বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রথাবিরোধী, যুক্তিবাদী ও প্রখর সমাজ-সমালোচক কবি ও ভাষাবিজ্ঞানী ড. হুমায়ুন আজাদের ‘মানুষের সঙ্গ ছাড়া’ কবিতাটি চরম মানববিদ্বেষ (Misanthropy), তীব্র মোহভঙ্গ, আধুনিক সভ্যতার অবক্ষয় এবং তার বিপরীতে প্রকৃতির অকৃত্রিম জগতের প্রতি এক পরম আশ্রয়ের মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান। কবি এখানে তথাকথিত ‘সেরা জীব’ মানুষের ভেতরের হিংস্রতা, কপটতা ও কুৎসিত রূপকে উন্মোচন করে, মানুষের সমাজ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে প্রকৃতির আদিম ও সরল আশ্রয়ে বেঁচে থাকার এক তীব্র ঘোষণা দিয়েছেন।
কবিতার প্রারম্ভেই এক চরম ও স্পর্ধিত সত্যের উন্মোচন ঘটে। কবি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, মানুষের সংসর্গ বা সমাজ ছাড়া এই পৃথিবীর আর সবকিছুই তাঁর ভীষণ ভালো লাগে। তিনি মানুষের চেয়ে প্রকৃতির গাছপালা আর পশুপাখিকে অনেক বেশি বিশ্বস্ত ও সুন্দর মনে করেন। আমের ডালে বসে থাকা কুচকুচে কালো কাক, বারান্দার কোণে কিচিরমিচির করা ছোট্ট চড়ুই, শালিকের ঝাঁক, সুদূর আফ্রিকার হিংস্র গণ্ডার, নেকড়ে কিংবা হায়েনা—এমনকি রাস্তার মোড়ে মল খেয়ে বেঁচে থাকা নোংরা কুকুর বা বহু দূর থেকে ভেসে আসা ডাহুক পাখির ডাকও কবিকে পরম সুখ দেয়। কবি অনুভব করেন, প্রকৃতির এই সরল ও অকৃত্রিম উপাদানগুলো বেঁচে আছে বলেই তিনি আজও কোনোমতে টিকে আছেন এবং তাঁর নতুন করে বাঁচতে ইচ্ছে করে। এই অবাধ্য ও খাঁটি পশু-প্রকৃতির মায়াতেই তিনি কখনো আত্মহত্যার মতো চরম পথ বেছে নেবেন না। কবি মানুষের কুৎসিত সঙ্গ এড়াতে চান এবং তাদের সম্পর্কে কোনো মন্তব্য না করে কেবল এক গভীর ও বিষণ্ণ ভাবনায় ডুবে যান।
কবিতার মধ্যভাগে মানুষের প্রতি কবির সেই চেপে রাখা ক্ষোভ, ঘৃণা ও তীব্র হতাশা এক প্রলয়ঙ্করী রূপ ধারণ করে। কবি বিস্ময় ও চরম ধিক্কারের সাথে প্রশ্ন তোলেন—সৃষ্টির সেরা জীব হয়েও এই ‘মানুষ’ নামক জন্তুগুলো দিন দিন এতটা কুৎসিত, বিকৃত আর নোংরা কীভাবে হয়ে উঠল? কীভাবে প্রতিটি মানুষের মুখে আর মনে জমে উঠল পরনিন্দা, লোভ আর ভণ্ডামির পাহাড়প্রমাণ আবর্জনা? সমাজ আজ এতটাই কৃত্রিম ও বিকৃত যে, প্রতিটি মানুষ আজ এক একটি স্বার্থান্বেষী ‘সংঘ’ বা দল উপদলে বিভক্ত। মানুষের চোখে আজ প্রেমের বদলে কেবলই হিংসার আগুন, প্রত্যেকেই আজ অন্যের ক্ষতি করার জন্য এক একটি উদ্যত ‘আগ্নেয়াস্ত্র’। মতাদর্শের নামে মানুষ আজ অন্ধ—প্রত্যেকেই এক একটি তীব্র ও উগ্র মতবাদ বুকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যার একমাত্র লক্ষ্য হলো অন্যের গ্রীবা বা গলা চেপে ধরে নিজের জীবনের মনোরম স্বাদ বা স্বার্থ ভোগ করা। মানুষের এই স্বার্থপরতা ও পাশবিকতা অরণ্যের হিংস্র পশুর চেয়েও ভয়াবহ।
শেষাংশে এসে কবিতাটি এক পরম নিরাসক্তি ও আত্মিক একাকীত্বের মাঝে থিতু হয়। মানুষের এই পঙ্কিল সমাজ ও কোলাহল থেকে নিজেকে বাঁচাতে কবি আজ লোকালয় থেকে “অতিশয় দূরে” একলা বেঁচে আছেন। তিনি মানুষের মায়াবী কিন্তু মেকি হাতছানি এড়িয়ে পথের একলা কুকুর দেখে মুগ্ধ হন, সুদূরে উড়ে যাওয়া গুনগুন করা মুখর মৌমাছির ডানায় জীবনের আসল সৌন্দর্য খুঁজে পান।
তথাকথিত সভ্য মানুষের ভেতরের এই আদিম হিংস্রতা, লোভ আর নৈতিক পতনকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে, মানুষের সঙ্গ বর্জন করে প্রকৃতির আদি ও অকৃত্রিম জগতের কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়ার এক চরম সত্যনিষ্ঠ ও দ্রোহী প্রকাশ ঘটেছে এই কবিতায়।
মানুষের সঙ্গ ছাড়া – হুমায়ুন আজাদ | হুমায়ুন আজাদের কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা | মানুষ, কাক, চড়াই, শালিখ, গন্ডার, নেকড়ে, হায়েনা, কুকুর, ডাহুকের ডাক, আত্মহত্যা ও অস্বাভাবিকতার অসাধারণ কাব্যভাষা
মানুষের সঙ্গ ছাড়া: হুমায়ুন আজাদের কাক, চড়াই, শালিখ, গন্ডার, নেকড়ে, হায়েনা, কুকুর, ডাহুক, আত্মহত্যা না করা, মানুষের কুৎসিৎ মুখ, হিংসা, আগ্নেয়াস্ত্র, মতবাদ ও মৌমাছির অসাধারণ কাব্যভাষা
হুমায়ুন আজাদের “মানুষের সঙ্গ ছাড়া” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য, তীক্ষ্ণ ও মানববিরোধী সৃষ্টি। “মানুষের সঙ্গ ছাড়া আর সব ভাল লাগে, আমের শাখায় / কালো কাক, বারান্দায় ছোট্ট চড়াই, শালিখের ঝাঁক / আফ্রিকার অদ্ভুত গন্ডার, নেকড়ে, হায়েনা, রাস্তার কোণায় / মলপরিতৃপ্ত নোংরা কুকুর, বহু দূরে ডাহুকের ডাক / সুখী করে, এইসব সুখ আছে ব’লে আজো বেঁচে আছি, এবং এখনো / বাঁচতে ইচ্ছে করে, তাই হয়তো আত্মহত্যায় যাবো না কখনো।” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে মানুষের সঙ্গ ছাড়া সব ভালো লাগে, আমের শাখায় কালো কাক, বারান্দায় ছোট্ট চড়াই, শালিখের ঝাঁক, আফ্রিকার গন্ডার-নেকড়ে-হায়েনা, রাস্তার কোণায় মলপরিতৃপ্ত নোংরা কুকুর, দূরে ডাহুকের ডাক, এই সুখগুলো বেঁচে থাকার কারণ, আত্মহত্যায় না যাওয়া, মানুষ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য না করা, কুৎসিৎ মুখ ও আবর্জনা জমা, অস্বভাবী হওয়া, প্রত্যেকেই সংঘ ও হিংসা, প্রত্যেকেই আগ্নেয়াস্ত্র ও মতবাদ, গ্রীবা চেপে জীবন উপভোগ, অতিশয় দূরে বেঁচে থাকা, পথের কুকুর দেখে মুগ্ধ হওয়া ও দূরে উড়ে মুখর মৌমাছি — এই সব মিলিয়ে এক মানুষের প্রতি বিরক্তি, প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা, অস্বাভাবিকতা ও আত্মহত্যার অসাধারণ কাব্যচিত্র। হুমায়ুন আজাদ (১৯৪৭-২০০৪) আধুনিক বাংলা সাহিত্যের এক কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব — কবি, ঔপন্যাসিক, ভাষাবিদ, সমালোচক ও অধ্যাপক। তাঁর সাহসী ও অকপট লেখার জন্য তিনি সমাদৃত ও বিতর্কিত উভয়ই। “মানুষের সঙ্গ ছাড়া” তাঁর সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি মানুষকে এড়িয়ে প্রকৃতি ও প্রাণীদের সঙ্গ পছন্দ করেছেন।
হুমায়ুন আজাদ: মানুষ, প্রকৃতি ও নিঃসঙ্গতার কবি
হুমায়ুন আজাদ ১৯৪৭ সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ডিগ্রি অর্জন করেন এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। তিনি অসংখ্য উপন্যাস, কাব্যগ্রন্থ, সমালোচনা ও গবেষণাগ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর লেখা ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’, ‘শুভ্র নিষ্ঠুর’, ‘কবিতাসমগ্র’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
হুমায়ুন আজাদের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো — মানুষের প্রতি বিরক্তি ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা, কাক-চড়াই-শালিখ-গন্ডার-নেকড়ে-হায়েনা-কুকুর-ডাহুক-মৌমাছির চিত্র, আত্মহত্যা না করা ও বেঁচে থাকার কারণ, মানুষের কুৎসিৎ মুখ ও আবর্জনা, হিংসা ও আগ্নেয়াস্ত্রের প্রতীক, এবং সহজ-সরল ভাষায় গভীর আবেগ ও তীক্ষ্ণ সমালোচনা। ‘মানুষের সঙ্গ ছাড়া’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি মানুষকে সঙ্গ না দিয়ে প্রকৃতি ও প্রাণীদের সঙ্গ পছন্দ করেছেন।
মানুষের সঙ্গ ছাড়া: শিরোনামের তাৎপর্য ও কবিতার পটভূমি
শিরোনাম ‘মানুষের সঙ্গ ছাড়া’ অত্যন্ত তাৎপর্পণপূর্ণ। ‘মানুষের সঙ্গ ছাড়া’ — অর্থাৎ মানুষ ছাড়া সবকিছু ভালো লাগে। মানুষের সঙ্গ এড়িয়ে চলা, প্রকৃতি ও প্রাণীদের কাছে আশ্রয় নেওয়া।
কবি শুরুতে বলছেন — মানুষের সঙ্গ ছাড়া আর সব ভাল লাগে, আমের শাখায় কালো কাক, বারান্দায় ছোট্ট চড়াই, শালিখের ঝাঁক, আফ্রিকার অদ্ভুত গন্ডার, নেকড়ে, হায়েনা, রাস্তার কোণায় মলপরিতৃপ্ত নোংরা কুকুর, বহু দূরে ডাহুকের ডাক সুখী করে, এইসব সুখ আছে বলে আজো বেঁচে আছি, এবং এখনো বাঁচতে ইচ্ছে করে, তাই হয়তো আত্মহত্যায় যাবো না কখনো।
মানুষ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে চাই না; শুধু ভাবি।
এতো কুৎসিৎ কি করে হলো এই জন্তুগুলো? প্রত্যেকের মুখে কি করে জমলো এতো আবর্জনা? কি করে সবাই এতো অস্বভাবী হয়ে উঠলো? আজ তারা প্রত্যেকেই সংঘ, প্রত্যেকের চোখে হিংসা, প্রত্যেকেই আগ্নেয়াস্ত্র; প্রত্যেকেই একেকটি তীব্র মতবাদ, গ্রীবা চেপে উপভোগ করতে চায় জীবনের মনোরম স্বাদ।
মানুষের সঙ্গ ছাড়া আর সব ভালো লাগে; অতিশয় দূরে বেঁচে আছি পথের কুকুর দেখে মুগ্ধ হই, দেখি দূরে আজো উড়ে মুখর মৌমাছি।
মানুষের সঙ্গ ছাড়া: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: মানুষের সঙ্গ ছাড়া সব ভালো, কাক-চড়াই-শালিখ-গন্ডার-নেকড়ে-হায়েনা-কুকুর-ডাহুক, বেঁচে থাকার কারণ, আত্মহত্যা না করা
“মানুষের সঙ্গ ছাড়া আর সব ভাল লাগে, আমের শাখায় / কালো কাক, বারান্দায় ছোট্ট চড়াই, শালিখের ঝাঁক / আফ্রিকার অদ্ভুত গন্ডার, নেকড়ে, হায়েনা, রাস্তার কোণায় / মলপরিতৃপ্ত নোংরা কুকুর, বহু দূরে ডাহুকের ডাক / সুখী করে, এইসব সুখ আছে ব’লে আজো বেঁচে আছি, এবং এখনো / বাঁচতে ইচ্ছে করে, তাই হয়তো আত্মহত্যায় যাবো না কখনো।”
প্রথম স্তবকে প্রকৃতি ও প্রাণীদের তালিকা। ‘কালো কাক, ছোট্ট চড়াই, শালিখের ঝাঁক, গন্ডার, নেকড়ে, হায়েনা, নোংরা কুকুর, ডাহুকের ডাক’ — সবই সুখ দেয়। এই সুখগুলোই বেঁচে থাকার কারণ। ‘আত্মহত্যায় যাবো না’ — জীবনের প্রতি টান।
দ্বিতীয় স্তবক: মানুষ সম্পর্কে মন্তব্য না করা, শুধু ভাবা
“মানুষ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে চাই না; শুধু ভাবি।”
দ্বিতীয় স্তবক খুব ছোট — মানুষ সম্পর্কে কিছু বলতে চান না, শুধু ভাবেন। এটি এক ধরনের বিরক্তি ও নির্বিকারতা।
তৃতীয় স্তবক: মানুষের কুৎসিৎ মুখ, আবর্জনা, অস্বভাবী হওয়া, সংঘ-হিংসা-অস্ত্র-মতবাদ, গ্রীবা চেপে উপভোগ
“এতো কুৎসিৎ কি ক’রে হলো এই জন্তুগুলো? প্রত্যেকের মুখে / কি করে জমলো এতো আবর্জনা? কি ক’রে সবাই এতো অস্বভাবী? / হয়ে উঠলো? আজ তারা প্রত্যেকেই সংঘ, প্রত্যেকের চোখে / হিংসা, প্রত্যেকেই আগ্নেয়াস্ত্র; প্রত্যেকেই একেকটি তীব্র মতবাদ, / গ্রীবা চেপে উপভোগ করতে চায় জীবনের মনোরম স্বাদ।”
তৃতীয় স্তবকে মানুষের ভয়াবহ রূপ। ‘কুৎসিৎ’ — ঘৃণ্য, নোংরা। ‘মুখে আবর্জনা’ — মিথ্যা, ঘৃণা, খারাপ কথা। ‘অস্বভাবী’ — স্বাভাবিক নয়, বিকৃত। ‘প্রত্যেকেই সংঘ’ — দল, গোষ্ঠী। ‘হিংসা, আগ্নেয়াস্ত্র, মতবাদ’ — মানুষের ধ্বংসাত্মক দিক। ‘গ্রীবা চেপে উপভোগ’ — অন্যকে দমিয়ে নিজের সুখ খোঁজা।
চতুর্থ স্তবক: মানুষের সঙ্গ ছাড়া সব ভালো, কুকুরে মুগ্ধ, মৌমাছি
“মানুষের সঙ্গ ছাড়া আর সব ভালো লাগে; অতিশয় দূরে বেঁচে আছি / পথের কুকুর দেখে মুগ্ধ হই, দেখি দূরে আজো উড়ে মুখর মৌমাছি।”
চতুর্থ স্তবকে চূড়ান্ত বক্তব্য। ‘অতিশয় দূরে বেঁচে আছি’ — মানুষ থেকে দূরে। ‘পথের কুকুরে মুগ্ধ’ — কুকুরকে ভালোবাসা। ‘মুখর মৌমাছি’ — প্রকৃতির শব্দ, জীবনের সুর।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি চারটি স্তবকে বিভক্ত। প্রথম স্তবক ৬ লাইন, দ্বিতীয় ১ লাইন, তৃতীয় ৫ লাইন, চতুর্থ ৩ লাইন। মুক্তছন্দ, গদ্যকাব্যের ধাঁচে লেখা। ভাষা সরল, প্রাঞ্জল, তীক্ষ্ণ ও আবেগঘন।
প্রতীক ব্যবহারে অসাধারণ। ‘কালো কাক, চড়াই, শালিখ’ — প্রকৃতির সাধারণ প্রাণী। ‘গন্ডার, নেকড়ে, হায়েনা’ — বন্য প্রাণী। ‘নোংরা কুকুর’ — পরিত্যক্ত, অবহেলিত। ‘ডাহুকের ডাক’ — দূরের শব্দ, প্রকৃতির সুর। ‘কুৎসিৎ মুখ ও আবর্জনা’ — মানুষের নোংরামি। ‘সংঘ, হিংসা, অস্ত্র, মতবাদ’ — মানুষের ধ্বংসাত্মক দিক। ‘গ্রীবা চেপে উপভোগ’ — দমিয়ে সুখ খোঁজা। ‘পথের কুকুর’ — সরল প্রাণী। ‘মৌমাছি’ — প্রকৃতির সৌন্দর্য।
পুনরাবৃত্তি কৌশল — ‘মানুষের সঙ্গ ছাড়া’ — প্রথম ও শেষ স্তবকে (২ বার)।
শেষের ‘দূরে আজো উড়ে মুখর মৌমাছি’ — একটি স্নিগ্ধ ও নির্মল সমাপ্তি।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের উচ্চতর পাঠ্যক্রমে হুমায়ুন আজাদের ‘মানুষের সঙ্গ ছাড়া’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের মানুষের প্রতি বিরক্তি, প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা, অস্তিত্ববাদী চিন্তা, এবং সহজ-সরল ভাষায় গভীর আবেগ প্রকাশের কৌশল সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে।
মানুষের সঙ্গ ছাড়া সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: ‘মানুষের সঙ্গ ছাড়া’ কবিতাটির লেখক কে?
এই কবিতাটির লেখক হুমায়ুন আজাদ (১৯৪৭-২০০৪)। তিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের এক কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব — কবি, ঔপন্যাসিক, ভাষাবিদ, সমালোচক ও অধ্যাপক।
প্রশ্ন ২: ‘মানুষের সঙ্গ ছাড়া আর সব ভাল লাগে’ — কেন?
মানুষের মধ্যে হিংসা, অস্বভাবীতা, সংঘ, অস্ত্র, মতবাদ দেখা যায়। তারা গ্রীবা চেপে সুখ উপভোগ করে। তাই মানুষ থেকে দূরে থাকতে ভালো লাগে।
প্রশ্ন ৩: ‘আমের শাখায় কালো কাক, বারান্দায় ছোট্ট চড়াই’ — কী বোঝায়?
প্রকৃতির সাধারণ প্রাণীগুলো কবিকে সুখ দেয়, কারণ তারা স্বাভাবিক, কৃত্রিম নয়।
প্রশ্ন ৪: ‘মলপরিতৃপ্ত নোংরা কুকুর’ — কেন ভালো লাগে?
কুকুর নোংরা হলেও সেটা স্বাভাবিক, মানুষ নয়। মানুষ নিজেকে ঢাকে, কিন্তু ভেতরে নোংরা।
প্রশ্ন ৫: ‘আত্মহত্যায় যাবো না’ — কেন?
প্রকৃতি ও প্রাণীদের মধ্যে সুখ আছে বলে বেঁচে থাকার ইচ্ছে হয়। তাই আত্মহত্যা করা হয় না।
প্রশ্ন ৬: ‘এতো কুৎসিৎ কি করে হলো এই জন্তুগুলো?’ — কাদের ‘জন্তু’ বলা হয়েছে?
‘জন্তু’ বলতে মানুষদের বোঝানো হয়েছে। তাদের আচরণ জন্তুর মতো কুৎসিৎ।
প্রশ্ন ৭: ‘প্রত্যেকেই সংঘ, হিংসা, আগ্নেয়াস্ত্র, মতবাদ’ — কী বোঝায়?
মানুষের মধ্যে দলাদলি, হিংসা, অস্ত্র ও কট্টর মতবাদ আছে — যা তাদের ধ্বংসাত্মক করে তুলেছে।
প্রশ্ন ৮: ‘গ্রীবা চেপে উপভোগ করতে চায় জীবনের মনোরম স্বাদ’ — কী বোঝায়?
মানুষ অন্যকে দমিয়ে, চেপে ধরে নিজের সুখ খোঁজে — নিষ্ঠুরতা ও স্বার্থপরতা।
প্রশ্ন ৯: ‘পথের কুকুর দেখে মুগ্ধ হই’ — কেন?
কুকুর সরল, নির্ভেজাল, মানুষ নয় — তাই তাদের দেখে মুগ্ধ হন।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা কী?
মানুষের মধ্যে হিংসা, স্বার্থ, অস্ত্র ও কৃত্রিমতা আছে, তাই মানুষ থেকে দূরে থাকাই ভালো। প্রকৃতি ও প্রাণীরা সরল ও নির্ভেজাল, তারা সত্যিকারের সুখ দেয়। এটি একটি তীক্ষ্ণ মানববিরোধী ও প্রকৃতিপ্রেমী কবিতা।
ট্যাগস: মানুষের সঙ্গ ছাড়া, হুমায়ুন আজাদ, হুমায়ুন আজাদের কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, প্রকৃতি প্রেম, কাক চড়াই শালিখ, গন্ডার নেকড়ে হায়েনা, কুকুর ডাহুক, আত্মহত্যা, হিংসা, আগ্নেয়াস্ত্র, মতবাদ, মৌমাছি, বাংলা কবিতা বিশ্লেষণ
© Kobitarkhata.com – কবি: হুমায়ুন আজাদ | কবিতার প্রথম লাইন: “মানুষের সঙ্গ ছাড়া আর সব ভাল লাগে, আমের শাখায় / কালো কাক, বারান্দায় ছোট্ট চড়াই, শালিখের ঝাঁক / আফ্রিকার অদ্ভুত গন্ডার, নেকড়ে, হায়েনা, রাস্তার কোণায় / মলপরিতৃপ্ত নোংরা কুকুর, বহু দূরে ডাহুকের ডাক” | মানুষ, প্রকৃতি ও নিঃসঙ্গতার অসাধারণ কাব্যভাষা | আধুনিক বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন