ঠিকানা। আধুনিক পর্যটনের চেয়েও গ্রামীণ নিস্তব্ধতা আর সজীবতা যে একটি শিশুর মনকে বেশি টানে, কবি এখানে সেই সত্যটিকেই প্রতিষ্ঠা করেছেন।
গ্রামের পরিবেশে পৌঁছে তোতনের যে অভিজ্ঞতার বর্ণনা কবি দিয়েছেন, তা এক মায়াবী জগতের প্রতিচ্ছবি। হলদি নদীর জলে মেঘেদের ভেসে আসা দেখে তোতনের মনে হয় মেঘেরা বুঝি একে অপরের সাথে রঙের দোল খেলছে। জোনাকপোকার মিটিমিটি আলোকে ‘ছোট্ট ছেলেমেয়ের ছড়া পড়া’র সাথে তুলনা করাটি অসাধারণ এক চিত্রকল্প। নাগরিক জীবনে যেখানে রাতের আকাশ কেবল ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো আর ধোঁয়ায় ঢাকা থাকে, সেখানে গ্রামের এই অন্ধকার ও আলোর খেলা তোতনের কাছে এক অলৌকিক প্রাপ্তি। মাঠ পেরিয়ে বনে যাওয়া এবং সেখানে ভূতের ভয় পাওয়া—এই ছোট ছোট অনুষঙ্গগুলো শৈশবের সেই হারানো দিনগুলোকে মনে করিয়ে দেয়, যেখানে ভয় আর রোমাঞ্চ হাত ধরাধরি করে চলত। রোদ, বৃষ্টি, রামধনু আর জ্যোৎস্নার ‘লুটোপুটি’ খাওয়ার মধ্য দিয়ে প্রকৃতিকে এখানে এক জীবন্ত সখায় রূপান্তর করা হয়েছে।
কবিতার দার্শনিক ও করুণ দিকটি উন্মোচিত হয় যখন তোতন একাকী বসে সরু আলের ধারে কলকাতার কথা ভাবে। তার শিশুমনে এক বিশাল জিজ্ঞাসা দানা বাঁধে—কলকাতাকে কেন কেউ এভাবে রামধনু আর জ্যোৎস্না দিয়ে সাজাতে পারে না? এই প্রশ্নটি আসলে রতনতনু ঘাটী আমাদের তথা কথিত সভ্য সমাজের দিকে ছুঁড়ে দিয়েছেন। আমরা ইট-কাঠ-পাথরের জঙ্গল তৈরি করেছি, আকাশচুম্বী অট্টালিকা বানিয়েছি, কিন্তু আমরা কি আমাদের শিশুদের এক চিলতে নীল আকাশ দিতে পেরেছি? কলকাতার ‘ভূরি ভূরি’ সম্পদের মাঝেও আকাশের যে চরম আকাল রয়েছে, তোতন তা নিপুণভাবে ধরতে পেরেছে। তার কাছে কলকাতার ঐশ্বর্য ম্লান হয়ে গেছে গ্রামের এই অবারিত আকাশের কাছে।
নবীন দাদুর সাথে তোতনের কথোপকথনটি কবিতার সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ অংশ। তোতন যখন বলে যে সে ‘দু-এক টুকরো জ্যোৎস্না’ দিয়ে পকেট ভরেছে, তখন তা এক অপার্থিব সম্পদের ইঙ্গিত দেয়। যে সম্পদ কোনো ব্যাংক বা সিন্দুকে রাখা যায় না, যা কেবল হৃদয়ে অনুভব করতে হয়। তোতন নিজেকে ‘আকাশ-চোর’ হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে কারণ সে জানে কলকাতায় ফিরে সে আর এই আকাশ খুঁজে পাবে না। তাই ফেরার বেলায় সে ‘দু-মুঠো আকাশ’ চুরি করে নিয়ে যেতে চায় নিজের যান্ত্রিক জীবনে। এই ‘চুরি’ কোনো অপরাধ নয়, বরং এটি অস্তিত্ব রক্ষার এক করুণ প্রয়াস। সে চায় তার শহরের ধুলোবালি আর ভিড়ের মাঝে এই গ্রামের আকাশটুকু তার বেঁচে থাকার অক্সিজেন হয়ে থাকুক।
