কবিতাটির গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, এটি কেবল অভাবের কথা বলে না, বরং নারীর সামাজিক ও পারিবারিক নিরাপত্তাহীনতার চিত্রও অঙ্কন করে। জ্যৈষ্ঠে ভাতের অভাব, আষাঢ়ে ভাঙা চাল দিয়ে বৃষ্টির জল পড়া, কিংবা ভাদ্রে মেয়ের বিয়ের পণ নিয়ে দুশ্চিন্তা— প্রতিটি পঙক্তিতে ফুটে উঠেছে এক রূঢ় বাস্তবতা। কবির বর্ণনায় উঠে এসেছে কীভাবে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর টাকা স্বামী কেড়ে নিয়ে মদ খায়, কিংবা কীভাবে সমাজ আজও কুসংস্কারের বশবর্তী হয়ে নারীকে ‘ডাইনি’ অপবাদে পুড়িয়ে মারতে চায়। এমনকি অভাবের তাড়নায় কন্যাসন্তানকে পাচার করে দেওয়ার মতো ভয়ংকর সত্যকেও কবি অত্যন্ত সাহসের সাথে উচ্চারণ করেছেন। এই ‘ফুল্লরা’ চরিত্রটি যেন কালান্তরের এক শাশ্বত রূপ, যে আজও ক্ষমতার লড়াইয়ে কেবল একটি সংখ্যামাত্র হয়ে টিকে আছে।
তবে এই দীর্ঘ যন্ত্রণার বিবরণের মাঝেও কবিতাটি শেষ পর্যন্ত এক বলিষ্ঠ রূপান্তরের কথা বলে। ভোটার মেয়েটি আজ আর কেবল অবলা নয়; সে রাতের স্কুলে ‘বর্ণপরিচয়’ শিখছে, মিটিং-মিছিলে গিয়ে বুঝতে শিখছে রাজনীতির কূটকৌশল। সে এখন নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন। সে যখন বলে, ‘পার্টি করি তাই বাবু জোট শিখে গেছি’, তখন বোঝা যায় যে দীর্ঘদিনের শোষণ তাকে প্রতিবাদী করে তুলেছে। কবি এখানে দেখিয়েছেন যে, অভাব আর বঞ্চনা সত্ত্বেও এই নারীসমাজই গণতন্ত্রের প্রকৃত মেরুদণ্ড। তারা যখন ভোট দিতে যায়, তখন তারা স্রেফ বোতাম টেপে না, বরং এক উজ্জ্বল আগামীর প্রত্যাশায় নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণের চেষ্টা করে।
মল্লিকা সেনগুপ্ত অত্যন্ত নিপুণভাবে এই কবিতায় রাজনীতি ও সমাজতত্ত্বের এক মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। কবির এই ভাবনা আমাদের বাধ্য করে গ্রামীণ বাংলার অন্দরে তাকিয়ে দেখতে, যেখানে প্রতিটি ভোট আসলে এক একটি বাঁচার লড়াইয়ের স্বপ্ন। ভোটার মেয়েটি শেষ পর্যন্ত সৎ এবং যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার যে অঙ্গীকার করে, তা আসলে এক নতুন দিনের সংকেত। এই দ্বান্দ্বিকতা আর জীবনবোধই কবিতাটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যা প্রতিটি পাঠকের মনে প্রান্তিক মানুষের অধিকার নিয়ে এক গভীর প্রশ্নের উদ্রেক করে। এটি বঞ্চনার ইতিহাস ছাপিয়ে এক জাগ্রত নারীসত্তার উত্তরণের আখ্যান।
ভোটার মেয়ের বারোমাস্যা – মল্লিকা সেনগুপ্ত | মল্লিকা সেনগুপ্তের সেরা কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা | বারোমাস ভোটের মরশুম | নারী ভোটার ও গ্রামীণ বঞ্চনার কাব্য | ফুল্লরা চরিত্র ও বাংলার মঙ্গলকাব্যের নারী
ভোটার মেয়ের বারোমাস্যা: মল্লিকা সেনগুপ্তের ফুল্লরার বারো মাসের ভোটচাওয়া, দুর্ভোগ ও প্রত্যাশার অসাধারণ কাব্যচিত্র — “যে লোক উন্নতি দিবে, যে লোক সৎ, তারই বোতামে দিব টিপছাপ আমি”
