সেদিনও কি এমনি অক্লান্ত ঝরঝর বৃষ্টি হবে এ শহরে?
ঘিনঘিনে কাদা
জমবে গলির মোড়ে সেদিনও কি এমনি,
যেদিন থাকব প’ড়ে খাটে নিশ্চেতন,
নির্বিকার, মৃত?
আলনায় খুব
সহজে থাকবে ঝুলে সাদা জামা। বোতামের ঘরগুলো যেন
করোটির চোখ, মানে কালোর গহ্বর। জুতো জোড়া
রইবে প’ড়ে এক কোণে, যমজ কবর। কবিতার
খাতা নগ্ন নারীর মতোই চিৎ হয়ে
উদর দেখিয়ে
টেবিলে থাকবে শুয়ে আর দেয়ালের টিকটিকি
প্রকাশ্যেই করবে সঙ্গম।
হয়তো কাঁদবে কেউ, আশা করা যেতে পারে; আত্মীয়-স্বজন
কেউ কেউ শোকে ধোবে সত্তা। ঘরে পুড়বে আগরবাতি আর
কোরানের পূণ্য সব আয়াতে আয়াতে
হবে গুঞ্জরিত চতুষ্কোণ। বাজারে ছুটবে কেউ
চাটাই, বাঁশের খোঁজে; কেউবা ফুঁকবে সিগারেট
ঘন-ঘন, কেউ মৃদু বলবে অদূরে, প্রতিবেশী একজন : ‘লোকটা নাস্তিক ছিল,
শরিয়তে মোটেই ছিল না
মন, মসজিদে তার সাথে কখনো হয়নি দেখা,
এবং নিষিদ্ধ দ্রব্যে ছিল তার উৎসাহ প্রচুর।
কিন্তু তবু কেন জানি বাস্তবিক কখনো ভুলেও
পারিনি করতে ঘেন্না তাকে।
মারেনি লাঠির বাড়ি মাথায় কারুর
কোনো দিন, উপরন্তু ছিল সদালাপী।’
যেদিন মরব আমি, সেদিন কি বার হবে, বলা মুশকিল।
শুক্রবার? বুধবার? শনিবার? নাকি রবিবার?
যেবারই হোক,
সেদিন বর্ষায় যেন না ভেজে শহর, যেন ঘিনঘিনে কাদা
না জমে গলির মোড়ে। সেদিন ভাসলে পথঘাট,
পুণ্যবান শবানুগামীরা বড় বিরক্ত হবেন।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। শামসুর রাহমানের কবিতা।
কবিতার খাতা –
শামসুর রাহমানের ‘বিবেচনা’ কবিতাটি আধুনিক মানুষের নিজের মৃত্যু সম্পর্কিত নির্মোহ ভাবনা, জীবন ও মৃত্যুর মধ্যকার চরম বৈপরীত্য, এবং মৃত্যুর পর প্রথাগত সমাজব্যবস্থার ভণ্ডামির ওপর আঁকা এক অনন্য ও শ্লেষাত্মক মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান। নিজের প্রয়াণমুহূর্তকে একজন নিরপেক্ষ দর্শকের দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করে কবি এখানে জীবনের নশ্বরতা ও মানবীয় স্বভাবের সূক্ষ্ম বাস্তবতাকে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ রূপকে ফুটিয়ে তুলেছেন।
কবিতার প্রথমাংশে কবি নিজের নিষ্প্রাণ, নিশ্চেতন দেহের গৃহকোণ ও পারিপার্শ্বিক বস্তুজগতের নিঃসঙ্গ দৃশ্যাবলী আঁকেন। বর্ষার ঘিনঘিনে কাদা আর বৃষ্টির আবহাওয়ায় নিজের মৃত্যুশয্যার কথা ভাবতে গিয়ে তিনি লক্ষ্য করেন—মানুষের প্রয়াণে প্রকৃতির বা অজৈব বস্তুর কোনো বিকার ঘটে না। আলনায় ঝুলে থাকা প্রিয় সাদা জামার বোতামের ঘরগুলোকে কবির মনে হয় কোনো করোটির অন্ধকার চোখের কোটর; এক কোণে পড়ে থাকা একজোড়া জুতো যেন যমজ কবরের নীরব প্রতীক। কবির নিবেদিত কবিতার খাতাটি টেবিলে নিঃসঙ্গভাবে পড়ে থাকে, আর ঘরের দেয়ালে জীবন ও প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মে টিকটিকির প্রকাশ্য সঙ্গম চলে। এই প্রাত্যহিক দৃশ্যকল্পগুলো প্রমাণ করে যে, ব্যক্তির অবসানে জাগতিক জগতের স্বাভাবিক গতি স্তব্ধ হয় না।
কবিতার মধ্যভাগে মৃত্যুপরবর্তী ধর্মাচার ও সামাজিক দ্বিমুখী আচরণের চিত্র ফুটে ওঠে। পরিজনদের কান্না, আগরবাতির সুবাস আর কোরআনের আয়াতের গুঞ্জনে যখন ঘরটি ভারী হয়ে ওঠে, তখন অন্যদিকে কেউ বাঁশ-চাটাইয়ের খোঁজে বাজারে ছোটে কিংবা ক্লান্তিতে বারবার সিগারেটে টান দেয়। এ সবের মাঝেই এক প্রতিবেশীর মুখে ফুটে ওঠে এক বিস্ময়কর ও স্পষ্ট মূল্যায়ন। মৃত কবিকে প্রথাগত ধর্মীয় চোখে “নাস্তিক”, শরিয়ত-বিমুখ কিংবা নিষিদ্ধ দ্রব্যে আগ্রহী বলা হলেও, সমাজের প্রতি তাঁর অহিংস ও সদালাপী আচরণের কারণে কেউই তাঁকে মনে মনে ঘৃণা করতে পারে না। প্রথাগত পাপ-পুণ্যের কাঠগড়ার চেয়ে যে কবির মানবিক আচরণ ও সদয় রূপটি মানুষের মনে গাঢ় হয়ে থাকে, সেই নির্মম অথচ মধুর সত্যটি এখানে উন্মোচিত হয়।
কবিতার শেষাংশে শামসুর রাহমান এক চরম শ্লেষ ও করুণ কৌতুকের আশ্রয় নিয়েছেন। মৃত্যুর দিনটি সপ্তাহের কোন বার হবে তা অনিশ্চিত হলেও, কবির একটাই আকুল প্রার্থনা বা ‘বিবেচনা’—সেদিন যেন প্রবল বর্ষা না হয়, গলির মোড়ে ঘিনঘিনে কাদা না জমে। কারণ, পথঘাট জলমগ্ন হলে কবির মরদেহ বহনকারী তথাকথিত “পুণ্যবান শবানুগামীরা” ভিজে গিয়ে চরম বিরক্ত হবেন! প্রথাগত পুণ্য অর্জনের তাগিদে যারা শবানুগামী হন, তাদের সেই ক্ষণিক অস্বস্তির চিন্তাকে মাথায় রেখে কবির এই শ্লেষাত্মক উদ্বেগ সমগ্র ভণ্ড সামাজিক ব্যবস্থার মুখে এক নীরব অথচ চরম চাবুক হেনে দেয়।
বিবেচনা – শামসুর রাহমান | মৃত্যু, ঘর ও শবানুগমনের কবিতা
বিবেচনা: কেন এই কবিতা মৃত্যুর পরিকল্পনা?
শামসুর রাহমানের বিবেচনা কবিতাটি বাংলা কবিতায় অনন্য — কারণ এটি মৃত্যুর আগেই নিজের মৃত্যুর দৃশ্য কল্পনা করে, এবং সেই কল্পনায় সবচেয়ে বড় চিন্তা হলো — সেদিন যেন বৃষ্টি না হয়। “সেদিনও কি এমনি অক্লান্ত ঝরঝর বৃষ্টি হবে এ শহরে? ঘিনঘিনে কাদা জমবে গলির মোড়ে সেদিনও কি এমনি, যেদিন থাকব প’ড়ে খাটে নিশ্চেতন, নির্বিকার, মৃত?” কবি নিজের মৃত্যুর দিনের আবহাওয়া নিয়ে চিন্তিত। কারণ তিনি জানেন — বৃষ্টি হলে শবানুগামীরা বিরক্ত হবেন। এই ‘বিবেচনা’ আসলে মৃত্যুর পরেও অন্যের কথা ভাবার এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত।
আলনায় সাদা জামা: করোটির চোখ ও বোতামের ঘর
“আলনায় খুব সহজে থাকবে ঝুলে সাদা জামা। বোতামের ঘরগুলো যেন করোটির চোখ, মানে কালোর গহ্বর।” এখানে শামসুর রাহমানের চিত্রকল্প একেবারে অনন্য — সাদা জামার বোতামের ঘরগুলোকে তিনি করোটির চোখের সঙ্গে তুলনা করছেন, অর্থাৎ মানুষের মাথার খুলির খালি গহ্বরের সঙ্গে। সাদা জামা মানে কাফন, বোতামের ঘর মানে মৃত্যুর ফাঁকা চোখ। জুতো জোড়া এক কোণে পড়ে থাকবে — “যমজ কবর।” এই চিত্রকল্পে মৃত্যু যেন ঘরময় ছড়িয়ে পড়ে — জামায়, জুতোয়, টেবিলে।
নগ্ন নারীর মতো কবিতার খাতা: সাহিত্যের মৃত্যু
“কবিতার খাতা নগ্ন নারীর মতোই চিৎ হয়ে উদর দেখিয়ে টেবিলে থাকবে শুয়ে।” এই লাইনটি সাহিত্যিকদের জন্য এক আত্ম-বিদ্রূপ। সারা জীবন যিনি কবিতা লিখেছেন, তার মৃত্যুর পর সেই কবিতার খাতা টেবিলে পড়ে থাকবে — নগ্ন, অসহায়, প্রায় লজ্জাহীন। কবিতার কোনো মালিক থাকে না, কবিতার কোনো ভক্ত থাকে না — মৃত্যুর পর কবিতাও মৃত। শামসুর এই সত্যকে নির্মমভাবে স্বীকার করেন।
টিকটিকির সঙ্গম: মৃত্যুর পরেও জীবন
“আর দেয়ালের টিকটিকি প্রকাশ্যেই করবে সঙ্গম।” এই লাইনটিই কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী বৈপরীত্য। কবি মৃত, কিন্তু দেয়ালে টিকটিকি প্রকাশ্যে সঙ্গম করছে — অর্থাৎ জীবন চলছে। মৃত্যু মানে সবকিছুর শেষ নয় — টিকটিকি জানে না কেউ মরেছে, টিকটিকির কাছে এই দিন অন্য যেকোনো দিনের মতো। এই লাইনেই শামসুর দেখান — মৃত্যু ব্যক্তিগত, কিন্তু জীবন সর্বজনীন।
আগরবাতি, কোরান ও চতুষ্কোণ: ধর্মীয় আচার
“ঘরে পুড়বে আগরবাতি আর কোরানের পূণ্য সব আয়াতে আয়াতে হবে গুঞ্জরিত চতুষ্কোণ।” — এখানে ধর্মীয় আচারের বর্ণনা। কিন্তু শামসুর এই আচারকে অস্বীকার করছেন না, আবার পবিত্রও করছেন না — তিনি শুধু বর্ণনা করছেন। আগরবাতির ধোঁয়া, কোরানের গুঞ্জন, চতুষ্কোণ ঘর — সবই একটি সামাজিক আচার, যাকে কবি শান্তভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।
প্রতিবেশীর স্বীকারোক্তি: ‘লোকটা নাস্তিক ছিল’
কবিতার সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশ — প্রতিবেশীর মন্তব্য। “লোকটা নাস্তিক ছিল, শরিয়তে মোটেই ছিল না মন, মসজিদে তার সাথে কখনো হয়নি দেখা, এবং নিষিদ্ধ দ্রব্যে ছিল তার উৎসাহ প্রচুর। কিন্তু তবু কেন জানি বাস্তবিক কখনো ভুলেও পারিনি করতে ঘেন্না তাকে। মারেনি লাঠির বাড়ি মাথায় কারুর কোনো দিন, উপরন্তু ছিল সদালাপী।” — এই স্বীকারোক্তি সমাজের ধর্মীয় বিচারের বিরুদ্ধে একটি তীক্ষ্ণ প্রতিবাদ। প্রতিবেশী স্বীকার করেন —虽然他 ধর্মের বিধান অনুযায়ী নাস্তিক, তবু তিনি ঘৃণা করতে পারেননি, কারণ লোকটি কখনও কারও মাথায় লাঠি মারেনি, বরং সদালাপী ছিল। অর্থাৎ নৈতিকতা ধর্মীয় আচারের চেয়ে বড়।
‘যেদিন মরব আমি, সেদিন কি বার হবে, বলা মুশকিল’
“যেদিন মরব আমি, সেদিন কি বার হবে, বলা মুশকিল। শুক্রবার? বুধবার? শনিবার? নাকি রবিবার?” — মৃত্যুর দিন নির্ধারণ করা যায় না, এটাই বাস্তব। কিন্তু কবির আসল চিন্তা অন্যত্র — “সেদিন বর্ষায় যেন না ভেজে শহর, যেন ঘিনঘিনে কাদা না জমে গলির মোড়ে। সেদিন ভাসলে পথঘাট, পুণ্যবান শবানুগামীরা বড় বিরক্ত হবেন।” — এই শেষ লাইনেই কবিতার মূল বিবেচনা। কবি মৃত্যুর পরেও ভাবছেন, শবানুগামীদের যেন অসুবিধা না হয়। এই বিবেচনাই কবিতার শিরোনামকে সার্থক করে।
বিবেচনার দর্শন: মৃত্যুর পরেও অন্যের কথা
শামসুর রাহমানের ‘বিবেচনা’ আসলে একটি দার্শনিক কবিতা — যেখানে মৃত্যু একাকী নয়, মৃত্যু সামাজিক। মৃত্যুর পরেও মানুষ অন্যের চিন্তা করে, অন্যের সুবিধা-অসুবিধার কথা ভাবে। এই বিবেচনাই মানুষকে পশু থেকে আলাদা করে। কবি জানেন তিনি নাস্তিক, কবি জানেন তাকে কেউ মসজিদে দেখেনি, কিন্তু তবু তিনি চান — তার মৃত্যুর দিন যেন বৃষ্টি না হয়, যাতে শবানুগামীরা বিরক্ত না হন।
ট্যাগস: বিবেচনা, শামসুর রাহমান, মৃত্যুর কবিতা, বোতামের ঘর, করোটির চোখ, নাস্তিক, শবানুগমন, আধুনিক বাংলা কবিতা
© Kobitarkhata.com – কবি: শামসুর রাহমান | “সেদিনও কি এমনি অক্লান্ত ঝরঝর বৃষ্টি হবে এ শহরে?” | মৃত্যু, ঘর ও শবানুগমনের অনবদ্য কাব্য