কবিতার খাতা
- 33 mins
অরণ্যের দিকে – সাঈদ বারী ।
অরণ্য পেরিয়ে হেঁটে যায় একটি হরিণ-
তার চোখে বিষণ্নতা, দূর গন্ধবিহীন ফুলের স্মৃতি।
আলো পড়ে নিঃশব্দ পাতায়-
আর আমি দেখি, এই বিকেল ক্রমে পুরনো হয়ে আসে।
মৌন পাখিদের ওড়াউড়ি নেই আজ,
তবু ডালপালার ফাঁকে হাওয়ার একান্ত নুড়ি বাজে;
এ যেন কোনো এক সুনসান পৃথিবীর প্রাচীন পাঠ-
অরণ্য পড়ে, আমি পড়ি না আর।
একটি ধূসর গাছ আমাকে চেনে-
তার গায়ে আঁচড় কেটে গেছে যে পুরুষ-
সে আজ নেই,
তবু চাঁদের আলোয়, গন্ধে, শ্যাওলার ভাঁজে
তার নিঃশ্বাসের চিহ্ন রয়ে গেছে, খুব গোপনে।
আমি শুধু হেঁটে যাই-
আমার ভেতরেও যেন এক নিঃশেষ অরণ্য জন্ম নিচ্ছে,
যেখানে শব্দ নেই, দুঃখ নেই-
আছে শুধু হারিয়ে যাওয়া কিছু অলৌকিক পাতা!
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। সাঈদ বারী ।
অরণ্যের দিকে – সাঈদ বারী | আধুনিক বাংলা কবিতা | প্রকৃতি ও মননের কবিতা
অরণ্যের দিকে কবিতা: সাঈদ বারী – প্রকৃতি, স্মৃতি ও নিঃসঙ্গতার এক অনন্য কাব্যভাষ্য
সাঈদ বারী-র “অরণ্যের দিকে” কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের একজন উদীয়মান কবির অসাধারণ সৃষ্টি, যা প্রকৃতি, স্মৃতি, হারিয়ে যাওয়া ও নিঃসঙ্গতার গভীর অনুভূতিকে ধারণ করেছে। “অরণ্য পেরিয়ে হেঁটে যায় একটি হরিণ- তার চোখে বিষণ্নতা, দূর গন্ধবিহীন ফুলের স্মৃতি” — এই চিত্রকল্পের মধ্য দিয়ে কবি পাঠককে নিয়ে যান এক রহস্যময় জগতে, যেখানে অরণ্য শুধু গাছপালার সমষ্টি নয়, বরং মানবমনের এক গভীর প্রতীক। সাঈদ বারী আধুনিক বাংলা কবিতার নতুন ধারার কবি, যার কবিতায় প্রকৃতি ও মননের এক অপূর্ব সম্মিলন ঘটেছে। এই কবিতায় অরণ্য, হরিণ, পাখি, গাছ, চাঁদের আলো, শ্যাওলা — প্রকৃতির এসব উপাদান মানবমনের জটিল অনুভূতি, স্মৃতি ও বিষণ্নতার বাহক হয়ে উঠেছে।
সাঈদ বারী: উদীয়মান এক কবির পরিচয়
সাঈদ বারী বাংলা সাহিত্যের একজন নতুন ও সম্ভাবনাময় কবি। তার কবিতা প্রথম আলো, কালের কণ্ঠসহ বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তিনি মূলত প্রকৃতি ও মানবমনের গভীর সম্পর্ককে তার কবিতার কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু হিসেবে বেছে নিয়েছেন। “অরণ্যের দিকে” তার একটি উল্লেখযোগ্য কবিতা যা পাঠকমহলে ইতিমধ্যেই সাড়া ফেলতে শুরু করেছে। আধুনিক বাংলা কবিতার প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে তিনি নিজস্ব একটি ভাষা ও ভঙ্গি তৈরি করার চেষ্টা করছেন। তার কবিতায় শব্দের কারুকাজ, চিত্রকল্পের গভীরতা এবং অনুভূতির সূক্ষ্ম প্রকাশ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সাঈদ বারী এখনও তেমন পরিচিত নাম না হলেও তার কবিতা ইঙ্গিত দেয় যে তিনি ভবিষ্যতে বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন।
অরণ্যের দিকে কবিতার মূল সুর ও বিষয়বস্তু
“অরণ্যের দিকে” কবিতাটির মূল সুর হলো নিঃসঙ্গতা, স্মৃতি ও হারিয়ে যাওয়ার বেদনা। কবিতায় একটি হরিণ অরণ্য পেরিয়ে হেঁটে যায়, তার চোখে বিষণ্নতা। এই হরিণটি হয়তো কবির নিজের প্রতিরূপ, যে জীবনের জটিল পথ পেরিয়ে চলছে, সঙ্গে শুধু স্মৃতি। কবিতায় বিকেল ক্রমে পুরনো হয়ে আসে — সময়ের প্রবহমানতা ও তার অনিবার্য পরিবর্তনের প্রতি ইঙ্গিত। ‘মৌন পাখিদের ওড়াউড়ি নেই’ — নিস্তব্ধতা, স্থিরতা, যেন সব কিছু থমকে গেছে। ‘এ যেন কোনো এক সুনসান পৃথিবীর প্রাচীন পাঠ’ — এই পৃথিবী যেন তার নিজস্ব ভাষায় কিছু বলতে চায়, কিন্তু আমরা তা পড়তে পারি না। ‘একটি ধূসর গাছ আমাকে চেনে’ — গাছটি চেনে কবিকে, কারণ তার গায়ে আঁচড় কেটে গেছে এক পুরুষের, যে আজ নেই। এই লাইনগুলোর মধ্য দিয়ে কবি স্মৃতি ও বর্তমানের এক গভীর সম্পর্ক তৈরি করেছেন। অতীতের মানুষটি নেই, কিন্তু তার উপস্থিতির চিহ্ন রয়ে গেছে চাঁদের আলোয়, গন্ধে, শ্যাওলার ভাঁজে। শেষাংশে কবি নিজের ভেতরেও এক নিঃশেষ অরণ্যের জন্মের কথা বলেন — যেখানে শব্দ নেই, দুঃখ নেই, আছে শুধু হারিয়ে যাওয়া কিছু অলৌকিক পাতা।
অরণ্যের দিকে কবিতার শৈলীগত ও কাব্যিক বিশ্লেষণ
“অরণ্যের দিকে” কবিতাটির ভাষা অত্যন্ত চিত্রময়, সংযত ও গভীর তাৎপর্যময়। সাঈদ বারী সহজ-সরল শব্দ ব্যবহার করলেও সেগুলো অসাধারণ কাব্যিক মাত্রা পেয়েছে। কবিতায় ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ চিত্রকল্প ও প্রতীকগুলো: ‘অরণ্য’ — জীবনের জটিল পথ, অজানা, রহস্যময় জগতের প্রতীক; ‘হরিণ’ — নিষ্পাপ, সৌন্দর্য, করুণার প্রতীক; ‘বিষণ্নতা’ ও ‘দূর গন্ধবিহীন ফুলের স্মৃতি’ — অতীতের মধুর স্মৃতি ও তার সঙ্গে জড়িত বিষাদের অনুভূতি; ‘নিঃশব্দ পাতা’ ও ‘মৌন পাখি’ — নিস্তব্ধতা, স্থিরতা, যোগাযোগহীনতার প্রতীক; ‘হাওয়ার একান্ত নুড়ি’ — প্রকৃতির গোপন সংলাপ; ‘সুনসান পৃথিবীর প্রাচীন পাঠ’ — প্রকৃতির চিরন্তন রহস্য, যা আমরা বুঝতে পারি না; ‘ধূসর গাছ’ — সময়ের সাক্ষী, স্মৃতির ধারক; ‘আঁচড় কেটে গেছে যে পুরুষ’ — অতীতের কোনো মানুষ, প্রিয় কেউ, যে এখন নেই; ‘চাঁদের আলো, গন্ধ, শ্যাওলার ভাঁজ’ — প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানে মিশে থাকা স্মৃতির চিহ্ন; ‘নিঃশেষ অরণ্য’ — অন্তরের শূন্যতা, নিঃসঙ্গতা; ‘অলৌকিক পাতা’ — অতীতের বিশেষ কিছু স্মৃতি, যা হারিয়ে গেলেও অসাধারণ।
অরণ্যের দিকে কবিতায় অরণ্যের প্রতীকী তাৎপর্য