মল্লিকা সেনগুপ্তের (Mallika Sengupta) “ভোটার মেয়ের বারোমাস্যা” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য, প্রতিবাদী ও নারীবাচক সৃষ্টি। এই কবিতাটি বাংলার প্রান্তিক নারী ফুল্লরার মুখে বারো মাসের ভোটপ্রার্থনার জবাব। “ভোট চাস ক্যানে বাবু, কাকে দিব ভোট ?” — এই প্রশ্ন দিয়ে শুরু হয়ে ফুল্লরা বাংলা বছরের প্রতিটি মাসের কষ্ট ও বঞ্চনার কথা ব্যক্ত করে। বৈশাখের জলকষ্ট, জ্যৈষ্ঠের অভাব, আষাঢ়ের ইস্কুল যাওয়া মেয়ের আধপেটা খাওয়া, শাওনের রোগবালাই, ভাদ্রের বিয়ের পণ ও টুসু গান, আশ্বিনের স্বয়ম্ভর ও দুর্নীতি, কার্তিকের ঈদের নামাজ, অঘ্রানের উন্নতির স্বপ্ন, পৌষের তালাকের হুমকি, মাঘের শীত ও নির্যাতন, ফাগুনের চিকেন পক্স ও মেয়েবেচা, চৈত্রের মশা ও মিটিং মিছিলের শিক্ষা। অবশেষে তিনি ঘোষণা করেন — “যে লোক উন্নতি দিবে, যে লোক সৎ, যে দেখেছে এতদিন, যে জন মহৎ – তারই বোতামে দিব টিপছাপ আমি।”
মল্লিকা সেনগুপ্ত (১৯৬০-২০১১) আধুনিক বাংলা কবিতার এক উজ্জ্বল ও নারীবাদী কণ্ঠস্বর। তিনি ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’, ‘মেঘের উপমা’, ‘কবিতার খাতা’ কাব্যগ্রন্থের জন্য বিখ্যাত। তাঁর কবিতায় নারীশ্রমিক, ভোটার নারী ও সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বিশেষভাবে ফুটে ওঠে। “ভোটার মেয়ের বারোমাস্যা” সেই ধারার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে মঙ্গলকাব্যের ফুল্লরা চরিত্রকে তিনি প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে বাংলার প্রতিটি নারী ভোটারের দাবি ও বঞ্চনার কথা সরল ও সাবলীল ছন্দে ফুটিয়ে তুলেছেন। শেষের স্বাধীন সিদ্ধান্তটি অসাধারণ — তিনি কাউকে অন্ধ ভোট দেবেন না, সৎ ও উন্নতিকামী প্রার্থীকেই ভোট দেবেন।
মল্লিকা সেনগুপ্ত: নারী, প্রান্তজীবন ও প্রতিরোধের কবি
মল্লিকা সেনগুপ্ত ১৯৬০ সালের ২৫ জুন পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় নারীবাদী চেতনার অন্যতম পুরোধা।
তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে — ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’, ‘মেঘের উপমা’, ‘রোদ যেখানে সেবা করে’, ‘কবিতার খাতা’, ‘নির্বাচিত কবিতা’ প্রভৃতি। তিনি অকালে প্রয়াত হন ২০১১ সালে।
মল্লিকা সেনগুপ্তের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো — (১) নারীবাদী ও সামাজিক বঞ্চনার প্রতিবাদী চেতনা (২) গ্রামীণ নারীর কণ্ঠস্বর ও ‘ফুল্লরা’ চরিত্রের প্রতীকায়ন (৩) বাংলা বর্ষপঞ্জি ও আঞ্চলিক ভাষার অনন্য ব্যবহার (৪) প্রচলিত মঙ্গলকাব্যের ধারায় নতুন ব্যঞ্জনা সৃষ্টি (৫) সরল, সাবলীল ও প্রবাহিত ছন্দ। ‘ভোটার মেয়ের বারোমাস্যা’ সেই ধারার এক অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে ফুল্লরা চরিত্রের মাধ্যমেই কৃষি, গৃহস্থালি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারী নির্যাতন ও ভোটাধিকার প্রসঙ্গ এক করুণ ও হাস্যরসাত্মক শৈলীতে ফুটে উঠেছে।
ভোটার মেয়ের বারোমাস্যা শিরোনামের গূঢ়ার্থ: ফুল্লরার ভোটদানের আপাত অনিচ্ছা আর অন্তর্নিহিত চাহিদা
শিরোনাম ‘ভোটার মেয়ের বারোমাস্যা’ — এখানে ‘বারোমাস্যা’ অর্থ বারো মাসের গল্প বা বারো মাসের অবস্থা। ‘ভোটার মেয়ে’ বলতে ফুল্লরার মতো সাধারণ গ্রামীণ নারী — যাঁরা সম্পত্তি বা সামাজিক স্থিতি এতটুকু না থাকলেও ভোট দেন। পুরো কবিতায় ফুল্লরা বাবুকে (প্রার্থী বা আবেদনকারীকে) জিজ্ঞেস করছেন — বারো মাসের প্রতিটি মাসেই তুমি ভোট চাও, অথচ আমার অভাব, কষ্ট, অসুখ ও লাঞ্ছনার দিন শেষ হয় না। কেন ভোট দেবো?
