বাঘের মেয়েকে আমি হিংসা পড়ানোর দায়িত্ব পেয়েছি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নতুন পাঠক্রমে
তাকে ভর্তি করতে চায় তার বাবা-মা।
হাতে-পায়ে তার এত বাঘনখ
দাঁতে তার টুটি কামড়ে ধরার আহ্লাদ
চোখে জঙ্গলের ব্যাকরণ।
আমি তাকে নতুন কী হিংসা পড়াব ?
তবু তাকে হিংসা-কবিতা, হিংসা-অঙ্ক
হিংসা-কুইজ ও হিংসা ব্যাকরণ পড়াই।
দেখি, এ-সম্পর্কে তার জ্ঞান বড় কম!
বাঘের মেয়ে, এখনও ঠিকমতো হিংসা বানান লিখতে শেখেনি?
আমি তার বাবা-মাকে ডেকে বলি—
আপনার মেয়ে এই হুঙ্কার শিখছে তো
এই ভুলে যাচ্ছে থাবার কৌশল,
এই দাঁতের তীক্ষ্ণতা রপ্ত করছে তো
এই ভুলে যাচ্ছে হুঙ্কার।
ওকে এক বছর হিংসাপুরের হস্টেলে রেখে আসুন।
আজ এক বছর পরে দেখি—
দূর মাঠ ভেঙে বাঘ আসছে মেয়েকে নিয়ে
মানুষের কাছে হিংসা পড়াতে!
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। রতনতনু ঘাটীর কবিতা।
কবিতার কথা—
রতনতনু ঘাটীর ‘নতুন পাঠক্রম’ কবিতাটি আধুনিক সভ্যতার অমানবিকতা এবং মানুষের অর্জিত ‘হিংসা’র এক তীব্র বিদ্রূপাত্মক আখ্যান। কবি এখানে এক অদ্ভুত রূপক ব্যবহার করেছেন—যেখানে বনের রাজা বাঘ তার সন্তানকে হিংসা শেখানোর জন্য পাঠাচ্ছে মানুষের তৈরি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এটি কেবল একটি কল্পনাপ্রসূত গল্প নয়, বরং এটি সমকালীন মানব সমাজের সেই ভয়ানক পতনের দিকে ইঙ্গিত করে, যেখানে বনের পশুদের চেয়েও মানুষ অনেক বেশি নিষ্ঠুর, কৌশলী এবং পরিকল্পিতভাবে হিংস্র হয়ে উঠেছে।
কবিতার প্রথমাংশেই আমরা এক অদ্ভুত পরিস্থিতির মুখোমুখি হই। একজন শিক্ষক বা কবি দায়িত্ব পেয়েছেন বাঘের মেয়েকে ‘হিংসা’ পড়ানোর। এটি একটি চরম শ্লেষ। প্রাকৃতিকভাবেই বাঘ হিংস্র; তার নখে বাঘনখ আছে, দাঁতে টুটি কামড়ে ধরার সহজাত প্রবৃত্তি আছে এবং চোখে আছে জঙ্গলের আদিম ব্যাকরণ। কিন্তু কবির প্রশ্নটি অত্যন্ত ধারালো—‘আমি তাকে নতুন কী হিংসা পড়াব?’ অর্থাৎ, প্রকৃতির দেওয়া সেই সহজাত হিংস্রতার বাইরেও কি অন্য কোনো ধরণের হিংসা আছে? উত্তরটি লুকিয়ে আছে কবিতার পরবর্তী স্তবকগুলোতে।
কবি যখন বাঘের মেয়েকে ‘হিংসা-কবিতা’, ‘হিংসা-অঙ্ক’ এবং ‘হিংসা ব্যাকরণ’ পড়াতে বসেন, তখন এক আশ্চর্য সত্য বেরিয়ে আসে। বাঘের মেয়েটি আসলে এই সব বিদ্যায় কাঁচা। সে ঠিকমতো ‘হিংসা’ বানান লিখতে পারে না, শিকারের কৌশল ভুলে যায় কিংবা দাঁতের তীক্ষ্ণতা রপ্ত করলেও হুঙ্কার দিতে অক্ষম হয়ে পড়ে। এখানে কবি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, বনের পশুর হিংস্রতা হলো জৈবিক বা প্রাকৃতিক—সেটি বাঁচার জন্য বা খাদ্যের জন্য। কিন্তু মানুষের হিংসা হলো ‘শিক্ষিত’ এবং ‘পরিকল্পিত’। মানুষের হিংসার পেছনে থাকে ব্যাকরণ, থাকে কূটকৌশল এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা। বাঘের মেয়ের সেই সহজাত সরলতা মানুষের এই জটিল হিংসার পাঠক্রমের সাথে তাল মেলাতে পারছে না।