এই কবিতায় অরণ্য একটি কেন্দ্রীয় প্রতীক হিসেবে কাজ করেছে। প্রথম স্তবকে অরণ্য একটি ভৌগোলিক স্থান — “অরণ্য পেরিয়ে হেঁটে যায় একটি হরিণ”। দ্বিতীয় স্তবকে অরণ্য একটি রহস্যময় জগৎ — “এ যেন কোনো এক সুনসান পৃথিবীর প্রাচীন পাঠ- অরণ্য পড়ে, আমি পড়ি না আর”। তৃতীয় স্তবকে অরণ্য স্মৃতির ধারক — একটি ধূসর গাছ কবিকে চেনে, তার গায়ে আঁচড়ের চিহ্ন। চতুর্থ স্তবকে অরণ্য কবির অন্তর্জগতে চলে আসে — “আমার ভেতরেও যেন এক নিঃশেষ অরণ্য জন্ম নিচ্ছে”। এইভাবে অরণ্য ধীরে ধীরে বাহ্যিক জগৎ থেকে অন্তর্জগতে প্রবেশ করে, বাস্তব থেকে প্রতীকে রূপান্তরিত হয়। কবির ভেতরের এই অরণ্যে “শব্দ নেই, দুঃখ নেই — আছে শুধু হারিয়ে যাওয়া কিছু অলৌকিক পাতা”। অর্থাৎ জীবনের সব শব্দ, সব দুঃখ শেষ হয়ে গেছে, অবশিষ্ট আছে শুধু কিছু অসাধারণ স্মৃতি।
অরণ্যের দিকে কবিতায় হরিণের প্রতীকী তাৎপর্য
কবিতার শুরুতে একটি হরিণ অরণ্য পেরিয়ে হেঁটে যায়। হরিণ সাধারণত সৌন্দর্য, করুণা, নিষ্পাপতা ও ভীরুতার প্রতীক। কিন্তু এই হরিণটির চোখে বিষণ্নতা। এই বিষণ্নতার কারণ “দূর গন্ধবিহীন ফুলের স্মৃতি”। অর্থাৎ হরিণটি বহু দূর থেকে এসেছে, তার মনে আছে কোনো এক ফুলের স্মৃতি, যে ফুলটির আর গন্ধ নেই। এটি জীবনের হারানো কিছু মধুর মুহূর্তের প্রতীক যা আমরা ফিরে পাই না, শুধু স্মৃতি থাকে। এই হরিণটি হয়তো কবির নিজের প্রতিরূপ — যে জীবনের জটিল পথ পেরিয়ে চলছে, সঙ্গে শুধু স্মৃতি। অথবা এটি মানবমনের প্রতীক — যা ক্রমাগত এগিয়ে চলে, কিন্তু পিছনে ফেলে আসে কিছু স্মৃতি, কিছু বিষণ্নতা।
অরণ্যের দিকে কবিতায় সময়ের ধারণা
কবিতায় সময়ের একটি গভীর ধারণা কাজ করেছে। “আমি দেখি, এই বিকেল ক্রমে পুরনো হয়ে আসে” — এই পঙ্ক্তিতে কবি সময়ের প্রবহমানতা ও তার অনিবার্য পরিবর্তনকে নির্দেশ করেছেন। বিকেল পুরনো হয়ে আসে মানে সময় এগিয়ে চলে, ক্ষণগুলো ইতিহাসে পরিণত হয়। “এ যেন কোনো এক সুনসান পৃথিবীর প্রাচীন পাঠ” — এই পঙ্ক্তিতে প্রাচীনতার উল্লেখ আছে, যা সময়ের সুদূর অতীতকে নির্দেশ করে। ‘প্রাচীন পাঠ’ বলতে কবি হয়তো প্রকৃতির চিরন্তন রহস্যের কথা বলেছেন, যা যুগ যুগ ধরে বিদ্যমান। “চাঁদের আলোয়, গন্ধে, শ্যাওলার ভাঁজে তার নিঃশ্বাসের চিহ্ন রয়ে গেছে, খুব গোপনে” — এই পঙ্ক্তিতে কবি দেখিয়েছেন কিভাবে সময় অতিক্রান্ত হলেও স্মৃতি প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানে লুকিয়ে থাকে। শেষ স্তবকে ‘নিঃশেষ অরণ্য’ ও ‘হারিয়ে যাওয়া কিছু অলৌকিক পাতা’ — এসবের মধ্য দিয়ে কবি সময়ের সাথে হারিয়ে যাওয়া সবকিছুর বেদনাকে ধারণ করেছেন।
অরণ্যের দিকে কবিতায় স্মৃতি ও বর্তমানের দ্বন্দ্ব
কবিতাটি জুড়ে রয়েছে স্মৃতি ও বর্তমানের এক গভীর দ্বন্দ্ব। প্রথম স্তবকে হরিণের চোখে “দূর গন্ধবিহীন ফুলের স্মৃতি” — অতীতের কোনো মধুর স্মৃতি যা এখন শুধু মনে আছে, বাস্তবতা নেই। দ্বিতীয় স্তবকে “অরণ্য পড়ে, আমি পড়ি না আর” — অরণ্য তার নিজস্ব পাঠ চালিয়ে যায়, কিন্তু কবি তা পড়তে পারেন না, অর্থাৎ অতীতের ভাষা তিনি বুঝতে পারেন না। তৃতীয় স্তবকে সবচেয়ে স্পষ্ট এই দ্বন্দ্ব — একটি ধূসর গাছ কবিকে চেনে, তার গায়ে আঁচড় কেটে গেছে যে পুরুষ, সে আজ নেই, কিন্তু তার নিঃশ্বাসের চিহ্ন রয়ে গেছে প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানে। অতীতের মানুষটি বর্তমানে নেই, কিন্তু তার উপস্থিতির চিহ্ন স্পষ্ট। শেষ স্তবকে কবির ভেতরে যে নিঃশেষ অরণ্য জন্ম নিচ্ছে, সেখানে শব্দ নেই, দুঃখ নেই — আছে শুধু হারিয়ে যাওয়া কিছু অলৌকিক পাতা। অর্থাৎ বর্তমানের শূন্যতার মাঝে অতীতের কিছু অসাধারণ স্মৃতি জেগে থাকে।
অরণ্যের দিকে কবিতায় ধূসর গাছ ও পুরুষের তাৎপর্য
“একটি ধূসর গাছ আমাকে চেনে — তার গায়ে আঁচড় কেটে গেছে যে পুরুষ — সে আজ নেই” — এই পঙ্ক্তিগুলো কবিতার সবচেয়ে মর্মস্পর্শী অংশ। ‘ধূসর গাছ’ সময়ের সাক্ষী, যা বহু বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে। এটি কবিকে চেনে, কারণ এর গায়ে আঁচড় কেটে গেছে এক পুরুষের। এই পুরুষ কে? হতে পারে কবির প্রিয় কেউ, বাবা, দাদা, অথবা কোনো বন্ধু, যে একদিন এই গাছের গায়ে তার নাম বা কোনো চিহ্ন এঁকেছিল। সে আজ নেই, মৃত্যু হয়েছে, বা দূরে চলে গেছে। কিন্তু তার নিঃশ্বাসের চিহ্ন রয়ে গেছে চাঁদের আলোয়, গন্ধে, শ্যাওলার ভাঁজে। এই লাইনগুলোর মধ্য দিয়ে কবি দেখিয়েছেন যে মানুষ মারা গেলেও, চলে গেলেও তাদের অস্তিত্বের ছাপ প্রকৃতিতে থেকে যায়। চাঁদের আলো, বাতাসের গন্ধ, গাছের শ্যাওলা — এসবের মধ্যে লুকিয়ে থাকে তাদের স্মৃতি। ‘খুব গোপনে’ বলার মধ্য দিয়ে কবি এই স্মৃতির গোপনীয়তা ও অন্তরঙ্গতা ফুটিয়ে তুলেছেন।
অরণ্যের দিকে কবিতায় নিঃসঙ্গতা ও শূন্যতার চিত্র
কবিতাটি জুড়ে নিঃসঙ্গতা ও শূন্যতার গভীর অনুভূতি কাজ করেছে। হরিণটি একা হেঁটে যায়, পাখিদের ওড়াউড়ি নেই, হাওয়া একা একা বাজে, অরণ্য একা পড়ে, কবি পড়েন না, ধূসর গাছটি একা দাঁড়িয়ে, যে পুরুষ ছিল সে আজ নেই, কবি একা হেঁটে যান, আর তার ভেতরে জন্ম নিচ্ছে এক নিঃশেষ অরণ্য। এই নিঃসঙ্গতা ও শূন্যতার মাঝেও কবি সৌন্দর্য খুঁজে পান — হারিয়ে যাওয়া কিছু অলৌকিক পাতা। অর্থাৎ জীবনের সব কিছু শেষ হয়ে গেলেও, সবাই চলে গেলেও, কিছু অসাধারণ স্মৃতি থেকে যায়, যা আমাদের অস্তিত্বকে অর্থপূর্ণ করে।
অরণ্যের দিকে কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
অরণ্যের দিকে কবিতার লেখক কে?
অরণ্যের দিকে কবিতার লেখক সাঈদ বারী। তিনি বাংলা সাহিত্যের একজন নতুন ও উদীয়মান কবি। তার কবিতা প্রথম আলো, কালের কণ্ঠসহ বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তিনি মূলত প্রকৃতি ও মানবমনের গভীর সম্পর্ককে তার কবিতার কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু হিসেবে বেছে নিয়েছেন। “অরণ্যের দিকে” তার একটি উল্লেখযোগ্য কবিতা যা পাঠকমহলে ইতিমধ্যেই সাড়া ফেলতে শুরু করেছে। সাঈদ বারী এখনও তেমন পরিচিত নাম না হলেও তার কবিতা ইঙ্গিত দেয় যে তিনি ভবিষ্যতে বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন।
অরণ্যের দিকে কবিতার মূল বিষয়বস্তু কী?
অরণ্যের দিকে কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো নিঃসঙ্গতা, স্মৃতি ও হারিয়ে যাওয়ার বেদনা। কবিতায় একটি হরিণ অরণ্য পেরিয়ে হেঁটে যায়, তার চোখে বিষণ্নতা। কবি দেখেন বিকেল ক্রমে পুরনো হয়ে আসে। মৌন পাখিদের ওড়াউড়ি নেই, তবু হাওয়া বাজে। মনে হয় এটি কোনো সুনসান পৃথিবীর প্রাচীন পাঠ, যা অরণ্য পড়ে কিন্তু কবি পড়তে পারেন না। একটি ধূসর গাছ কবিকে চেনে, তার গায়ে আঁচড় কেটে গেছে এক পুরুষের, যে আজ নেই, কিন্তু তার নিঃশ্বাসের চিহ্ন রয়ে গেছে চাঁদের আলোয়, গন্ধে, শ্যাওলার ভাঁজে। কবি শুধু হেঁটে যান, আর তার ভেতরেও যেন এক নিঃশেষ অরণ্য জন্ম নিচ্ছে — যেখানে শব্দ নেই, দুঃখ নেই, আছে শুধু হারিয়ে যাওয়া কিছু অলৌকিক পাতা।
অরণ্যের দিকে কবিতায় হরিণ কীসের প্রতীক?