শেষ পর্যন্ত ভোট দেবেন, কিন্তু আগে চেনা দরকার সৎ ও উন্নতিকামী প্রার্থীকে। ‘বারোমাস্যা’ শব্দটি মঙ্গলকাব্যের ‘মঙ্গলবারের বাণী’ বা ‘কবি কঙ্কনের চণ্ডী’র ছায়ায় নির্মিত — নতুন আঙ্গিকে এক প্রতিবাদী কাব্যগাথা।
ভোটার মেয়ের বারোমাস্যা: মাসভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ — প্রতিটি লাইনের গভীর অর্থ
ভূমিকা: ভোট চাস ক্যানে বাবু, বারো মাসে তেরো ফুঁটা, গতর ভরা চোট, বাঁকুড়া-পুরুল্লা-গৌড় বঙ্গ রাঢ়
“ভোট চাস ক্যানে বাবু, কাকে দিব ভোট ? / বারো মাসে তেরো ফুঁটা, গতর ভরা চোট / বাঁকুড়া, পুরুল্লা, গৌড় বঙ্গ রাঢ় / মঙ্গলকাব্যের দশা আজও ফুল্লরার।”
প্রথম লাইনে ফুল্লরা ‘বাবু’কে (ভোটপ্রার্থী নেতা বা এজেন্ট) প্রশ্ন করেন — ‘ভোট চাস কেন, কাকে দেব?’ ‘বারো মাসে তেরো ফুঁটা’ মানে সারাবছরই কষ্ট — ‘গতর ভরা চোট’ মানে গায়ে জ্বালা-বেদনা। ‘মঙ্গলকাব্যের দশা আজও ফুল্লরার’ — প্রাচীন মঙ্গলকাব্যের ফুল্লরা চরিত্রের দুর্গতি আজও বদলায়নি।
বৈশাখ: তেষ্টায় ছাতি ফাটে, কাদামাটি পথ, কলসি মাথায় সোনামোতি বিল, বৈশাখী ঝড়ে বউবি, জলের আশায় হাঁটা
“বৈশাখে কি করে বাবু ভোট দিব বল / তেষ্টায় ছাতি ফাটে নাই টিপকল / কাদামাটি পথ ভাঙে কয়েক মাইল / কলসি মাথায় হেঁটে সোনামোতি বিল / বৈশাখী ঝড়ের মধ্যে বউবিটিগুলা, / জলের আশায় হাঁটে পেটে জ্বলে চুলা।”
বৈশাখের প্রচণ্ড গরমে টিউবওয়েল নেই (‘টিপকল’ শব্দটি আঞ্চলিক), হাঁটতে হয় কয়েক মাইল কাদা পথ। ‘বউবি’ বধূরা পানির সন্ধানে ছোটে, ঘরে রান্নার জন্য নিদারুণ কষ্ট।
জ্যৈষ্ঠ: ধান-ভাত নেই মা ষষ্ঠীর থানে, বর্গার মহলে কাজ, স্বামী পলায়িত, ছাগল চরানো
“জষ্টিমাসে বাবু ভোট দিব কুন প্রাণে ? / ধান নাই ভাত নাই মা ষষ্ঠীর থানে / পেট ভাতা কাজ করি বর্গার মহলে, / স্বামী পলায়ে গেছে মহুয়া জঙ্গলে / ছাগল চরাতে যাই মাঠে ঘাস লাই / সবুজের খুঁজে কুথা ব্যাটাকে পাঠাই ?”