কবিতার মধ্যভাগে এক ধরণের কৌতুকপ্রদ ও বিষণ্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। শিক্ষক বাঘের বাবা-মাকে পরামর্শ দিচ্ছেন সন্তানকে ‘হিংসাপুরের হস্টেলে’ পাঠিয়ে দিতে। এই ‘হিংসাপুর’ আসলে আমাদের আধুনিক নগরজীবন বা সেই সব প্রতিষ্ঠান, যেখানে মানুষকে শেখানো হয় কীভাবে অন্যকে টপকে যেতে হয়, কীভাবে স্বার্থের জন্য অন্যের ক্ষতি করতে হয়। মানুষের সমাজ আজ এমনই এক হস্টেলে পরিণত হয়েছে যেখানে কেবল টিকে থাকার লড়াই নয়, বরং অপরকে ধ্বংস করার বিদ্যাই হলো উচ্চশিক্ষা।
কবিতার অন্তিম চরণে এক মহা-বিদ্রূপের বিস্ফোরণ ঘটে। এক বছর পরে দেখা যায়, বাঘ তার মেয়েকে নিয়ে মানুষের কাছে আসছে হিংসা শিখতে। এই একটি বাক্যেই কবি বর্তমান পৃথিবীর চালচিত্র বদলে দিয়েছেন। আদিম কাল থেকে মানুষ বাঘকে ভয় পেত তার হিংস্রতার জন্য। কিন্তু আজ বাঘ নিজেই ভয়ে কম্পমান মানুষের সেই ভয়ংকর রূপ দেখে। মানুষের কাছে যে ধরণের মারণাস্ত্র আছে, যে ধরণের কূটচাল আছে এবং যেভাবে মানুষ ঠান্ডা মাথায় স্বজাতিকে ধ্বংস করতে পারে, তা বনের পশুর কল্পনাতেও নেই। তাই আজ বাঘকে মানুষের কাছে টিউশনি নিতে আসতে হয়—শিখতে হয় আধুনিক পৃথিবীর ‘অ্যাডভান্সড’ হিংসা।
রতনতনু ঘাটী এখানে আমাদের শিক্ষার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। যে পাঠক্রমে সহমর্মিতা, করুণা বা দয়া নেই, যে শিক্ষা কেবল মানুষকে স্বার্থপর আর হিংস্র হতে শেখায়, সেই শিক্ষা বাঘের সহজাত পাশবিকতার চেয়েও অনেক বেশি বিপজ্জনক। বাঘের হিংসা তার পেটে, কিন্তু মানুষের হিংসা তার মস্তকে। আর মস্তকের এই বিষ যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে ঢুকে পড়ে, তখন পৃথিবী এক বিশাল ‘হিংসাপুর’ হয়ে ওঠে।
নতুন পাঠক্রম – রতনতনু ঘাটী | রতনতনু ঘাটীর কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা | হিংসা শিক্ষা, বাঘের মেয়ে ও বিদ্রূপের অসাধারণ কাব্যভাষা
নতুন পাঠক্রম: রতনতনু ঘাটীর হিংসা শিক্ষা, বাঘের মেয়ে ও সভ্যতার বিদ্রূপের অসাধারণ কাব্যভাষা
রতনতনু ঘাটীর “নতুন পাঠক্রম” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য, ব্যঙ্গাত্মক ও গভীর সৃষ্টি। এটি একটি ছোট কবিতা, কিন্তু এর বিদ্রূপ ও প্রশ্ন অসীম। “বাঘের মেয়েকে আমি হিংসা পড়ানোর দায়িত্ব পেয়েছি। / বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নতুন পাঠক্রমে / তাকে ভর্তি করতে চায় তার বাবা-মা” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক অসাধারণ বিদ্রূপ — বাঘের মেয়েকে মানুষ হিংসা পড়াতে চায়। বাঘের হাতে-পায়ে বাঘনখ, দাঁতে টুটি কামড়ে ধরার আহ্লাদ, চোখে জঙ্গলের ব্যাকরণ। তবু তাকে হিংসা-কবিতা, হিংসা-অঙ্ক, হিংসা-কুইজ ও হিংসা ব্যাকরণ পড়ানো হয়। তার বাবা-মাকে বলা হয় — ‘ওকে এক বছর হিংসাপুরের হস্টেলে রেখে আসুন’। এক বছর পর দেখা যায় — দূর মাঠ ভেঙে বাঘ আসছে মেয়েকে নিয়ে — মানুষের কাছে হিংসা পড়াতে! অর্থাৎ বাঘের মেয়ে যখন মানুষ হয়ে যায়, তখন বাঘকে আবার মানুষের কাছে হিংসা পড়াতে আসতে হয়। রতনতনু ঘাটী একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় ব্যঙ্গ, বিদ্রূপ, সামাজিক সমালোচনা ও অদ্ভুত উপমার ব্যবহারের জন্য পরিচিত। ‘নতুন পাঠক্রম’ তাঁর সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি বাঘের মেয়ের হিংসা শিক্ষার গল্পের মাধ্যমে সভ্যতার হিংসা ও শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি তীক্ষ্ণ বিদ্রূপ করেছেন।
রতনতনু ঘাটী: ব্যঙ্গ, বিদ্রূপ ও অদ্ভুত উপমার কবি
রতনতনু ঘাটী একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় ব্যঙ্গ, বিদ্রূপ, সামাজিক সমালোচনা ও অদ্ভুত উপমার ব্যবহারের জন্য পরিচিত। ‘নতুন পাঠক্রম’ তাঁর সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি একটি কাল্পনিক চরিত্রের মাধ্যমে বাস্তবের কঠিন প্রশ্ন তুলেছেন।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘নতুন পাঠক্রম’ (২০১৫), ‘নির্বাচিত কবিতা’ (২০২০) ইত্যাদি।
শিরোনাম ও কেন্দ্রীয় বিদ্রূপ
শিরোনাম ‘নতুন পাঠক্রম’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘নতুন পাঠক্রম’ — শিক্ষার নতুন সিলেবাস, নতুন বিষয়। কিন্তু এখানে সেই ‘নতুন পাঠক্রম’-এ পড়ানো হয় ‘হিংসা’। বাঘের মেয়েকে হিংসা পড়ানো হচ্ছে — অথচ বাঘ তো হিংসার প্রতীক। এই বিপরীত চিত্রায়নের মধ্য দিয়েই কবি সভ্যতার হিংসা ও শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি বিদ্রূপ করেছেন।
স্তবকভিত্তিক বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: বাঘের মেয়েকে হিংসা পড়ানোর দায়িত্ব