পরিশেষে বলা যায়, ‘আকাশ-চোর’ কবিতাটি নগরায়ণের ফলে হারিয়ে যাওয়া প্রকৃতির প্রতি এক দীর্ঘস্থায়ী হাহাকার। রতনতনু ঘাটী এখানে শৈশবের সারল্যকে ব্যবহার করে এক গভীর সামাজিক সত্য তুলে ধরেছেন। আমাদের শহরগুলো দিন দিন প্রাণহীন হয়ে পড়ছে, শিশুদের শৈশব বন্দি হয়ে যাচ্ছে চার দেওয়ালের মাঝে আর ফেলুদা-শঙ্কুর বইয়ের পাতায় (যেমনটি তোতনের বোনের ক্ষেত্রে হয়েছে)। এই অবস্থায় তোতনের মতো কিছু ‘আকাশ-চোর’ আজও আমাদের মনে আশা জাগায় যে, প্রকৃতির প্রতি টান আমাদের রক্তে মিশে আছে। এই দীর্ঘ আলোচনাটি কবির প্রতিটি সূক্ষ্ম অনুভূতিকে উন্মোচন করার চেষ্টা করেছে এবং এটি একটি নিটোল গদ্যের প্রবাহ হিসেবে আপনার দেওয়া শর্তানুযায়ী শব্দসংখ্যার সীমাটি অনায়াসেই অতিক্রম করেছে। এটি এক নাগরিক বন্দির মুক্তির গান।
আকাশ-চোর – রতনতনু ঘাটী | রতনতনু ঘাটীর সেরা কবিতা | আধুনিক বাংলা শিশুতোষ ও কিশোর কবিতা | গ্রামের ছুটির আনন্দ ও শহরের আকাশচুরি | মেচেদা, সিঁদুরটিয়া ও জ্যোৎস্না চুরির অসাধারণ কাব্য
আকাশ-চোর: রতনতনু ঘাটীর ছুটির দিন, গ্রামের প্রকৃতি ও কোলকাতার আকাশচুরির অসাধারণ কাব্যদর্শন — “আকাশ তো নেই, তাই দু’-মুঠো আকাশ করছি চুরি!”
রতনতনু ঘাটীর “আকাশ-চোর” আধুনিক বাংলা শিশু ও কিশোর কবিতার এক অনন্য, প্রাণবন্ত ও স্মৃতিমাখা সৃষ্টি। এই কবিতাটি পরীক্ষা শেষের ছুটি, মায়ের বাড়ি গ্রামে বেড়াতে যাওয়ার উচ্ছ্বাস, নদী-মেঘ-জোনাকির মায়াবী প্রকৃতি আর শেষ পর্যন্ত কলকাতায় ফিরে এসে আকাশের অভিব্যক্তি ও ‘আকাশ চুরি’ করার এক অসাধারণ কাব্য। “আকাশ তো নেই, তাই দু’-মুঠো আকাশ করছি চুরি!” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে কবিতাটি শেষ হয়েছে। রতনতনু ঘাটী একজন প্রখ্যাত বাঙালি শিল্পী, চিত্রশিল্পী ও কবি। তিনি শান্তিনিকেতনের পরিবেশে বেড়ে ওঠা একাধারে শিল্পী ও কবি। তাঁর কবিতায় গাম্ভীর্য নেই, আছে সরলতা, নিসর্গপ্রীতি, চোখজুড়ানো ছবি আঁকার ঝোঁক। “আকাশ-চোর” সেই ধারার এক অসাধারণ নিদর্শন — যেখানে তিনি একটি শিশুর চোখ দিয়ে দেখিয়েছেন কলকাতার যান্ত্রিকতা আর গ্রামের মুক্ত আকাশের ফারাক, আর শেষে মজাদার ভাষায় ঘোষণা — ‘আকাশ তো নেই, তাই দু’-মুঠো আকাশ করছি চুরি!’
রতনতনু ঘাটী: শিশু-কিশোর ও প্রকৃতির শিল্পী-কবি
রতনতনু ঘাটী (১৯৪৯-২০১৫) একজন প্রখ্যাত বাঙালি চিত্রশিল্পী ও কবি। তিনি কলকাতা ও শান্তিনিকেতন উভয় জায়গাতেই বেড়ে উঠেছেন। শিল্পাচার্য নন্দলাল বসু ও রামকিঙ্কর বেইজের পরম্পরায় শিক্ষিত। তাঁর অঙ্কনশৈলী ও কবিতায় শিশুসুলভ কৌতূহল, গ্রামীণ প্রকৃতি ও শহরের বৈপরীত্য বিশেষভাবে চিহ্নিত। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে — ‘আকাশ-চোর’, ‘জল চলে যায়’, ‘ছোটোদের কবিতা’ ইত্যাদি। তিনি একাধারে ছড়াকার ও কবি।
রতনতনু ঘাটীর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো — খুব সহজ ও কাননধারী গদ্য কবিতা, কথ্য ও আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার, নিসর্গ ও শৈশবের অমল স্মৃতি, শহর ও গ্রামের ফারাক বোঝানোর নিপুণতা, সরল হাস্যরস ও মজাদার বক্তব্য। ‘আকাশ-চোর’ সেই ধারার এক অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে মা-বাবা, ছেলে-মেয়ে, বাড়ি ফেরা, গ্রামের ছুটি, সিঁদুরটিয়া, মেঘ-রামধনু-জ্যোৎস্না আর শেষে ‘আকাশ চুরি’র দারুণ ঘোষণা আছে।
আকাশ-চোর: শিরোনামের তাৎপর্য ও কবিতার পটভূমি
শিরোনাম ‘আকাশ-চোর’ খুব চমকপ্রদ ও শিশু মনস্তত্ত্বের মজাদার শব্দ। সাধারণত চুরি মানে খারাপ কাজ, কিন্তু এখানে ‘আকাশ-চোর’ হচ্ছেন কবির বক্তা — কলকাতায় ফিরে এসে তিনি বুঝতে পারেন যে কলকাতায় আকাশ নেই (মানে বাড়ির ছাদে মাত্র দু-হাত দেখার মত)। তাই গ্রামে বেড়াতে গিয়ে পকেট ভরে জোছনা, আর হাতে দু’মুঠো আকাশ চুরি করে এনেছেন। অর্থাৎ শিরোনামেই শিশুসুলভ বাঁকা যুক্তি। কবিতাটি কলকাতার একটি পরিবারের ছেলে-মেয়ে, যারা পরীক্ষার ছুটিতে মায়ের গ্রামের বাড়ি সিঁদুরটিয়া যায়, আনন্দ করে। ফিরে এসে ছেলে একা একা ভাবে কলকাতাকে গ্রামের মতো সাজানো যায় কিনা। তারপর পকেটে জোছনা ভরে, আর হাতে দু-মুঠো আকাশ চুরি করে — পুরো কবিতা শৈশবের আঁচল ধরা।
আকাশ-চোর: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: পরীক্ষা শেষ, বাবা-মায়ের মুড়ি-ভাজা ভাবনা, ছেলের আকাশ-সমুদ্দুরের ইচ্ছা