অরণ্যের দিকে কবিতায় হরিণটি একাধিক প্রতীক ধারণ করে। প্রথমত, হরিণ সাধারণত সৌন্দর্য, করুণা, নিষ্পাপতা ও ভীরুতার প্রতীক। দ্বিতীয়ত, এই হরিণটির চোখে বিষণ্নতা, যা জীবনের গভীর বেদনার ইঙ্গিত দেয়। তৃতীয়ত, হরিণটির মনে আছে “দূর গন্ধবিহীন ফুলের স্মৃতি” — এটি অতীতের কোনো হারানো মধুর মুহূর্তের প্রতীক। চতুর্থত, হরিণটি অরণ্য পেরিয়ে হেঁটে যায় — এটি জীবনের জটিল পথ পেরিয়ে চলার প্রতীক। পঞ্চমত, এই হরিণটি কবির নিজের প্রতিরূপ হতে পারে, যে জীবনপথে এগিয়ে চলে সঙ্গে নিয়ে শুধু স্মৃতি ও বিষণ্নতা। ষষ্ঠত, এটি মানবমনের প্রতীক — যা ক্রমাগত এগিয়ে চলে, কিন্তু পিছনে ফেলে আসে কিছু স্মৃতি, কিছু বিষণ্নতা।
“আমার ভেতরেও যেন এক নিঃশেষ অরণ্য জন্ম নিচ্ছে” — বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
“আমার ভেতরেও যেন এক নিঃশেষ অরণ্য জন্ম নিচ্ছে” — এই পঙ্ক্তির মাধ্যমে কবি তার অন্তর্জগতের শূন্যতা ও নিঃসঙ্গতাকে প্রকাশ করেছেন। বাহ্যিক অরণ্যের মতোই তার ভেতরে এক অরণ্য জন্ম নিচ্ছে, কিন্তু তা নিঃশেষ — অর্থাৎ শেষ হয়ে যাওয়া, ফুরিয়ে যাওয়া। এই অন্তর্জগতের অরণ্যে “শব্দ নেই, দুঃখ নেই — আছে শুধু হারিয়ে যাওয়া কিছু অলৌকিক পাতা”। অর্থাৎ জীবনের সব শব্দ, সব কোলাহল, সব দুঃখ শেষ হয়ে গেছে, অবশিষ্ট আছে শুধু কিছু অসাধারণ স্মৃতি, যা হারিয়ে গেলেও এখনও অলৌকিক। এটি কবির এক গভীর আত্মউপলব্ধির মুহূর্তকে নির্দেশ করে।
“ধূসর গাছ” ও “আঁচড় কেটে গেছে যে পুরুষ” — এই চিত্রের তাৎপর্য কী?
“ধূসর গাছ” ও “আঁচড় কেটে গেছে যে পুরুষ” — এই চিত্রটি কবিতার সবচেয়ে মর্মস্পর্শী অংশ। ধূসর গাছটি সময়ের সাক্ষী, যা বহু বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে। এটি কবিকে চেনে, কারণ এর গায়ে আঁচড় কেটে গেছে এক পুরুষের। এই পুরুষ কবির প্রিয় কেউ হতে পারেন — বাবা, দাদা, বন্ধু, বা প্রেমিক — যে একদিন এই গাছের গায়ে তার নাম বা কোনো চিহ্ন এঁকেছিল। সে আজ নেই — মৃত্যু হয়েছে, বা দূরে চলে গেছে। কিন্তু তার নিঃশ্বাসের চিহ্ন রয়ে গেছে চাঁদের আলোয়, গন্ধে, শ্যাওলার ভাঁজে। এই চিত্রের মধ্য দিয়ে কবি দেখিয়েছেন যে মানুষ চলে গেলেও তাদের অস্তিত্বের ছাপ প্রকৃতিতে থেকে যায়, গোপনে লুকিয়ে থাকে। এটি স্মৃতির স্থায়িত্ব ও তার গোপন উপস্থিতির এক অসাধারণ রূপক।
“অরণ্য পড়ে, আমি পড়ি না আর” — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
“অরণ্য পড়ে, আমি পড়ি না আর” — এই পঙ্ক্তির মাধ্যমে কবি প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে যোগাযোগের একটি গভীর দার্শনিক প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন। অরণ্য তার নিজস্ব ভাষায় কিছু পাঠ করে, সম্ভবত প্রকৃতির চিরন্তন রহস্য, জীবনের গভীর সত্য। কিন্তু কবি সেই পাঠ আর পড়তে পারেন না। অর্থাৎ প্রকৃতির ভাষা, তার রহস্য, তার বার্তা — এসব এখন কবির কাছে অবোধ্য হয়ে গেছে। এটি আধুনিক মানুষের প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বেদনাকে নির্দেশ করে। আমরা প্রকৃতির মধ্যে বাস করি, কিন্তু প্রকৃতির ভাষা আমরা আর বুঝতে পারি না। অরণ্য তার প্রাচীন পাঠ চালিয়ে যায়, কিন্তু আমরা সেই পাঠের অর্থ উদ্ঘাটনে অসমর্থ।
সাঈদ বারী সম্পর্কে সংক্ষেপে বলুন।
সাঈদ বারী বাংলা সাহিত্যের একজন নতুন ও সম্ভাবনাময় কবি। তিনি এখনও তেমন পরিচিত নাম নন, তবে তার কবিতা ধীরে ধীরে পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করছে। তার কবিতার মূল বিষয়বস্তু প্রকৃতি, মানবমন, স্মৃতি ও নিঃসঙ্গতা। “অরণ্যের দিকে” তার একটি উল্লেখযোগ্য কবিতা। তার কবিতায় শব্দের কারুকাজ, চিত্রকল্পের গভীরতা এবং অনুভূতির সূক্ষ্ম প্রকাশ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তিনি প্রথম আলো, কালের কণ্ঠসহ বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায় কবিতা প্রকাশ করেছেন। আধুনিক বাংলা কবিতার প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে তিনি নিজস্ব একটি ভাষা ও ভঙ্গি তৈরি করার চেষ্টা করছেন। তার কবিতা ইঙ্গিত দেয় যে তিনি ভবিষ্যতে বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন।
অরণ্যের দিকে কবিতাটি আধুনিক পাঠকের জন্য কীভাবে প্রাসঙ্গিক?
“অরণ্যের দিকে” কবিতাটি আজকের আধুনিক পাঠকের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক: প্রথমত, এটি আমাদের প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের বিচ্ছিন্নতার কথা মনে করিয়ে দেয়। দ্বিতীয়ত, এটি স্মৃতি ও হারিয়ে যাওয়ার বেদনাকে ধারণ করে, যা প্রতিটি মানুষের চিরন্তন অনুভূতি। তৃতীয়ত, কবিতাটি নিঃসঙ্গতার গভীর অনুভূতি প্রকাশ করে, যা আধুনিক নগরজীবনের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। চতুর্থত, এটি আমাদের শেখায় যে মানুষ চলে গেলেও তাদের স্মৃতি প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানে লুকিয়ে থাকে। পঞ্চমত, কবিতার শেষাংশে ‘অলৌকিক পাতা’-এর উল্লেখ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলো হারিয়ে গেলেও অসাধারণ থাকে। ষষ্ঠত, একজন নতুন কবির কণ্ঠস্বর হিসেবে এই কবিতা আমাদের বাংলা সাহিত্যের নতুন ধারার সাথে পরিচিত করায়।
এই কবিতার অন্যতম সেরা লাইন কোনটি এবং কেন?
এই কবিতার অন্যতম সেরা লাইন: “আমি শুধু হেঁটে যাই- আমার ভেতরেও যেন এক নিঃশেষ অরণ্য জন্ম নিচ্ছে, যেখানে শব্দ নেই, দুঃখ নেই- আছে শুধু হারিয়ে যাওয়া কিছু অলৌকিক পাতা!” এই লাইনটি সেরা হওয়ার কারণ: প্রথমত, এটি সমগ্র কবিতার কেন্দ্রীয় বক্তব্য ও চেতনাকে ধারণ করে। দ্বিতীয়ত, এখানে বাহ্যিক অরণ্য ও অন্তর্জগতের অরণ্যের এক অসাধারণ সমান্তরালতা তৈরি হয়েছে। তৃতীয়ত, ‘নিঃশেষ অরণ্য’ বলতে কবি জীবনের সব কিছুর শেষ পরিণতির দিকে ইঙ্গিত করেছেন। চতুর্থত, ‘শব্দ নেই, দুঃখ নেই’ বলার মধ্য দিয়ে তিনি এক ধরনের শান্তি ও নির্বাণের ইঙ্গিত দিয়েছেন। পঞ্চমত, ‘হারিয়ে যাওয়া কিছু অলৌকিক পাতা’ — এই চিত্রকল্পটি অসাধারণ সৌন্দর্যের, যা হারানোর মাঝেও এক ধরনের জাদু খুঁজে পায়। ষষ্ঠত, এই লাইনে কবির সম্পূর্ণ জীবনদর্শন ও কাব্যভাবনা ধরা পড়েছে।
ট্যাগস: অরণ্যের দিকে, সাঈদ বারী, সাঈদ বারী কবিতা, বাংলা কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, প্রকৃতির কবিতা, নিঃসঙ্গতার কবিতা, স্মৃতির কবিতা, উদীয়মান কবি, নতুন কবি, বাংলাদেশের কবিতা, প্রতীকী কবিতা, অরণ্য কবিতা