জ্যৈষ্ঠ মাসে ফসল নেই, অনাহার। ‘বর্গা’ বা ভাগচাষের কাজ করেন, স্বামী পলিয়েছেন, ছাগল চরান। ‘সবুজের খোঁজে’ ব্যাটা (ছেলে) কোথায় পাঠাবেন — ভাবা যায় না।
আষাঢ়: বৃষ্টিতে বাচ্চার মুখে জল, ইস্কুল ঠেঙ্গানো, মিড ডে মিলের ডিম, পড়ুয়ার বুকে দ্রিদিম দ্রিদিম
“আষাঢ়ে কেমনে বাবু ভোট দিব তুকে ? / ছাত ফুঁড়ে জল পড়ে বাচ্চাটার মুখে / পাঁচ ক্রোশ হেঁটে মেয়ে ইস্কুল ঠেঙ্গায় / গেলে তবু আধপেটা ডালভাত খায় / মিড ডে মিলের পাতে একখানি ডিম / পড়ুয়ার বুকে বাজে দ্রিদিম দ্রিদিম।”
বর্ষায় ছাতা ফুটো, বাচ্চা ভিজছে। মেয়ে পাঁচ ক্রোশ হেঁটে স্কুল যায়, সেখানে মিড ডে মিলে ডিম পায়। শিক্ষার উন্নয়নের প্রতীক ‘দ্রিদিম দ্রিদিম’ — শিখতে হবে।
শ্রাবণ: কলেরা-আন্ত্রিক, উজার বসত, নিমুনিয়া, ওষুধ শহরে, ভিজা কাঠ ও নুনহীন পান্তা
“শাওনে কিকরে বাবু ভোট দিবো আর ? / কলেরা আন্ত্রিক এসে বসত উজার। / ভিজে ভিজে ছেলেটার নিমুনিয়া ধরে। / স্বাস্থ্যকেন্দ্র গাঁয়ে কিন্তু ওষুধ শহরে। / ভিজা কাঠে জ্বলছেনা চুলার আগুন। / রানিবাঁধে ফুল্লরার পান্তা আনতে নুন।”
শ্রাবণে রোগের প্রকোপ, হাসপাতাল ও ওষুধের অভাব, নুনহীন পান্তা ভাত — চরম অভাব চিহ্নিত হয়েছে।
ভাদ্র: ভাদুগান, পুরুলিয়ার ফুল্লরার গান, মেয়ের বিয়ের কবে, পণের টাকা নেই, টুসু গান
“ভাদর এসেছে ঘরে ভাদুগান ভাসে। / পুরুল্যের ফুল্লরাও গাইছে অভ্যাসে। / মেয়ে বলে ‘মা, মোর কবে দিবি বিহা ? / কত লোক ডাকে পথে চোখে লোভ নিয়া, / তবু বিটি খালিপেটে গায় টুসু গান / পণ দিব টাকা কোথা, ঘরে নাই ধান।”
ভাদু ও টুসু গানের মধ্য দিয়ে বিয়ের প্রস্তাবনায় কনের পণের টাকা নেই, ভাতঘরে ধান নেই। ফুল্লরার মেয়েরা খালিপেটে গান গায়।
আশ্বিন: বীরভূমের ফুল্লরা ও দামোদর, স্বয়ম্ভর ও সেলাই ফোঁড়াই, মেয়েদের টাকা কেড়ে বর মদ খায়
“আশ্বিন মাসেতে ভোট দিব কার ঘর ? / বীরভূমে ফুল্লরার ঘরে দামোদর। / স্বয়ম্ভর গোষ্ঠী বেঁধে সেলাই ফোঁড়াই। / গাঁয়ের মেয়েকে টাকা দিছিস তোরাই। / সেই টাকা কেড়ে নিয়ে বর মদ খায়। / পঞ্চায়েতে বল বাবু কি হবে উপায় ?”
আশ্বিনে স্বয়ম্ভরে গাঁয়ের মেয়ের উপার্জিত টাকা নিয়ে বর মদ খায়, পঞ্চায়েত অক্ষম।
কার্তিক: ভোটের কথা কম বলো, মা দুর্গার পট আঁকা, রোজা, ঈদের নামাজ মাঠে পড়ার আয়োজন
“কার্তিকে ভোটের কথা বোলো দিদি কম। / মা দুগ্গার পট আঁকি ফুল্লরা বেগম। / সারাদিন রোজা রেখে ফল খাই সাঁঝে, / যদিও মেয়েরা নাই ঈদের নামাজে / দল বেঁধে রুখে উঠি যত বিবিগণ / নামাজ পড়ব মাঠে আমরা কজন।”
কার্তিকে পটচিত্র আঁকা, রোজা রাখা; নারীরা মাঠে নামাজ পড়ার দাবি তোলে — ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও নারীর স্বাধিকার মিশে গেছে।
অঘ্রাণ: সুঘ্রাণ ভাসে, ময়নাগুঁড়ির হাটে ফুল্লরার জোট, মায়ের থাকা থেকে এগিয়ে আসা, আছি সুখে, ভোট দেব
“অঘ্রানে সুঘ্রাণ ভাসে, কাকে দিই ভোট ? / ময়নাগুঁড়ির হাটে ফুল্লরার জোট, / পার্টি করি তাই বাবু জোট শিখে গেছি / আমার মায়ের থাকে আমি এগিয়েছি / আগের চাইতে তবু আছি বটে সুখে / আমাকে দেখিস তুই ভোট দিব তুকে।”
অঘ্রানে জোটবদ্ধ হয়েছেন ফুল্লরার দল, আগের চাইতে উন্নতির সুখ। ভোট দিতে সম্মত।
পৌষ: খেজুরের গুড়, স্বামী রস পেড়ে আনে, তালাকের হুমকি, দিদি-বাবুর কাছে ন্যায় বিচার চাওয়া
“পৌষমাসে সর্বনাশ তবু ভোট চাস ? / খেজুরের গুড়ে যদি না উঠে সুবাস ? / স্বামী গাছের থেকে রস পেড়ে আনে / সেই রস জ্বাল দিই সারা দিনমানে / যখেন তালাক দিবে ভাঙে দিবে মাজা, / দিদিরা বাবুরা ঠিক দিবি ওকে সাজা ?”
পৌষে গুড় তৈরির মগ্নতা; স্বামী তালাকের হুমকি দিলে দিদি-বাবুরা (সমাজ) শাস্তি দেবেন? দুর্বল আইন ব্যবস্থা।
মাঘ: শীত, ছেঁড়া আলোয়ান, না আসা বিদ্যুৎ, না হওয়া পাকা রাস্তা, স্বামীর নির্যাতন ও ডাইনি ভেবে পোড়ানো
“মাঘের ঠান্ডায় বাবু ডাকিস না ভোটে / ছেঁড়া আলোয়ানে শীত মানায়না মোটে। / বিজলী আসবে কবে রাস্তা পাকা হবে ? / কবে সব ছেলেমেয়ে অ আ ক খ কবে ? / যদি বলি বৌটাকে মারিসনা আর / আমাকে ডাইনি বলে পুড়াবে আবার।”
মৌলিক সুবিধা বিদ্যুৎ, পাকা রাস্তা ও শিক্ষার অভাব; নারী নির্যাতন ও ডাইনি প্রথার প্রসঙ্গ চমকে দেয়।
ফাল্গুন: ভোটার মিছিলে ডাকো? চিকেন পক্সের দিন পাশে ছিলে? বসন্তের টীকা? মেয়েবেচার প্রতিকার কোথায়?
“ফাগুনে ডাকছ দিদি ভোটার মিছিলে ? / চিকেন পক্সের দিন তুমি পাশে ছিলে ? / কাকে কাকে দিয়েছিলে বসন্তের টীকা ? / কোথা ছিল পঞ্চায়েত কোথা প্রতিকার / যিদিন মেয়ের বাপ দালালের হাতে / বেচে দিলে মেয়েটাকে খারাপ পাড়াতে ?”
চিকেন পক্সে টিকা ও স্বাস্থ্যসেবা না পাওয়া, মেয়েবেচা প্রতিরোধের ব্যবস্থা না থাকা — সরাসরি অভিযোগ।
চৈত্র: মশার কামড়, গরমে কাবু, রাতের ইস্কুলে বর্ণপরিচয়, মিটিং মিছিল, ভোট দেব তোকে, তুই বড় সৎ লোক
“চৈত্রমাসে কেনে তুরা ভোট চাস বাবু ? / মশার কামড় আর গরমে কাবু। / রাতের ইস্কুলে শিখি বর্ণপরিচয়, / মিটিং মিছিলে শিখি কি করে কি হয়। / এতো কষ্ট তবু বাবু ভোট দিব তোকে। / তু্ই বড় সৎ লোক টেনে নিস বুকে।”
চৈত্রে মশার উপদ্রব ও শিক্ষার আলো মিটিং মিছিলে? সৎ মনে হলে ভোট দেবেন — শেষমেশ আস্থার কথা।
উপসংহার: ভোট দেব, কথা বলে; উন্নতির ছিটা গলে পড়ুক; যে লোক উন্নতি দেবে, সৎ, মহৎ — তার বোতামে টিপছাপ
“তবু আমি ভোট দিব ভোট কথা বলে। / উন্নতির ছিটা যেন পরে মোর গলে। / যে লোক উন্নতি দিবে, যে লোক সৎ, / যে দেখেছে এতদিন, যে জন মহৎ – / তারই বোতামে দিব টিপছাপ আমি। / ইবারের মতো তাই ভোট দিতে নামি॥”
ফুল্লরা বলছেন — তিনি ভোট দেবেন, কিন্তু সৎ, উন্নতিকামী ও প্রকৃত মহৎ ব্যক্তিকেই ভোট দেবেন। এটি গণতন্ত্রের চমৎকার শিক্ষা।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি মঙ্গলকাব্যের ছন্দে রচিত, প্রতিটি স্তবক মাসভিত্তিক সাজানো। ভাষা আঞ্চলিক ও কথ্যভাষার সংমিশ্রণে প্রাণবন্ত। প্রতীক ও চিহ্ন — ‘ফুল্লরা’ (বঞ্চিত নারী), ‘বারোমাস তেরো ফুঁটা’ (সারাবছর কষ্ট), ‘বর্গার মহল’ (ভূমিহীন শ্রমিক), ‘মিড ডে মিলের ডিম’ (শিক্ষার প্রণোদনা), ‘বসন্তের টীকা’ (স্বাস্থ্য সুরক্ষা), ‘টিপছাপ’ (ভোট চিহ্ন) — অসাধারণ। পুনরাবৃত্তি — প্রতিটি মাসের শেষে ‘ভোট দিব’ বা ভোটদানের প্রশ্ন। সমাপ্তিতে জবাবী কর্তব্য — সৎ ও মহৎ প্রার্থীর জয়গান।
ভোটার মেয়ের বারোমাস্যা: রাজনীতি ও নারীর মুক্তির অসাধারণ গণতান্ত্রিক দর্শন
মল্লিকা সেনগুপ্তের এই কবিতা গ্রামবাংলার নারীদের নীরব প্রতিবাদের কাব্য। ক্ষুধা, রোগ, কুসংস্কার, নারী নির্যাতন ও ভোটের রাজনীতি এসব অত্যন্ত বাস্তব চিত্র এঁকেছেন। শেষের দাবি — শুধু ভোট দেওয়া নয়, সঠিক ও সৎ প্রার্থীকে ভোট দেওয়া — গণতন্ত্রের স্বার্থক ব্যবহার।
ভোটার মেয়ের বারোমাস্যা: নির্বাচনী বাংলার এক অনবদ্য কাব্যগাথা
নির্বাচনের সময় এই কবিতা অত্যধিক জনপ্রিয়তা লাভ করে। ‘ফুল্লরা’ চরিত্র বাংলার চিরায়ত কাব্যধারায় নতুন ভাবনার সঞ্চার করেছে।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব: ‘ভোটার মেয়ের বারোমাস্যা’ গণতন্ত্র ও সামাজিক সচেতনতা বাড়ায়
পাঠ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে শিক্ষার্থীরা নির্বাচনী প্রক্রিয়া, নারী ও প্রান্তশ্রেণির বঞ্চনা, বাংলার ভূগোল ও ‘মঙ্গলকাব্যের’ আধুনিক ব্যবহার জানতে পারে।
ভোটার মেয়ের বারোমাস্যা (মল্লিকা সেনগুপ্ত) সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর — পরীক্ষা ও সাধারণ জ্ঞানের জন্য
প্রশ্ন ১: ‘ভোটার মেয়ের বারোমাস্যা’ কবিতাটির লেখিকা কে?
মল্লিকা সেনগুপ্ত (১৯৬০-২০১১), আধুনিক বাংলা কবিতার এক জনপ্রিয় নারীবাদী কবি।
প্রশ্ন ২: ‘ফুল্লরা’ চরিত্রটি কী প্রতীক?
গ্রামাঞ্চলের বঞ্চিত, দরিদ্র ও নির্যাতিতা নারী শ্রেণির প্রতীক। বাংলার মঙ্গলকাব্য থেকেও চরিত্রটি গৃহীত।
প্রশ্ন ৩: ‘মঙ্গলকাব্যের দশা আজও ফুল্লরার’ লাইনটির মানে কী?
প্রাচীন সাহিত্যে ফুল্লরা যত কষ্টে ছিলেন, আজও বঞ্চিত নারীরা তত কষ্টেই রয়েছেন — অগ্রগতি হয়নি।
প্রশ্ন ৪: বারো মাসের কোন মাসে শিক্ষার প্রসঙ্গ উঠেছে?
আষাঢ়ে মিড ডে মিল, ভাদ্রে মেয়ের বিয়ের পণ না দেওয়া, চৈত্রে রাতের ইস্কুলে বর্ণপরিচয় ও মিটিং মিছিল উল্লিখিত।
প্রশ্ন ৫: ‘বর্গার মহল’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
যে কৃষাণ জমির মালিকের জমিতে ভাগ নিয়ে চাষ করে, তাকে ‘বর্গা চাষি’ বলে। ফুল্লরা সেই কঠিন শ্রম করে।
প্রশ্ন ৬: ‘মিড ডে মিলের পাতে একখানি ডিম’ কেন উল্লেখযোগ্য?
এটি সরকারি স্কুলের মধ্যাহ্নভোজন প্রকল্প — দরিদ্র পড়ুয়াদের পুষ্টি নিশ্চিত করে ও বিদ্যালয়ে ধরে রাখে।
প্রশ্ন ৭: ‘স্বামী পলায়ে গেছে মহুয়া জঙ্গলে’ লাইনটি কী বোঝায়?
স্বামী বেকার, অন্যের কাছে ঠকে গিয়ে বনে পালিয়েছেন — সংসারের দায়িত্ব একা ফুল্লরার ঘাড়ে।
প্রশ্ন ৮: কার্তিক মাসে ফুল্লরার কোন ধর্মীয় প্রসঙ্গ এসেছে?
দুর্গার পট আঁকা, রোজা রাখা, ঈদের নামাজ মাঠে পড়ার সংকল্প — যাতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নারীর অধিকার ও ঐক্যের বার্তা বোঝানো হয়েছে।
প্রশ্ন ৯: ‘ময়নাগুঁড়ির হাটে ফুল্লরার জোট’ লাইনটির তাৎপর্য কী?
এটি গ্রামের স্ত্রীসংঘ বা সমবায় ব্যবস্থার ইঙ্গিত — মিলে দর কষাকষি, ব্যবসা ও সচেতনতা বোঝায়।
প্রশ্ন ১০: ‘বসন্তের টীকা’ প্রসঙ্গ ফাগুনে কেন?
চিকেন পক্সের প্রতিষেধক বসন্ত টিকা। ফুল্লরা অভিযোগ করেন, নির্বাচনের সময় টিকা দেওয়া হয়নি, শুধু ভোট চাওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন ১১: ‘মেয়ের বাপ দালালের হাতে বেচে দিলে মেয়েটাকে’ লাইনটির সামাজিক প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করো।
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কন্যাশিশু বিক্রির ঘটনা উদাহরণ। ফুল্লরা এখানে তারই বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান।
প্রশ্ন ১২: ‘ডাইনি বলে পুড়াবে’ — কোন ধরনের কুসংস্কারের দিকে ইঙ্গিত?
অনেক গ্রামে নির্দোষ নারীকে ‘ডাইনি’ সাব্যস্ত করে নির্যাতন ও হত্যা করা হয় — ফুল্লরাও সেই হুমকিতে রয়েছে।
প্রশ্ন ১৩: ‘ভোট দিব তোকে, তুই বড় সৎ লোক’ — এই লাইনে ফুল্লরা মানছেন কোন বাবুকে?
সাধারণ কোনও প্রার্থী নয়, কেবল তাকে স্বীকার করবেন যিনি সত্যিই সৎ ও উন্নতির কাজ করেছেন।
প্রশ্ন ১৪: ‘ইবারের মতো তাই ভোট দিতে নামি’ — উক্তিটি স্বাধীন ভোটাধিকারের প্রতিফলন হয় কীভাবে?
ফুল্লরা নিজ ইচ্ছায় ও নির্ধারিত সৎ ব্যক্তিকেই ভোট দেওয়ার শপথ নেন — এটাই আসল গণতন্ত্রের ভিত্তি।
প্রশ্ন ১৫: ‘ভোটার মেয়ের বারোমাস্যা’ কোন সাহিত্যের ধারায় রচিত?
এটি আধুনিক মঙ্গলকাব্য ধারায় রচিত, যেখানে কাব্যগাথার ছন্দ ও আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করেছেন।
প্রশ্ন ১৬: ‘বারো মাসে তেরো ফুঁটা’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
অসুখ-বিরক্তি আর গায়ে ব্যথা বারো মাস লেগেই থাকে; তেরো ফুঁটা মানে বাড়তি যন্ত্রণা।
প্রশ্ন ১৭: কবিতায় ফুল্লরার মেয়েরা ‘টুসু’ ও ‘ভাদু’ গান গায় কেন?
এটি গ্রামীণ নারীদের আঞ্চলিক লোকসংগীত চর্চার ছবি — যা একইসঙ্গে বিনোদন ও বিয়ের আগে কন্যার ব্যাকুলতা প্রকাশ করে।
প্রশ্ন ১৮: ‘গরমে কাবু’ ও ‘মশার কামড়’ দিয়ে কী বোঝানো হয়েছে?
গ্রীষ্মে মশার উপদ্রব ও গরমে অস্থিরতা আর নানা অসুবিধা তালিকাভুক্ত করা হয়েছে স্বাস্থ্যহানির প্রতীক হিসেবে।
প্রশ্ন ১৯: ‘উন্নতির ছিটা যেন পরে মোর গলে’ — অর্থ কী?
উন্নতির ছিটা মানে উন্নতির অল্প অংশ, যা যেন তার গলায় পড়ে (শান্তির প্রতীক হিসেবে গলায় পড়া)।
প্রশ্ন ২০: এই কবিতার মাধ্যমে লেখিকা কী বার্তা দিতে চেয়েছেন?
পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর রাজনৈতিক সচেতনতা অপরিহার্য। কেবল ভোট দেওয়া নয়, সৎ ও উন্নতিকামী প্রার্থীকে ভোট দেওয়াও জরুরি। শুধু প্রার্থী নয়, আমজনতারও কর্তব্য রয়েছে।
ভোটার মেয়ের বারোমাস্যা: ফুল্লরার গণতান্ত্রিক অভিযান ও জেগে ওঠার কাব্য
মল্লিকা সেনগুপ্তের ‘ভোটার মেয়ের বারোমাস্যা’ বাংলা কবিতায় অসাধারণ এক রচনা। ফুল্লরা চরিত্রের মাধ্যমে তিনি কেবল ভোটপ্রার্থীর চরিত্রই আঁকেননি, বরং গ্রামীন নারীর দারিদ্র্য, রোগ, কুসংস্কার, নির্যাতন ও প্রতিরোধের গভীর বাস্তবতাও ফুটিয়ে তুলেছেন। বারো মাসের প্রতিটি মাসই যেন অভাবের একেকটি গল্প। শেষ পর্যন্ত ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন — কিন্তু শুধু সৎ ও উন্নতিকামী প্রার্থীকে। এই শিক্ষা গণতন্ত্র ও নারীর ক্ষমতায়নের চরম দৃষ্টান্ত।
ট্যাগস: ভোটার মেয়ের বারোমাস্যা, মল্লিকা সেনগুপ্ত, ফুল্লরা, মঙ্গলকাব্যের নারী, বারো মাসের কষ্ট, গ্রামীণ নারী নির্যাতন, ভোট ও গণতন্ত্র, নারীবাদী কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, উন্নতির ছিটা
© Kobitarkhata.com – কবি: মল্লিকা সেনগুপ্ত | “যে লোক উন্নতি দিবে, যে লোক সৎ, তারই বোতামে দিব টিপছাপ আমি” — নারী ভোটারের দৃপ্ত স্বাক্ষর।