“বাঘের মেয়েকে আমি হিংসা পড়ানোর দায়িত্ব পেয়েছি। / বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নতুন পাঠক্রমে / তাকে ভর্তি করতে চায় তার বাবা-মা।” — প্রথম স্তবকে সেটিং তৈরি। বাঘের মেয়ে — যার স্বভাবগতভাবে হিংসা থাকার কথা। তাকে হিংসা পড়ানো হবে। বাবা-মা তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নতুন পাঠক্রমে’ ভর্তি করতে চান। এখানে বিদ্রূপ শুরু — যার সহজাত গুণ, তাকেই শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে।
দ্বিতীয় স্তবক: বাঘের মেয়ের প্রাকৃতিক হিংসার লক্ষণ
“হাতে-পায়ে তার এত বাঘনখ / দাঁতে তার টুটি কামড়ে ধরার আহ্লাদ / চোখে জঙ্গলের ব্যাকরণ।” — বাঘের মেয়ের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে। ‘বাঘনখ’ — নখ, যা হিংসার অস্ত্র। ‘টুটি কামড়ে ধরার আহ্লাদ’ — শিকারের সময় টুটি কামড়ে ধরা বাঘের স্বভাব, এখানে তা ‘আহ্লাদ’ — অর্থাৎ আনন্দের বিষয়। ‘চোখে জঙ্গলের ব্যাকরণ’ — চোখের দৃষ্টিতে জঙ্গলের নিয়ম, প্রকৃতির কঠোরতা ফুটে ওঠে।
তৃতীয় স্তবক: কী পড়াব? — প্রশ্ন ও বিভ্রম
“আমি তাকে নতুন কী হিংসা পড়াব ?” — একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বাঘের মেয়ে তো হিংসায় সিদ্ধহস্ত। তাকে নতুন কী হিংসা পড়ানো যায়? এই প্রশ্নের ভেতরই লুকিয়ে আছে বিদ্রূপ — মানুষ হয়ত বাঘের চেয়েও নানাভাবে হিংস্র, সেটাই শেখানো হবে।
চতুর্থ স্তবক: হিংসার আনুষ্ঠানিক শিক্ষা
“তবু তাকে হিংসা-কবিতা, হিংসা-অঙ্ক / হিংসা-কুইজ ও হিংসা ব্যাকরণ পড়াই। / দেখি, এ-সম্পর্কে তার জ্ঞান বড় কম! / বাঘের মেয়ে, এখনও ঠিকমতো হিংসা বানান লিখতে শেখেনি?” — এখানে বিদ্রূপ চরমে। ‘হিংসা-কবিতা’, ‘হিংসা-অঙ্ক’, ‘হিংসা-কুইজ’, ‘হিংসা ব্যাকরণ’ — হিংসাকেও আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বিষয়বস্তু বানানো হয়েছে। ‘হিংসা বানান লিখতে না শেখা’ — ব্যঙ্গের চরম প্রকাশ। বাঘের মেয়ে বানান শেখেনি, কিন্তু হিংসা করতে জানে।
পঞ্চম স্তবক: হিংসাপুরের হস্টেলে পাঠানোর পরামর্শ
“আমি তার বাবা-মাকে ডেকে বলি— / আপনার মেয়ে এই হুঙ্কার শিখছে তো / এই ভুলে যাচ্ছে থাবার কৌশল, / এই দাঁতের তীক্ষ্ণতা রপ্ত করছে তো / এই ভুলে যাচ্ছে হুঙ্কার। / ওকে এক বছর হিংসাপুরের হস্টেলে রেখে আসুন।” — এখানে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। ‘হুঙ্কার’ শিখছে, আবার ভুলে যাচ্ছে ‘থাবার কৌশল’। ‘দাঁতের তীক্ষ্ণতা’ রপ্ত করছে, আবার ভুলে যাচ্ছে ‘হুঙ্কার’। অর্থাৎ একটি গুণ শিখতে গিয়ে আরেকটি গুণ হারিয়ে ফেলছে। ‘হিংসাপুরের হস্টেল’ — নামটিই ব্যঙ্গাত্মক। হিংসার হস্টেলে হিংসা শিক্ষা দেওয়া হয়।
