যদি চাও,আমার কবিতা ছাড়া সব দেবো।
এই মন,শ্যামল শরীর দেবো এই বুক জোড়া
অঘ্রানের মাঠ,শস্যময়।আমার স্বজন দেবো,
যদি চাও দিয়ে দেবো আমার স্বপ্নময় বাসনা।
সুখ দেবো,স্বস্তি দেবো–শুধু এই কবিতা দেবো না।
যদি চাও,এই রাত্রির নিদ্রাকে নির্বাসন দেবো
যদি চাও,নিসর্গ উজাড় কোরে সাজাবো শ্মশান
যদি চাও,বারুদের গন্ধ হবে ফুলের সৌরভ
নদীরা বাংকার হবে,বৃক্ষ দেবে সুরক্ষা.আড়াল
যদি চাও,রক্ত দেবো–শুধু এই কবিতা দেবো না।
আমার স্বাচ্ছন্দ ঘর,নানা রঙ খোপের কৈতর,
জোস্না রাত যদি চাও থুয়ে যাবো কাংখিত শরীর।
যদি চাও.স্বপ্ন দুঃখ মাথা আমার পাঁজরখানি
মেলে দেবো নির্দ্বিধায় জলপাই বুলেটের মুখে।
কবিতা দেবো না।
শোণিতের আল্পনা এঁকে দেবো পিচের শহরে
যদি চাও,সন্তানের রক্তমাখা ডোরাকাটা শার্ট
কারাগার,বেয়নেট,হুলিয়া,জখম বুকে নেবো–
কবিতা দেবো না,এই স্বপ্নবান কবিতা দেবো না॥
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কবিতা।
কবিতার কথা-
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর ‘দেবো না সাম্যের বিশ্বাস’ (কবিতার মূল পাঠে ‘কবিতা দেবো না’ বা ‘সাম্যের বিশ্বাস’) কবিতাটি একজন কবির আপসহীন রাজনৈতিক ইশতেহার, চরম আত্মত্যাগ এবং তাঁর সৃষ্টির প্রতি এক অটল ও অবিনশ্বর আনুগত্যের আখ্যান। ‘সব দেবো—শুধু এই কবিতা দেবো না’—এই তীব্র ও অনমনীয় ঘোষণার মধ্য দিয়ে কবি মূলত বোঝাতে চেয়েছেন যে, কবিতা তাঁর কাছে কেবল কিছু শব্দের বিন্যাস নয়; কবিতা হলো তাঁর আদর্শ, সাম্যের বিশ্বাস এবং শোষিত মানুষের মুক্তির হাতিয়ার। শাসকগোষ্ঠী বা বৈরী শক্তির কাছে জীবনের সবকিছু বিলিয়ে দেওয়া গেলেও নিজের চেতনার মূল ভিত্তিটি যে কখনো সমর্পণ করা যায় না, কবিতাটি তারই এক জলন্ত দলিল।
কবিতার প্রথমাংশে কবি ব্যক্তিগত প্রেম, সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যকে বিসর্জন দেওয়ার এক চরম ঔদার্য দেখিয়েছেন। তিনি তাঁর মন, শ্যামল শরীর, অঘ্রানের শস্যময় মাঠ, স্বজন এবং স্বপ্নময় বাসনা—সবকিছুই নির্দ্বিধায় দিয়ে দিতে রাজি আছেন। এমনকি রাতের ঘুমকে নির্বাসন দিতে কিংবা নিজের আরাম-আয়েসের ঘর আর রূপালী জোছনা রাত বিসর্জন দিতেও তাঁর দ্বিধা নেই। কিন্তু যেখানে তাঁর দ্রোহ আর বিশ্বাসের জন্ম, সেই ‘কবিতা’ তিনি কোনো কিছুর বিনিময়েই হাতছাড়া করবেন না।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তবকে কবিতাটি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং আশির দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে ধারণ করে। কবি রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও যুদ্ধের ভয়াবহতাকে মেনে নিতে প্রস্তুত। যদি প্রয়োজন হয়, ফুলের সৌরভ বদলে বারুদের গন্ধ হবে, নদীর বুক বাংকার হয়ে উঠবে আর গাছের আড়ালে লুকিয়ে চলবে লড়াই। কবি নিজের বুকখানি ‘জলপাই বুলেটের মুখে’ (যা সামরিক স্বৈরাচারের এক অমোঘ রূপক) মেলে দিতেও প্রস্তুত। অর্থাৎ, ভীতি বা মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও কবির ভেতরের আদর্শিক সত্তাটি বিন্দুমাত্র টলে না।
কবিতার শেষাংশে এসে এই ত্যাগ আরও ভয়ংকর ও রাজপথ-সংগ্রামী রূপ নেয়। কবি পিচের শহরে নিজের ‘শোণিতের আল্পনা’ বা রক্তের দাগ এঁকে দিতে পারেন, সন্তানের রক্তমাখা ডোরাকাটা শার্ট (যা শহীদি চেতনার প্রতীক) বুকে তুলে নিতে পারেন। কারাগারের অন্ধকার, বেয়নেটের খোঁচা, হুলিয়া কিংবা জখম—সবকিছুকে আলিঙ্গন করতে তাঁর বুক কাঁপবে না। কিন্তু এই সবকিছুর বিনিময়েও তিনি তাঁর ‘স্বপ্নবান কবিতা’ শত্রুর পায়ে সমর্পণ করবেন না। কারণ, কবিতা বেঁচে থাকলেই বেঁচে থাকবে সাম্যের গান, বেঁচে থাকবে আগামীর বিপ্লব।
পরিশেষে, কবিতাটি প্রমাণ করে যে একজন প্রকৃত গণকবির কাছে তাঁর সৃষ্টিই হলো তাঁর শেষ আশ্রয় ও শক্তির উৎস। সৃষ্টির সার্থকতা লৌকিক হাততালিতে নয়, বরং স্রষ্টার নিজের মানসিক মুক্তি এবং অস্তিত্বের তাগিদে—যা এই কবিতায় রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর চিরকালীন দ্রোহ, আপসহীনতা এবং সাম্যের বিশ্বাসের এক অনন্য ও অবিনশ্বর জয়গান হিসেবে মূর্ত হয়ে উঠেছে।
দেবো না সাম্যের বিশ্বাস – রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
দেবো না সাম্যের বিশ্বাস: রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতা, রক্ত ও প্রতিরোধের অসাধারণ কাব্যদর্শন — “শুধু এই কবিতা দেবো না”
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর “দেবো না সাম্যের বিশ্বাস” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য, তীব্র ও বিদ্রোহী সৃষ্টি। এই কবিতাটি কবিতার প্রতি গভীর আনুগত্য ও আত্মার অমরত্বের এক অসাধারণ দলিল। “যদি চাও, আমার কবিতা ছাড়া সব দেবো” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক মর্মস্পর্শী সত্য — কবি সব কিছু দিতে পারেন, কিন্তু কবিতা দিতে পারেন না। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ (১৯৫৬-১৯৯১) আধুনিক বাংলা কবিতার এক বিদ্রোহী ও প্রেমিক কণ্ঠস্বর। অকালপ্রয়াত এই কবি ‘আমার ভাঙা ডানায় বন্ধু’, ‘উদার নীল’, ‘ইচ্ছে ঘুড়ি’, ‘অমৃত উপাখ্যান’ প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থের জন্য বিখ্যাত। “দেবো না সাম্যের বিশ্বাস” সেই ধারার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি কবিতাকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রেখেছেন। শেষে তিনি বারবার ঘোষণা করেন — “কবিতা দেবো না, এই স্বপ্নবান কবিতা দেবো না”।
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ: স্বল্পায়ু কিন্তু অমর এক বিদ্রোহী কণ্ঠস্বর
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ১৯৫৬ সালের ৬ ডিসেম্বর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। মাত্র ৩৪ বছর বয়সে ১৯৯১ সালের ২১ জুন তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বাংলা কবিতায় এক অনন্য স্থান তৈরি করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে — ‘আমার ভাঙা ডানায় বন্ধু’ (১৯৮১), ‘উদার নীল’ (১৯৮৩), ‘ইচ্ছে ঘুড়ি’ (১৯৮৫), ‘অমৃত উপাখ্যান’ (১৯৮৯), ‘বিরস নদীর স্বপ্ন’ (মরণোত্তর) ইত্যাদি। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো — কবিতার প্রতি চরম অনুরাগ ও আত্মত্যাগ, প্রতিবাদ ও বিদ্রোহের তীব্র সুর, মৃত্যু ও আত্মাহুতির প্রস্তুতি, ‘কবিতা দেবো না’ ধ্বনির পুনরাবৃত্তি ও শক্তিশালী সমাপ্তি।
দেবো না সাম্যের বিশ্বাস: শিরোনামের গূঢ়ার্থ ও কবিতার পটভূমি
শিরোনাম ‘দেবো না সাম্যের বিশ্বাস’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘সাম্যের বিশ্বাস’ মানে সমতার প্রতিশ্রুতি বা ভ্রাতৃত্ববোধের আদর্শ। কবি বলছেন — এই বিশ্বাস দেবেন না। তবে পুরো কবিতায় তিনি বারবার বলেছেন — কবিতা ছাড়া সব দেবেন। অর্থাৎ কবিতাই তাঁর শেষ ও একমাত্র অটল সম্পদ।
কবিতার শুরুতে তিনি বলেন — যদি চাও, আমার কবিতা ছাড়া সব দেবো। এই মন, শ্যামল শরীর, এই বুক জোড়া অঘ্রানের মাঠ, শস্যময়। আমার স্বজন দেবো, যদি চাও দিয়ে দেবো আমার স্বপ্নময় বাসনা। সুখ দেবো, স্বস্তি দেবো — শুধু এই কবিতা দেবো না। যদি চাও, এই রাত্রির নিদ্রাকে নির্বাসন দেবো, যদি চাও নিসর্গ উজাড় করে সাজাবো শ্মশান, যদি চাও বারুদের গন্ধ হবে ফুলের সৌরভ, নদীরা বাঁকা হবে, বৃক্ষ দেবে সুরক্ষা, আড়াল। যদি চাও, রক্ত দেবো — শুধু এই কবিতা দেবো না। তাঁর স্বাচ্ছন্দ ঘর, নানা রঙ খোপের কৈতর, জোছনা রাত যদি চাও থুয়ে যাবো কাংখিত শরীর। যদি চাও স্বপ্ন দুঃখ মাথা, তাঁর পাঁজরখানি মেলে দেবো নির্দ্বিধায় জলপাই বুলেটের মুখে। কবিতা দেবো না। শোণিতের আল্পনা এঁকে দেবো পিচের শহরে। যদি চাও সন্তানের রক্তমাখা ডোরাকাটা শার্ট, কারাগার, বেয়নেট, হুলিয়া, জখম বুকে নেবো — কবিতা দেবো না, এই স্বপ্নবান কবিতা দেবো না।
দেবো না সাম্যের বিশ্বাস: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: কবিতা ছাড়া সব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি — মন, শরীর, স্বজন, স্বপ্ন, সুখ, স্বস্তি
“যদি চাও,আমার কবিতা ছাড়া সব দেবো۔ / এই মন,শ্যামল শরীর দেবো এই বুক জোড়া / অঘ্রানের মাঠ,শস্যময়।আমার স্বজন দেবো, / যদি চাও দিয়ে দেবো আমার স্বপ্নময় বাসনা। / সুখ দেবো,স্বস্তি দেবো–শুধু এই কবিতা দেবো না।”
প্রথম স্তবকের বিশ্লেষণ: ‘কবিতা ছাড়া সব দেবো’ — কবিতার প্রতি চরম মমতা ও অধিকার। ‘মন, শ্যামল শরীর, অঘ্রানের মাঠ’ — নিজের সত্তা ও প্রকৃতির সৌন্দর্য। ‘স্বজন, স্বপ্নময় বাসনা, সুখ, স্বস্তি’ — সব কিছুই দেওয়া যায়। ‘শুধু এই কবিতা দেবো না’ — বারবার পুনরুক্তি জোর দিয়েছে।
দ্বিতীয় স্তবক: নিদ্রা নির্বাসন, নিসর্গ উজাড় করে শ্মশান সাজানো, বারুদের গন্ধ ফুলের সৌরভ, নদী বাঁকা, বৃক্ষের সুরক্ষা, রক্ত দেওয়া
“যদি চাও,এই রাত্রির নিদ্রাকে নির্বাসন দেবো / যদি চাও,নিসর্গ উজাড় কোরে সাজাবো শ্মশান / যদি চাও,বারুদের গন্ধ হবে ফুলের সৌরভ / নদীরা বাংকার হবে,বৃক্ষ দেবে সুরক্ষা.আড়াল / যদি চাও,রক্ত দেবো–শুধু এই কবিতা দেবো না।”
দ্বিতীয় স্তবকের বিশ্লেষণ: ‘নিদ্রাকে নির্বাসন দেবো’ — ঘুম ত্যাগ করার প্রস্তুতি। ‘নিসর্গ উজাড় করে শ্মশান সাজানো’ — প্রকৃতি ধ্বংস করে মৃত্যুক্ষেত্র তৈরির ক্ষমতা। ‘বারুদের গন্ধ ফুলের সৌরভ’ — যুদ্ধ ও প্রেমের মিলন। ‘নদী বাঁকা ও বৃক্ষের সুরক্ষা’ — প্রকৃতির পরিবর্তন। ‘রক্ত দেবো’ — নিজের জীবন দিতে পারেন। ‘শুধু এই কবিতা দেবো না’ — পুনরাবৃত্তি।
তৃতীয় স্তবক: স্বাচ্ছন্দ ঘর, জোছনা রাত, কাংখিত শরীর, স্বপ্ন-দুঃখ, পাঁজর জলপাই বুলেটের মুখে
“আমার স্বাচ্ছন্দ ঘর,নানা রঙ খোপের কৈতর, / জোস্না রাত যদি চাও থুয়ে যাবো কাংখিত শরীর। / যদি চাও.স্বপ্ন দুঃখ মাথা আমার পাঁজরখানি / মেলে দেবো নির্দ্বিধায় জলপাই বুলেটের মুখে۔ / কবিতা দেবো না۔”
তৃতীয় স্তবকের বিশ্লেষণ: ‘স্বাচ্ছন্দ ঘর, কৈতর (কুয়াশা)’ — আরাম ও কাব্যের জিনিস। ‘জোছনা রাতে কাংখিত শরীর থুয়ে যাওয়া’ — প্রেম ও কামনার বিলাসিতা। ‘স্বপ্ন-দুঃখ মাথা, পাঁজর বুলেটের মুখে মেলে দেওয়া’ — আত্মাহুতির প্রস্তুতি। ‘জলপাই বুলেট’ — সম্ভবত জলপাই রঙের বুলেট (শান্তির বুলেট?) অথবা জলপাই শাখার মতো দেখতে বুলেট। ‘কবিতা দেবো না’ — সংক্ষিপ্ত, জোরালো ঘোষণা।
চতুর্থ স্তবক: শোণিতের আল্পনা, পিচের শহর, সন্তানের রক্তমাখা শার্ট, কারাগার, বেয়নেট, হুলিয়া, জখম নেওয়া — কবিতা না দেওয়া
“শোণিতের আল্পনা এঁকে দেবো পিচের শহরে / যদি চাও,সন্তানের রক্তমাখা ডোরাকাটা শার্ট / কারাগার,বেয়নেট,হুলিয়া,জখম বুকে নেবো– / কবিতা দেবো না,এই স্বপ্নবান কবিতা দেবো না॥”
চতুর্থ স্তবকের বিশ্লেষণ: ‘শোণিতের আল্পনা (রক্তের আলপনা)’ — রক্ত দিয়ে রঙিন নকশা আঁকা। ‘পিচের শহরে’ — কালো পিচঢাকা রাস্তার শহর, সম্ভবত যন্ত্রণার শহর। ‘সন্তানের রক্তমাখা ডোরাকাটা শার্ট’ — সন্তান হত্যার প্রতীক, অথবা শহিদের রক্তমাখা পোশাক। ‘কারাগার, বেয়নেট, হুলিয়া, জখম বুকে নেওয়া’ — নির্যাতন, কারাবরণ ও আঘাত সহ্য করার প্রস্তুতি। ‘কবিতা দেবো না, এই স্বপ্নবান কবিতা দেবো না’ — চূড়ান্ত ঘোষণা, ‘স্বপ্নবান কবিতা’ বলে কবিতাকে স্বপ্ন ও বাস্তবের মিলনস্থল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি চারটি স্তবকে বিভক্ত, গদ্যকবিতার ধারায় রচিত, কিন্তু রুদ্রের অনন্য ছন্দ ও পুনরাবৃত্তিতে সমৃদ্ধ। ভাষা অত্যন্ত সরল, তীব্র ও বিদ্রোহী। প্রতীক ও চিহ্নের ব্যবহার অসাধারণ — ‘কবিতা ছাড়া সব দেওয়া’ (কবিতার প্রতি চরম অনুরাগ), ‘অঘ্রানের মাঠ, শস্যময়’ (উর্বরতা ও সৌন্দর্য), ‘স্বজন ও স্বপ্নময় বাসনা’ (ব্যক্তিগত সম্পদ), ‘নিদ্রাকে নির্বাসন দেওয়া’ (জাগরণ ও ত্যাগ), ‘নিসর্গ উজাড় করে শ্মশান সাজানো’ (প্রকৃতি ধ্বংস), ‘বারুদের গন্ধ ফুলের সৌরভ’ (যুদ্ধ ও শান্তির মিলন), ‘নদী বাঁকা ও বৃক্ষের সুরক্ষা’ (প্রকৃতির বিকৃতি), ‘রক্ত দেওয়া’ (আত্মাহুতি), ‘জলপাই বুলেটের মুখে পাঁজর মেলে দেওয়া’ (আত্মঘাতী আত্মত্যাগ), ‘শোণিতের আল্পনা’ (রক্তের নকশা), ‘পিচের শহর’ (কালো ও কঠিন শহর), ‘সন্তানের রক্তমাখা শার্ট’ (শহিদের রক্ত), ‘কারাগার, বেয়নেট, হুলিয়া, জখম’ (নির্যাতন ও সংগ্রামের প্রতীক), ‘স্বপ্নবান কবিতা’ (স্বপ্ন ও বাস্তবের মিলনে সৃষ্ট কবিতা)। ‘কবিতা দেবো না’ ধ্বনির পুনরাবৃত্তি পুরো কবিতাকে ঘিরে ফেলেছে — এক অমোঘ অঙ্গীকারের মতো।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“দেবো না সাম্যের বিশ্বাস” রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর এক অসাধারণ বিদ্রোহী ও আত্মোৎসর্গের কাব্য। তিনি সব কিছু দিতে পারেন — মন, শরীর, স্বজন, স্বপ্ন, সুখ, স্বস্তি, রক্ত, এমনকি নিজের পাঁজর পর্যন্ত। কিন্তু কবিতা দিতে পারেন না। কারণ কবিতা তাঁর শেষ আশ্রয়, তাঁর আত্মার স্বাধীনতা, তাঁর প্রতিরোধের অস্ত্র। তিনি বলেছেন — ‘শুধু এই কবিতা দেবো না’ — এটি কবির আত্মমর্যাদা ও কবিতার প্রতি চরম আনুগত্যের ঘোষণা।
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতায় কবিতা, রক্ত ও প্রতিরোধ
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর ‘দেবো না সাম্যের বিশ্বাস’ কবিতায় কবিতার প্রতি গভীর আনুগত্য ও আত্মমর্যাদার অসাধারণ চিত্র ফুটে উঠেছে। ‘কবিতা দেবো না’ ধ্বনিটি বাংলা কবিতায় আত্মসম্মানের এক চূড়ান্ত দলিল।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক স্তরে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর ‘দেবো না সাম্যের বিশ্বাস’ অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। কারণ — (১) আধুনিক ও বিদ্রোহী কাব্যধারার চমৎকার উদাহরণ, (২) কবিতার প্রতি আত্মত্যাগ ও আনুগত্যের শিক্ষা, (৩) ‘কবিতা দেবো না’ ধ্বনির পুনরাবৃত্তি ও জোরালো বার্তা, (৪) রক্ত, বুলেট, কারাগার, বেয়নেট, হুলিয়া — এসব প্রতীকের সাহসী ব্যবহার, (৫) কবিকে সব শেষে নিজের কবিতা ছাড়া সব ছাড়তে হয় — এই বাস্তবতা শিক্ষার্থীদের কবিতা ও স্বাধীনতার মূল্য শেখায়।
দেবো না সাম্যের বিশ্বাস সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: ‘দেবো না সাম্যের বিশ্বাস’ কবিতাটির লেখক কে?
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ (১৯৫৬-১৯৯১) — আধুনিক বাংলা কবিতার এক বিদ্রোহী ও প্রেমিক কণ্ঠস্বর۔
প্রশ্ন ২: ‘যদি চাও, আমার কবিতা ছাড়া সব দেবো’ — কেন কবিতা দিতে পারেন না?
কবিতা তাঁর শেষ আশ্রয়, আত্মার স্বাধীনতা ও প্রতিরোধের অস্ত্র। সব কিছু দেওয়া গেলেও কবিতা দেওয়া যায় না।
প্রশ্ন ৩: ‘জলপাই বুলেটের মুখে পাঁজর মেলে দেওয়া’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
আত্মাহুতি ও মৃত্যুকে বরণ করে নেওয়ার প্রস্তুতি। ‘জলপাই’ শান্তির প্রতীক — অর্থাৎ শান্তির বুলেটের মুখেও নিজেকে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত।
প্রশ্ন ৪: ‘কবিতা দেবো না, এই স্বপ্নবান কবিতা দেবো না’ — শেষ লাইনের চূড়ান্ত বক্তব্য কী?
স্বপ্ন ও বাস্তবের মিলনে সৃষ্ট এই কবিতা কখনো দেওয়া যাবে না। এটি কবির আত্মমর্যাদা ও কবিতার প্রতি চরম আনুগত্যের ঘোষণা।
ট্যাগস: দেবো না সাম্যের বিশ্বাস, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর সেরা কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, কবিতা ও প্রতিরোধ, আত্মমর্যাদার কবিতা
© Kobitarkhata.com – কবি: রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ | কবিতার প্রথম লাইন: “যদি চাও, আমার কবিতা ছাড়া সব দেবো” | কবিতা ও আত্মমর্যাদার অসাধারণ কাব্যদর্শন | আধুনিক বাংলা কবিতার অনন্য নিদর্শন