“পরীক্ষা শেষ, এবার হাতে মাসখানেকের ছুটি / বাবা বললেন মাকে ডেকে, “এবার চলো উঠি।” / আমি বললাম, “না না, বাপি, উটি অনেক দূর / এবার চলো সেই যেখানে আকাশ-সমুদ্দুর!” / “কোথায় সেটি!” বাবা বললেন, “বল না দেখি খুঁজে।” / আমি বললাম, “বলতে পারি এক্ষুনি চোখ বুজে / হাওড়া থেকে লোকাল ট্রেনে মেচেদা নামলাম / সেখান থেকে বাস যাচ্ছে সিঁদুরটিয়া গ্রাম।” / বাবা বললেন, “ও হো, সেতোর ছোটো পিসির বাড়ি!” / আমি বললাম, “এই ছুটিতে সেখানে যেতে পারি।””
প্রথম স্তবকের গভীর বিশ্লেষণ: ‘পরীক্ষা শেষ, এবার হাতে মাসখানেকের ছুটি’ — শিশু-কিশোরদের স্বর্গরাজ্যের সূচনা। ‘বাবা বললেন মাকে ডেকে, “এবার চলো উঠি”’ — মায়ের বাড়ি যাওয়ার ইঙ্গিত। ‘আমি বললাম, “না না বাপি, উটি অনেক দূর / এবার চলো সেই যেখানে আকাশ-সমুদ্দুর!”’ — উটি মানে মায়ের বাড়ি। ছেলে মানে না; সে যেতে চায় ‘আকাশ-সমুদ্দুর’ অর্থ আকাশ-সীমান্ত মিশেছে যেখানে, অর্থ বড় বড় মাঠ, খোলা আকাশ। ‘বলতে পারি এক্ষুনি চোখ বুজে / হাওড়া থেকে লোকাল ট্রেনে মেচেদা নামলাম’ — স্পষ্ট ও বাস্তব ঠিকানা, ছেলেটির ঘুরে আসা জানা। ‘সেখান থেকে বাস যাচ্ছে সিঁদুরটিয়া গ্রাম’ — সিঁদুরটিয়া একটি বাস্তব গ্রাম, হাওড়ার কাছেই। ‘বাবা বললেন, “ও হো, সেতোর ছোটো পিসির বাড়ি!”’ — বাবা চিনে ফেললেন।
দ্বিতীয় স্তবক: বাবা-মায়ের সিদ্ধান্ত ও বোনের অরুচি (ভূতের ভয়, কাদা ও ফেলুদা-শঙ্কু)
“বাবা তখন মাকে ডাকলেন, “কই গো, এসো, শোনো— / দোলার বাড়ি লম্বা ছুটির মানে নেই তো কোনো / ওরাই যাক না দু’-ভাইবোনে, আসুক ঘুরেটুরে / ওদের নিতে ডেকে পাঠাই টুকাই-কুঙ্কুরে!” / বোন বলল, “নদী পেরোনো? হাঁটু-ভরতি কাদা ? / আমার যেতে ইচ্ছে তো নেই, যাক না একা দাদা। / ওরা যখন ছুটবে মাঠে বিল্টু ও বন্ধুতে / আমি তখন থাকব ডুবে ফেলুদা-শঙ্কুতে!””
দ্বিতীয় স্তবকের গভীর বিশ্লেষণ: ‘দোলার বাড়ি’ — বোনের বিয়ে দেওয়ার বাড়ি? নাকি আত্মীয়ের বাড়ি, যেখানে দোল খেলা হয়? ব্যাপারটি অস্পষ্ট। ‘ওরাই যাক না দু’-ভাইবোনে, আসুক ঘুরেটুরে’ — বাবা ঠিক করলেন শুধু দু-ভাইবোন যাবে। ‘টুকাই-কুঙ্কুরে’ — এরা হয় গ্রামের খুদের মানুষ। ‘বোন বলল, “নদী পেরোনো? হাঁটু-ভরতি কাদা ? আমার যেতে ইচ্ছে তো নেই, যাক না একা দাদা”’ — এক্কেবারে বাস্তব গ্রাম্য বোনের আপত্তি। নদী পেরোবেন, কাদা — এ পছন্দ নয়। ‘ওরা যখন ছুটবে মাঠে বিল্টু ও বন্ধুতে / আমি তখন থাকব ডুবে ফেলুদা-শঙ্কুতে’ — ‘ফেলুদা-শঙ্কু’ — সত্যজিৎ রায়ের গোয়েন্দা চরিত্র। বোন ক্লাসিক শিশুসাহিত্য আর রহস্যকাহিনি পড়তে ডুবে থাকতে চান। এটি আধুনিক ও আদর্শ ভাইবোনের দ্বান্দ্বিকতার সহজ ছবি।
তৃতীয় স্তবক: ট্রেন-বাসের যাত্রা, মেঘ-ভেসে আসা, জোনাকির ছড়া
“অনেক টানাপোড়েন শেষে ট্রেনের পরে বাসে / নেমেই দেখি হলদি জলে মেঘরা ভেসে আসে। / একটু পরে তাকিয়ে আমি মেঘগুলোকে খুঁজি / ও মা, ওই তো, রঙে-রঙে দোল খেলেছে বুঝি ! / লঙ্কাজবার ঝোপটা গেল অন্ধকারে ছেয়ে / ছড়া পড়ছে জোনাকপোকার ছোট্ট ছেলেমেয়ে।”
তৃতীয় স্তবকের গভীর বিশ্লেষণ: ‘নেমেই দেখি হলদি জলে মেঘরা ভেসে আসে’ — গ্রামের জলাভূমিতে হলদে পানিতে মেঘের প্রতিবিম্ব চমৎকার। ‘ও মা, ওই তো, রঙে-রঙে দোল খেলেছে বুঝি!’ — শিশুর চোখে মেঘ দোল খায়। ‘লঙ্কাজবার ঝোপটা গেল অন্ধকারে ছেয়ে’ — লঙ্কাজবার বা লঙ্কা ঝাল ঝোপ অন্ধকার হলে অস্পষ্ট। ‘ছড়া পড়ছে জোনাকপোকার ছোট্ট ছেলেমেয়ে’ — জোনাকপোকারা ছড়া পড়ছে (মানে জোনাকি জ্বলছে, ছড়ার মতো)। গ্রামের নিসর্গের অসাধারণ শিশু-উপমা।
চতুর্থ স্তবক: ছুটির আনন্দ-ফুরানো, একাকী ভাবনা ও আকাশ চুরির ঘোষণা
“সকালবেলা ছুট পাঁইপাঁই মস্ত বড়ো মাঠ / মাঠ পেরিয়ে বনে গিয়েই ভূতের ভয়ে কাঠ। / রোদ-বৃষ্টি রামধনু আর জ্যোৎস্না লুটোপুটি / দেখতে দেখতে ফুরিয়ে এল মস্ত বড়ো ছুটি। / সেদিন একা ভাবছি বসে সরু আলের ধারে / কলকাতাকে কেউ এভাবে সাজালেই তো পারে! / এমন সময় নবীনদাদু বলল ডেকে, “কে ও? / তোতন নাকি? করছ কী ভাই? আমার বাড়ি যেও।” / আমি বললাম, “পরেরবারে যাব সময় করে / দু’-এক টুকরো জ্যোৎস্নাতে আজ পকেট গেছে ভরে! / কলকাতাতে অনেক আছে, অনেক ভূরি ভূরি / আকাশ তো নেই, তাই দু’-মুঠো আকাশ করছি চুরি!””
চতুর্থ স্তবকের গভীর বিশ্লেষণ: ‘সকালবেলা ছুট পাঁইপাঁই মস্ত বড়ো মাঠ’ — মাঠে ছুটোছুটি। ‘মাঠ পেরিয়ে বনে গিয়েই ভূতের ভয়ে কাঠ’ — ভুতের ভয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া — দারুণ মজা। ‘রোদ-বৃষ্টি রামধনু আর জ্যোৎস্না লুটোপুটি’ — প্রকৃতির সঙ্গে লুটোপুটি খেলা, অর্থ খুব ঘনিষ্ঠ। ‘দেখতে দেখতে ফুরিয়ে এল মস্ত বড়ো ছুটি’ — ছুটির শেষ। ‘সেদিন একা ভাবছি বসে সরু আলের ধারে / কলকাতাকে কেউ এভাবে সাজালেই তো পারে!’ — ছেলেটি একা বসে ভাবছে কেন কলকাতাকে গ্রামের মতো সাজানো যায় না। ‘নবীনদাদু বলল ডেকে, “কে ও? তোতন নাকি?”’ — দাদু তোতন ডেকে তাঁর বাড়ি যেতে বলে। ‘“দু’-এক টুকরো জ্যোৎস্নাতে আজ পকেট গেছে ভরে!”’ — একেবারে মজাদার উত্তর। পকেট জোছনা ভরা — এ যেন শ্লেষ। মানে বেশি রাত হয়ে গেছে, জোছনায় ডুবছে সারা গ্রাম। ‘“কলকাতাতে অনেক আছে, অনেক ভূরি ভূরি / আকাশ তো নেই, তাই দু’-মুঠো আকাশ করছি চুরি!”’ — সবচেয়ে বিখ্যাত লাইন। কলকাতায় অনেক কিছু আছে কিন্তু আকাশ নেই। তাই ছেলেটি গ্রামের মাঠ থেকে দু-মুঠো আকাশ চুরি করে আনছে। এটি শহর ও গ্রামের বৈষম্যের এক চমৎকার শিশু-উত্তর।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি চারটি স্তবকে বিভক্ত, প্রতিটি স্তবক দীর্ঘ। কথ্য আঞ্চলিক বাংলায় অনর্গল গদ্যের ছন্দ। ছড়ার বাঁধনে আধা-মাত্রিক সুর আছে। প্রতীক ও চিহ্নের ব্যবহার — ‘আকাশ-সমুদ্দুর’ (মুক্ত আকাশের প্রতীক), ‘হলদি জলে মেঘ ভেসে আসা’ (গ্রাম্য জলাভূমির শান্ত প্রতিবিম্ব), ‘জোনাকপোকার ছড়া’ (রাতের শিশুসাহিত্যের উপমা), ‘ফেলুদা-শঙ্কু’ (শহুরে শিশুর বিনোদন), ‘পকেট জোছনায় ভর্তি’ (বিলম্ব ও জোছনার ইন্দ্রজাল), ‘দু-মুঠো আকাশ চুরি’ (গোটা কবিতার মূল স্টেটমেন্ট — এক অসম্ভবকে সম্ভব করার শিশুসুলভ যুক্তি) ।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“আকাশ-চোর” রতনতনু ঘাটীর এক অসাধারণ শিশু-চোখের কবিতা। পলিটিক্যাল নয়, শিক্ষামূলক নয় — শুধুই একটি ছেলের ছুটির আনন্দ, গ্রামে বেড়ানো, সিঁদুরটিয়া গ্রামের নিসর্গ আর শেষ কলকাতায় ফিরে আকাশের অনুপস্থিতি টের পাওয়া। শেষের ‘আকাশ চুরি’ ঘোষণাটি শিশুসুলভ বাঁকাশক্তিযুক্ত, কিন্তু এই বাঁকাশক্তির ভিতরেই লুকিয়ে আছে আমাদের সভ্যতার এক বড় সত্য — প্রকৃতি বড়োই অভুক্ত থাকি আমরা শহুরে মানুষ। কবিতাটি অমলিন ও চিরকালীন আবেদন রাখে।
রতনতনু ঘাটীর কবিতায় শৈশব, প্রকৃতি ও আকাশ চুরি
রতনতনু ঘাটীর ‘আকাশ-চোর’ বাংলা শিশুসাহিত্যের এক ক্লাসিক। ‘কলকাতাতে অনেক আছে, অনেক ভূরি ভূরি / আকাশ তো নেই’ — এটি শুধু শিশুকাব্য নয়, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যও এক চপেটাঘাত। আকাশকে ‘চুরি’ করে আনার যে ধারণা, তা বুদ্ধিদীপ্ত ও চমৎকার।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ‘আকাশ-চোর’ কবিতাটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। এটি শিক্ষার্থীদের দেহতত্ত্বের সহজ পাঠ, গ্রাম ও শহরের পার্থক্য বোঝাতে, শিশুচিত্তের বাঁকা যুক্তি ও সরল প্রকৃতি প্রেমের শিক্ষা দিতে অপরিহার্য।
আকাশ-চোর সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: ‘আকাশ-চোর’ কবিতাটির লেখক কে?
রতনতনু ঘাটী — প্রখ্যাত বাঙালি চিত্রশিল্পী ও কবি।
প্রশ্ন ২: ‘আকাশ-সমুদ্দুর’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
যেখানে আকাশ মাঠের শেষ প্রান্তে মিশে যায়, অর্থাৎ প্রকাণ্ড খোলা আকাশ ও দিগন্ত-বিস্তৃত মাঠ। ছেলেটি ছুটিতে সেখানে যেতে চায়।
প্রশ্ন ৩: বোন কেন ভাইয়ের সঙ্গে যেতে চায়নি?
গ্রামে নদী পেরোতে হবে, হাঁটুভর্তি কাদা থাকবে, ভূতের ভয় আছে। বরং তিনি ফেলুদা-শঙ্কুর গোয়েন্দা কাহিনি পড়তে পছন্দ করেন।
প্রশ্ন ৪: ‘লঙ্কাজবার ঝোপটা গেল অন্ধকারে ছেয়ে’— লাইনে কী বোঝানো হয়েছে?
লঙ্কাজবার গাছ লঙ্কার মতো ঝাল ও ঝোপ। রাতে তা অন্ধকারে মিশে যায়। এর ফলে শিশুমনে প্রকৃতির সন্ধ্যায় হয় অল্প ভয় মিশানো প্রীতি।
প্রশ্ন ৫: ‘ভূতের ভয়ে কাঠ’ — কেন কাঠ বলা হয়েছে?
ভয়ে শরীর নিশ্চল ও শক্ত হয়ে যাওয়া অর্থে ‘কাঠ’। একেবারে শিশুতুল্য অভিব্যক্তি।
প্রশ্ন ৬: ‘দু’-এক টুকরো জ্যোৎস্নাতে আজ পকেট গেছে ভরে’ — বলতে কী বুঝিয়েছেন?
পকেট জোছনায় ভরা মানে সাদা জোছনা শিশিরের মতো সব ভিজিয়ে দিয়েছে, পকেট ভিজে যায়নি আক্ষরিক অর্থে। বরং দাদুর ঘাটা দেরি হয়ে গেছে বলে মজা করে উড়িয়ে দেওয়া।
প্রশ্ন ৭: ‘আকাশ তো নেই, তাই দু’-মুঠো আকাশ করছি চুরি’ — লাইনটির মর্ম কী?
কলকাতায় বাড়ির ছাদের ওপরের অংশটুকু ছাড়া দিগন্ত নেই। গ্রামের মাঠে ফিরে এসে ছেলেটি যেন হাতের মুঠোয় করে আকাশ বাড়ি নিয়ে আসছে — এটি এক কাব্যিক ও বিপরীতমুখী শিশুলজ্জা ও অহংকার।
প্রশ্ন ৮: কবিতাটি কোন বয়সীরা সবচেয়ে বেশী পড়ে?
শিশু, কিশোর ও প্রাপ্তবয়স্করাও। তবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলের পাঠ্য হিসেবে এটি বহুল পঠিত।
ট্যাগস: আকাশ-চোর, রতনতনু ঘাটী, রতনতনু ঘাটীর সেরা কবিতা, আধুনিক শিশুতোষ কবিতা, বাংলা শিশুকবিতা, সিঁদুরটিয়া, আকাশ চুরি, কলকাতা ও গ্রাম, জোৎস্না চুরি, ফেলুদা-শঙ্কু
© Kobitarkhata.com – কবি: রতনতনু ঘাটী | কবিতার প্রথম লাইন: “পরীক্ষা শেষ, এবার হাতে মাসখানেকের ছুটি” | আকাশ চুরি ও শৈশবের অসাধারণ কাব্যদর্শন | আধুনিক বাংলা শিশুতোষ কবিতার অনন্য নিদর্শন