ষষ্ঠ স্তবক: এক বছর পর — বাঘ আসছে মেয়েকে নিয়ে হিংসা পড়াতে
“আজ এক বছর পরে দেখি— / দূর মাঠ ভেঙে বাঘ আসছে মেয়েকে নিয়ে / মানুষের কাছে হিংসা পড়াতে!” — এটি কবিতার চূড়ান্ত বিদ্রূপ ও সমাপ্তি। এক বছর পর বাঘ আসছে মেয়েকে নিয়ে — মানুষের কাছে হিংসা পড়াতে। অর্থাৎ বাঘের মেয়ে যখন ‘হিংসাপুরের হস্টেলে’ শিক্ষা নিয়ে ফিরেছে, তখন সে এতটাই সভ্য হয়ে গেছে যে বাঘকে আবার মানুষের কাছ থেকে হিংসা শিখতে হচ্ছে।
প্রতীক ও রূপকের গভীর পাঠ
‘বাঘের মেয়ে’ — প্রকৃতি, স্বাভাবিক হিংস্রতা, যা সভ্যতা ধ্বংস করতে চায়। ‘বাঘনখ’ — প্রাকৃতিক অস্ত্র, হিংসার উপকরণ। ‘টুটি কামড়ে ধরার আহ্লাদ’ — প্রাকৃতিক শিকারের আনন্দ। ‘জঙ্গলের ব্যাকরণ’ — প্রকৃতির নিয়ম, জীবনের কঠোর সত্য। ‘হিংসা-কবিতা, হিংসা-অঙ্ক, হিংসা-কুইজ, হিংসা ব্যাকরণ’ — আনুষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যঙ্গ, যা হিংসাকে পদ্ধতিগত ও যান্ত্রিক করে তোলে। ‘হিংসা বানান লিখতে না শেখা’ — সভ্যতার মাপকাঠিতে বাঘের মেয়েকে অশিক্ষিত বলে চিহ্নিত করা। ‘হুঙ্কার ও থাবার কৌশল’ — বাঘের দুটি ভিন্ন আক্রমণ কৌশল, যা একসঙ্গে ধরে রাখতে পারে না। ‘হিংসাপুরের হস্টেল’ — নামটিতে ব্যঙ্গ। ‘দূর মাঠ ভেঙে বাঘ আসছে’ — প্রকৃতির প্রত্যাবর্তন, যা সভ্যতা দমন করতে পারেনি। ‘মানুষের কাছে হিংসা পড়াতে আসা’ — চূড়ান্ত বিদ্রূপ — মানুষ যাকে সভ্য বলে দাবি করে, সেই মানুষই আসলে হিংসার আধুনিক পাঠশালা।
ব্যঙ্গের চারটি স্তর
প্রথম স্তর: বাঘের মেয়েকে হিংসা পড়ানো — যার সহজাত গুণ, তাকে শিক্ষা দেওয়া। দ্বিতীয় স্তর: হিংসাকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বিষয়বস্তু বানানো — হিংসা-কবিতা, হিংসা-অঙ্ক, হিংসা-কুইজ। তৃতীয় স্তর: হিংসাপুরের হস্টেল — নামটির ব্যঙ্গ। চতুর্থ ও শেষ স্তর: বাঘ আসছে মানুষের কাছে হিংসা পড়াতে — অর্থাৎ সভ্য মানুষই আসলে বাঘের চেয়েও বেশি হিংস্র।
‘হিংসা বানান’ — কেন বানান?
‘হিংসা বানান লিখতে না শেখা’ লাইনটি অত্যন্ত ব্যঙ্গাত্মক। বাঘের মেয়ে বানান জানে না, কিন্তু হিংসা করতে জানে। আবার সভ্য মানুষেরা বানান জানে, কিন্তু হিংসা করে কীভাবে — সেটাও জানে। বানান জানা আর হিংসা করার মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই।
প্রশ্নোত্তর: গভীর পাঠের জন্য
প্রশ্ন ১: ‘নতুন পাঠক্রম’ কবিতাটির লেখক কে?
উত্তর: এই কবিতাটির লেখক রতনতনু ঘাটী। তিনি একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি।
প্রশ্ন ২: বাঘের মেয়েকে কী পড়ানো হবে?
উত্তর: তাকে ‘হিংসা’ পড়ানো হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন পাঠক্রমে তাকে ভর্তি করাতে চায় তার বাবা-মা।
প্রশ্ন ৩: বাঘের মেয়ের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলো কী কী?
উত্তর: হাতে-পায়ে বাঘনখ, দাঁতে টুটি কামড়ে ধরার আহ্লাদ, চোখে জঙ্গলের ব্যাকরণ।
প্রশ্ন ৪: কবি তাকে কী কী পড়ান?
উত্তর: হিংসা-কবিতা, হিংসা-অঙ্ক, হিংসা-কুইজ ও হিংসা ব্যাকরণ পড়ান।
প্রশ্ন ৫: ‘হিংসা বানান লিখতে শেখেনি’ — লাইনটির ব্যঙ্গ কোথায়?
উত্তর: বাঘের মেয়ে বানান জানে না, কিন্তু হিংসা করতে জানে। আবার সভ্য মানুষেরা বানান জানে, কিন্তু হিংসা করে কীভাবে — সেটাও জানে। বানান জানা আর হিংসা করার মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই।
প্রশ্ন ৬: ‘হুঙ্কার’ ও ‘থাবার কৌশল’ — কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: বাঘের দুটি ভিন্ন আক্রমণ কৌশল। একটু শিখতে গিয়ে আরেকটি ভুলে যাচ্ছে — অর্থাৎ আনুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রাকৃতিক দক্ষতাকে নষ্ট করে।
প্রশ্ন ৭: ‘হিংসাপুরের হস্টেল’ — নামটির ব্যঙ্গ কী?
উত্তর: হিংসার হস্টেলে হিংসা শিক্ষা দেওয়া হয় — এটি যেন এক বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। নামটিই সভ্যতার হিংসার প্রতি বিদ্রূপ।
প্রশ্ন ৮: এক বছর পর কী ঘটে?
উত্তর: দূর মাঠ ভেঙে বাঘ আসছে মেয়েকে নিয়ে — মানুষের কাছে হিংসা পড়াতে।
প্রশ্ন ৯: বাঘ কেন মানুষের কাছে হিংসা পড়াতে আসে?
উত্তর: কারণ বাঘের মেয়ে যখন ‘হিংসাপুরের হস্টেলে’ শিক্ষা নিয়ে ফিরেছে, তখন সে এতটাই সভ্য হয়ে গেছে যে বাঘকে আবার মানুষের কাছ থেকে হিংসা শিখতে হচ্ছে। এটি চূড়ান্ত বিদ্রূপ — মানুষ আসলে বাঘের চেয়েও বেশি হিংস্র।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
উত্তর: কবিতাটি শেখায় — সভ্যতা যাকে ‘শিক্ষা’ বলে, তা আসলে মানুষকে আরও পরিশীলিত হিংস্র করে তোলে। বাঘের মেয়েকে হিংসা পড়ানো হয় — অথচ বাঘ প্রাকৃতিকভাবে হিংস্র। আবার সভ্য মানুষ হিংসাকে প্রতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। শেষ পর্যন্ত বাঘ আসে মানুষের কাছে হিংসা পড়াতে — অর্থাৎ মানুষই প্রকৃতির চেয়েও বেশি হিংস্র। আজকের যুদ্ধ, নৃশংসতা, অস্ত্র প্রতিযোগিতার যুগে এই কবিতা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
ট্যাগস: নতুন পাঠক্রম, রতনতনু ঘাটী, রতনতনু ঘাটীর কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, ব্যঙ্গ ও বিদ্রূপ, হিংসার শিক্ষা, সভ্যতার সমালোচনা
© Kobitarkhata.com – কবি: রতনতনু ঘাটী | কবিতার প্রথম লাইন: “বাঘের মেয়েকে আমি হিংসা পড়ানোর দায়িত্ব পেয়েছি” | হিংসা শিক্ষা, বাঘের মেয়ে ও সভ্যতার বিদ্রূপের অসাধারণ কাব্যভাষা | আধুনিক বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন