কবিতার প্রারম্ভেই কবি এক চরম অনুশোচনা ও নতজানু আত্মসমর্পণের সুর বেঁধে দিয়েছেন। কবি স্বীকার করেছেন যে, এক বিভ্রান্তির ঝড়ে যদি ক্ষমার অযোগ্য কোনো ভুল হয়ে থাকে, যার কারণে দেশের ভৌগোলিক সীমানাই বদলে গেছে, তবে তার জন্য যেকোনো শাস্তি বা ‘রাজদণ্ড’ তিনি মাথা পেতে নিতে প্রস্তুত। কবি নিজেকে সেই বিভ্রান্ত বালক হিসেবে দেখিয়েছেন, যে শ্রাবণের মেঘ আর বজ্রের হুংকারের মতো উদ্ধত আক্রোশের আগুনে অন্ধ হয়ে বুঝতে পারেনি যে—পিতাকে আঘাত করা মানে আসলে নিজের অস্তিত্বের মূলেই কুঠারাঘাত করা। এই আত্মঘাতী বিনাশের পুরস্কার হিসেবে কবি আফ্রিকার দুর্গম গহন অরণ্যে নির্বাসন মেনে নিতেও দ্বিধাবোধ করেননি।
কবিতার মধ্যভাগে চেনা ইতিহাস ও পুরাণের রূপকে ১৫ই আগস্টের সেই কালরাত্রির মর্মন্তুদ ও নারকীয় চিত্র ফুটে উঠেছে। কবি অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে বলেছেন—যদি আগে জানা থাকত যে নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারের মতো নিজেরই পিতৃভূমিতে জন্মদাতার রক্তে রঞ্জিত হবে স্বাধীন মানচিত্র; যদি জানা থাকত মধ্যরাতে পিতারই চেনা ছায়ারা (চেনা মানুষেরা) এসে তাঁকে নির্মমভাবে বধ করবে এবং তাঁর নিথর দেহ রক্তাপ্লুত অবস্থায় পড়ে থাকবে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের সেই উপবাসী সিঁড়ির ওপরে—তবে সন্তান নিজের চোখেই অভ্রভেদী শিমুলের কাঁটা বিঁধিয়ে দিত, তবু এই উদ্ভ্রান্ত আত্মাকে ঘাতক হতে দিত না। সিঁড়ি বেয়ে নেমে যাওয়া সেই ‘সাত কোটি রক্তের ধারা’র অপরাধবোধ কবিকে প্রতিনিয়ত দহন করে। অথচ যে পিতার হৃদয় ছিল পাহাড়ের অন্তরালে বয়ে যাওয়া ঝর্ণার মতো শান্ত, বাউলের একতারা কিংবা ক্লান্ত ভাটিয়ালির মতো স্নিগ্ধ—বাংলার মানুষ সেই পিতৃত্বের চরম দায়কে রক্তমূল্যে শোধ করিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে টুঙ্গিপাড়ার মধুমতী নদীর তীরে, বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে একলা ঘুমিয়ে পড়তে হয়েছে।
পরবর্তী অংশে পিতার মৃত্যুহীন উপস্থিতি এবং ঘাতকদের প্রতি তীব্র ঘৃণা ও ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে। পিতা আজ সশরীরে নেই ঠিকই, কিন্তু ভোরের পুব আকাশে রক্তিম সূর্য আর সবুজের বুকে যে লাল-সবুজের আশ্চর্য আভা, তার মাঝেই পিতা প্রতিদিন জেগে ওঠেন। বাঙালির প্রতি মুহূর্তের নিশ্বাসের বাতাসে তিনি মিশে আছেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, একদল শিকারি বা ঘাতক আজও পিতার সেই মহান ছায়ার ওপরে অন্ধকারের প্রলেপ লাগাতে চায়। একদিন পিতা যাদের হৃদয়ের উষ্ণ আলিঙ্গনে বেঁধেছিলেন, তারাই আজ লাল-সবুজের পতাকার ওপরে পনেরোই আগস্টের কালো অন্ধকার লেপ্টে দিতে চায়। এই চরম কলঙ্ককে কবি কিছুতেই মেনে নিতে পারেন না।
শেষাংশে এসে কবিতাটি এক রাজকীয় প্রতিজ্ঞা এবং ঘাতকদের বিরুদ্ধে এক চরম ধিক্কারে রূপ নেয়। মানুষ হিসেবে ভুলের দাসত্ব মেনে নিয়ে কবি পিতার কাছে অধম সন্তান হিসেবে ক্ষমা ভিক্ষা করেছেন। কিন্তু কবি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন—যারা পিতার রক্তের দামে কেনা এই স্বদেশের মানচিত্রকে বদলে দিতে চায়, লাল-সবুজের গায়ে কলঙ্কতিলক আঁকতে চায়, তাদের জন্য কবির মনে কোনো ক্ষমা নেই। সেইসব দেশদ্রোহী ও ঘাতকদের বিচার দিনে কবি নিজের জন্য ফাঁসির কাষ্ঠ বা যেকোনো কঠিনতম রাজদণ্ড মাথা পেতে নিতে রাজি আছেন; কিন্তু নিজের বুকের ওপর চেপে থাকা আগস্টের সেই সম্মিলিত ঘাতকদের কালো অন্ধকারকে তিনি কিছুতেই মেনে নেবেন না। পিতার আদর্শ ও ভালোবাসাকে বুকের ভেতর বাঁচিয়ে রাখার এক তীব্র জেদ আর অবাধ্য দ্রোহের মাঝেই কবিতাটি পূর্ণতা লাভ করে।
যদি রাজদণ্ড দাও – অসীম সাহা | অসীম সাহার কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা | পিতা, রাজদণ্ড, নির্বাসন ও অস্তিত্বের অসাধারণ কাব্যভাষা
যদি রাজদণ্ড দাও: অসীম সাহার পিতার কাছে নতজানু, অস্তিত্বের ভুল, আত্মঘাতী বিনাশ ও আগস্টের আঁধারের অসাধারণ কাব্যভাষা
অসীম সাহার “যদি রাজদণ্ড দাও” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য, গভীর ও আত্মসমালোচক সৃষ্টি। “যদি রাজদণ্ড দাও-আমি মাথা পেতে নেবো। / ক্ষমার অযোগ্য যদি কোনো ভুল হয়ে থাকে, / আর সেই ভুলের জন্যে যদি বদলে যায় ভৌগোলিক সীমা, / যদি আত্মত্মজের নিক্ষিপ্ত তির শূন্যতায় উড়ে গিয়ে শক্তিশেল হয়ে বেঁধে তোমার শরীরে- / তুমি তবে কোন্ দণ্ড দেবে? / যদি রাজদণ্ড দাও-আমি মাথা পেতে নেবো।” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে রাজদণ্ড মাথা পেতে নেওয়া, ভৌগোলিক সীমা বদলে যাওয়া, আত্মজের তির শক্তিশেল হয়ে পিতার শরীরে বেঁধে যাওয়া, পিতার স্বপ্নের ভেতর অখণ্ড নীলাকাশ খুঁজে পাওয়া, শ্রাবণের কালো মেঘ ও বজ্রের হুংকারে পৃথিবী ভস্মীভূত হওয়া, বিভ্রান্ত বালকের নিজের অস্তিত্বের মূলে আঘাত করা, শাস্তি-রাজদণ্ড-নির্বাসন আফ্রিকার দুর্গম গহন অরণ্যে মেনে নেওয়া, পিতৃভূমিতে রক্ত-ক্লেদ জমা, নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে পিতার বুকের রক্তে মানচিত্র রঞ্জিত, মধ্যরাতে পিতার ছায়ারা পিতাকে বধ করা, পিতার নিথর দেহ রক্তপ্লুত উপবাসী সিঁড়ির ওপরে, সাত কোটি রক্তের ধারা, নিজের উদ্ভ্রান্ত আত্মা আঁকড়ে ধরা ও চোখে শিমুলের কাঁটা বিঁধিয়ে দেওয়া, নতজানু সন্তানকে ক্ষমাহীন দুই হাতে ফেরানো, পিতার হৃদয় শান্ত স্নিগ্ধ নদী ও বাউলের একতারা, সেই জল বঙ্গোপসাগরে উগড়ে দেওয়া, মধুমতি নদীর তীরে আর্তনাদ, পিতৃত্বের দায় রক্তমূল্যে শোধ, পরাধীন মানুষের মুক্তিমন্ত্র হওয়া, পিতার ছায়া ও রক্তিম সূর্যের আভায় পিতাকে দেখা, পিতার মৃত্যুহীন উপস্থিতি, শিকারিদের পনেরোর কালো অন্ধকার, ভুলের দাস দেহ, ক্ষমা প্রার্থনা, লাল-সবুজের মানচিত্রে কলঙ্কতিলক, নির্বাসন ও ফাঁসিকাষ্ঠ মেনে নেওয়া, কিন্তু আগস্টের সম্মিলিত ঘাতক আঁধার না মানা — এই সব মিলিয়ে এক পিতা-পুত্রের সম্পর্ক, অস্তিত্বের সংকট, স্বদেশপ্রেম, আত্মদণ্ড ও বিদ্রোহের অসাধারণ কাব্যচিত্র। অসীম সাহা একজন বিশিষ্ট বাঙালি কবি। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, পিতা-পুত্রের সম্পর্ক, রাজনৈতিক চেতনা ও অস্তিত্বের প্রশ্ন নিয়ে লিখেছেন। “যদি রাজদণ্ড দাও” তাঁর সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি পিতাকে (বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বা আদর্শ) সম্বোধন করে রাজদণ্ড, নির্বাসন ও মৃত্যু মেনে নিয়েও একটি আঁধারকে মানতে অস্বীকার করেছেন।
অসীম সাহা: পিতা, স্বদেশ ও অস্তিত্বের কবি
অসীম সাহা একজন বিশিষ্ট বাঙালি কবি। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, পিতা-পুত্রের সম্পর্ক, রাজনৈতিক চেতনা, অস্তিত্বের সংকট ও আত্মসমালোচনার জন্য পরিচিত। তাঁর কবিতায় সহজ-সরল ভাষায় গভীর দার্শনিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন ফুটে ওঠে।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘যদি রাজদণ্ড দাও’, ‘নির্বাচিত কবিতা’ প্রভৃতি।
অসীম সাহার কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো — পিতা সম্বোধন, রাজদণ্ড ও নির্বাসনের প্রতীক, নতজানু হওয়া ও মাথা পেতে নেওয়া, পিতৃভূমিতে রক্ত-ক্লেদের চিত্র, নিজের অস্তিত্বের মূলে আঘাত করা, পিতার হৃদয়কে নদী-একতারা-ভাটিয়ালির সঙ্গে তুলনা, বঙ্গোপসাগরে উগড়ে দেওয়া ও মধুমতি নদীর তীরে আর্তনাদ, পনেরোর কালো অন্ধকার ও আগস্টের সম্মিলিত ঘাতক আঁধার — এই প্রতীকগুলির মাধ্যমে ইতিহাস ও রাজনীতি স্পর্শ করা, এবং শেষ পর্যন্ত একটি আঁধারকে মানতে অস্বীকার করা। ‘যদি রাজদণ্ড দাও’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি পিতার কাছে সব শাস্তি মেনে নিয়েও একটি নির্দিষ্ট আঁধারকে (১৯৭৫-এর আগস্ট বা অন্য কোনো অন্ধকার সময়) অস্বীকার করেছেন।
যদি রাজদণ্ড দাও: শিরোনামের তাৎপর্য ও কবিতার পটভূমি
শিরোনাম ‘যদি রাজদণ্ড দাও’ অত্যন্ত তাৎপর্পূর্ণ। ‘রাজদণ্ড’ — রাজার শাস্তি, মৃত্যুদণ্ড, নির্বাসন, ক্ষমতার শাস্তি। কবি বলছেন — যদি রাজদণ্ড দাও, আমি মাথা পেতে নেবো। কিন্তু এরপর তিনি প্রশ্ন করেন — ক্ষমার অযোগ্য ভুল হলে কোন দণ্ড দেবে? তিনি রাজদণ্ড, নির্বাসন, এমনকি ফাঁসিকাষ্ঠ মেনে নিতে পারেন, কিন্তু ‘আগস্টের সম্মিলিত ঘাতক আঁধার’ মেনে নিতে পারবেন না। এটি একটি সাহসী ও বিদ্রোহী অবস্থান।
কবি শুরুতে বলছেন — যদি রাজদণ্ড দাও-আমি মাথা পেতে নেবো। ক্ষমার অযোগ্য যদি কোনো ভুল হয়ে থাকে, আর সেই ভুলের জন্যে যদি বদলে যায় ভৌগোলিক সীমা, যদি আত্মত্মজের নিক্ষিপ্ত তির শূন্যতায় উড়ে গিয়ে শক্তিশেল হয়ে বেঁধে তোমার শরীরে- তুমি তবে কোন্ দণ্ড দেবে? যদি রাজদণ্ড দাও-আমি মাথা পেতে নেবো।
পিতা, একদিন তুমি ছিলে স্বপ্নের ভেতরে, তোমার স্বপ্নের মধ্যে আমি খুঁজে পেয়েছিলাম আমার অখণ্ড নীলাকাশ; কিন্তু তুমি তো জানো পিতা, স্বচ্ছ সুন্দর সেই নীলাকাশকে ঢেকে দেয় যে শ্রাবণের ঘন কালো মেঘ আর তার পেছনে লুকিয়ে থাকে যে বজ্রের হুংকার উদ্ধত আক্রোশে গর্জে উঠে পৃথিবীকে ভস্মীভূত করে, আমি সেই গর্জনের অগ্নি থেকে জেগে ওঠা বিভ্রান্ত বালক কিছুতেই বুঝতে পারিনি আমি তোমাকে আঘাত করে আমারই অস্তিত্বের মূলে আঘাত করেছি।
তার জন্যে আমাকে এখন যে শাস্তি দেবে দাও- আমি মাথা পেতে নেবো। যদি রাজদণ্ড দাও-যদি নির্বাসন দিয়ে দাও আফ্রিকার দুর্গম গহন অরণ্যে আমি মেনে নেবো, এ-আমার আত্মঘাতী বিনাশের যোগ্য পুরস্কার। পিতা, যদি জানতাম, আমারই ভুলের জন্যে এতো রক্ত, এতো ক্লেদ জমা হবে পিতৃভূমিতে, যদি জানতাম, নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে তোমারই বুকের রক্তে রঞ্জিত হয়ে যাবে মানচিত্র আমার, যদি জানতাম, মধ্যরাতে তোমারই ছায়ারা এসে তোমাকেই বধ করবে নির্মম দু’হাতে; যদি জানতাম, তোমার নিথর দেহ রক্তাপ্লুত পড়ে থাকবে উপবাসী সিঁড়ির ওপরে; যদি জানতাম, তোমার বক্ষ থেকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে যাবে সাত কোটি রক্তের ধারা- তা হলে এই হাতের প্রতিটি আঙুল দিয়ে আমি শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রাখতাম আমার উদ্ভ্রান্ত আত্মাকে, আমি আমার চোখে বিঁধিয়ে দিতাম অভ্রভেদী শিমুলের কাঁটা। আমার বক্ষবিদীর্ণ আর্তচিৎকারে যদি তোমার ঘুম ভাঙতো তুমি দেখতে পেতে, করজোড়ে তোমারই পায়ের কাছে পড়ে আছে নতজানু তোমার সন্তান। তুমি কী করে তাকে ক্ষমাহীন দুই হাতে ফেরাতে তখনি?
আমি জানি, পাহাড়ের অন্তরালে বয়ে যাওয়া স্বচ্ছতর ঝর্নাধারার মতো তোমার হৃদয় ছিলো শান্ত স্নিগ্ধ নদী, তোমার হৃদয় ছিলো বাউলের একতারা, ক্লান্ত ভাটিয়ালি।
পিতা, তুমি কি জানতে, তোমার হৃদয় থেকে উৎসারিত এই জল একদিন সবকিছু ভুলে গিয়ে তোমাকেই উগড়ে দেবে বঙ্গোপসাগরে? তুমিহীন এই মাটি আর্তনাদ করে উঠবে মধুমতি নদীটির তীরে? যদি জানতে, যদি তুমি জানতে পিতৃত্বের এই দায় তোমাকেই একদিন রক্তমূল্যে শোধ দিতে হবে; তখনো কি তুমি এই স্বদেশের মাটি ফুঁড়ে জেগে উঠে পরাধীন মানুষের মুক্তিমন্ত্র হতে?
পিতা, এইখানে তুমি আজ নেই-তোমার ছায়ারা পড়ে আছে। খুব ভোরে আকাশ বিদীর্ণ করে যে রক্তিম সূর্য ওঠে পুবের আকাশে সবুজ প্রকৃতির মধ্যে তার গাঢ় রং মিশে গিয়ে যে আশ্চর্য আভা ছড়িয়ে যায় দিগন্তে-দিগন্তে, তার মধ্যে তোমাকে আমি দেখতে পাই। আমার প্রতিমুহূর্তের নিশ্বাসের মধ্যে তুমি চিরকালের বাতাস হয়ে ঢুকে যাও।
আমার সবটুকু অস্তিত্বের মধ্যে তোমার মৃত্যুহীন উপস্থিতি আমাকেই তুমি করে তোলে: তার মানে তুমি ছাড়া আমার কোনো অস্তিত্বই নেই। তবু তোমার উপস্থিতিহীন অস্তিত্বের ভয়ে শঙ্কিত একদল শিকারি তোমার ছায়ার ওপরে অন্ধকারের প্রলেপ লাগিয়ে দিতে চায়; একদিন তুমি যাদেরকে হৃদয়ের উষ্ণ আলিঙ্গনে বেঁধে নিয়েছিলে, তারাই তোমার অস্তিত্বের অহংকারের ওপরে লেপ্টে দিতে চায় পনেরোর কালো অন্ধকার তুমিহীন তোমার অস্তিত্ব এসে ভর করে বঙ্গভূমিতে!
মানুষই তো ভুল করে পিতা আমার এই দেহখানি সে-ভুলেরই দাস। যদি পারো ক্ষমা কোরো অধম সন্তানে।
আর যারা তোমারই রক্তের দামে কেনা এই স্বদেশের মাটিকেই বদলে দিতে চায়, লাল ও সবুজের মানচিত্রে আঁকতে চায় কলঙ্কতিলক, তোমার ক্ষমার হাত একদিন যদি ঐ জলে-স্থলে অন্তরিক্ষে ছুটে চলে যায় সেইদিন আমাকেও নির্বাসন দিও- এ-পৃথিবী পার করে ফেলে দিও অন্য কোনো গহন অরণ্যে। যদি রাজদণ্ড দাও-যদি ফাঁসিকাষ্ঠে স্তব্ধ হয় এ-দেহ আমার সব আমি মাথা পেতে নেবো; শুধু আমি কিছুতেই মানবো না আমার বুকের ‘পরে চেপে থাকা আগস্টের সম্মিলিত ঘাতক আঁধার।
যদি রাজদণ্ড দাও: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: রাজদণ্ড মাথা পেতে নেওয়া, ভৌগোলিক সীমা বদলে যাওয়া, আত্মজের তির শক্তিশেল হয়ে পিতার শরীরে বেঁধে যাওয়া
“যদি রাজদণ্ড দাও-আমি মাথা পেতে নেবো। / ক্ষমার অযোগ্য যদি কোনো ভুল হয়ে থাকে, / আর সেই ভুলের জন্যে যদি বদলে যায় ভৌগোলিক সীমা, / যদি আত্মত্মজের নিক্ষিপ্ত তির শূন্যতায় উড়ে গিয়ে শক্তিশেল হয়ে বেঁধে তোমার শরীরে- / তুমি তবে কোন্ দণ্ড দেবে? / যদি রাজদণ্ড দাও-আমি মাথা পেতে নেবো।”
প্রথম স্তবকে রাজদণ্ড গ্রহণের প্রতিজ্ঞা ও প্রশ্ন। ‘রাজদণ্ড’ — মৃত্যুদণ্ড বা রাজার শাস্তি। ‘ভৌগোলিক সীমা বদলে যাওয়া’ — যুদ্ধ বা বিপ্লবের ফলে দেশের সীমানা পরিবর্তন। ‘আত্মজের নিক্ষিপ্ত তির’ — নিজের সন্তানের ছোঁড়া বাণ। ‘শক্তিশেল হয়ে বেঁধে তোমার শরীরে’ — সেই বাণ পিতার শরীরে বেঁধে যাওয়া। প্রশ্ন — কী দণ্ড দেবে?
দ্বিতীয় স্তবক: পিতার স্বপ্নে অখণ্ড নীলাকাশ, শ্রাবণের কালো মেঘ ও বজ্রের হুংকার, পৃথিবী ভস্মীভূত, বিভ্রান্ত বালকের আত্মঘাতী আঘাত
“পিতা, একদিন তুমি ছিলে স্বপ্নের ভেতরে, / তোমার স্বপ্নের মধ্যে আমি খুঁজে পেয়েছিলাম / আমার অখণ্ড নীলাকাশ; / কিন্তু তুমি তো জানো পিতা, স্বচ্ছ সুন্দর সেই নীলাকাশকে ঢেকে দেয় / যে শ্রাবণের ঘন কালো মেঘ / আর তার পেছনে লুকিয়ে থাকে যে বজ্রের হুংকার / উদ্ধত আক্রোশে গর্জে উঠে পৃথিবীকে ভস্মীভূত করে, / আমি সেই গর্জনের অগ্নি থেকে জেগে ওঠা বিভ্রান্ত বালক কিছুতেই বুঝতে পারিনি / আমি তোমাকে আঘাত করে / আমারই অস্তিত্বের মূলে আঘাত করেছি।”
দ্বিতীয় স্তবকে পিতা-পুত্রের দ্বন্দ্ব ও আত্মোপলব্ধি। পিতার স্বপ্নে নীলাকাশ পাওয়া, কিন্তু শ্রাবণের কালো মেঘ ও বজ্রের হুংকার পৃথিবী ভস্মীভূত করে। বিভ্রান্ত বালক বুঝতে পারেনি — পিতাকে আঘাত করে নিজের অস্তিত্বের মূলে আঘাত করেছে।
তৃতীয় স্তবক: শাস্তি-রাজদণ্ড-নির্বাসন আফ্রিকার অরণ্যে মেনে নেওয়া, আত্মঘাতী বিনাশের পুরস্কার, পিতৃভূমিতে রক্ত-ক্লেদ জমা, নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে পিতার রক্তে মানচিত্র রঞ্জিত, পিতার ছায়াদের বধ, নিথর দেহ ও উপবাসী সিঁড়ি, সাত কোটি রক্তের ধারা, উদ্ভ্রান্ত আত্মা আঁকড়ে ধরা ও চোখে শিমুলের কাঁটা
“তার জন্যে আমাকে এখন যে শাস্তি দেবে দাও- / আমি মাথা পেতে নেবো। / যদি রাজদণ্ড দাও-যদি নির্বাসন দিয়ে দাও / আফ্রিকার দুর্গম গহন অরণ্যে / আমি মেনে নেবো, এ-আমার আত্মঘাতী বিনাশের যোগ্য পুরস্কার। / পিতা, যদি জানতাম, আমারই ভুলের জন্যে / এতো রক্ত, এতো ক্লেদ জমা হবে পিতৃভূমিতে, / যদি জানতাম, নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে তোমারই বুকের রক্তে রঞ্জিত হয়ে যাবে মানচিত্র আমার, / যদি জানতাম, মধ্যরাতে তোমারই ছায়ারা / এসে তোমাকেই বধ করবে নির্মম দু’হাতে; / যদি জানতাম, তোমার নিথর দেহ রক্তাপ্লুত পড়ে থাকবে / উপবাসী সিঁড়ির ওপরে; / যদি জানতাম, তোমার বক্ষ থেকে সিঁড়ি বেয়ে / নেমে যাবে সাত কোটি রক্তের ধারা- / তা হলে এই হাতের প্রতিটি আঙুল দিয়ে / আমি শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রাখতাম আমার উদ্ভ্রান্ত আত্মাকে, / আমি আমার চোখে বিঁধিয়ে দিতাম / অভ্রভেদী শিমুলের কাঁটা।”
তৃতীয় স্তবকে ইতিহাসের করুণ চিত্র ও আত্মদণ্ড। রাজদণ্ড-নির্বাসন মেনে নেওয়া। পিতৃভূমিতে রক্ত-ক্লেদ, নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে পিতার রক্তে মানচিত্র রঞ্জিত, পিতার ছায়াদের বধ, নিথর দেহ উপবাসী সিঁড়িতে, সাত কোটি রক্তের ধারা। উদ্ভ্রান্ত আত্মা আঁকড়ে ধরা ও চোখে শিমুলের কাঁটা বিঁধিয়ে দেওয়া — আত্মদণ্ডের চিত্র।
চতুর্থ স্তবক: করজোড়ে নতজানু সন্তান, ক্ষমাহীন দুই হাতে ফেরানো
“আমার বক্ষবিদীর্ণ আর্তচিৎকারে যদি তোমার ঘুম ভাঙতো তুমি দেখতে পেতে, / করজোড়ে তোমারই পায়ের কাছে / পড়ে আছে নতজানু তোমার সন্তান। / তুমি কী করে তাকে ক্ষমাহীন দুই হাতে ফেরাতে তখনি?”
চতুর্থ স্তবকে নতজানু সন্তানের চিত্র। বক্ষবিদীর্ণ আর্তচিৎকারে পিতার ঘুম ভাঙলে তিনি দেখতেন — নতজানু সন্তান। প্রশ্ন — কী করে তাকে ক্ষমাহীন দুই হাতে ফেরাতে পারবেন?
পঞ্চম স্তবক: পিতার হৃদয় শান্ত স্নিগ্ধ নদী, বাউলের একতারা, ক্লান্ত ভাটিয়ালি
“আমি জানি, পাহাড়ের অন্তরালে বয়ে যাওয়া / স্বচ্ছতর ঝর্নাধারার মতো / তোমার হৃদয় ছিলো শান্ত স্নিগ্ধ নদী, / তোমার হৃদয় ছিলো বাউলের একতারা, ক্লান্ত ভাটিয়ালি।”
পঞ্চম স্তবকে পিতার হৃদয়ের প্রশংসা। ঝর্নাধারা, শান্ত স্নিগ্ধ নদী, বাউলের একতারা, ভাটিয়ালি — সবই কোমল, সুরেলা, শান্ত।
ষষ্ঠ স্তবক: পিতার হৃদয়ের জল বঙ্গোপসাগরে উগড়ে দেওয়া, মধুমতি নদীর তীরে আর্তনাদ, পিতৃত্বের দায় রক্তমূল্যে শোধ, পরাধীন মানুষের মুক্তিমন্ত্র
“পিতা, তুমি কি জানতে, তোমার হৃদয় থেকে উৎসারিত / এই জল একদিন সবকিছু ভুলে গিয়ে / তোমাকেই উগড়ে দেবে বঙ্গোপসাগরে? / তুমিহীন এই মাটি আর্তনাদ করে উঠবে / মধুমতি নদীটির তীরে? / যদি জানতে, যদি তুমি জানতে / পিতৃত্বের এই দায় তোমাকেই একদিন রক্তমূল্যে শোধ দিতে হবে; / তখনো কি তুমি এই স্বদেশের মাটি ফুঁড়ে জেগে উঠে / পরাধীন মানুষের মুক্তিমন্ত্র হতে?”
ষষ্ঠ স্তবকে পিতার উত্তরাধিকার ও ত্যাগের প্রশ্ন। পিতার হৃদয়ের জল বঙ্গোপসাগরে উগড়ে দেওয়া, মধুমতি নদীর তীরে আর্তনাদ, পিতৃত্বের দায় রক্তমূল্যে শোধ। তখনো কি তিনি পরাধীন মানুষের মুক্তিমন্ত্র হতে পারবেন?
সপ্তম স্তবক: পিতার ছায়া, রক্তিম সূর্যের আভায় পিতাকে দেখা, চিরকালের বাতাস
“পিতা, এইখানে তুমি আজ নেই-তোমার ছায়ারা পড়ে আছে। / খুব ভোরে আকাশ বিদীর্ণ করে যে রক্তিম সূর্য ওঠে পুবের আকাশে / সবুজ প্রকৃতির মধ্যে তার গাঢ় রং মিশে গিয়ে / যে আশ্চর্য আভা ছড়িয়ে যায় দিগন্তে-দিগন্তে, / তার মধ্যে তোমাকে আমি দেখতে পাই। / আমার প্রতিমুহূর্তের নিশ্বাসের মধ্যে / তুমি চিরকালের বাতাস হয়ে ঢুকে যাও।”
সপ্তম স্তবকে পিতার আত্মার উপস্থিতি। পিতা নেই, কিন্তু তাঁর ছায়া আছে। রক্তিম সূর্যের আভায় পিতাকে দেখা, নিশ্বাসের মধ্যে বাতাস হয়ে ঢুকে যাওয়া — পিতার চিরকালীন উপস্থিতি।
অষ্টম স্তবক: পিতার মৃত্যুহীন উপস্থিতি, শিকারিদের পনেরোর কালো অন্ধকার, বঙ্গভূমিতে অস্তিত্ব ভর করা
“আমার সবটুকু অস্তিত্বের মধ্যে তোমার মৃত্যুহীন উপস্থিতি আমাকেই তুমি করে তোলে: / তার মানে তুমি ছাড়া আমার কোনো অস্তিত্বই নেই। / তবু তোমার উপস্থিতিহীন অস্তিত্বের ভয়ে শঙ্কিত / একদল শিকারি তোমার ছায়ার ওপরে অন্ধকারের প্রলেপ লাগিয়ে দিতে চায়; / একদিন তুমি যাদেরকে হৃদয়ের উষ্ণ আলিঙ্গনে বেঁধে নিয়েছিলে, / তারাই তোমার অস্তিত্বের অহংকারের ওপরে / লেপ্টে দিতে চায় পনেরোর কালো অন্ধকার / তুমিহীন তোমার অস্তিত্ব এসে ভর করে বঙ্গভূমিতে!”
অষ্টম স্তবকে শত্রুদের চিহ্নিতকরণ। পিতার মৃত্যুহীন উপস্থিতি তাঁর অস্তিত্ব। কিন্তু একদল শিকারি পিতার ছায়ায় অন্ধকার প্রলেপ দিতে চায়। যাদের পিতা হৃদয়ে বেঁধেছিলেন, তারাই পনেরোর কালো অন্ধকার লেপ্টে দিতে চায়। ‘পনেরোর কালো অন্ধকার’ — ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ঘাতক আঁধার? অথবা অন্য কোনো ঐতিহাসিক অন্ধকার মুহূর্ত।
নবম স্তবক: ভুলের দাস দেহ, ক্ষমা প্রার্থনা
“মানুষই তো ভুল করে পিতা / আমার এই দেহখানি সে-ভুলেরই দাস। / যদি পারো ক্ষমা কোরো অধম সন্তানে।”
নবম স্তবকে ক্ষমা প্রার্থনা। মানুষ ভুল করে, দেহ ভুলের দাস। ‘অধম সন্তান’ বলে নিজেকে নিচু করে ক্ষমা চাওয়া।
দশম স্তবক: লাল-সবুজের মানচিত্রে কলঙ্কতিলক, নির্বাসন চাওয়া, ফাঁসিকাষ্ঠ মেনে নেওয়া, কিন্তু আগস্টের সম্মিলিত ঘাতক আঁধার না মানা
“আর যারা তোমারই রক্তের দামে কেনা এই স্বদেশের / মাটিকেই বদলে দিতে চায়, / লাল ও সবুজের মানচিত্রে আঁকতে চায় কলঙ্কতিলক, / তোমার ক্ষমার হাত একদিন যদি ঐ জলে-স্থলে অন্তরিক্ষে ছুটে চলে যায় / সেইদিন আমাকেও নির্বাসন দিও- / এ-পৃথিবী পার করে ফেলে দিও অন্য কোনো গহন অরণ্যে। / যদি রাজদণ্ড দাও-যদি ফাঁসিকাষ্ঠে স্তব্ধ হয় এ-দেহ আমার সব আমি মাথা পেতে নেবো; / শুধু আমি কিছুতেই মানবো না / আমার বুকের ‘পরে চেপে থাকা আগস্টের সম্মিলিত ঘাতক আঁধার।”
দশম স্তবকে চূড়ান্ত অবস্থান ও বিদ্রোহ। যারা স্বদেশের মাটি বদলে দিতে চায় ও লাল-সবুজের মানচিত্রে কলঙ্ক আঁকতে চায় — তাদের বিরুদ্ধে। নির্বাসন ও ফাঁসিকাষ্ঠ মেনে নেওয়া। কিন্তু ‘আগস্টের সম্মিলিত ঘাতক আঁধার’ — অর্থাৎ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই অন্ধকার ঘাতক দিন — তা তিনি মানবেন না। এটি একটি সাহসী ও ঐতিহাসিক অবস্থান।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি দশটি স্তবকে বিভক্ত। মুক্তছন্দ, গদ্যকাব্যের ধাঁচে লেখা। ভাষা সরল, প্রাঞ্জল, আবেগঘন, রাজনৈতিক ও দার্শনিক।
প্রতীক ব্যবহারে অসাধারণ। ‘রাজদণ্ড’ — শাস্তি, মৃত্যুদণ্ড, রাজার দণ্ড। ‘ভৌগোলিক সীমা’ — দেশের সীমানা, রাজনৈতিক পরিবর্তন। ‘আত্মজের তির’ — সন্তানের আঘাত। ‘শ্রাবণের কালো মেঘ ও বজ্রের হুংকার’ — বিপর্যয়, যুদ্ধ, ধ্বংস। ‘নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগার’ — ষড়যন্ত্রের স্থান। ‘উপবাসী সিঁড়ি’ — শোকাবহ স্মৃতি (ঢাকার সিঁড়ি? ১৯৭৫-এর ঘটনা)। ‘সাত কোটি রক্তের ধারা’ — গণহত্যা। ‘শিমুলের কাঁটা’ — আত্মদণ্ড, তপস্যা। ‘বাউলের একতারা, ভাটিয়ালি’ — বাংলার সংস্কৃতি। ‘বঙ্গোপসাগর, মধুমতি নদী’ — ভৌগোলিক স্থান। ‘পনেরোর কালো অন্ধকার’ — ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ঘাতক অন্ধকার। ‘লাল ও সবুজের মানচিত্রে কলঙ্কতিলক’ — বাংলাদেশের পতাকায় কলঙ্ক আঁকার চেষ্টা। ‘আগস্টের সম্মিলিত ঘাতক আঁধার’ — ১৯৭৫-এর আগস্টের ঘটনা।
পুনরাবৃত্তি কৌশল — ‘যদি রাজদণ্ড দাও-আমি মাথা পেতে নেবো’ — প্রথম স্তবকে দুইবার, তৃতীয় স্তবকে, দশম স্তবকে। ‘যদি জানতাম’ — তৃতীয় স্তবকে ৫ বার। ‘পিতা’ — সম্বোধন ৮ বার।
শেষের ‘আগস্টের সম্মিলিত ঘাতক আঁধার’ — একটি ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়। কবি সেই অন্ধকার আঁধারকে মানতে অস্বীকার করেছেন।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“যদি রাজদণ্ড দাও” অসীম সাহার এক অসাধারণ সৃষ্টি। তিনি এখানে পিতাকে (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বা আদর্শ পিতা) সম্বোধন করে রাজদণ্ড, নির্বাসন, আফ্রিকার অরণ্য, পিতৃভূমিতে রক্ত-ক্লেদ, নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগার, পিতার রক্তে মানচিত্র রঞ্জিত, পিতার ছায়াদের বধ, উপবাসী সিঁড়ি, সাত কোটি রক্তের ধারা, উদ্ভ্রান্ত আত্মা ও শিমুলের কাঁটা, নতজানু সন্তান, পিতার হৃদয় নদী-একতারা-ভাটিয়ালি, বঙ্গোপসাগর-মধুমতি, পনেরোর কালো অন্ধকার, লাল-সবুজের মানচিত্রে কলঙ্কতিলক, এবং শেষ পর্যন্ত রাজদণ্ড-ফাঁসিকাষ্ঠ মেনে নিয়েও আগস্টের সম্মিলিত ঘাতক আঁধারকে অস্বীকার — এই সব মিলিয়ে এক পিতা-পুত্র সম্পর্ক, স্বদেশপ্রেম, ইতিহাস, আত্মদণ্ড ও বিদ্রোহের চিত্র এঁকেছেন।
এই কবিতা আমাদের শেখায় — পিতার কাছে সব শাস্তি মেনে নেওয়া যায়, এমনকি রাজদণ্ড, নির্বাসন, ফাঁসিকাষ্ঠও মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট অন্ধকার (আগস্টের ঘাতক আঁধার) মেনে নেওয়া যায় না। সেই অন্ধকারকে অস্বীকার করাই এই কবিতার মূল বিদ্রোহ ও চূড়ান্ত বক্তব্য।
অসীম সাহার কবিতায় পিতা, রাজদণ্ড ও আগস্টের আঁধার
অসীম সাহার কবিতায় পিতা ও ইতিহাস একটি পুনরাবৃত্ত বিষয়। তিনি ‘যদি রাজদণ্ড দাও’ কবিতায় পিতাকে (বঙ্গবন্ধু) সম্বোধন করে তাঁর কাছে রাজদণ্ড, নির্বাসন, মৃত্যুদণ্ড মেনে নিয়েও ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ঘাতক অন্ধকারকে অস্বীকার করেছেন। এটি একটি সাহসী ও ঐতিহাসিক অবস্থান।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের উচ্চতর পাঠ্যক্রমে অসীম সাহার ‘যদি রাজদণ্ড দাও’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের পিতা-পুত্র সম্পর্ক, ইতিহাস, রাজনৈতিক চেতনা, আত্মদণ্ড ও বিদ্রোহের ভাষা সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে।
যদি রাজদণ্ড দাও সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: ‘যদি রাজদণ্ড দাও’ কবিতাটির লেখক কে?
এই কবিতাটির লেখক অসীম সাহা। তিনি একজন বিশিষ্ট বাঙালি কবি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, পিতা-পুত্রের সম্পর্ক ও রাজনৈতিক চেতনার কবিতা লেখেন।
প্রশ্ন ২: ‘রাজদণ্ড’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘রাজদণ্ড’ — রাজার শাস্তি, মৃত্যুদণ্ড, ক্ষমতার শাস্তি। কবি রাজদণ্ড মাথা পেতে নেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছেন।
প্রশ্ন ৩: ‘আত্মজের নিক্ষিপ্ত তির শক্তিশেল হয়ে বেঁধে তোমার শরীরে’ — কী বোঝায়?
সন্তানের ছোঁড়া বাণ বা আঘাত পিতার শরীরে শক্তিশেলের মতো বেঁধে যায় — অর্থাৎ সন্তানের ভুল পিতাকে গভীরভাবে আঘাত করে।
প্রশ্ন ৪: ‘নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে তোমারই বুকের রক্তে রঞ্জিত হয়ে যাবে মানচিত্র আমার’ — কী বোঝায়?
ষড়যন্ত্রের স্থানে পিতার বুকের রক্তে দেশের মানচিত্র রঞ্জিত হবে — অর্থাৎ পিতার রক্তের বিনিময়ে দেশের স্বাধীনতা বা অস্তিত্ব।
প্রশ্ন ৫: ‘উপবাসী সিঁড়ির ওপরে’ — কোন ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ?
ঢাকার সিঁড়ি? অথবা বঙ্গবন্ধুর নিহত দেহের প্রসঙ্গ? ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়। ‘উপবাসী সিঁড়ি’ সম্ভবত সেই দৃশ্যের রূপক।
প্রশ্ন ৬: ‘সাত কোটি রক্তের ধারা’ — কী বোঝায়?
বাংলাদেশের সাত কোটি মানুষের রক্তের ধারা — মুক্তিযুদ্ধের রক্ত, ১৯৭৫-এর রক্ত, বা সাধারণ মানুষের ত্যাগ।
প্রশ্ন ৭: ‘শিমুলের কাঁটা চোখে বিঁধিয়ে দেওয়া’ — কী বোঝায়?
আত্মদণ্ড, তপস্যা, নিজেকে শাস্তি দেওয়া — যাতে পিতার ক্ষতি না হয়। শিমুলের কাঁটা অভ্রভেদী (আকাশ ভেদী), অর্থাৎ তীব্র যন্ত্রণা।
প্রশ্ন ৮: ‘বাউলের একতারা, ক্লান্ত ভাটিয়ালি’ — কী বোঝায়?
পিতার হৃদয় বাংলার সংস্কৃতির প্রতীক — বাউলের একতারা ও ভাটিয়ালি গান, যা শান্ত, সুরেলা ও গভীর।
প্রশ্ন ৯: ‘পনেরোর কালো অন্ধকার’ ও ‘আগস্টের সম্মিলিত ঘাতক আঁধার’ — কী বোঝায়?
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ঘটনা — বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের হত্যাকাণ্ড। কবি সেই আঁধারকে ‘মানতে অস্বীকার’ করেছেন।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
কবিতাটি আমাদের শেখায় — পিতার কাছে সব শাস্তি মেনে নেওয়া যায়, এমনকি রাজদণ্ড, নির্বাসন, ফাঁসিকাষ্ঠও মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট অন্ধকার (আগস্টের ঘাতক আঁধার) মেনে নেওয়া যায় না। সেই অন্ধকারকে অস্বীকার করাই এই কবিতার মূল বিদ্রোহ ও চূড়ান্ত বক্তব্য। এটি ইতিহাসের প্রতি এক সাহসী অবস্থান ও সত্যের প্রতি অঙ্গীকার।
ট্যাগস: যদি রাজদণ্ড দাও, অসীম সাহা, অসীম সাহার কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, পিতা ও রাজদণ্ড, নির্বাসন, আগস্টের আঁধার, বঙ্গবন্ধু, পনেরোর কালো অন্ধকার, শিমুলের কাঁটা, নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগার, উপবাসী সিঁড়ি, বাংলা কবিতা বিশ্লেষণ
© Kobitarkhata.com – কবি: অসীম সাহা | কবিতার প্রথম লাইন: “যদি রাজদণ্ড দাও-আমি মাথা পেতে নেবো। / ক্ষমার অযোগ্য যদি কোনো ভুল হয়ে থাকে, / আর সেই ভুলের জন্যে যদি বদলে যায় ভৌগোলিক সীমা, / যদি আত্মত্মজের নিক্ষিপ্ত তির শূন্যতায় উড়ে গিয়ে শক্তিশেল হয়ে বেঁধে তোমার শরীরে- / তুমি তবে কোন্ দণ্ড দেবে? / যদি রাজদণ্ড দাও-আমি মাথা পেতে নেবো।” | পিতা, রাজদণ্ড ও অস্তিত্বের অসাধারণ কাব্যভাষা | আধুনিক বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন