কবিতার প্রারম্ভেই কবির বর্তমান সচ্ছলতা ও সামাজিক প্রভাবের এক বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে। একসময় যে মানুষটি হয়তো অভাব বা সংগ্রামে দিন কাটিয়েছে, আজ তার বাবাও মাঝে মাঝে টাকার জন্য তার কাছে চিঠি লেখেন এবং কবি অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও সামর্থ্যবান সন্তানের মতো ডাকঘরে যান। তাঁর এই আর্থিক ও সামাজিক প্রতিপত্তির কারণে তিনি যখন কোনো রেস্তোরাঁয় যান, সেখানকার বয় বা বেয়ারারা তাঁকে সানন্দে ও পরম শ্রদ্ধায় ‘আদাব’ ঠোকে। চারপাশের তরুণ বন্ধুরা তাঁকে দেখে সোল্লাসে স্বাগত জানায়। কবি আজ এতটাই সচ্ছল যে, বন্ধুদের অনায়াসে টাকা ধার দিতে পারেন। প্রকৃতির কোনো উপাদান কিংবা কোনো মানুষের কাছে তিনি আজ আর ঋণী নন, বরং তিনিই আজ চারপাশের সমাজকে অকাতরে বিলিয়ে দিচ্ছেন।
কবিতার মধ্যভাগে কবির political ও প্রশাসনিক ক্ষমতার দাপট উন্মোচিত হয়। তাঁর বেকার বন্ধুরা যখন চাকরির জন্য বা কোনো প্রয়োজনে তাঁকে বিব্রত করে, কবি তখন অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে সরাসরি সরকারের কোনো এক মন্ত্রীর সাথে টেলিফোনে কথা বলে তাদের কাজ করে দেন এবং বন্ধুরা খুশিতে আত্মহারা হয়। শুধু তাই নয়, কবি একজন প্রতিষ্ঠিত লেখক বা ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠায় যেকোনো পুস্তক প্রকাশক এখন তাঁর কৃপাপ্রার্থী। এমনকি সমাজের অন্ধকার জগতের তথাকথিত মাস্তান বা প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও কবির ব্যক্তিত্বের কাছে মন্ত্রমুগ্ধ, একান্ত অনুগত এবং বাধ্য বশংবদ হয়ে থাকে। ফিল্মের গান লেখার মতো বাণিজ্যিক ও লোভনীয় অফার পেয়েও কবি তা অনায়াসে ফিরিয়ে দেন। চারপাশের সমাজ ‘কত টাকা চাই—আসুন আমার ঘরে’ বলে কবির জন্য হাজারো দুয়ার খুলে রেখেছে। কিন্তু কবি ক্ষমতার এই মায়াবী সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার সময় চিনে নিতে পারেন ভেতরের সেই আদি ও আদিম ‘জন্ম-প্রলোভন’ বা লোভকে, যা মানুষকে সাময়িকভাবে অন্ধ করে দেয়।
পরবর্তী অংশে কবির সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও শক্তির এক অলৌকিক বহিঃপ্রকাশ ঘটে। কবির নিজ এলাকার সাধারণ মানুষ চায় তিনি যেন আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী বা প্রার্থী হন, কারণ তারা তাঁকে এক পরম বিশ্বস্ত মানুষ হিসেবে চিনেছে। কবি প্রতিদিন মানসিকভাবে সৎ এবং সামাজিকভাবে আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছেন। কবির নিজের মনে হচ্ছে, কুমারী স্তনের মতো বক্ষময় তীব্র গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাঁর অলৌকিক ও জাগতিক ক্ষমতা। তিনি আজ এক অপরাজেয় পুরুষে রূপান্তরিত হয়েছেন।
শেষের দুই চরণে এসে কবিতাটি এক পরম মনস্তাত্ত্বিক মোড় নেয় এবং সমস্ত জাগতিক ক্ষমতা গিয়ে আঘাত করে কবির সেই পুরোনো, হারিয়ে যাওয়া বা অবহেলা করা প্রেমিকার ওপর। কবি অত্যন্ত অহংকার ও পরম তৃপ্তির সাথে তাঁর সেই একদা অবহেলা করা প্রেমিকাকে উদ্দেশ্য করে বলেন—তোমার দেওয়া যেকোনো উপেক্ষা বা অবজ্ঞাই আজ আমার এই ‘সহ্যসীমার মধ্যে’। একসময় হয়তো তোমার সামান্য অবহেলা বা দূরে ঠেলে দেওয়া আমাকে স্তব্ধ করে দিত, কিন্তু আজ আমি সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে এতখানি উঁচুতে দাঁড়িয়ে আছি যে, তোমার সেই উপেক্ষা আমাকে আর স্পর্শই করতে পারে না। ক্ষমতার এই চূড়ায় বসে কবি অনুভব করেন, সেই অহংকারী প্রিয়তমা আজ আর তাঁর নাগালের বাইরে কেউ নয়; সে আজ কবির ‘করতলগত’ অর্থাৎ হাতের মুঠোয় এসে থিতু হয়েছে। জাগতিক সাফল্যের চরম অহংকারে ভালোবাসার পুরোনো ক্ষতকে জয় করার এবং সমস্ত অবহেলাকে তুচ্ছ করে দেওয়ার এক রাজকীয় মনস্তাত্ত্বিক বিজয়ের মধ্য দিয়েই কবিতাটি শেষ হয়।
সহ্যসীমার মধ্যে – নির্মলেন্দু গুণ | নির্মলেন্দু গুণের কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা | বাবা, টাকা, চিঠি, বেকার বন্ধু, মন্ত্রী, পুস্তক প্রকাশক, মাস্তান, ফিল্মী গীত, নির্বাচন, ক্ষমতা ও সহ্যসীমার অসাধারণ কাব্যভাষা
সহ্যসীমার মধ্যে: নির্মলেন্দু গুণের বাবার কাছে টাকা পাঠানো, বেকার বন্ধুর বিরক্তি, মন্ত্রীর সঙ্গে কথা, প্রকাশক-মাস্তানের কৃপাপ্রার্থনা, ফিল্মী গীতের অফার, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ক্ষমতার বৃদ্ধির অসাধারণ কাব্যভাষা
নির্মলেন্দু গুণের “সহ্যসীমার মধ্যে” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য, তীক্ষ্ণ ও আত্মবিশ্লেষণী সৃষ্টি। “বাবা আমার কাছে এখন মাঝে মাঝে টাকার জন্য চিঠি লেখেন, / আমি ডাকঘরে যাই। / আমাকে আসতে দেখে রেস্তোঁরার যে-কোনো বেয়ারা এখন / সানন্দে আদাব ঠোকে- সোল্লাসে স্বাগত জানায়” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে বাবার টাকার জন্য চিঠি লেখা, ডাকঘরে যাওয়া, রেস্তোঁরার বেয়ারাদের আদাব ঠোকা ও স্বাগত জানানো, তরুণ বন্ধুদের টাকা ধার দেওয়া, গাছ-পাখি-ফুল-নারীর কাছে ঋণী না হওয়া, বেকার বন্ধুকে বিব্রত করা ও মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলা, পুস্তক প্রকাশকদের কৃপাপ্রার্থী হওয়া ও মাস্তানদের মন্ত্রমুগ্ধ হওয়া, ফিল্মী গীত রচনার অফার ও রাজী না হওয়া, ‘কত টাকা চাই- আসুন আমার ঘরে’ ডাক, লোভ ও জন্ম-প্রলোভন সিঁড়িতে তুলে নেওয়া, এলাকাবাসীর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আহ্বান, সবচেয়ে বিশ্বাসী-সৎ-শক্তিশালী হওয়া, কুমারী স্তনের মতো বক্ষময় বৃদ্ধি পাচ্ছে অলৌকিক ক্ষমতা, তোমার যে-কোনো উপেক্ষাই এখন সহ্যসীমার মধ্যে ও তুমি করতলগত — এই সব মিলিয়ে এক ক্ষমতা, টাকা, সমাজ, সম্পর্ক ও সহ্যসীমার গভীর ও বহুমাত্রিক কাব্যচিত্র। নির্মলেন্দু গুণ (জন্ম ১৯৪৫) আধুনিক বাংলা কবিতার এক গুরুত্বপূর্ণ পুরুষ। তিনি প্রেম, সমাজ, ক্ষমতা ও আত্মবিশ্লেষণের কবি হিসেবে পরিচিত। “সহ্যসীমার মধ্যে” তাঁর সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি টাকা, ক্ষমতা ও সমাজের সাথে সম্পর্কের পরিবর্তনের কথা লিখেছেন।
নির্মলেন্দু গুণ: সমাজ, ক্ষমতা ও আত্মবিশ্লেষণের কবি
নির্মলেন্দু গুণ ১৯৪৫ সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক। তাঁর কবিতায় প্রেম, সমাজ, ক্ষমতা, অর্থ, সম্পর্ক ও আত্মবিশ্লেষণ গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি সহজ-সরল ভাষায় জটিল সামাজিক বাস্তবতা ও মনস্তত্ত্ব প্রকাশে সিদ্ধহস্ত।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’, ‘বিষাদ বারান্দা’, ‘রক্তকলম’, ‘অমর একুশে’ প্রভৃতি।
নির্মলেন্দু গুণের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো — সমাজ ও অর্থের সম্পর্ক, ক্ষমতার উত্থান ও তার প্রভাব, বাবার কাছে টাকা পাঠানো থেকে শুরু করে মন্ত্রী-প্রকাশক-মাস্তানদের সম্পর্ক, নির্বাচন ও রাজনীতি, ‘সহ্যসীমার মধ্যে’ থাকার ঘোষণা, ‘কুমারী স্তনের মতো বক্ষময় বৃদ্ধি’ ও ‘অলৌকিক ক্ষমতা’-র প্রতীক, এবং শেষ পর্যন্ত ‘করতলগত’ হওয়ার বক্তব্য। ‘সহ্যসীমার মধ্যে’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি একজন মানুষের অর্থ ও ক্ষমতার উত্থানের কাহিনি লিখেছেন।
সহ্যসীমার মধ্যে: শিরোনামের তাৎপর্য ও কবিতার পটভূমি
শিরোনাম ‘সহ্যসীমার মধ্যে’ অত্যন্ত তাৎপর্পণপূর্ণ। ‘সহ্যসীমা’ — যা সহ্য করা যায়, যে সীমার মধ্যে সবকিছু সহনীয়। কবি বলছেন — এখন সবকিছু তাঁর সহ্যসীমার মধ্যে। ক্ষমতা ও টাকা তাকে এমন জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে যে কোনো উপেক্ষা, কোনো অপমান সহ্য করার ক্ষমতা আছে।
কবি শুরুতে বলছেন — বাবা আমার কাছে এখন মাঝে মাঝে টাকার জন্য চিঠি লেখেন, আমি ডাকঘরে যাই। আমাকে আসতে দেখে রেস্তোঁরার যে-কোনো বেয়ারা এখন সানন্দে আদাব ঠোকে- সোল্লাসে স্বাগত জানায়। আপাততঃ তরুণ বন্ধুরা, আমি টাকা ধার দিই অনায়াসে। গাছ-পাখি-ফুল-নারী, আমি কারো কাছে ঋণী নই।
আমার বেকার বন্ধুা আমাকে বিব্রত করে, আমি বিরক্ত হয়ে টেলিফোনে জনৈক মন্ত্রীর সাথে কথা বলি। তারা খুশি হয়। যে-কোনো পুস্তক প্রকাশক এখন আমার কৃপাপ্রার্থী, যে-কোনো মাস্তান এখন আমার মন্ত্রমুগ্ধ, একান্ত অনুগত, বাধ্য বশংবদ। সম্প্রতি দু’একটি ফিল্মী গীত রচনার অফার পেয়েছি, আমি রাজী নই।
‘কত টাকা চাই- আসুন আমার ঘরে”- বলে ডাকে হাজার দুয়ার; আমি চিনতে পারি না, বুঝি লোভ, সেই জন্ম-প্রলোভন যে আমাকে অন্ধকারে হাত ধরে টেনে টেনে তুলছে সিঁড়িতে।
আমার এলাকাবাসীরা চায় আমি আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী হই, তারা গণভোট দেবে, কেননা আমি এখন সবচেয়ে বিশ্বাসী, প্রতিদিন সৎ এবং শক্তিশালী হচ্ছি। কুমারী স্তনের মতো বক্ষময় বৃদ্ধি পাচ্ছে, অলৌকিক আমার ক্ষমতা। তোমার যে-কোনো উপেক্ষাই এখন আমার সহ্যসীমার মধ্যে, তুমি করতলগত, করতলে গত।
সহ্যসীমার মধ্যে: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: বাবার চিঠি, ডাকঘর, রেস্তোঁরার বেয়ারাদের আদাব, টাকা ধার দেওয়া, ঋণী না হওয়া
“بابا আমার কাছে এখন মাঝে মাঝে টাকার জন্য چিঠি লেখেন، / আমি ডাকঘরে যাই। / আমাকে আসতে দেখে رেস্তোঁরার যে-কোনো بےارا এখন / সানন্দে আদাব ঠোকে- সোল্লাসে স্বাগত জানায় / আপাততঃ তরুণ বন্ধুরা، আমি টাকা ধার دিই অনায়াসে। / گাছ-پাখی-ফুল-ناری، আমি কারো কাছে ঋণী نই۔”
প্রথম স্তবকে অর্থ ও সামাজিক মর্যাদার সম্পর্ক। বাবা টাকার জন্য চিঠি লেখেন — ছেলে এখন অভাবী নয়, বাবা নির্ভরশীল। রেস্তোঁরার বেয়ারারা আদাব ঠোকে — সম্মান দেখায়। তরুণ বন্ধুদের টাকা ধার দেওয়া — অর্থের ক্ষমতা। গাছ-পাখি-ফুল-নারীর কাছে ঋণী না হওয়া — কারও কাছে দায়বদ্ধ নয়।
দ্বিতীয় স্তবক: বেকার বন্ধু, মন্ত্রীর সঙ্গে কথা, পুস্তক প্রকাশক ও মাস্তানদের কৃপাপ্রার্থনা
“আমার بيكار بন্ধুা আমাকে বিব্রত করে، আমি বিরক্ত হ’য়ে / টেলিফোনে জনৈক মন্ত্রীর সাথে কথা বলি। তারা খুশি হয়। / যে-কোনো পুস্তك প্রকাশক এখন আমার কৃপাপ্রার্থী، যে-কোনো مাস্তان / এখন আমার مন্ত্রমুগ्ध، একান্ত অনুগত، بाध্য بশংبদ۔”
দ্বিতীয় স্তবকে ক্ষমতার সম্পর্ক। বেকার বন্ধু বিব্রত করে — কবি বিরক্ত হন, মন্ত্রীর সাথে কথা বলেন — উচ্চ পর্যায়ে সংযোগ। পুস্তক প্রকাশক কৃপাপ্রার্থী, মাস্তানরা মন্ত্রমুগ্ধ ও অনুগত — অর্থ ও ক্ষমতার প্রভাব।
তৃতীয় স্তবক: ফিল্মী গীতের অফার, রাজী না হওয়া, লোভ ও জন্ম-প্রলোভন সিঁড়িতে তুলে নেওয়া
“সম্প্রতি دو’একটি ফিল্মী গীত رচনার অফার পেয়েছি، আমি রাজী নই। / ‘كত টাকা চাই- আসুন আমার ঘরে”- ب’লে ডাকে হাজার دوয়ার; / আমি چিনতে পারি না، বুঝি لوب، সেই জন্ম-প্রলোভন / যে আমাকে অন্ধকারে হাত ধ’রে টেনে টেনে তুলছে সিঁڑিতে۔”
তৃতীয় স্তবকে লোভ ও প্রলোভনের চিত্র। ফিল্মী গীতের অফার — বাণিজ্যিক সুযোগ, রাজী নন — আত্মসম্মান বজায়। ‘কত টাকা চাই’ ডাক — লোভের আহ্বান। ‘জন্ম-প্রলোভন’ — পুরনো কামনা, যা অন্ধকারে সিঁড়ি বেয়ে তুলে নিচ্ছে।
চতুর্থ স্তবক: নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিশ্বাসী-সৎ-শক্তিশালী হওয়া, অলৌকিক ক্ষমতা, সহ্যসীমা ও করতলগত
“আমার এলাকাবাসীরা চায় আমি আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দী হই, / তারা গণভোট দেবে، কেননা আমি এখন সবচেয়ে বিশ্বাসী، প্রতিদিন / সৎ এবং শক্তিশালী হচ্ছি। كুমারী স্তনের মতো বক্ষময় বৃদ্ধি পাচ্ছে، / অলৌকিক আমার ক্ষমতা। تےামার যে-কোনো উপেক্ষাই / এখন আমার সহ্যসীমার মধ্যে، تুমি করতলگت، করতলে গত۔”
চতুর্থ স্তবকে ক্ষমতার চূড়ান্ত রূপ। এলাকাবাসী নির্বাচনে চায় — জনসমর্থন। বিশ্বাসী, সৎ, শক্তিশালী — আত্ম-প্রচার। ‘কুমারী স্তনের মতো বক্ষময় বৃদ্ধি’ — ক্ষমতার অলৌকিক উত্থান। ‘সহ্যসীমার মধ্যে’ — সবকিছু সহনীয়। ‘করতলগত’ — প্রিয়জন এখন তাঁর করতলে, তাঁর নিয়ন্ত্রণে।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি চারটি স্তবকে বিভক্ত। প্রথম স্তবক ৬ লাইন, দ্বিতীয় ৪ লাইন, তৃতীয় ৪ লাইন, চতুর্থ ৪ লাইন। মুক্তছন্দ, গদ্যকাব্যের ধাঁচে লেখা। ভাষা সরল, প্রাঞ্জল, তীক্ষ্ণ ও আত্মবিশ্লেষণী।
প্রতীক ব্যবহারে অসাধারণ। ‘বাবার চিঠি’ — অর্থের উত্থান ও সম্পর্কের পরিবর্তন। ‘রেস্তোঁরার বেয়ারা’ — সামাজিক মর্যাদা। ‘টাকা ধার দেওয়া’ — অর্থের ক্ষমতা। ‘মন্ত্রীর সঙ্গে কথা’ — উচ্চ সংযোগ। ‘পুস্তক প্রকাশক, মাস্তান’ — বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের প্রতি প্রভাব। ‘ফিল্মী গীত’ — বাণিজ্যিক প্রলোভন। ‘জন্ম-প্রলোভন’ — পুরনো কামনা। ‘সিঁড়ি’ — ক্ষমতার উত্থান। ‘নির্বাচন’ — রাজনৈতিক ক্ষমতা। ‘কুমারী স্তনের মতো বৃদ্ধি’ — ক্ষমতার অলৌকিক উত্থান। ‘সহ্যসীমা’ — সহনশীলতার সীমা। ‘করতলগত’ — নিয়ন্ত্রণে আনা।
পুনরাবৃত্তি কৌশল — ‘এখন’ — প্রথম স্তবকে ২ বার, দ্বিতীয় স্তবকে ২ বার, চতুর্থ স্তবকে ২ বার।
শেষের ‘তুমি করতলগত, করতলে গত’ — একটি চমৎকার ও সাহসী সমাপ্তি।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের পাঠ্যক্রমে নির্মলেন্দু গুণের ‘সহ্যসীমার মধ্যে’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের অর্থ, ক্ষমতা, সমাজ ও সম্পর্কের বাস্তবতা, আত্মবিশ্লেষণ, এবং সহজ-সরল ভাষায় তীক্ষ্ণ সামাজিক সমালোচনার কৌশল সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে।
সহ্যসীমার মধ্যে সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: ‘সহ্যসীমার মধ্যে’ কবিতাটির লেখক কে?
এই কবিতাটির লেখক নির্মলেন্দু গুণ (জন্ম ১৯৪৫)। তিনি বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।
প্রশ্ন ২: ‘সহ্যসীমার মধ্যে’ শিরোনামটির তাৎপর্য কী?
সবকিছু এখন সহ্য করার সীমার মধ্যে — অর্থাৎ ক্ষমতা ও টাকা তাকে এমন জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে যে কোনো অপমান বা উপেক্ষা সহ্য করা যায়।
প্রশ্ন ৩: ‘বাবা টাকার জন্য চিঠি লেখেন’ — কী বোঝায়?
ছেলে এখন অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল, বাবা নির্ভরশীল — সম্পর্কের পরিবর্তন।
প্রশ্ন ৪: ‘রেস্তোঁরার বেয়ারা আদাব ঠোকে’ — কী বোঝায়?
সামাজিক মর্যাদা ও সম্মান বৃদ্ধি পেয়েছে — মানুষ তাকে চিনে ও সম্মান করে।
প্রশ্ন ৫: ‘মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলি’ — কী বোঝায়?
উচ্চ পর্যায়ে সংযোগ ও প্রভাব — ক্ষমতার প্রতীক।
প্রশ্ন ৬: ‘পুস্তক প্রকাশক কৃপাপ্রার্থী, মাস্তান মন্ত্রমুগ্ধ’ — কী বোঝায়?
সব শ্রেণির মানুষ তার কাছে আসে — অর্থ ও ক্ষমতার আকর্ষণ।
প্রশ্ন ৭: ‘ফিল্মী গীত রচনার অফার, রাজী নই’ — কেন?
বাণিজ্যিক প্রলোভন প্রত্যাখ্যান — আত্মসম্মান ও শৈল্পিক মূল্যবোধ বজায় রাখা।
প্রশ্ন ৮: ‘জন্ম-প্রলোভন সিঁড়িতে তুলে নেওয়া’ — কী বোঝায়?
পুরনো কামনা ও লোভ তাকে ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে উপরে তুলে নিচ্ছে।
প্রশ্ন ৯: ‘কুমারী স্তনের মতো বক্ষময় বৃদ্ধি’ — কী বোঝায়?
ক্ষমতার অলৌকিক ও দ্রুত উত্থান — একটি সাহসী ও বিতর্কিত প্রতীক।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা কী?
অর্থ ও ক্ষমতা সমাজে সম্পর্ক বদলে দেয়। বাবা থেকে শুরু করে মন্ত্রী, প্রকাশক, মাস্তান — সবাই প্রভাবিত হয়। কিন্তু সেই উত্থানের সঙ্গে লোভ ও প্রলোভনও আসে। শেষ পর্যন্ত সবকিছু সহ্যসীমার মধ্যে চলে আসে, আর প্রিয়জন করতলগত হয়। এটি এক তীক্ষ্ণ সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ।
ট্যাগস: সহ্যসীমার মধ্যে, নির্মলেন্দু গুণ, নির্মলেন্দু গুণের কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, বাবার চিঠি, টাকা, মন্ত্রী, পুস্তক প্রকাশক, মাস্তান, ফিল্মী গীত, নির্বাচন, ক্ষমতা, করতলগত, বাংলা কবিতা বিশ্লেষণ
© Kobitarkhata.com – কবি: নির্মলেন্দু গুণ | কবিতার প্রথম লাইন: “বাবা আমার কাছে এখন মাঝে মাঝে টাকার জন্য চিঠি লেখেন, / আমি ডাকঘরে যাই। / আমাকে আসতে দেখে রেস্তোঁরার যে-কোনো বেয়ারা এখন / সানন্দে আদাব ঠোকে- সোল্লাসে স্বাগত জানায়” | সমাজ, ক্ষমতা ও সহ্যসীমার অসাধারণ কাব্যভাষা | আধুনিক বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন