কবিতার খাতা
- 32 mins
মা – কাজী নজরুল ইসলাম।
যেখানেতে দেখি যাহা
মা-এর মতন আহা
একটি কথায় এত সুধা মেশা নাই,
মায়ের মতন এত
আদর সোহাগ সে তো
আর কোনোখানে কেহ পাইবে না ভাই।
হেরিলে মায়ের মুখ,
দূরে যায় সব দুখ,
মায়ের কোলেতে শুয়ে জুড়ায় পরান,
মায়ের শীতল কোলে
সকল যাতনা ভোলে
কতো না সোহাগে মাতা বুকটি ভরান।
যখন জনম নিনু
কতো অসহায় ছিনু,
কাঁদা ছাড়া নাহি জানিতাম কোনো কিছু,
ওঠা বসা দূরে থাক—
মুখে নাহি ছিল বাক,
চাহনি ফিরিত শুধু মা-র পিছু পিছু!
মা – কাজী নজরুল ইসলাম | কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা | মাতৃভক্তি, স্নেহ ও আত্মত্যাগের কবিতা | মায়ের মতো কেউ নাই
মা: কাজী নজরুল ইসলামের মাতৃস্নেহ, আত্মত্যাগ ও অমর ভালোবাসার অসাধারণ কাব্যভাষা
কাজী নজরুল ইসলামের “মা” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য, হৃদয়গ্রাহী ও চিরন্তন সৃষ্টি। এটি মাতৃভক্তির এক অমর কাব্যগাথা। মায়ের স্নেহ, আদর, ত্যাগ, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা — সবকিছু এই কবিতায় ফুটে উঠেছে অনবদ্য শিল্পরূপে। “যেখানেতে দেখি যাহা / মা-এর মতন আহা / একটি কথায় এত সুধা মেশা নাই” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে মায়ের সকল গুণ — তার মুখে সব দুখ দূর হয়, তার কোলে জুড়ায় প্রাণ, তার শীতল কোলে সকল যাতনা ভোলা যায়। কবি শৈশব থেকে যৌবন পর্যন্ত মায়ের নিঃস্বার্থ সেবা, তার জাগরণ, তার চোখের জল, তার মানত, তার আশীর্বাদ — সবকিছুই কবিতায় স্থান পেয়েছে। শেষের দিকে কবি সব ভাইবোনকে আহ্বান জানিয়েছেন — “আয় তবে ভাই বোন, আয় সবে আয় শোন / গাই গান, পদধূলি শিরে লয়ে মা-র; / মার বড়ো কেউ নাই – / কেউ নাই কেউ নাই!” কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় কবি। তিনি বিদ্রোহী কবি হিসেবে খ্যাত, কিন্তু মাতৃভক্তি ও প্রেমের কবিতায়ও তিনি অসাধারণ। তাঁর কবিতায় মা চিরন্তন, অবিনশ্বর, সব দুখের মুক্তিদাত্রী। “মা” তাঁর সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি মায়ের স্নেহ, আদর, ত্যাগ, জাগরণ, মানত, আশীর্বাদ — সবকিছুকে এক অনন্য কাব্যিক ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন।
কাজী নজরুল ইসলাম: বিদ্রোহ ও মাতৃভক্তির কবি
কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় কবি। তিনি বিদ্রোহী কবি হিসেবে খ্যাত, কিন্তু মাতৃভক্তি ও প্রেমের কবিতায়ও তিনি অসাধারণ। তাঁর কবিতায় মা চিরন্তন, অবিনশ্বর, সব দুখের মুক্তিদাত্রী। তিনি তাঁর লেখনীর মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে এক নতুন মাত্রা সংযোজন করেছেন। ‘মা’ কবিতাটি তার সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাঁশি’, ‘সনাম চণ্ডী’, ‘চক্রবাক’ ইত্যাদি। তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা তাকে অমরত্ব দিয়েছে।
কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো বিদ্রোহী চেতনা, সাম্যের বাণী, মাতৃভক্তি, প্রেম ও মানবিকতা। তিনি ধর্ম, বর্ণ, জাতি নির্বিশেষে সব মানুষের সমতার কথা বলেছেন। ‘মা’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি মায়ের স্নেহ ও ভালোবাসার চিরন্তন রূপটি ফুটিয়ে তুলেছেন।
মা: শিরোনামের তাৎপর্য ও কবিতার পটভূমি
শিরোনাম ‘মা’ অত্যন্ত সরল ও স্পষ্ট। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর শব্দ, সবচেয়ে পবিত্র সম্পর্ক। নজরুল ইসলাম এই একটি শব্দের মাধ্যমেই মায়ের সমস্ত গুণ, স্নেহ, ত্যাগ, আদর — সবকিছু ধরে ফেলতে চেয়েছেন। শিরোনামেই কবিতার মর্মকথা ধরা আছে — মায়ের মতো কেউ নেই, মায়ের স্নেহের তুলনা নেই।
কবিতার পটভূমি একটি সন্তানের শৈশব থেকে যৌবন পর্যন্ত মায়ের স্মৃতি। কবি মনে করছেন মায়ের মুখ দেখলে সব দুখ দূর হয়ে যায়, মায়ের কোলে জুড়ায় প্রাণ। তিনি স্মরণ করছেন শৈশবে অসুখে মায়ের জাগরণ, মায়ের মানত, মায়ের ছড়া-গানে ঘুম পাড়ানো, মায়ের হাতে খাওয়া, মায়ের গর্ব — সবকিছু। শেষে তিনি সব ভাইবোনকে আহ্বান জানান — মায়ের পায়ের ধুলা মাথায় নিয়ে মায়ের গান গাইতে, কারণ মায়ের বড় কেউ নেই।
মা: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: যেখানেতে দেখি যাহা মা-এর মতন আহা একটি কথায় এত সুধা মেশা নাই, মায়ের মতন এত আদর সোহাগ সে তো আর কোনোখানে কেহ পাইবে না ভাই।
“যেখানেতে দেখি যাহা / মা-এর মতন আহা / একটি কথায় এত সুধা মেশা নাই, / মায়ের মতন এত / আদর সোহাগ সে তো / আর কোনোখানে কেহ পাইবে না ভাই।”
প্রথম স্তবকে কবি মায়ের অনন্যতার কথা বলছেন। পৃথিবীতে যেখানেই তাকান, যাই দেখেন — কোথাও মায়ের মতো সুধা (অমৃত) মেশানো কথা নেই। মায়ের মতো এত আদর, সোহাগ আর কোথাও পাওয়া যায় না। এটি মাতৃস্নেহের এক অসাধারণ প্রশংসা।
দ্বিতীয় স্তবক: হেরিলে মায়ের মুখ দূরে যায় সব দুখ, মায়ের কোলেতে শুয়ে জুড়ায় পরান, মায়ের শীতল কোলে সকল যাতনা ভোলে কত না সোহাগে মাতা বুকটি ভরান।
“হেরিলে মায়ের মুখ / দূরে যায় সব দুখ, / মায়ের কোলেতে শুয়ে জুড়ায় পরান, / মায়ের শীতল কোলে / সকল যাতনা ভোলে / কত না সোহাগে মাতা বুকটি ভরান।”
দ্বিতীয় স্তবকে মায়ের স্পর্শ ও সান্নিধ্যের গুণ বর্ণিত হয়েছে। মায়ের মুখ দেখলে সব দুখ দূরে চলে যায়। মায়ের কোলে শুয়ে প্রাণ জুড়ায়। মায়ের শীতল কোলে সব যাতনা ভুলে যায়। মাতা কত সোহাগে বুক ভরান — অর্থাৎ সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরেন, ভালোবাসায় ভরিয়ে দেন।
তৃতীয় স্তবক: কত করি উৎপাত আবদার দিন রাত, সব সন হাসি মুখে, ওরে সে যে মা! আমাদের মুখ চেয়ে নিজে রন নাহি খেয়ে, শত দোষে দোষী তবু মা তো ত্যজে না।
“কত করি উৎপাত / আবদার দিন রাত, / সব সন হাসি মুখে, ওরে সে যে মা! / আমাদের মুখ চেয়ে / নিজে রন নাহি খেয়ে, / শত দোষে দোষী তবু মা তো ত্যজে না।”
তৃতীয় স্তবকে সন্তানের দুষ্টুমি ও মায়ের ধৈর্যের কথা। সন্তান কত উৎপাত করে, আবদার করে দিনরাত। মা সব সহ্য করেন হাসি মুখে। তিনি নিজে না খেয়ে থাকেন, সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। শত দোষ থাকলেও মা সন্তানকে ত্যাগ করেন না। এটি মায়ের নিঃস্বার্থ ত্যাগ ও ক্ষমার অসাধারণ চিত্র।
চতুর্থ স্তবক: ছিনু খোকা এতটুকু, একটুতে ছোটো বুক যখন ভাঙিয়া যেত, মা-ই সে তখন বুকে করে নিশিদিন আরাম-বিরামহীন দোলা দিয়ে শুধাতেন, ‘কী হল খোকন?’
“ছিনু খোকা এতটুকু, / একটুতে ছোটো বুক / যখন ভাঙিয়া যেত, মা-ই সে তখন / বুকে করে নিশিদিন / আরাম-বিরামহীন / দোলা দিয়ে শুধাতেন, ‘কী হল খোকন?’”
চতুর্থ স্তবকে শৈশবের স্মৃতি। কবি যখন ছোট ছিলেন, ছোট্ট বুক ভেঙে যেত — অর্থাৎ মন ভেঙে যেত, কষ্ট পেতেন। তখন মা তাকে বুকে নিয়ে দিনরাত আরামহীন (নিজের আরাম ছেড়ে) দোলা দিয়ে জিজ্ঞেস করতেন — ‘কী হল খোকন?’ এটি মায়ের অসীম মমতার চিত্র।
পঞ্চম স্তবক: আহা সে কতই রাতি শিয়রে জ্বালায়ে বাতি একটু অসুখ হলে জাগেন মাতা, সবকিছু ভুলে গিয়ে কেবল আমারে নিয়ে কত আকুলতা যেন জগন্মাতা।
“আহা সে কতই রাতি / শিয়রে জ্বালায়ে বাতি / একটু অসুখ হলে জাগেন মাতা, / সবকিছু ভুলে গিয়ে / কেবল আমারে নিয়ে / কত আকুলতা যেন জগন্মাতা।”
পঞ্চম স্তবকে অসুখের সময় মায়ের জাগরণের কথা। কত রাতে মা শিয়রে বাতি জ্বালিয়ে বসে থাকেন। একটু অসুখ হলেই মা জেগে ওঠেন। সবকিছু ভুলে গিয়ে শুধু সন্তানকে নিয়ে কত আকুলতা — যেন তিনি জগন্মাতা (পৃথিবীর মা)।
ষষ্ঠ স্তবক: যখন জনম নিনু কত অসহায় ছিনু, কাঁদা ছাড়া নাহি জানিতাম কোনো কিছু, ওঠা বসা দূরে যাক – মুখে নাহি ছিল বাক, চাহনি ফিরিত শুধু মা-র পিছু পিছু!
“যখন জনম নিনু / কত অসহায় ছিনু, / কাঁদা ছাড়া নাহি জানিতাম কোনো কিছু, / ওঠা বসা দূরে যাক – / মুখে নাহি ছিল বাক, / চাহনি ফিরিত শুধু মা-র পিছু পিছু!”
ষষ্ঠ স্তবকে জন্মের পর অসহায় শিশুর চিত্র। কবি যখন জন্ম নেন, তখন কত অসহায় ছিলেন। কাঁদা ছাড়া আর কিছু জানতেন না। ওঠা-বসা তো দূরের কথা, মুখে কোনো কথা ছিল না। তাঁর দৃষ্টি শুধু মায়ের পিছু পিছু ফিরত। এটি মা ও শিশুর অবিচ্ছেদ্য বন্ধনের চিত্র।
সপ্তম স্তবক: তখন সে মা আমার চুমু খেয়ে বারবার চাপিতেন বুকে, শুধু একটি চাওয়ায় বুঝিয়া নিতেন যত আমার কী ব্যথা হত, বলো কে এমন স্নেহে বুকটি ছাওয়ায়!
“তখন সে মা আমার / চুমু খেয়ে বারবার / চাপিতেন বুকে, শুধু একটি চাওয়ায় / বুঝিয়া নিতেন যত / আমার কী ব্যথা হত, / বলো কে এমন স্নেহে বুকটি ছাওয়ায়!”
সপ্তম স্তবকে মায়ের শিশুর ব্যথা বুঝতে পারার অলৌকিক ক্ষমতার কথা। মা বারবার চুমু খেয়ে সন্তানকে বুকে চাপতেন। শুধু একটি চাওয়ায় বুঝে নিতেন সন্তানের কী ব্যথা হয়েছে। প্রশ্ন — বলো, কে এমন স্নেহে বুক ছাওয়ায় (ঢেকে দেয়)? অর্থাৎ আর কেউ নয়, শুধু মা।
অষ্টম স্তবক: তারপর কত দুখে আমারে ধরিয়া বুকে করিয়া তুলেছে মাতা দেখো কত বড়ো, কত না সুন্দর এ দেহ এ অন্তর সব মোরা ভাই বোন হেথা যত পড়।
“তারপর কত দুখে / আমারে ধরিয়া বুকে / করিয়া তুলেছে মাতা দেখো কত বড়ো, / কত না সুন্দর / এ দেহ এ অন্তর / সব মোরা ভাই বোন হেথা যত পড়।”
অষ্টম স্তবকে মায়ের ত্যাগের ফল। কত কষ্টে, কত দুখে মা সন্তানকে বুকে ধরে মানুষ করেছেন — দেখো কত বড় করেছেন। কত সুন্দর এই দেহ, এই অন্তর। সব ভাইবোনই মায়ের ত্যাগের ফল।
নবম স্তবক: পাঠশালা হতে যবে ঘরে ফিরি যাব সবে, কত না আদরে কোলে তুলি নেবে মাতা, খাবার ধরিয়া মুখে শুধাবেন কত সুখে ‘কত আজ লেখা হল, পড়া কত পাতা?’
“পাঠশালা হতে যবে / ঘরে ফিরি যাব সবে, / কত না আদরে কোলে তুলি নেবে মাতা, / খাবার ধরিয়া মুখে / শুধাবেন কত সুখে / ‘কত আজ লেখা হল, পড়া কত পাতা?’”
নবম স্তবকে স্কুল থেকে ফেরার স্মৃতি। পাঠশালা থেকে যখন ঘরে ফিরতেন, মা কত আদরে কোলে তুলে নিতেন। খাবার মুখে দিয়ে সুখে জিজ্ঞেস করতেন — আজ কত লেখা হল, কত পাতা পড়া হল? এটি মায়ের সন্তানের পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ ও যত্নের চিত্র।
দশম স্তবক: পড়ে লেখা ভালো হলে দেখেছ সে কত ছলে ঘরে ঘরে মা আমার কত নাম করে! বলে, ‘মোর খোকামণি। হিরা-মানিকের খনি, এমনটি নাই কারও!’ শুনে বুক ভরে!
“পড়ে লেখা ভালো হলে / দেখেছ সে কত ছলে / ঘরে ঘরে মা আমার কত নাম করে! / বলে, ‘মোর খোকামণি। / হিরা-মানিকের খনি, / এমনটি নাই কারও!’ শুনে বুক ভরে!”
দশম স্তবকে সন্তানের সাফল্যে মায়ের গর্বের কথা। পড়ে লেখা ভালো হলে মা কত ছলে ঘরে ঘরে সন্তানের নাম করে — অর্থাৎ গর্ব করে বেড়ান। তিনি বলেন — ‘আমার খোকামণি হিরা-মানিকের খনি, এমনটি কারও নেই!’ এই কথা শুনে সন্তানের বুক ভরে যায়। এটি মায়ের গর্ব ও সন্তানের আনন্দের চিত্র।
একাদশ স্তবক: গা-টি গরম হলে মা সে চোখের জলে ভেসে বলে, ‘ওরে জাদু কী হয়েচে বল!’ কত দেবতার ‘থানে’ পিরে মা মানত মানে – মাতা ছাড়া নাই কারও চোকে এত জল।
“গা-টি গরম হলে / মা সে চোখের জলে / ভেসে বলে, ‘ওরে জাদু কী হয়েচে বল!’ / কত দেবতার ‘থানে’ / পিরে মা মানত মানে – / মাতা ছাড়া নাই কারও চোকে এত জল।”
একাদশ স্তবকে সন্তানের অসুখে মায়ের কান্নার কথা। সন্তানের গা গরম হলেই মা চোখের জলে ভেসে যায় — ‘ওরে জাদু কী হয়েছে বল!’ কত দেবতার কাছে মা মানত মানেন। কবি বলেন — মাতা ছাড়া আর কারও চোখে এত জল নেই। এটি মায়ের সন্তানের জন্য অশ্রুপাতের অসাধারণ চিত্র।
দ্বাদশ স্তবক: যখন ঘুমায় থাকি জাগে রে কাহার আঁখি আমার শিয়রে, আহা কীসে হবে ঘুম! তাই কত ছড়া গানে ঘুম-পাড়ানিরে আনে, বলে, ‘ঘুম! দিয়ে যা রে খুকু-চোখে চুম!’
“যখন ঘুমায় থাকি / জাগে রে কাহার আঁখি / আমার শিয়রে, আহা কীসে হবে ঘুম! / তাই কত ছড়া গানে / ঘুম-পাড়ানিরে আনে, / বলে, ‘ঘুম! দিয়ে যা রে খুকু-চোখে চুম!’”
দ্বাদশ স্তবকে সন্তানকে ঘুম পাড়ানোর চিত্র। সন্তান যখন ঘুমিয়ে থাকে, মা জেগে থাকেন — কীসে ঘুম হবে? তাই মা কত ছড়া-গানে ঘুম পাড়ানির ডাকেন — ‘ঘুম! দিয়ে যা রে খুকু-চোখে চুম!’ এটি মায়ের রাত জাগার এক অনবদ্য চিত্র।
ত্রয়োদশ স্তবক: দিবানিশি ভাবনা কীসে ক্লেশ পাব না, কীসে সে মানুষ হব, বড়ো হব কীসে; বুক ভরে ওঠে মার ছেলেরই গরবে তাঁর, সব দুখ সুখ হয় মায়ের আশিসে।
“দিবানিশি ভাবনা / কীসে ক্লেশ পাব না, / কীসে সে মানুষ হব, বড়ো হব কীসে; / বুক ভরে ওঠে মার / ছেলেরই গরবে তাঁর, / সব দুখ সুখ হয় মায়ের আশিসে।”
ত্রয়োদশ স্তবকে মায়ের ভাবনা ও আশীর্বাদের কথা। মা দিনরাত ভাবেন — কীভাবে সন্তান কষ্ট পাবে না, কীভাবে মানুষ হবে, কীভাবে বড় হবে। মায়ের বুক ভরে ওঠে ছেলের গরবে। সব দুখ ও সুখ হয় মায়ের আশীর্বাদে।
চতুর্দশ স্তবক: আয় তবে ভাই বোন, আয় সবে আয় শোন গাই গান, পদধূলি শিরে লয়ে মা-র; মার বড়ো কেউ নাই – কেউ নাই কেউ নাই! নত করি বল সবে ‘মা আমার! মা আমার!’
“আয় তবে ভাই বোন, / আয় সবে আয় শোন / গাই গান, পদধূলি শিরে লয়ে মা-র; / মার বড়ো কেউ নাই – / কেউ নাই কেউ নাই! / নত করি বল সবে ‘মা আমার! মা আমার!’”
চতুর্দশ স্তবক — শেষ স্তবক — পুরো কবিতার চূড়ান্ত আহ্বান। সব ভাইবোনকে আহ্বান — এসো, মায়ের পদধূলি মাথায় নিয়ে গান গাই। কারণ মায়ের বড় কেউ নেই — কেউ নেই, কেউ নেই! সবাই নত হয়ে বলো — ‘মা আমার! মা আমার!’ এটি মাতৃভক্তির এক চরম ও অনবদ্য প্রকাশ।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি চতুর্দশ স্তবকে বিভক্ত। প্রতিটি স্তবকের ছন্দ ও মিল নজরুলের কাব্যশৈলীর অনন্য বৈশিষ্ট্য বহন করে। ভাষা অত্যন্ত সরল ও প্রাঞ্জল। কোনও জটিল শব্দ নেই, সরাসরি হৃদয়ের কথা। পুনরাবৃত্তি শৈলী ও আবেগময় বক্তব্য কবিতাকে এক অনন্য সুর দিয়েছে।
প্রতীক ব্যবহারে কাজী নজরুল ইসলাম অত্যন্ত দক্ষ। ‘মা’ — মাতৃস্নেহ, ত্যাগ, ভালোবাসা, নিরাপত্তার প্রতীক। ‘সুধা’ — অমৃত, মিষ্টি ভালোবাসার প্রতীক। ‘শীতল কোলে’ — প্রশান্তি, আরাম, নিরাপত্তার প্রতীক। ‘চুমু’ — স্নেহ, ভালোবাসা, মমতার প্রতীক। ‘জগন্মাতা’ — সমগ্র বিশ্বের মা, অসীম মাতৃত্বের প্রতীক। ‘হিরা-মানিকের খনি’ — মূল্যবান সন্তান, মায়ের চোখে সন্তানের অমূল্যতার প্রতীক। ‘দেবতার থানে মানত’ — মায়ের আকুলতা, সন্তানের জন্য বিনিময়ের প্রতীক। ‘পদধূলি’ — মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা, তাকে স্পর্শ করার প্রতীক।
পুনরাবৃত্তি — ‘কেউ নাই কেউ নাই’ — শেষ স্তবকে পুনরাবৃত্তি, জোরালোতা। ‘মা আমার! মা আমার!’ — শেষ লাইনে পুনরাবৃত্তি, আবেগের চরম প্রকাশ।
শেষের ‘মার বড়ো কেউ নাই – কেউ নাই কেউ নাই!’ — এটি অত্যন্ত শক্তিশালী সমাপ্তি। মায়ের চেয়ে বড় কেউ নেই — এই সত্যটিকে জোরালো পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে কবি ঘোষণা করেছেন।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“মা” কাজী নজরুল ইসলামের এক অসাধারণ সৃষ্টি। তিনি এখানে মাতৃস্নেহের চিরন্তন রূপটি ফুটিয়ে তুলেছেন। মায়ের মুখ দেখলে সব দুখ দূর হয়, মায়ের কোলে জুড়ায় প্রাণ। মায়ের শীতল কোলে সব যাতনা ভুলে যায়। মা সন্তানের জন্য নিজের আরাম বিসর্জন দেন, নিজে না খেয়ে থাকেন, শত দোষেও সন্তানকে ত্যাগ করেন না। অসুখে মা জেগে থাকেন, কাঁদেন, মানত মানেন। সন্তানের সাফল্যে মা গর্বিত হন, ঘরে ঘরে সন্তানের নাম করেন। সন্তানকে ঘুম পাড়াতে মা ছড়া-গানে ডাকেন। মা দিনরাত ভাবেন কীভাবে সন্তান বড় হবে। শেষ পর্যন্ত কবি আহ্বান জানান — মায়ের পদধূলি মাথায় নিয়ে গান গাইতে, কারণ মায়ের বড় কেউ নেই।
এই কবিতা আমাদের শেখায় — মা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সত্তা। তাঁর স্নেহ, ত্যাগ, ভালোবাসার তুলনা নেই। তিনি সন্তানের জন্য সবকিছু দিতে প্রস্তুত। তাঁর আশীর্বাদেই সব দুখ-সুখ। মায়ের বড় কেউ নেই — এই সত্যটি কখনও ভোলা উচিত নয়।
কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় মাতৃভক্তি ও মানবিকতা
কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় মাতৃভক্তি ও মানবিকতা একটি পুনরাবৃত্ত বিষয়। তিনি ‘মা’ কবিতায় এই ধারণাগুলোকে এক চরম আবেগের স্তরে নিয়ে গেছেন। তিনি দেখিয়েছেন — কীভাবে মা সন্তানের জন্য সব ত্যাগ করেন, কীভাবে মায়ের স্নেহে সন্তান বড় হয়, কীভাবে মায়ের আশীর্বাদে সব দুখ-সুখ হয়, এবং কীভাবে মায়ের চেয়ে বড় কেউ নেই।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের পাঠ্যক্রমে কাজী নজরুল ইসলামের ‘মা’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের মাতৃভক্তি, ত্যাগ, নিঃস্বার্থ ভালোবাসার মূল্য বুঝতে সাহায্য করে। এটি চিরায়ত এক মাতৃত্বের কবিতা যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে চলে আসছে।
মা সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: ‘মা’ কবিতাটির লেখক কে?
এই কবিতাটির লেখক কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি এবং বিদ্রোহী কবি হিসেবে খ্যাত।
প্রশ্ন ২: ‘যেখানেতে দেখি যাহা মা-এর মতন আহা একটি কথায় এত সুধা মেশা নাই’ — লাইনটির অর্থ কী?
পৃথিবীতে যেখানেই তাকান, যাই দেখেন — কোথাও মায়ের মতো মিষ্টি (সুধামেশা) কথা নেই। মায়ের কথায় অমৃত মেশানো থাকে।
প্রশ্ন ৩: ‘মায়ের কোলেতে শুয়ে জুড়ায় পরান’ — কী বোঝানো হয়েছে?
মায়ের কোলে শুয়ে সন্তানের প্রাণ জুড়ায়, আরাম পায়, সব কষ্ট দূর হয়। মায়ের কোল সন্তানের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।
প্রশ্ন ৪: ‘আমাদের মুখ চেয়ে নিজে রন নাহি খেয়ে’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
মা সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন, নিজে না খেয়েও থাকেন। এটি মায়ের নিঃস্বার্থ ত্যাগ ও সন্তানের প্রতি অগাধ ভালোবাসার চিত্র।
প্রশ্ন ৫: ‘একটুতে ছোটো বুক যখন ভাঙিয়া যেত, মা-ই সে তখন বুকে করে নিশিদিন আরাম-বিরামহীন দোলা দিয়ে শুধাতেন, ‘কী হল খোকন?’ — কেন?
শৈশবে সন্তানের মন ভেঙে গেলে — কষ্ট পেলে — মা তাকে বুকে নিয়ে দিনরাত দোলা দিয়ে জিজ্ঞেস করতেন ‘কী হল খোকন?’ এটি মায়ের অসীম মমতা ও সন্তানের প্রতি যত্নের চিত্র।
প্রশ্ন ৬: ‘একটু অসুখ হলে জাগেন মাতা, সবকিছু ভুলে গিয়ে কেবল আমারে নিয়ে কত আকুলতা’ — কী বোঝানো হয়েছে?
সন্তানের সামান্য অসুখ হলেই মা সবকিছু ভুলে শুধু সন্তানকে নিয়ে আকুল হন। এটি মায়ের সন্তানের জন্য চরম উদ্বেগ ও যত্নের চিত্র।
প্রশ্ন ৭: ‘বলো কে এমন স্নেহে বুকটি ছাওয়ায়!’ — লাইনটির অর্থ কী?
কবি প্রশ্ন করছেন — মা ছাড়া আর কে এমন স্নেহে বুক ঢেকে দেয়? অর্থাৎ আর কেউ নয়, শুধু মা।
প্রশ্ন ৮: ‘বলে, ‘মোর খোকামণি। হিরা-মানিকের খনি, এমনটি নাই কারও!’ শুনে বুক ভরে!’ — কী বোঝানো হয়েছে?
সন্তানের সাফল্যে মা গর্বিত হয়ে ঘরে ঘরে বলেন — আমার সন্তান হিরা-মানিকের খনি, এমন সন্তান কারও নেই। এই গর্বের কথা শুনে সন্তানের বুক ভরে যায়।
প্রশ্ন ৯: ‘মাতা ছাড়া নাই কারও চোকে এত জল’ — লাইনটির গভীরতা কী?
মা ছাড়া আর কারও চোখে সন্তানের জন্য এত জল নেই। মায়ের কান্না, মায়ের অশ্রু সবচেয়ে বাস্তব ও নিঃস্বার্থ।
প্রশ্ন ১০: ‘মার বড়ো কেউ নাই – কেউ নাই কেউ নাই!’ — পুনরাবৃত্তির তাৎপর্য কী?
তিনবার পুনরাবৃত্তি মায়ের মহিমাকে জোরালো করে। মায়ের চেয়ে বড় কেউ নেই — এই সত্যটি বারবার উচ্চারণ করে কবি নিশ্চিত করতে চান যে পাঠকের মনে এটি গেঁথে যায়।
ট্যাগস: মা, কাজী নজরুল ইসলাম, কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, মাতৃভক্তির কবিতা, নজরুলের মা কবিতা, বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবিতা
© Kobitarkhata.com – কবি: কাজী নজরুল ইসলাম | কবিতার প্রথম লাইন: “যেখানেতে দেখি যাহা / মা-এর মতন আহা” | মাতৃস্নেহ ও আত্মত্যাগের অসাধারণ কাব্যভাষা | আধুনিক বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন





