কবিতার খাতা
আঠারো বছর বয়স – সুকান্ত ভট্টাচার্য।
আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ
স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি,
আঠারো বছর বয়সেই অহরহ
বিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি।
আঠারো বছর বয়সের নেই ভয়
পদাঘাতে চায় ভাঙতে পাথর বাধা,
এ বয়সে কেউ মাথা নোয়াবার নয়−
আঠারো বছর বয়স জানে না কাঁদা।
এ বয়স জানে রক্তদানের পুণ্য
বাষ্পের বেগে স্টিমারের মতো চলে,
প্রাণ দেওয়া-নেওয়া ঝুলিটা থাকে না শূন্য
সঁপে আত্মাকে শপথের কোলাহলে।
আঠারো বছর বয়স ভয়ংকর
তাজা তাজা প্রাণে অসহ্য যন্ত্রণা,
এ বয়সে প্রাণ তীব্র আর প্রখর
এ বয়সে কানে আসে কত মন্ত্রণা।
আঠারো বছর বয়স যে দুর্বার
পথে প্রান্তরে ছোটায় বহু তুফান,
দুর্যোগে হাল ঠিকমতো রাখা ভার
ক্ষত-বিক্ষত হয় সহস্র প্রাণ।
আঠারো বছর বয়সে আঘাত আসে
অবিশ্রান্ত; একে একে হয় জড়ো,
এ বয়স কালো লক্ষ দীর্ঘশ্বাসে
এ বয়স কাঁপে বেদনায় থরোথরো।
তবু আঠারোর শুনেছি জয়ধ্বনি,
এ বয়স বাঁচে দুর্যোগে আর ঝড়ে,
বিপদের মুখে এ বয়স অগ্রণী
এ বয়স তবু নতুন কিছু তো করে।
এ বয়স জেনো ভীরু, কাপুরুষ নয়
পথ চলতে এ বয়স যায় না থেমে,
এ বয়সে তাই নেই কোনো সংশয়−
এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে।।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা।
কবিতার কথা-
কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘আঠারো বছর বয়স’ কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তারুণ্যের এক অবিনশ্বর ইশতেহার, দ্রোহের গান এবং এক অনন্য মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক দলিল। কবি এখানে মানবজীবনের সবচেয়ে সন্ধিক্ষণ—কৈশোর থেকে যৌবনে পদার্পণের এই আঠারো বছর বয়সটিকে তুলে ধরেছেন। এই বয়সটি যেমন একদিকে তীব্র ঝড়-ঝাপটা, যন্ত্রণা আর সংকটের, অন্যদিকে তেমনি তা সমস্ত অন্যায় ও জড়তার বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর, সৃষ্টি আর আত্মত্যাগের এক পরম শক্তির উৎস।
কবিতার প্রথমাংশেই কবি এই বয়সের এক দুর্দান্ত ও অদম্য রূপ এঁকেছেন। আঠারো বছর বয়স যেমন ‘দুঃসহ’, তেমনি তা যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে ‘স্পর্ধায় মাথা তোলবার ঝুঁকি’ নিতে জানে। যুবকদের অবচেতন মনে অহরহ বিরাট বিরাট দুঃসাহসী স্বপ্ন ও ভাবনা উঁকি দিয়ে যায়। এই বয়সের তরুণরা কোনো বাধা বা বিপদকে তোয়াক্কা করে না; তারা যেন পায়ের আঘাতে পথের সমস্ত পাথুরে বাধাকে ভেঙে চুরমার করতে চায়। কোনো শৃঙ্খল বা শক্তির কাছে এই বয়স মাথা নোয়াতে জানে না। এমনকি নিজের ব্যক্তিগত দুঃখ-কষ্টে এই বয়স কখনো ঘরের কোণে বসে কাপুরুষের মতো অশ্রুপাত করে না, কারণ ‘আঠারো বছর বয়স জানে না কাঁদা’।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তবকে কবি এই বয়সের আত্মোৎসর্গ করার মহৎ গুণটিকে মূর্ত করেছেন। ‘এ বয়স জানে রক্তদানের পুণ্য’—দেশের প্রয়োজনে, মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে নিজের বুকের তাজা রক্ত বিলিয়ে দিতে এই তরুণদের বিন্দুমাত্র দ্বিধা থাকে না। এদের জীবন চলার গতি কোনো মন্থর নদী নয়, বরং তা ‘বাষ্পের বেগে স্টিমারের মতো’ তীব্র ও বেগবান। অন্যায়কে ধ্বংস করতে কিংবা সুন্দরকে গ্রহণ করতে জীবন দেওয়া-নেওয়ার যে খেলা, তাতে এদের ঝুলির শূন্যতা নিমেষেই কেটে যায়। তীব্র শপথের কোলাহলে এরা নিজের আত্মাকে সঁপে দেয় এক বৃহত্তর কল্যাণে।
তবে কবি এই বয়সের কেবল ইতিবাচক দিকটিই দেখাননি; একজন কুশলী শিল্পীর মতো এর ভেতরের অন্ধকার, যন্ত্রণা ও দ্বিধাদ্বন্দ্বের বাস্তব চিত্রও ফুটিয়ে তুলেছেন। কবি বলেছেন, আঠারো বছর বয়স অত্যন্ত ‘ভয়ংকর’। কারণ এই তাজা প্রাণগুলোর ভেতর পরিবর্তনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকে, যা কখনো কখনো ‘অসহ্য যন্ত্রণা’র জন্ম দেয়। এই প্রখর ও সংবেদনশীল বয়সে চারপাশে নানা রকম অশুভ ও নেতিবাচক ‘মন্ত্রণা’ বা কু-পরামর্শ কানে আসে, যা তরুণদের পথভ্রষ্ট করতে পারে। এটি এমন এক ‘দুর্বার’ বয়স, যা আবেগ আর উত্তেজনার বশে পথে-প্রান্তরে বহু তুফান ছোটায়, কিন্তু অভিজ্ঞতার অভাবে জীবনের বড় বড় দুর্যোগে নিজের হাল ঠিকমতো ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ভুল পথে পা বাড়িয়ে সহস্র তাজা প্রাণ ক্ষত-বিক্ষত হয়, সমাজ ও পারিপার্শ্বিকতার ‘কালো লক্ষ দীর্ঘশ্বাসে’ এই বয়স বেদনায় থরোথরো কেঁপে ওঠে।
পরিশেষে, সমস্ত নেতিবাচকতা ও ক্ষতকে ছাপিয়ে কবি আঠারো বছর বয়সের অবধারিত জয়ধ্বনিই উচ্চারণ করেছেন। সমস্ত দুর্যোগ, ঝড় আর সামাজিক জীর্ণতার মুখে এই বয়সই প্রথম বুক পেতে দেয়; বিপদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এরাই হয় ‘অগ্রণী’। এরা স্থবিরতাকে ভেঙে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে জানে। এই বয়স ভীরু বা কাপুরুষ নয়, তাই চলার পথে কোনো সংশয় বা ক্লান্তি এদের থামিয়ে দিতে পারে না। কবি তাই ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনের সমস্ত জড়তা, পচন আর কুসংস্কার দূর করার জন্য এক গভীর আশাবাদ নিয়ে প্রার্থনা করেছেন—‘এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে’। আঠারো বছরের সেই তেজ, উদ্যম আর আপসহীন চেতনার মশাল যেন প্রতিটি মানুষের অন্তরে জ্বলে ওঠে।
সৃষ্টির সার্থকতা লৌকিক হাততালিতে নয়, বরং স্রষ্টার নিজের মানসিক মুক্তি এবং অস্তিত্বের তাদিগে—যা এই কবিতায় সুকান্ত ভট্টাচার্যের নিজস্ব ওজস্বী, দীপ্ত ও বিপ্লবী ছন্দে তারুণ্যের শক্তিকে চিরকালের জন্য এক অবিনশ্বর আলোকবর্তিকা হিসেবে বাংলা সাহিত্যের আকাশে অমর করে রেখেছে।





