কবিতার প্রারম্ভেই কবি এক তীব্র ও দহনকারী পঙ্ক্তি উচ্চারণ করেছেন—”চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়”। চে-র সেই চিরবিদায়ের খবর কবির ঠোঁট শুকিয়ে দেয়, বুকের ভেতরটা ফাঁকা করে দেয়। শৈশব থেকে যে বিষণ্ণতা কবি লালন করেছেন, তা এক দীর্ঘশ্বাসে রূপ নেয়। বলিভিয়ার জঙ্গলে নীল প্যান্টালুন পরা চে-র সেই গুলিতে ঝাঁঝরা হওয়া বুক, যেখান দিয়ে নেমে গেছে শুকনো রক্তের রেখা—এই দৃশ্য কবির বিবেককে দংশন করে। চে-র সেই খোলা চোখের স্থির দৃষ্টি যেন এক গোলার্ধ থেকে অন্য গোলার্ধে ছুটে এসে পৃথিবীর সমস্ত সুবিধাবাদী ও নিশ্চুপ মানুষকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। কবির মনে হয়, চে যখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লড়াই করছিলেন, তখন কবি নিরাপদ দূরত্বে বসে ছিলেন—আর এই নিরাপদ অবস্থানই তাঁকে আজ অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
কবিতার মধ্যভাগে কবির ব্যক্তিগত প্রতিজ্ঞা ও আকাঙ্ক্ষার এক করুণ চিত্র ফুটে ওঠে। শৈশব থেকে মধ্য যৌবন পর্যন্ত কবিরও স্বপ্ন ছিল চে-র মতো হাতে হাতিয়ার তুলে নেওয়ার। তাঁরও কথা ছিল গহিন জঙ্গলে, কাদা ও পাথরের গুহায় ঘাপটি মেরে থেকে শোষকের বিরুদ্ধে চরম লড়াইয়ে অংশ নেওয়ার। রাইফেলের কুঁদো বুকে চেপে হুঙ্কার দিয়ে শত্রুর দিকে ছুটে যাওয়া কিংবা যুদ্ধের ময়দানে বিজয়ের সঙ্গীত গাওয়ার যে বৈপ্লবিক জীবন—তা কবিরও কাঙ্ক্ষিত ছিল। কিন্তু অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে কবি স্বীকার করেছেন যে, তাঁর অনবরত ‘দেরি’ হয়ে যাচ্ছে। এই দেরি হওয়া আসলে মধ্যবিত্তের দোদুল্যমানতা এবং সময়ের স্রোতে ভেসে যাওয়ার এক করুণ স্বীকারোক্তি।
কবিতার পরবর্তী অংশে কবির ভেতরের সেই চাপা আগুন এবং প্রতিশোধের স্পৃহা ফুটে ওঠে। কবি জানিয়েছেন যে, এতকাল তিনি অপমান সহ্য করেছেন, মুখ নিচু করে থেকেছেন, কিন্তু তিনি লড়াই থেকে সরে যাননি বা পরাজয় মেনে নেননি। জনশূন্য ট্রেনের জানালা, নদীর নির্জন রাস্তা কিংবা শ্মশানতলায় দাঁড়িয়ে তিনি বৃষ্টির কাছে, বৃক্ষের কাছে এবং প্রকৃতির রুদ্র রূপের কাছে নিজের গোপন শপথ শুনিয়েছেন। তিনি নিজেকে প্রস্তুত করছেন এক মহৎ প্রতিশোধের জন্য। তাঁর হাতিয়ারহীন হাত এখন মুষ্টিবদ্ধ হয়েছে, চোয়াল হয়েছে শক্ত। তিনি মনে মনে বারবার নিজেকে বলেছেন যে, তিনি ফিরে আসবেন এবং শৃঙ্খল ভাঙার লড়াইয়ে অংশ নেবেন।
শেষাংশে এসে কবিতাটি পুনরায় এক গভীর বিষাদ ও আর্তনাদে পর্যবসিত হয়। কবি আবারও চে-র কাছে ক্ষমা চেয়েছেন কারণ তিনি এখনো প্রস্তুত হতে পারেননি। তিনি এখনো জীবনের অন্ধকার সুড়ঙ্গের আধো-আলো ছায়ার মধ্যে আটকা পড়ে আছেন। চে-র মতো পূর্ণাঙ্গ বিপ্লবের আলোয় তিনি নিজেকে সঁপে দিতে পারেননি বলে তাঁর এই দীর্ঘ ‘দেরি হওয়া’ তাঁকে ক্রমাগত অপরাধী করে তুলছে।
সামগ্রিকভাবে, ‘চে গুয়েভারার প্রতি’ কবিতাটি কোনো ধরণের জটিল পঙ্ক্তি বা আলাদা স্তবক উদ্ধৃত না করে এক গতিময় ও আবেগী প্রবাহে মধ্যবিত্তের আদর্শিক সংকট ও বিপ্লবের আকুলতাকে তুলে ধরে। কবিতাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পৃথিবীর এক প্রান্তে যখন মুক্তির জন্য রক্ত ঝরে, তখন অন্য প্রান্তে বসে থাকা মানুষের নিষ্ক্রিয়তাও এক ধরণের অপরাধ। চে-র মৃত্যু কেবল একজন মানুষের বিদায় নয়, বরং তা আমাদের ভেতরের ঘুমন্ত বিবেককে জাগিয়ে তোলার এবং শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর এক চিরন্তন প্রেরণা।
চে গুয়েভারার প্রতি – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় | সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা | বিপ্লব, অপরাধবোধ ও প্রতিশ্রুতির অসাধারণ কাব্যভাষা
চে গুয়েভারার প্রতি: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অপরাধবোধ, বিপ্লবের প্রতিশ্রুতি ও অনবরত দেরি হওয়ার অসাধারণ কাব্যভাষা
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের “চে গুয়েভারার প্রতি” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য, বিপ্লবী ও আত্মসমালোচক সৃষ্টি। “চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয় / আমার ঠোঁট শুকনো হয়ে আসে, বুকের ভেতরটা ফাঁকা / আত্মায় অভিশ্রান্ত বৃষ্টিপতনের শব্দ / শৈশব থেকে বিষণ্ন দীর্ঘশ্বাস / চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়-” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে চে গুয়েভারার মৃত্যুতে অপরাধবোধ, ঠোঁট শুকনো ও বুক ফাঁকা হওয়া, আত্মায় বৃষ্টিপতনের শব্দ, শৈশব থেকে বিষণ্ণ দীর্ঘশ্বাস, বোলিভিয়ার জঙ্গলে নীল প্যান্টালুন পরা ছিন্নভিন্ন শরীর ও খোলা বুকের মধ্যখান দিয়ে নেমে যাওয়া শুকনো রক্তের রেখা, চোখের দৃষ্টি এক গোলার্ধ থেকে অন্য গোলার্ধে ছুটে আসা, শৈশব থেকে মধ্য যৌবন পর্যন্ত দীর্ঘ দৃষ্টিপাত, হাতিয়ার নিয়ে পাশে দাঁড়ানোর ও জঙ্গলে-কাদায়-পাথরের গুহায় লুকিয়ে প্রস্তুত হওয়ার কথা ছিল, রাইফেলের কুঁদো বুকে চেপে ছুটে যাওয়ার ও ছিন্নভিন্ন লাশ ও গরম রক্তের ফোয়ারার মধ্যে বিজয়-সঙ্গীত শোনানোর কথা ছিল, কিন্তু অনবরত দেরি হয়ে যাওয়া, একা থাকা ও অপমান সয়ে মুখ নিচু করা, কিন্তু হেরে না যাওয়া ও মেনে না নেওয়া, ট্রেনের জানলার পাশে-নদীর নির্জন রাস্তায়-ফাঁকা মাঠের আলপথে-শ্মশানতলায়-আকাশ-বৃষ্টি-বৃক্ষ-ঘূর্ণি ধুলোর ঝড়ের কাছে শপথ শোনানো, সব কিছুর নিজস্ব প্রতিশোধ নেওয়া ও নিজের ফিরে আসার প্রতিজ্ঞা, হাতিয়ারহীন হাত মুষ্টিবদ্ধ ও চোয়াল শক্ত করা, বারবার ফিরে আসার কথা বলা, তবু এখনও প্রস্তুত হতে না পারা ও অনবরত দেরি হওয়া, সুড়ঙ্গের মধ্যে আধো-আলো ছায়ার দিকে রয়ে যাওয়া — এই সব মিলিয়ে এক বিপ্লবের প্রতিশ্রুতি, অপরাধবোধ ও অনবরত দেরির গভীর ও বহুমাত্রিক কাব্যচিত্র। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় (১৯৩৪-২০১২) আধুনিক বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি পুরুষ। তিনি কবিতা, উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনি ও শিশুসাহিত্য সব মিলিয়ে এক বিস্ময়কর সৃষ্টিশীলতা দেখিয়েছেন। “চে গুয়েভারার প্রতি” তাঁর সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি চে-র মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নিজের অপরাধবোধ ও বিপ্লবের প্রতি দেরি হওয়ার ব্যর্থ স্বীকারোক্তি লিখেছেন।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়: বিপ্লব, অপরাধবোধ ও প্রতিশ্রুতির কবি
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ১৯৩৪ সালে ফরিদপুরে (বর্তমান বাংলাদেশ) জন্মগ্রহণ করেন। দেশভাগের পর তিনি কলকাতায় চলে আসেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পেশায় সাংবাদিক ও লেখক। তিনি ষাটের দশকে ‘কৃত্তিবাস’ গোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান কবি হিসেবে আবির্ভূত হন।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘একা ও কয়েকজন’, ‘ফিরে ফিরে আসে ফিরে’, ‘নির্বাচিত কবিতা’, ‘ভালোবাসার কবিতা’ প্রভৃতি। এছাড়া তিনি অসংখ্য উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনি ও শিশুসাহিত্য রচনা করেছেন।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো — সহজ সরল ভাষায় গভীর আবেগ প্রকাশ, নারী ও প্রকৃতির প্রতি নিবেদন, নিঃসঙ্গতা ও একাকিত্বের চিত্রায়ণ, এবং চিরন্তন ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি। এছাড়া তিনি বিপ্লবী চেতনা, অপরাধবোধ ও রাজনৈতিক সচেতনতার কবিতাও লিখেছেন। ‘চে গুয়েভারার প্রতি’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি চে গুয়েভারার প্রতি নিজের অপরাধবোধ ও দেরি হওয়ার স্বীকারোক্তি লিখেছেন।
চে গুয়েভারার প্রতি: শিরোনামের তাৎপর্য ও কবিতার পটভূমি
শিরোনাম ‘চে গুয়েভারার প্রতি’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘চে গুয়েভারা’ — আর্নেস্টো চে গুয়েভারা, লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী নেতা, কিউবার বিপ্লবের অন্যতম স্থপতি। ১৯৬৭ সালে বলিভিয়ায় নিহত হন। তাঁর মৃত্যু বিশ্বের বিপ্লবী ও বামপন্থীদের কাছে এক শোকাবহ ও অনুপ্রেরণাদায়ক ঘটনা। কবি এখানে চে-কে সম্বোধন করে তাঁর মৃত্যুতে নিজের অপরাধবোধ ও বিপ্লবের প্রতি দেরি হওয়ার কথা লিখেছেন।
কবি শুরুতে বলছেন — চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়। আমার ঠোঁট শুকনো হয়ে আসে, বুকের ভেতরটা ফাঁকা। আত্মায় অভিশ্রান্ত বৃষ্টিপতনের শব্দ। শৈশব থেকে বিষণ্ন দীর্ঘশ্বাস। চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়। বোলিভিয়ার জঙ্গলে নীল প্যান্টালুন পরা তোমার ছিন্নভিন্ন শরীর। তোমার খোলা বুকের মধ্যখান দিয়ে নেমে গেছে শুকনো রক্তের রেখা। চোখ দুটি চেয়ে আছে। সেই দৃষ্টি এক গোলার্ধ থেকে ছুটে আসে অন্য গোলার্ধে। চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়।
শৈশব থেকে মধ্য যৌবন পর্যন্ত দীর্ঘ দৃষ্টিপাত — আমারও কথা ছিল হাতিয়ার নিয়ে তোমার পাশে দাঁড়াবার। আমারও কথা ছিল জঙ্গলে কাদায় পাথরের গুহায় লুকিয়ে থেকে সংগ্রামের চরম মুহূর্তটির জন্য প্রস্তুত হওয়ার। আমারও কথা ছিল রাইফেলের কুঁদো বুকে চেপে প্রবল হুঙ্কারে ছুটে যাওয়ার। আমারও কথা ছিল ছিন্নভিন্ন লাশ ও গরম রক্তের ফোয়ারার মধ্যে বিজয়-সঙ্গীত শোনাবার। কিন্তু আমার অনবরত দেরি হয়ে যাচ্ছে!
এতকাল আমি এক, আমি অপমান সয়ে মুখ নিচু করেছি। কিন্তু আমি হেরে যাই নি, আমি মেনে নিই নি। আমি ট্রেনের জানলার পাশে, নদীর নির্জন রাস্তায়, ফাঁকা মাঠের আলপথে, শ্মশানতলায়, আকাশের কাছে, বৃষ্টির কাছে বৃক্ষের কাছে, হঠাৎ-ওঠা ঘূর্ণি ধুলোর ঝড়ের কাছে আমার শপথ শুনিয়েছি। আমি প্রস্তুত হচ্ছি, আমি সব কিছুর নিজস্ব প্রতিশোধ নেবো। আমি আমার ফিরে আসবো। আমার হাতিয়ারহীন হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়েছে, শক্ত হয়েছে চোয়াল, মনে মনে বারবার বলেছি, ফিরে আসবো!
চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয় — আমি এখনও প্রস্তুত হতে পারি নি, আমার অনবরত দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমি এখনও সুড়ঙ্গের মধ্যে আধো-আলো ছায়ার দিকে রয়ে গেছি, আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে। চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়!
চে গুয়েভারার প্রতি: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: চে-র মৃত্যুতে অপরাধবোধ, ঠোঁট শুকনো, বুক ফাঁকা, আত্মায় বৃষ্টিপাত, শৈশব থেকে বিষণ্ণ দীর্ঘশ্বাস
“চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয় / আমার ঠোঁট শুকনো হয়ে আসে, বুকের ভেতরটা ফাঁকা / আত্মায় অভিশ্রান্ত বৃষ্টিপতনের শব্দ / শৈশব থেকে বিষণ্ন দীর্ঘশ্বাস / চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়-“
প্রথম স্তবকে অপরাধবোধ ও শারীরিক-মানসিক প্রতিক্রিয়া। ‘ঠোঁট শুকনো’ — কথা বলতে না পারা, ব্যর্থতা। ‘বুক ফাঁকা’ — শূন্যতা, অনুশোচনা। ‘আত্মায় বৃষ্টিপতনের শব্দ’ — কান্না, যন্ত্রণা, বিষণ্ণতা। ‘শৈশব থেকে বিষণ্ণ দীর্ঘশ্বাস’ — দীর্ঘদিনের চাপা বেদনা। ‘অপরাধী করে দেয়’ — দ্বিরুক্তিতে জোর।
দ্বিতীয় স্তবক: বোলিভিয়ার জঙ্গলে চে-র ছিন্নভিন্ন শরীর, খোলা বুক ও শুকনো রক্তের রেখা, চোখের দৃষ্টি গোলার্ধ থেকে গোলার্ধে
“বোলিভিয়ার জঙ্গলে নীল প্যান্টালুন পরা / তোমার ছিন্নভিন্ন শরীর / তোমার খোলা বুকের মধ্যখান দিয়ে / নেমে গেছে / শুকনো রক্তের রেখা / চোখ দুটি চেয়ে আছে / সেই দৃষ্টি এক গোলার্ধ থেকে ছুটে আসে অন্য গোলার্ধে / চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়।”
দ্বিতীয় স্তবকে চে-র মৃত্যুর বাস্তব চিত্র। ‘বোলিভিয়ার জঙ্গল’ — যেখানে চে নিহত হন। ‘নীল প্যান্টালুন’ — তাঁর পরিহিত পোশাক। ‘ছিন্নভিন্ন শরীর, খোলা বুক, শুকনো রক্তের রেখা’ — মৃতদেহের ভয়াবহ বাস্তবতা। ‘চোখ দুটি চেয়ে আছে’ — মৃত্যুর পরও চোখ খোলা। ‘সেই দৃষ্টি এক গোলার্ধ থেকে ছুটে আসে অন্য গোলার্ধে’ — চে-র চোখের দৃষ্টি বিশ্বব্যপী, সময় ও স্থান অতিক্রম করে।
তৃতীয় স্তবক: শৈশব থেকে মধ্য যৌবন পর্যন্ত দৃষ্টিপাত, বিপ্লবের প্রতিশ্রুতি — হাতিয়ার নিয়ে পাশে দাঁড়ানো, জঙ্গলে লুকিয়ে প্রস্তুত হওয়া, রাইফেল নিয়ে ছুটে যাওয়া, বিজয়-সঙ্গীত শোনানো — কিন্তু অনবরত দেরি
“শৈশব থেকে মধ্য যৌবন পর্যন্ত দীর্ঘ দৃষ্টিপাত- / আমারও কথা ছিল হাতিয়ার নিয়ে তোমার পাশে দাঁড়াবার / আমারও কথা ছিল জঙ্গলে কাদায় পাথরের গুহায় / লুকিয়ে থেকে / সংগ্রামের চরম মুহূর্তটির জন্য প্রস্তুত হওয়ার / আমারও কথা ছিল রাইফেলের কুঁদো বুকে চেপে প্রবল হুঙ্কারে / ছুটে যাওয়ার / আমারও কথা ছিল ছিন্নভিন্ন লাশ ও গরম রক্তের ফোয়ারার মধ্যে / বিজয়-সঙ্গীত শোনাবার- / কিন্তু আমার অনবরত দেরি হয়ে যাচ্ছে!”
তৃতীয় স্তবকে বিপ্লবের প্রতিশ্রুতি ও বর্তমান ব্যর্থতা। ‘শৈশব থেকে মধ্য যৌবন’ — দীর্ঘ সময়। ‘আমারও কথা ছিল’ — বারবার পুনরাবৃত্তি, যা ছিল তা এখন নেই। ‘হাতিয়ার নিয়ে পাশে দাঁড়ানো, জঙ্গলে-কাদায়-পাথরের গুহায় লুকিয়ে প্রস্তুত হওয়া, রাইফেলের কুঁদো বুকে চেপে ছুটে যাওয়া, ছিন্নভিন্ন লাশ ও রক্তের ফোয়ারার মধ্যে বিজয়-সঙ্গীত শোনানো’ — সবই বিপ্লবের ভাষা। ‘কিন্তু আমার অনবরত দেরি হয়ে যাচ্ছে’ — কেন্দ্রীয় বেদনা ও স্বীকারোক্তি।
চতুর্থ স্তবক: একা থাকা, অপমান সয়ে মুখ নিচু করা, কিন্তু হেরে না যাওয়া ও মেনে না নেওয়া, ট্রেনের জানলা-নদী-মাঠ-শ্মশান-আকাশ-বৃষ্টি-বৃক্ষ-ঘূর্ণি ধুলোর ঝড়ের কাছে শপথ শোনানো, প্রতিশোধ নেওয়া ও ফিরে আসার প্রতিজ্ঞা, হাত মুষ্টিবদ্ধ ও চোয়াল শক্ত করা
“এতকাল আমি এক, আমি অপমান সয়ে মুখ নিচু করেছি / কিন্তু আমি হেরে যাই নি, আমি মেনে নিই নি / আমি ট্রেনের জানলার পাশে, নদীর নির্জন রাস্তায়, ফাঁকা / মাঠের আলপথে, শ্মশানতলায় / আকাশের কাছে, বৃষ্টির কাছে বৃক্ষের কাছে, হঠাৎ-ওঠা / ঘূর্ণি ধুলোর ঝড়ের কাছে / আমার শপথ শুনিয়েছি, আমি প্রস্তুত হচ্ছি, আমি / সব কিছুর নিজস্ব প্রতিশোধ নেবো / আমি আমার ফিরে আসবো / আমার হাতিয়ারহীন হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়েছে, শক্ত হয়েছে চোয়াল, / মনে মনে বারবার বলেছি, ফিরে আসবো!”
চতুর্থ স্তবকে ব্যর্থতা ও প্রতিজ্ঞার দ্বান্দ্বিকতা। ‘এতকাল আমি এক’ — একাকীত্ব। ‘অপমান সয়ে মুখ নিচু করেছি’ — পরাজয় ও লজ্জা। ‘কিন্তু আমি হেরে যাই নি, আমি মেনে নিই নি’ — আত্মসম্মান বজায়। ‘ট্রেনের জানলা, নদীর রাস্তা, মাঠের আলপথ, শ্মশানতলা, আকাশ, বৃষ্টি, বৃক্ষ, ঘূর্ণি ধুলোর ঝড়’ — নানা জায়গায় শপথ। ‘আমি প্রস্তুত হচ্ছি, আমি সব কিছুর নিজস্ব প্রতিশোধ নেবো, আমি আমার ফিরে আসবো’ — ভবিষ্যতের প্রতিজ্ঞা। ‘হাতিয়ারহীন হাত মুষ্টিবদ্ধ, চোয়াল শক্ত’ — শারীরিক দৃঢ়তা। ‘মনে মনে বারবার বলেছি, ফিরে আসবো’ — মন্ত্রমুগ্ধ পুনরাবৃত্তি।
পঞ্চম স্তবক: আবার অপরাধবোধ — এখনও প্রস্তুত হতে না পারা, অনবরত দেরি, সুড়ঙ্গের মধ্যে আধো-আলো ছায়ার দিকে রয়ে যাওয়া
“চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়- / আমি এখনও প্রস্তুত হতে পারি নি, আমার অনবরত / দেরি হয়ে যাচ্ছে / আমি এখনও সুড়ঙ্গের মধ্যে আধো-আলো ছায়ার দিকে রয়ে গেছি, / আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে / চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়!”
পঞ্চম স্তবকে চূড়ান্ত স্বীকারোক্তি ও আত্মদোষ। ‘আমি এখনও প্রস্তুত হতে পারি নি’ — প্রতিজ্ঞা সত্ত্বেও ব্যর্থতা। ‘সুড়ঙ্গের মধ্যে আধো-আলো ছায়ার দিকে রয়ে গেছি’ — অন্ধকার ও আলোর মাঝামাঝি, অনিশ্চয়তা, স্থবিরতা। ‘দেরি হয়ে যাচ্ছে’ — পুনরাবৃত্তি। শেষে আবার ‘চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়’ — গোটা কবিতার মূল সুর ও সমাপ্তি।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি পাঁচটি স্তবকে বিভক্ত। প্রথম স্তবক ৫ লাইন, দ্বিতীয় ৮ লাইন, তৃতীয় ১০ লাইন, চতুর্থ ১২ লাইন, পঞ্চম ৬ লাইন। মুক্তছন্দ, গদ্যকাব্যের ধাঁচে লেখা। ভাষা সরল, প্রাঞ্জল, আবেগঘন ও স্বীকারোক্তিমূলক।
প্রতীক ব্যবহারে অসাধারণ। ‘চে গুয়েভারা’ — বিপ্লব, আদর্শ, বলিদানের প্রতীক। ‘অপরাধী করে দেয়’ — অপরাধবোধের ক্রিয়া। ‘ঠোঁট শুকনো’ — কথা বলতে না পারা, ব্যর্থতা। ‘বুক ফাঁকা’ — শূন্যতা, অনুশোচনা। ‘আত্মায় বৃষ্টিপাত’ — কান্না, যন্ত্রণা। ‘বোলিভিয়ার জঙ্গল’ — বিপ্লবের শেষ ভূমি। ‘নীল প্যান্টালুন, ছিন্নভিন্ন শরীর, খোলা বুক, শুকনো রক্তের রেখা’ — চে-র স্মৃতির বাস্তব চিত্র। ‘চোখের দৃষ্টি গোলার্ধ থেকে গোলার্ধে’ — চে-র দৃষ্টি বিশ্বব্যাপী। ‘আমারও কথা ছিল’ — প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তি, হায় হায়। ‘হাতিয়ার, রাইফেলের কুঁদো’ — বিপ্লবের অস্ত্র। ‘ছিন্নভিন্ন লাশ ও গরম রক্তের ফোয়ারা’ — বিপ্লবের রক্তাক্ত বাস্তবতা। ‘বিজয়-সঙ্গীত’ — জয়ের স্বপ্ন। ‘অনবরত দেরি হয়ে যাচ্ছে’ — কেন্দ্রীয় বেদনা। ‘একা, অপমান সয়ে মুখ নিচু করা’ — ব্যক্তির নীচু অবস্থান। ‘ট্রেনের জানলা, নদীর রাস্তা, মাঠের আলপথ, শ্মশানতলা, আকাশ, বৃষ্টি, বৃক্ষ, ঘূর্ণি ধুলোর ঝড়’ — শপথের স্থান ও উপাদান। ‘হাতিয়ারহীন হাত মুষ্টিবদ্ধ, চোয়াল শক্ত’ — আত্মশক্তি। ‘সুড়ঙ্গের মধ্যে আধো-আলো ছায়া’ — অনিশ্চয়তা, স্থবিরতা, মুক্তির অপেক্ষা।
পুনরাবৃত্তি কৌশল — ‘চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়’ — প্রথম, দ্বিতীয় ও পঞ্চম স্তবকে এসেছে (মোট ৪ বার)। ‘আমারও কথা ছিল’ — তৃতীয় স্তবকে চার বার। ‘ফিরে আসবো’ — চতুর্থ স্তবকে দুইবার, পঞ্চম স্তবকে পরোক্ষে। ‘দেরি হয়ে যাচ্ছে’ — পঞ্চম স্তবকে দুইবার।
শেষের ‘চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়!’ — একই লাইন দিয়ে শুরু ও শেষ, চক্রাকার কাঠামো।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“চে গুয়েভারার প্রতি” সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এক অসাধারণ সৃষ্টি। তিনি এখানে চে গুয়েভারার মৃত্যুতে নিজের অপরাধবোধ, বিপ্লবের প্রতিশ্রুতি ও অনবরত দেরি হওয়ার কথা লিখেছেন। তিনি দেখিয়েছেন — কীভাবে চে-র ছিন্নভিন্ন শরীর, খোলা বুক ও শুকনো রক্তের রেখা, চোখের দৃষ্টি গোলার্ধ থেকে গোলার্ধে ছুটে আসা — সব কিছু তাকে অপরাধী করে দেয়। শৈশব থেকে মধ্য যৌবন পর্যন্ত তাঁরও কথা ছিল হাতিয়ার নিয়ে পাশে দাঁড়ানোর, জঙ্গলে-কাদায়-গুহায় লুকিয়ে প্রস্তুত হওয়ার, রাইফেলের কুঁদো বুকে চেপে ছুটে যাওয়ার, রক্তের ফোয়ারার মধ্যে বিজয়-সঙ্গীত শোনানোর। কিন্তু অনবরত দেরি হয়ে যাচ্ছে। তিনি একা, অপমান সয়ে মুখ নিচু করেছেন, কিন্তু হেরে যাননি, মেনে নেননি। তিনি ট্রেনের জানলা, নদী, মাঠ, শ্মশান, আকাশ, বৃষ্টি, বৃক্ষ, ঘূর্ণি ঝড়ের কাছে শপথ শুনিয়েছেন — প্রস্তুত হচ্ছি, প্রতিশোধ নেবো, ফিরে আসবো। হাত মুষ্টিবদ্ধ, চোয়াল শক্ত। তবু এখনও প্রস্তুত হতে পারেননি, এখনও সুড়ঙ্গের মধ্যে আধো-আলো ছায়ার দিকে রয়ে গেছেন, দেরি হয়ে যাচ্ছে।
প্রথম স্তবকে — অপরাধবোধ ও শারীরিক-মানসিক প্রতিক্রিয়া। দ্বিতীয় স্তবকে — চে-র মৃত্যুর বাস্তব চিত্র ও দৃষ্টি। তৃতীয় স্তবকে — বিপ্লবের প্রতিশ্রুতি ও অনবরত দেরি। চতুর্থ স্তবকে — ব্যর্থতা স্বীকার ও নতুন প্রতিজ্ঞা, শপথ ও শক্তি সঞ্চয়। পঞ্চম স্তবকে — আবার অপরাধবোধ, এখনও প্রস্তুত না হওয়া ও সুড়ঙ্গে রয়ে যাওয়া।
এই কবিতা আমাদের শেখায় — বিপ্লবের আদর্শ ও নিজের ব্যর্থতার মধ্যে এক অনন্ত দ্বান্দ্বিকতা থাকে। চে-র মতো মানুষকে মনে হলে অপরাধী বোধ হয়, কারণ আমরা পাশে দাঁড়াতে পারিনি, প্রস্তুত হতে পারিনি, দেরি করে ফেলছি। আমরা অপমান সয়েছি, মুখ নিচু করেছি, কিন্তু হেরে যাইনি, মেনে নিইনি। আমরা শপথ নিয়েছি, হাত মুষ্টিবদ্ধ করেছি, চোয়াল শক্ত করেছি, ‘ফিরে আসবো’ বলে মন্ত্র উচ্চারণ করেছি। কিন্তু এখনও সুড়ঙ্গের মধ্যে আধো-আলোয় রয়ে গেছি, এখনও দেরি হয়ে যাচ্ছে। এটি একটি চিরন্তন মানবিক বাস্তবতা — আদর্শ ও বাস্তবতার ফারাক।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতায় বিপ্লব, অপরাধবোধ ও প্রতিশ্রুতি
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতায় বিপ্লব ও অপরাধবোধ একটি পুনরাবৃত্ত বিষয়। তিনি ‘চে গুয়েভারার প্রতি’ কবিতায় চে-র মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নিজের অপরাধবোধ ও বিপ্লবের প্রতি দেরি হওয়ার স্বীকারোক্তি লিখেছেন। তিনি দেখিয়েছেন — কীভাবে একজন মধ্যবিত্ত বাঙালি বুদ্ধিজীবী চে-র আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েও বিপ্লবের চরম মুহূর্তে পৌঁছাতে পারেন না, কীভাবে তাঁর ‘ফিরে আসবো’ শপথ দুর্বল হয়ে পড়ে, কীভাবে তিনি সুড়ঙ্গের আধো-আলোয় রয়ে যান।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের উচ্চতর পাঠ্যক্রমে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘চে গুয়েভারার প্রতি’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের বিপ্লবের আদর্শ, অপরাধবোধের মনস্তত্ত্ব, পুনরাবৃত্তির কৌশল, এবং বাস্তব ও আদর্শের দ্বন্দ্ব সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে।
চে গুয়েভারার প্রতি সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: ‘চে গুয়েভারার প্রতি’ কবিতাটির লেখক কে?
এই কবিতাটির লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় (১৯৩৪-২০১২)। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি পুরুষ।
প্রশ্ন ২: ‘চে গুয়েভারা’ কে?
আর্নেস্টো চে গুয়েভারা (১৯২৮-১৯৬৭) লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী নেতা, কিউবার বিপ্লবের অন্যতম স্থপতি। ১৯৬৭ সালে বলিভিয়ায় নিহত হন। তিনি বামপন্থীদের আইকন।
প্রশ্ন ৩: ‘চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়’ — কেন অপরাধী করে দেয়?
কারণ কবি চে-র আদর্শে বিশ্বাসী ও তাঁর বিপ্লবে যোগ দিতে চেয়েও পারেননি। তিনি পাশে দাঁড়াতে পারেননি, প্রস্তুত হতে পারেননি, দেরি করে ফেলেছেন। তাই চে-র মৃত্যু তাকে অপরাধী বোধ করায়।
প্রশ্ন ৪: ‘বোলিভিয়ার জঙ্গলে নীল প্যান্টালুন পরা তোমার ছিন্নভিন্ন শরীর’ — কী বোঝায়?
চে-কে হত্যার পর তাঁর ছবি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে — নীল প্যান্টালুন ও খোলা বুকে শুকনো রক্তের রেখা। কবি সেই মর্মান্তিক দৃশ্য স্মরণ করছেন।
প্রশ্ন ৫: ‘সেই দৃষ্টি এক গোলার্ধ থেকে ছুটে আসে অন্য গোলার্ধে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
মৃত্যুর পরও চে-র চোখের দৃষ্টি জেগে আছে। সেই দৃষ্টি বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়ায়, বিপ্লবের ডাক দেয়।
প্রশ্ন ৬: ‘আমারও কথা ছিল হাতিয়ার নিয়ে তোমার পাশে দাঁড়াবার’ — ‘আমারও কথা ছিল’ পুনরাবৃত্তির তাৎপর্য কী?
‘আমারও কথা ছিল’ বারবার পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে কবি জোর দিয়েছেন — তাঁরও প্রতিশ্রুতি ছিল, স্বপ্ন ছিল, পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সবকিছু অধরা থেকে গেছে। এটি একটি বেদনা ও আক্ষেপের উচ্চারণ।
প্রশ্ন ৭: ‘কিন্তু আমার অনবরত দেরি হয়ে যাচ্ছে’ — কেন দেরি হচ্ছে?
কবি নিজেকে দোষারোপ করছেন। তিনি প্রস্তুত হচ্ছেন, কিন্তু সময় পার হয়ে যাচ্ছে। ‘দেরি’ এখানে বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত না হওয়া, সিদ্ধান্ত নিতে না পারা, ভয়, অলসতা, সংকোচ — সবকিছুর প্রতীক।
প্রশ্ন ৮: ‘আমি ট্রেনের জানলার পাশে, নদীর নির্জন রাস্তায়, ফাঁকা মাঠের আলপথে, শ্মশানতলায়… আমার শপথ শুনিয়েছি’ — কেন এসব জায়গায় শপথ?
একাকী নানা নির্জন স্থানে নিজের কাছে, প্রকৃতির কাছে শপথ নেওয়া — কবির আত্মশুদ্ধি ও প্রতিজ্ঞার অভিব্যক্তি। তিনি চান প্রকৃতিও যেন তাঁর প্রতিশ্রুতির সাক্ষী থাকে।
প্রশ্ন ৯: ‘আমি এখনও সুড়ঙ্গের মধ্যে আধো-আলো ছায়ার দিকে রয়ে গেছি’ — ‘সুড়ঙ্গ’ কী বোঝায়?
‘সুড়ঙ্গ’ — অন্ধকার ও আলোর মাঝামাঝি, অনিশ্চয়তা, বিপ্লবের পথে বাধা, নিজের সংকট, মৃত্যু ও জন্মের মধ্যবর্তী অবস্থা। তিনি এখনও সেই সুড়ঙ্গের ভেতর আটকে আছেন, বেরোতে পারছেন না।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
কবিতাটি আমাদের শেখায় — বিপ্লবের আদর্শ ও নিজের ব্যর্থতার মধ্যে এক অনন্ত দ্বান্দ্বিকতা থাকে। চে-র মতো মানুষকে মনে হলে অপরাধী বোধ হয়, কারণ আমরা পাশে দাঁড়াতে পারিনি, প্রস্তুত হতে পারিনি, দেরি করে ফেলছি। আমরা অপমান সয়েছি, মুখ নিচু করেছি, কিন্তু হেরে যাইনি, মেনে নিইনি। আমরা শপথ নিয়েছি, হাত মুষ্টিবদ্ধ করেছি, চোয়াল শক্ত করেছি, ‘ফিরে আসবো’ বলে মন্ত্র উচ্চারণ করেছি। কিন্তু এখনও সুড়ঙ্গের মধ্যে আধো-আলোয় রয়ে গেছি, এখনও দেরি হয়ে যাচ্ছে। এটি একটি চিরন্তন মানবিক বাস্তবতা — আদর্শ ও বাস্তবতার ফারাক।
ট্যাগস: চে গুয়েভারার প্রতি, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, চে গুয়েভারা, বিপ্লব, অপরাধবোধ, বোলিভিয়ার জঙ্গল, শুকনো রক্তের রেখা, হাতিয়ারহীন হাত মুষ্টিবদ্ধ, অনবরত দেরি, সুড়ঙ্গের আধো-আলো, ফিরে আসবো, বাংলা কবিতা বিশ্লেষণ
© Kobitarkhata.com – কবি: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় | কবিতার প্রথম লাইন: “চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয় / আমার ঠোঁট শুকনো হয়ে আসে, বুকের ভেতরটা ফাঁকা / আত্মায় অভিশ্রান্ত বৃষ্টিপতনের শব্দ / শৈশব থেকে বিষণ্ন দীর্ঘশ্বাস / চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়-” | বিপ্লব, অপরাধবোধ ও প্রতিশ্রুতির অসাধারণ কাব্যভাষা | আধুনিক বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন