কবিতার খাতা
চাঁদের বুড়ি – বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
“A young girl threading an invisible needle with invisible silk…”
সময়ের রেশমি সুতোয়
বোনে সে রূপের শেমিজ—
কী যে রূপ যায় না বলা
এমনই রঙের মায়া।…
মেয়েটির ভাবনা তবু
তমালের আবছা ছায়া।
আহা, কী রঙের জাদু,
চোখে যা যায় না দেখা!
তবু সে গানের মতো
হৃদয়ে শ্রাবণ আনে।
মেয়েটির দিন যে গেছে,
দেখে তো হয় না মনে।
মনে হয় সুতোই শুধু
চোখেরে দিচ্ছে ফাঁকি—
বোনে যে, সেই মেয়েটি
আমাদের কঙ্কাবতী!
কখনো নয়কো বাসি
এ-লতা লজ্জাবতী।
আহা, কী মনের মায়া!
চুলে যার পাক ধরেছে,
সে যখন বুনছে শেমিজ
আবিরেই দু’চোখ কানা!…
মেয়েটির ভাবনা তবু
শীতেরই তুষার-কণা!
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা।
কবিতার কথা-
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘চাঁদের বুড়ি’ কবিতাটি রূপকথার চিরন্তন আবহ, নারীর রূপান্তর, সময়ের প্রবাহ এবং মানুষের মনের চিরযৌবনা রূপের এক অদ্ভুত মায়াবী ও মনস্তাত্ত্বিক দলিল। কবিতার প্রারম্ভে ইংরেজিতে উদ্ধৃত “A young girl threading an invisible needle with invisible silk…” (এক তরুণী মেয়ে যে এক অদৃশ্য সুতো দিয়ে অদৃশ্য সূচে গাঁথনি তুলছে) বাক্যটিই পুরো কবিতার মূল সুরকে বেঁধে দেয়। কবি এখানে শৈশবের চেনা রূপকথার সেই ‘চাঁদের বুড়ি’র চেনা অবয়বকে এক ভিন্ন মাত্রায় রূপায়িত করেছেন, যেখানে বার্ধক্য কেবলই শরীরের এক আবরণ, কিন্তু মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সৃজনশীলতা ও স্বপ্ন চিরকালই এক চিরতরুণী মেয়ের মতো সতেজ।
কবিতার প্রারম্ভেই এক গভীর নান্দনিক ও রূপক আবহ তৈরি হয়। মেয়েটি কোনো সাধারণ সুতো দিয়ে কাজ করছে না, সে আসলে ‘সময়ের রেশমি সুতো’ দিয়ে বুনে চলেছে এক অদ্ভুত সুন্দর রূপের শেমিজ বা পোশাক। এই রূপ বা সৌন্দর্যের কোনো পার্থিব সংজ্ঞা হয় না, এর রঙের মায়া ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। বাহ্যিকভাবে তাকে এক শান্ত, অন্তর্মুখী মেয়ে মনে হয়, যার মনের সমস্ত ভাবনা তমাল গাছের আবছা ও স্নিগ্ধ ছায়ার মতো শান্ত ও রহস্যময়। জীবনের সবটুকু প্রকাশ না করেও যে এক গভীর সুন্দরের সৃষ্টি করা যায়, কবির এই বর্ণনা মূলত সেই সত্যকে নির্দেশ করে।
কবিতার মধ্যভাগে কবি এক অদৃশ্য জাদুর কথা বলেছেন। মেয়েটি যে রঙের সুতো দিয়ে তার স্বপ্ন বুনে চলেছে, তা সাধারণ চোখে হয়তো দেখা যায় না, কিন্তু তা এক অপার্থিব গানের মতো মানুষের হৃদয়ে এক নিমেষে বর্ষার বা শ্রাবণের সজল স্নিগ্ধতা নিয়ে আসে। সময়ের নিয়মে মেয়েটির জীবনের অনেকগুলো দিন পার হয়ে গেছে, অর্থাৎ সে যৌবন পেরিয়ে বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে গেছে। কিন্তু তার বুনন, তার সৃষ্টি আর তার ভেতরের তাড়না দেখে কোনোভাবেই মনে হয় না যে তার দিন ফুরিয়ে এসেছে। কবি পাঠককে মনে করিয়ে দেন যে, আসলে সুতোর অদৃশ্য রূপটাই মানুষের চোখকে ফাঁকি দিচ্ছে। যে মেয়েটি এই অলৌকিক রূপের বাসর বুনছে, সে আর কেউ নয়—সে আমাদের রূপকথার চেনা, শাশ্বত ও চিরন্তন বাঙালি নারী ‘কঙ্কাবতী’। এই কঙ্কাবতী বা চাঁদের বুড়ি আসলে সময়ের কাছে কখনো বাসি বা পুরোনো হয় না; সে এক চিরকালীন লজ্জাবতী লতার মতো, যা সবসময় স্পর্শকাতর ও সতেজ থাকে।
শেষাংশে এসে কবিতাটি এক পরম মনস্তাত্ত্বিক সত্য ও বৈপরীত্যের ওপর দাঁড়িয়ে পূর্ণতা লাভ করে। কবি দেখিয়েছেন যে, সময়ের নিয়মে মেয়েটির চুলে হয়তো পাক ধরেছে, অর্থাৎ শরীর বুড়ো হয়েছে। কিন্তু মনের মায়া তো ফুরিয়ে যায়নি। সে যখন তার রেশমি সুতো দিয়ে শেমিজ বুনতে বসে, তখন তার দুই চোখ আবিরের রাঙা রঙে রঙিন হয়ে ওঠে, যেন সে আবার তার সমস্ত রঙ নিয়ে সেই হারিয়ে যাওয়া অতীতে বা যৌবনে ফিরে গেছে। অথচ এই রঙিন আবেগের সমান্তরালেই তার ভেতরের গভীরতম ভাবনাগুলো শীতের শান্ত ও শুভ্র তুষার-কণার মতো নিস্পৃহ ও পবিত্র হয়ে ওঠে। বার্ধক্যের শুভ্রতা আর মনের ভেতরের রঙিন স্বপ্নের এই যে সহাবস্থান, তা কেবল এক অনন্য খ্যাপা শিল্পীর পক্ষেই সম্ভব।
সামগ্রিকভাবে, ‘চাঁদের বুড়ি’ কবিতাটি কোনো ধরণের জটিল পঙ্ক্তি বা আলাদা স্তবক উদ্ধৃত না করে এক মায়াবী ও সাবলীল প্রবাহে মানুষের ভেতরের চিরন্তন যৌবন ও সৃজনশীল আত্মাকে উদযাপন করে। কবি আমাদের সমাজকে এক নতুন দৃষ্টিতে দেখতে শেখান—যেখানে একজন প্রবীণ মানুষের শরীরের জীর্ণতা বা পাকা চুলই তার শেষ পরিচয় নয়। তার ভেতরের অদৃশ্য সুতো দিয়ে বোনা স্বপ্নের জগৎ, তার মনের ভেতরের কঙ্কাবতী সত্তা চিরকালই অক্ষত ও অপরাজিত থেকে যায়, যা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মানুষকে নতুন কোনো সুন্দরের জন্ম দেওয়ার প্রেরণা জোগায়।





