ভালোবাসি, —-এই শব্দ উচ্চারণে পাপ লেগে থাকে,
ওই কথা তোমাকে বলব না।
বরং তোমার চোখে দু-হাত ঢুকিয়ে দিয়ে
তুলে আনব গভীর অসুখ,
সেই তীব্র স্পর্শ লেগে চোখের পাথর ফেটে যাবে,
চোখের ভেতর থেকে ঝমঝমিয়ে বেজে উঠবে
জন্ম জন্ম ঘুমন্ত ঝর্ণারা।
ঘুম ভেঙে উঠে তারা পাগল পাগল করবে—
:ওগো এসো, স্নান নিয়ে যাও…
আমি যে কী করে ওই জলে নামব, এতদিন পর…
সর্ব অঙ্গে পাপ লেগে আছে।
তবুও আকাঙ্ক্ষা হয়ে টানে স্রোত, সহসা ঝাঁপাই।
এক জন্ম ডুব দিয়ে মাথা তুলে দেখি— হা ঈশ্বর!
দ্রবীভূত হয়ে গেছে এ শরীর তোমার শরীরে।
সে শরীর এত স্বচ্ছ, তলদেশে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে মন,
তবু ঠোঁট কামড়ে থাকছি,
কিছুতেই মুখ ফুটে তোমাকে ও-কথাটি বলছি না
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। মন্দাক্রান্তা সেনের কবিতা।
কবিতার কথা –
মন্দাক্রান্তা সেনের ‘অপয়া’ কবিতাটি প্রেম, সামাজিক অপরাধবোধ (পাপের অনুভূতির) এবং শারীরিক ও আত্মিক মিলনের এক চরম তীব্র ও সংবেদনশীল কাব্যিক অন্বেষণ। কবি অত্যন্ত দুঃসাহসী ও শারীরিক রূপকের মাধ্যমে ভালোবাসার এমন এক প্রকাশ ঘটিয়েছেন, যা প্রথাগত ভাষার সীমানা ছাড়িয়ে এক অলৌকিক ও আত্মিক একাত্মতায় রূপ নেয়।
কবিতার শুরুতেই কবি ভালোবাসার প্রচলিত রূপকে এবং ‘ভালোবাসি’ শব্দটির উচ্চাবাচ প্রকাশকে এক প্রকার সামাজিক পাপ বা অভিশাপের চিহ্ন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাই প্রিয়জনকে সরাসরি সেই চেনা শব্দে প্রেম নিবেদন করতে তাঁর ইতস্তত বোধ। কিন্তু শব্দের এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে কবি বেছে নেন এক চরম ও গভীর শারীরিক স্পর্শের ভাষা। প্রিয়জনের চোখের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে তার ভেতরের গভীর অসুখ বা বিষাদকে ছুঁয়ে দেওয়ার যে রূপক কবি ব্যবহার করেছেন, তা পরম অনুভূতির এক তীব্র প্রকাশ। সেই স্পর্শে জমাট বাঁধা চোখের পাথর ফেটে জেগে ওঠে জন্ম জন্মান্তরের ঘুমন্ত ঝর্ণা, যা উভয়কেই এক আত্মিক স্নান ও ধোয়ার আহ্বান জানায়।
কবিতাটিতে পাপের শঙ্কা এবং আকাঙ্ক্ষার টানের মধ্যে এক চিরন্তন মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে। কবি অনুভব করেন যে তাঁর সর্বাঙ্গে পাপের চিহ্ন লেগে আছে, যার কারণে সেই পবিত্র জলে নামতে তাঁর দ্বিধা হয়। অথচ প্রেমানুভূতির প্রবল স্রোত তাঁকে সহসা ঝাঁপ দিতে বাধ্য করে। সেই এক জন্মের গভীর ডুব শেষে কবি যখন মাথা তুলে তাকান, তখন দেখেন এক অলৌকিক রূপান্তর—তাঁর নিজস্ব অস্তিত্ব ও শরীর সম্পূর্ণ দ্রবীভূত হয়ে মিশে গেছে প্রিয়জনের শরীরে।
কবিতার শেষাংশে এসে এই প্রেম এক পরম স্বচ্ছতায় পৌঁছায়। দুটি শরীর ও মন এতটাই একাকার ও পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে তলদেশের মন পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যায়। কিন্তু এত গভীর আত্মিক ও শারীরিক মিলনের পরও কবি ‘ভালোবাসি’ শব্দটি মুখে ফুটে উচ্চারণ করেন না; ঠোঁট কামড়ে নীরব থাকেন। প্রথাগত শব্দ উচ্চারণ না করেও যে ভালোবাসার চরম শিখর ও আত্মিক একাত্মতা অর্জন করা যায়—সেই নিশব্দ, প্রগাঢ় ও গভীর অনুভূতিকেই কবি এই কবিতায় নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
অপয়া – মন্দাক্রান্তা সেন | মন্দাক্রান্তা সেনের কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা | প্রেম, পাপ, স্পর্শ ও দ্রবীভূত হওয়ার অসাধারণ কাব্যভাষা
অপয়া: মন্দাক্রান্তা সেনের ভালোবাসা, পাপ, স্পর্শ, ঝর্ণা ও দ্রবীভূত হওয়ার অসাধারণ কাব্যভাষা
মন্দাক্রান্তা সেনের “অপয়া” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য, তীব্র ও রহস্যময় সৃষ্টি। এটি প্রেম, পাপ, স্পর্শ ও আত্মবিলোপের এক অসাধারণ কাব্যচিত্র। “ভালোবাসি, —-এই শব্দ উচ্চারণে পাপ লেগে থাকে, / ওই কথা তোমাকে বলব না।” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক নারীর গভীর অনুভূতি — যে ‘ভালোবাসি’ বলতে পারে না, কারণ সেই শব্দে পাপ লেগে আছে। বরং সে তার চোখে দু-হাত ঢুকিয়ে গভীর অসুখ তুলে আনবে, সেই তীব্র স্পর্শে চোখের পাথর ফেটে যাবে, জন্ম-জন্ম ঘুমন্ত ঝর্ণারা বেজে উঠবে। ঝর্ণারা তাকে স্নানের জন্য ডাকবে, কিন্তু সে দ্বিধায় — এতদিন পর, সর্ব অঙ্গে পাপ লেগে আছে। তবু আকাঙ্ক্ষার স্রোতে ঝাঁপ দেয়। এক জন্ম ডুব দিয়ে মাথা তুলে দেখে — দ্রবীভূত হয়ে গেছে তার শরীর, তার শরীরে। সেই শরীর এত স্বচ্ছ যে তলদেশে মন পরিষ্কার দেখা যায়। তবু ঠোঁট কামড়ে থাকে, মুখ ফুটে সেই কথাটি বলে না। মন্দাক্রান্তা সেন একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় নারীর কামনা, প্রেম, শরীর, পাপবোধ ও আত্মবিলোপের চিত্রায়ণের জন্য পরিচিত। ‘অপয়া’ তাঁর সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যা প্রেমের গভীরে লুকিয়ে থাকা পাপবোধ ও আত্মসমর্পণের গভীরে ডুব দেয়।
মন্দাক্রান্তা সেন: প্রেম, পাপ ও আত্মসমর্পণের কবি
মন্দাক্রান্তা সেন একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় নারীর কামনা, প্রেম, শরীর, পাপবোধ ও আত্মবিলোপের চিত্রায়ণের জন্য পরিচিত। ‘অপয়া’ তাঁর সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি প্রেমের গভীরে লুকিয়ে থাকা পাপবোধ ও আত্মসমর্পণের গভীরে ডুব দিয়েছেন।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘হুইসেল’, ‘অপয়া’ (২০১০), ‘নির্বাচিত কবিতা’ (২০১৫) ইত্যাদি।
শিরোনাম ও কেন্দ্রীয় পাপবোধ
শিরোনাম ‘অপয়া’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘অপয়া’ — অশুভ, অমঙ্গল, দুর্ভাগা। কবিতায় নারী নিজেকে ‘অপয়া’ মনে করে — যে ‘ভালোবাসি’ বলতে পারে না, কারণ সেই শব্দে পাপ লেগে আছে। এই পাপবোধই কবিতার কেন্দ্রীয় চালিকাশক্তি।
কবিতার স্তরে স্তরে বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: ভালোবাসি বলার পাপ
“ভালোবাসি, —-এই শব্দ উচ্চারণে পাপ লেগে থাকে, / ওই কথা তোমাকে বলব না।” — প্রথম স্তবকে ‘ভালোবাসি’ বলার অস্বীকার। ‘ভালোবাসি’ — প্রেমের চরম স্বীকারোক্তি। ‘উচ্চারণে পাপ লেগে থাকে’ — এই শব্দ বলতে গেলে পাপ হয়। ‘ওই কথা তোমাকে বলব না’ — তাই বলে না।
দ্বিতীয় স্তবক: চোখে হাত ঢুকিয়ে অসুখ তোলা
“বরং তোমার চোখে দু-হাত ঢুকিয়ে দিয়ে / তুলে আনব গভীর অসুখ, / সেই তীব্র স্পর্শ লেগে চোখের পাথর ফেটে যাবে, / চোখের ভেতর থেকে ঝমঝমিয়ে বেজে উঠবে / জন্ম জন্ম ঘুমন্ত ঝর্ণারা।” — দ্বিতীয় স্তবকে স্পর্শের তীব্রতা। ‘চোখে দু-হাত ঢুকিয়ে’ — গভীরে প্রবেশ। ‘গভীর অসুখ তুলে আনা’ — ভেতরের ব্যথা বের করা। ‘তীব্র স্পর্শে চোখের পাথর ফেটে যাবে’ — শক্ত হৃদয় ভেঙে যাবে। ‘জন্ম জন্ম ঘুমন্ত ঝর্ণারা বেজে উঠবে’ — চিরন্তন কামনা, প্রেম, আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠবে।
তৃতীয় স্তবক: ঝর্ণার ডাক ও পাপের বোধ
“ঘুম ভেঙে উঠে তারা পাগল পাগল করবে— / :ওগো এসো, স্নান নিয়ে যাও… / আমি যে কী করে ওই জলে নামব, এতদিন পর… / সর্ব অঙ্গে পাপ লেগে আছে।” — তৃতীয় স্তবকে ঝর্ণার ডাক। ‘পাগল পাগল করবে’ — প্রবল আকাঙ্ক্ষা। ‘এসো, স্নান নিয়ে যাও’ — পরিষ্কার হওয়ার ডাক। ‘এতদিন পর’ — দীর্ঘ বিরতি। ‘সর্ব অঙ্গে পাপ লেগে আছে’ — শরীরে পাপের বোধ।
চতুর্থ স্তবক: স্রোতে ঝাঁপ ও দ্রবীভূত হওয়া
“তবুও আকাঙ্ক্ষা হয়ে টানে স্রোত, সহসা ঝাঁপাই। / এক জন্ম ডুব দিয়ে মাথা তুলে দেখি— হা ঈশ্বর! / দ্রবীভূত হয়ে গেছে এ শরীর তোমার শরীরে।” — চতুর্থ স্তবকে আত্মসমর্পণ। ‘আকাঙ্ক্ষা টানে স্রোত’ — কামনা টানে। ‘সহসা ঝাঁপাই’ — আচমকা ঝাঁপ। ‘এক জন্ম ডুব দিয়ে’ — চিরকালের ডুব। ‘দ্রবীভূত হয়ে গেছে এ শরীর তোমার শরীরে’ — আত্মবিলোপ, মিলন।
পঞ্চম স্তবক: স্বচ্ছ শরীর ও ঠোঁট কামড়ে থাকা
“সে শরীর এত স্বচ্ছ, তলদেশে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে মন, / তবু ঠোঁট কামড়ে থাকছি, / কিছুতেই মুখ ফুটে তোমাকে ও-কথাটি বলছি না” — পঞ্চম স্তবক — শেষ স্তবক — পুরো কবিতার চূড়ান্ত বাণী। ‘শরীর এত স্বচ্ছ, তলদেশে মন দেখা যায়’ — সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা, কোনো লুকোচুরি নেই। ‘তবু ঠোঁট কামড়ে থাকছি’ — তবু চুপ। ‘ও-কথাটি বলছি না’ — ‘ভালোবাসি’ বলছে না।
প্রতীক ও রূপকের গভীর পাঠ
‘ভালোবাসি’ — প্রেমের শব্দ, যা পাপে লিপ্ত। ‘চোখে হাত ঢুকিয়ে’ — গভীরে প্রবেশ। ‘গভীর অসুখ’ — ভেতরের ব্যথা। ‘চোখের পাথর’ — শক্ত হৃদয়। ‘জন্ম জন্ম ঘুমন্ত ঝর্ণারা’ — চিরন্তন কামনা। ‘স্নান’ — পরিষ্কার হওয়া। ‘পাপ’ — অপরাধবোধ। ‘স্রোত’ — আকাঙ্ক্ষা। ‘ডুব’ — আত্মসমর্পণ। ‘দ্রবীভূত শরীর’ — আত্মবিলোপ। ‘স্বচ্ছ শরীর, তলদেশে মন’ — সম্পূর্ণ প্রকাশ। ‘ঠোঁট কামড়ে থাকা’ — চুপ থাকা।
প্রশ্নোত্তর: গভীর পাঠের জন্য
প্রশ্ন ১: ‘অপয়া’ কবিতাটির লেখিকা কে?
উত্তর: এই কবিতাটির লেখিকা মন্দাক্রান্তা সেন। তিনি একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি।
প্রশ্ন ২: ‘ভালোবাসি শব্দের উচ্চারণে পাপ লেগে থাকে’ — কেন?
উত্তর: নারীর মনে পাপবোধ — ভালোবাসা প্রকাশ করলেই পাপ হয়ে যায়।
প্রশ্ন ৩: ‘তোমার চোখে দু-হাত ঢুকিয়ে দিয়ে তুলে আনব গভীর অসুখ’ — কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: প্রিয়জনের গভীরে প্রবেশ করে তার ভেতরের ব্যথা বের করা।
প্রশ্ন ৪: ‘চোখের পাথর ফেটে যাবে’ — কেন?
উত্তর: তীব্র স্পর্শে শক্ত হৃদয় ভেঙে যাবে, আবেগ বেরিয়ে আসবে।
প্রশ্ন ৫: ‘জন্ম জন্ম ঘুমন্ত ঝর্ণারা’ — কী?
উত্তর: চিরন্তন কামনা, প্রেম, আকাঙ্ক্ষা — যা ঘুমিয়ে ছিল।
প্রশ্ন ৬: ‘সর্ব অঙ্গে পাপ লেগে আছে’ — কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: দীর্ঘদিনের বিরতি, পাপের বোধ, অপরাধবোধ।
প্রশ্ন ৭: ‘দ্রবীভূত হয়ে গেছে এ শরীর তোমার শরীরে’ — কী?
উত্তর: আত্মবিলোপ, সম্পূর্ণ মিলন — নিজের সত্তা হারিয়ে যাওয়া।
প্রশ্ন ৮: ‘সে শরীর এত স্বচ্ছ, তলদেশে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে মন’ — কী?
উত্তর: সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা — কোনো লুকোচুরি নেই, মন খোলা।
প্রশ্ন ৯: ‘তবু ঠোঁট কামড়ে থাকছি, কিছুতেই মুখ ফুটে ও-কথাটি বলছি না’ — কেন?
উত্তর: পাপবোধ এত প্রবল যে ‘ভালোবাসি’ বলা যায় না, যদিও সবকিছু স্বীকার করা হয়েছে।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
উত্তর: কবিতাটি শেখায় — নারীর প্রেম ও কামনা সমাজের চোখে পাপ। ‘ভালোবাসি’ বলাও পাপ। কিন্তু শরীর-মন দ্রবীভূত হওয়া পর্যন্ত প্রেম করা যায়, তবু সেই শব্দ উচ্চারণ করা যায় না। এটি পাপবোধ ও কামনার দ্বান্দ্বিকতার এক অনবদ্য দলিল।
ট্যাগস: অপয়া, মন্দাক্রান্তা সেন, মন্দাক্রান্তা সেনের কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, প্রেমের কবিতা, পাপবোধ, নারীর কামনা
© Kobitarkhata.com – কবি: মন্দাক্রান্তা সেন | কবিতার প্রথম লাইন: “ভালোবাসি, —-এই শব্দ উচ্চারণে পাপ লেগে থাকে, ওই কথা তোমাকে বলব না।” | প্রেম, পাপ, স্পর্শ ও দ্রবীভূত হওয়ার অসাধারণ কাব্যভাষা | আধুনিক বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন