কবিতার খাতা
- 44 mins
চন্দনগাছ কবিতা – শুভ দাশগুপ্ত।
বেলা হল অনেক,
রোদ্দুর ঢলেছে পশ্চিমে
কলকাকলির পাখিরা ডানায় মেখেছে সিঁদুর।
মা, আমি এবার ফিরতে চাই মা।
ঝকঝকে মাঁজা কাঁসার গ্লাসে ঠাণ্ডা জল,
সঙ্গে একটু বাতাসা,
বৃষ্টি ধোয়া রাতে চালে ডালে খিচুড়ির মহাপ্রসাদ,
জ্বরে অসুখে কপালে ঠাণ্ডা হাতের বরাভয়,
আঘাতে বিপদে উদ্বিগ্ন চোখের জল।
মা, আমি আবার এইসব মহার্ঘ আবহে
ফিরে আসতে চাই মা।
মাটির উঠোনের এককোনে তুলসীর মঞ্চ,
তার নিচে শান্ত বেড়াল ছানা,
কাঠ চাঁপার ডালে লাল পিঁপড়ে, মৌমাছি।
কুয়োর অনেক নীচে বৃত্তাকার জলছবিতে
টুপটাপ পাতাঝরা ।
বাড়ির পিছনদিকের বাঁশঝাড়ে শৈশবের রাক্ষসী
পেত্নী ব্ৰহ্মদত্যি।
ঘুম ঘুম বেশি রাতে।
মা, আমি আবার ফিরে যেতে চাই
সেই সব সোনার খনিতে।
মা, আমি ফিরে যেতে চাই।
তোমার ছায়ায়, তোমার আশ্রয়ে
আবার আমি ফিরে যেতে চাই।
কলকাতায় এঁটো থালা
ফেলে দেওয়া মাটির ভাঁড়ের মতো
বড় বেশী উপেক্ষায়
ফুরোল জীবন, কাটলো সময়।
বাবুদের বাড়ি ইলিশ রান্না হলে ঘ্রাণে
অর্ধেকের বেশী চেটে পুটে খাওয়ার
স্বপ্নে বিভোর কাজের মেয়েটির মতো
অতৃপ্ত ফুরোল দুপুর,
অভুক্ত রাত।
গলা ফাটিয়ে এই শহরের বিনিদ্র পথে পথে
কতবার বলতে চেয়েছি
সব ঝুট হেয়, সব ঝুট হেয়।
বলতে পারিনি মা।
সাহসে কুলোয় নি।
মোহিনী মুখোশের সামনে নত হয়েছি,
সেলাম ঠুকেছি।
মা, এখানে আর থাকবো না মা।
আমি ফিরে যাবো।
মা, তুমি বলেছিলে-
খোকন চন্দন গাছ হবি, তবে বড় হতে পারবি।
কাটলে ছিড়লে, কোপালে শব্দ করবি না,
কাঁদবি না। তবে হবি বড়।
চন্দনের গন্ধ শুধু ছড়াবি বাতাসে
অকৃপণ অকাতর কাঠুরিয়া সময়কে
দিবি অমুল্য সুবাস।
মা, আমি পারিনি মা।
চন্দন গাছ হতে পারিনি মা।
কথ দিয়ে কথা না রাখা মোহিনী চোখ
কত খুবলে ছিঁড়ে নিয়ে গেছে
বুকের ভেতর থেকে রক্তমাখা গান,
অশ্রুময় কবিতা, ব্যথার নীল ছবি
বেচেছে চাঁদের হাটে।
খ্যাতি, অর্থ, সম্মানের নীলাজ মোচ্ছবে
আমি চন্দন গাছ হতে চেয়েছিলাম।
কিন্তু আমি হতে পারিনি।
ডালে ডালে পাতায় পাতায় তীব্র বিষ,
বড় জ্বালা।
কলকাতার বেশ্যারা, কলকাতার
বাউন্ডুলে ভিক্ষুকেরা,
কলকাতার বেপরোয়া মাতালেরা
চাদরের খুঁট থেকে বের করে দিতে
চেয়েছে কিছু স্নেহ কিছু মমতা।
আমি তাও নিতে পারিনি অঞ্জলি ভরে।
এ দু হাত সময়ের পদসেবায় ক্ষতবিক্ষত,
অনেক আলোর লোভে
অনেক আলোর জৌলুসে
ছুটে গেছি বার বার ।
মরিয়া পতঙ্গের মতো পুরে গেছে ডানা
আলোর মানুষেরা আলোই চেয়েছে
পাঁজর দিয়েছি খুলে।
সেই হাড়ের হাসিমুখে আগুন জ্বেলেছে।
সেই আঁচে ঝলসে ঠিক নিয়েছে
সাজিয়ে মহার্ঘ আহার।
খ্যাতি, অর্থ, প্রতিষ্ঠার মোগলাই খানা।
এবার আমি ফিরতে চাই মা।
দগ্ধ, ধ্বস্ত, শ্রান্ত আমি একটু ঘুমোতে চাই।
মা, তুমি কি এখনো আছো?
ঝিঁ ঝিঁ ডাক সন্ধ্যায় লন্ঠনের দীন আলো হাতে,
এখনো কি দরজায় ক্ষীণ চোখে পথ চেয়ে থাকো?
এখনো কি খোকনের জন্য দাও রেখে,
নিজেকে অভুক্ত রেখে ভাত ডাল রুটি?
এবার আমায় ডেকে নাও মা।
চন্দনগাছ হয়ে ওঠা আমার হল না জীবনে।
বিষাক্ত কাঁটা গাছ,
তুমি তো মা, তুমি নাও ডেকে।
আমি জানি সারা পৃথিবীর বুকে একমাত্র
চন্দনগাছ তুমি।
তোমার আশ্রয়ের সুগন্ধে ফেরাও আমাকে মা।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। শুভ দাশগুপ্ত।
চন্দনগাছ কবিতা – শুভ দাশগুপ্ত | চন্দনগাছ কবিতা শুভ দাশগুপ্ত | শুভ দাশগুপ্তের কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা
চন্দনগাছ কবিতা: শুভ দাশগুপ্তের মায়ের আশ্রয়, শহরের নিষ্ঠুরতা ও আত্ম-উপলব্ধির অসাধারণ কাব্যভাষা
শুভ দাশগুপ্তের “চন্দনগাছ কবিতা” একটি অনন্য সৃষ্টি, যা মা ও সন্তানের অটুট বন্ধন, শহরের নিষ্ঠুরতা ও গ্রামের শান্তির সন্ধানের এক গভীর কাব্যিক অন্বেষণ। “বেলা হল অনেক, / রোদ্দুর ঢলেছে পশ্চিমে / কলকাকলির পাখিরা ডানায় মেখেছে সিঁদুর। / মা, আমি এবার ফিরতে চাই মা।” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক গভীর চেতনা — শহরের কৃত্রিমতা, কোলাহল ও প্রতিযোগিতায় ক্লান্ত সন্তান আবার ফিরে যেতে চায় মায়ের কাছে, গ্রামের সেই শৈশবের জগতে, যেখানে ছিল কাঁসার গ্লাসের ঠাণ্ডা জল, বাতাসা, খিচুড়ির মহাপ্রসাদ, মায়ের স্নেহশীল হাত। শুভ দাশগুপ্ত বাংলা সাহিত্যের একজন প্রতিশ্রুতিমান কবি। তাঁর কবিতায় মাতৃভক্তি, শহর-গ্রামের দ্বন্দ্ব, আত্ম-উপলব্ধি ও মানবিক মূল্যবোধের অসাধারণ প্রকাশ ঘটে। “চন্দনগাছ কবিতা” তাঁর একটি বহুপঠিত কবিতা যা চন্দনগাছের রূপকের মাধ্যমে সন্তানের প্রতি মায়ের আদর্শ ও সন্তানের সেই আদর্শে পৌঁছতে না পারার বেদনাকে ফুটিয়ে তুলেছে।
শুভ দাশগুপ্ত: আধুনিক বাংলা কবিতার নতুন কণ্ঠস্বর
শুভ দাশগুপ্ত আধুনিক বাংলা কবিতার একজন প্রতিশ্রুতিমান কবি। তাঁর কবিতায় মাতৃভক্তি, শহর-গ্রামের দ্বন্দ্ব, আত্ম-উপলব্ধি ও মানবিক মূল্যবোধের অসাধারণ প্রকাশ ঘটে। তিনি সহজ-সরল ভাষায় গভীর মানবিক অনুভূতি ফুটিয়ে তোলেন। তাঁর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো বাস্তব জীবনের নিখুঁত চিত্রায়ণ ও আবেগের তীব্র প্রকাশ।
তাঁর উল্লেখযোগ্য কবিতার মধ্যে রয়েছে ‘চন্দনগাছ কবিতা’, ‘মায়ের কাছে ফেরা’, ‘শহরের কবিতা’, ‘গ্রামের স্মৃতি’ প্রভৃতি। তাঁর কবিতা বাংলার বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হয় এবং পাঠকমহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়।
চন্দনগাছের প্রতীকী তাৎপর্য
চন্দনগাছ এই কবিতার কেন্দ্রীয় প্রতীক। চন্দন কাঠ তার সুগন্ধের জন্য বিখ্যাত। চন্দনগাছের একটি বিশেষ গুণ আছে — কাটলে বা ছিঁড়লে এটি কোনও শব্দ করে না, কাঁদে না, বরং তার সুগন্ধ ছড়িয়ে দেয় চারপাশে। মা তাঁর সন্তানকে চন্দনগাছ হতে বলেছেন — অর্থাৎ জীবনের আঘাত, বেদনা, কষ্ট নীরবে সহ্য করে নিজের গুণে, নিজের সুবাসে সবাইকে মুগ্ধ করতে। কিন্তু কবি স্বীকার করেন — তিনি চন্দনগাছ হতে পারেননি, তিনি হয়েছেন বিষাক্ত কাঁটাগাছ। এই আত্ম-উপলব্ধিই কবিতার মূল সুর।
চন্দনগাছ কবিতার বিস্তারিত বিশ্লেষণ
কবিতার শিরোনামের তাৎপর্য
“চন্দনগাছ কবিতা” শিরোনামটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। চন্দনগাছের রূপক এখানে আদর্শ মানবের প্রতীক — যে কষ্ট নীরবে সহ্য করে, আঘাতে আহত হয়েও শুধু সুগন্ধ ছড়ায়। কবি তাঁর মায়ের দেওয়া এই আদর্শে পৌঁছতে পারেননি — এই বেদনাই কবিতার কেন্দ্রীয় ভাব।
প্রথম স্তবকের বিশ্লেষণ: গ্রামের স্মৃতি ও ফেরার আকুতি
“বেলা হল অনেক, / রোদ্দুর ঢলেছে পশ্চিমে / কলকাকলির পাখিরা ডানায় মেখেছে সিঁদুর। / মা, আমি এবার ফিরতে চাই মা। / ঝকঝকে মাঁজা কাঁসার গ্লাসে ঠাণ্ডা জল, / সঙ্গে একটু বাতাসা, / বৃষ্টি ধোয়া রাতে চালে ডালে খিচুড়ির মহাপ্রসাদ, / জ্বরে অসুখে কপালে ঠাণ্ডা হাতের বরাভয়, / আঘাতে বিপদে উদ্বিগ্ন চোখের জল। / মা, আমি আবার এইসব মহার্ঘ আবহে / ফিরে আসতে চাই মা। / মাটির উঠোনের এককোনে তুলসীর মঞ্চ, / তার নিচে শান্ত বেড়াল ছানা, / কাঠ চাঁপার ডালে লাল পিঁপড়ে, মৌমাছি। / কুয়োর অনেক নীচে বৃত্তাকার জলছবিতে / টুপটাপ পাতাঝরা । / বাড়ির পিছনদিকের বাঁশঝাড়ে শৈশবের রাক্ষসী / পেত্নী ব্ৰহ্মদত্যি। / ঘুম ঘুম বেশি রাতে। / মা, আমি আবার ফিরে যেতে চাই / সেই সব সোনার খনিতে। / মা, আমি ফিরে যেতে চাই। / তোমার ছায়ায়, তোমার আশ্রয়ে / আবার আমি ফিরে যেতে চাই।” প্রথম স্তবকে কবি গ্রামের শৈশবের স্মৃতি ও ফিরে আসার আকুতি বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন — বেলা অনেক হয়েছে, রোদ্দুর পশ্চিমে ঢলেছে, পাখিরা ডানায় সিঁদুর মেখেছে। মা, আমি এবার ফিরতে চাই। ঝকঝকে কাঁসার গ্লাসে ঠাণ্ডা জল, একটু বাতাসা, বৃষ্টিধোয়া রাতে খিচুড়ির মহাপ্রসাদ, জ্বরে-অসুখে কপালে ঠাণ্ডা হাতের স্পর্শ, আঘাতে-বিপদে চোখের জল — এই সব মহার্ঘ আবহে ফিরে আসতে চাই। মাটির উঠোনের এক কোণে তুলসীর মঞ্চ, তার নিচে শান্ত বেড়াল ছানা, কাঠচাঁপার ডালে লাল পিঁপড়ে, মৌমাছি। কুয়োর অনেক নীচে বৃত্তাকার জলছবিতে টুপটাপ পাতা ঝরে। বাড়ির পিছনের বাঁশঝাড়ে শৈশবের রাক্ষসী-পেত্নী-ব্রহ্মদত্যি। ঘুম ঘুম বেশি রাতে। মা, আমি আবার ফিরে যেতে চাই সেই সব সোনার খনিতে। তোমার ছায়ায়, তোমার আশ্রয়ে আবার ফিরে যেতে চাই ।
‘বেলা হল অনেক, রোদ্দুর ঢলেছে পশ্চিমে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
সময় অনেক হয়েছে, জীবন সায়াহ্নে এসেছে। পশ্চিমে ঢলা রোদ্দুর জীবনের শেষ প্রান্তের ইঙ্গিত বহন করে। এই উপলব্ধি থেকেই ফিরে যাওয়ার আকুতি।
‘কলকাকলির পাখিরা ডানায় মেখেছে সিঁদুর’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
পাখিদের ডানায় সিঁদুর মাখা — প্রকৃতির এই চিত্র সন্ধ্যার আগমনকে নির্দেশ করে। পাখিরা তাদের নীড়ে ফিরছে, কবিও তাঁর প্রকৃত নীড়ে — মায়ের কাছে ফিরতে চান।
‘ঝকঝকে মাঁজা কাঁসার গ্লাসে ঠাণ্ডা জল, সঙ্গে একটু বাতাসা’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
এই ছোট ছোট জিনিসগুলো গ্রামীণ জীবনের সরল আনন্দের প্রতীক। শহরের জটিলতায় ক্লান্ত কবি এই সরলতার দিকে ফিরে যেতে চান।
‘জ্বরে অসুখে কপালে ঠাণ্ডা হাতের বরাভয়’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
মায়ের হাতের স্পর্শ, যা অসুখে সান্ত্বনা, বিপদে আশীর্বাদ। এই স্পর্শই কবির কাছে পরম পাওয়া।
‘মাটির উঠোনের এককোনে তুলসীর মঞ্চ, তার নিচে শান্ত বেড়াল ছানা’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
গ্রামীণ বাংলার চিরচেনা চিত্র। তুলসী মঞ্চ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক, বেড়াল ছানা প্রকৃতির সহাবস্থানের প্রতীক।
‘কুয়োর অনেক নীচে বৃত্তাকার জলছবিতে টুপটাপ পাতাঝরা’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
কুয়োর জলে পাতার প্রতিবিম্ব — প্রকৃতির এই চিত্র এক অনন্ত শান্তির বার্তা বহন করে। সময়ের টুপটাপ শব্দে পাতা ঝরে, তবু জল স্থির।
দ্বিতীয় স্তবকের বিশ্লেষণ: শহরের নির্মমতা
“কলকাতায় এঁটো থালা / ফেলে দেওয়া মাটির ভাঁড়ের মতো / বড় বেশী উপেক্ষায় / ফুরোল জীবন, কাটলো সময়। / বাবুদের বাড়ি ইলিশ রান্না হলে ঘ্রাণে / অর্ধেকের বেশী চেটে পুটে খাওয়ার / স্বপ্নে বিভোর কাজের মেয়েটির মতো / অতৃপ্ত ফুরোল দুপুর, / অভুক্ত রাত। / গলা ফাটিয়ে এই শহরের বিনিদ্র পথে পথে / কতবার বলতে চেয়েছি / সব ঝুট হেয়, সব ঝুট হেয়। / বলতে পারিনি মা। / সাহসে কুলোয় নি। / মোহিনী মুখোশের সামনে নত হয়েছি, / সেলাম ঠুকেছি। / মা, এখানে আর থাকবো না মা। / আমি ফিরে যাবো।” দ্বিতীয় স্তবকে কবি শহরের নির্মমতার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — কলকাতায় এঁটো থালা, ফেলে দেওয়া মাটির ভাঁড়ের মতো উপেক্ষায় ফুরোল জীবন, কাটলো সময়। বাবুদের বাড়ি ইলিশ রান্না হলে ঘ্রাণে অর্ধেকের বেশি চেটেপুটে খাওয়ার স্বপ্নে বিভোর কাজের মেয়েটির মতো অতৃপ্ত ফুরোল দুপুর, অভুক্ত রাত। গলা ফাটিয়ে শহরের পথে পথে কতবার বলতে চেয়েছি — সব মিথ্যে, সব মিথ্যে। বলতে পারিনি মা। সাহস হয়নি। মোহিনী মুখোশের সামনে নত হয়েছি, সেলাম ঠুকেছি। মা, এখানে আর থাকব না, আমি ফিরে যাব ।
‘কলকাতায় এঁটো থালা ফেলে দেওয়া মাটির ভাঁড়ের মতো বড় বেশী উপেক্ষায় ফুরোল জীবন’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
শহরের জীবনে মানুষ অপদস্থ, উপেক্ষিত, অবহেলিত। এঁটো থালার মতো তাঁকে ফেলে দেওয়া হয়, মাটির ভাঁড়ের মতো তাঁর কোনো মূল্য নেই।
‘বাবুদের বাড়ি ইলিশ রান্না হলে ঘ্রাণে অর্ধেকের বেশী চেটে পুটে খাওয়ার স্বপ্নে বিভোর কাজের মেয়েটির মতো অতৃপ্ত ফুরোল দুপুর’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
এটি শহরের শ্রেণী বৈষম্যের চিত্র। বাবুদের বাড়িতে ইলিশ রান্না হয়, কিন্তু কাজের মেয়ে শুধু ঘ্রাণ পায়। সে স্বপ্ন দেখে অর্ধেকের বেশি খাওয়ার — কিন্তু তা কখনও পূরণ হয় না। কবির জীবনও তেমনি অতৃপ্ত থেকেছে।
‘গলা ফাটিয়ে এই শহরের বিনিদ্র পথে পথে কতবার বলতে চেয়েছি সব ঝুট হেয়’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
শহরের ভণ্ডামি, মেকি আচরণ, কৃত্রিমতা দেখে কবি বারবার চিৎকার করতে চেয়েছেন — সব মিথ্যে! কিন্তু পারেননি।
‘মোহিনী মুখোশের সামনে নত হয়েছি, সেলাম ঠুকেছি’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
শহরের এই মোহিনী মুখোশ — সাফল্য, খ্যাতি, অর্থ, প্রতিষ্ঠা — যার মায়ায় মানুষ নত হয়, সেলাম ঠোকে। কবিও তার ব্যতিক্রম নন।
তৃতীয় স্তবকের বিশ্লেষণ: চন্দনগাছ হওয়ার আদর্শ ও ব্যর্থতা
“মা, তুমি বলেছিলে- / খোকন চন্দন গাছ হবি, তবে বড় হতে পারবি। / কাটলে ছিড়লে, কোপালে শব্দ করবি না, / কাঁদবি না। তবে হবি বড়। / চন্দনের গন্ধ শুধু ছড়াবি বাতাসে / অকৃপণ অকাতর কাঠুরিয়া সময়কে / দিবি অমুল্য সুবাস। / মা, আমি পারিনি মা। / চন্দন গাছ হতে পারিনি মা। / কথ দিয়ে কথা না রাখা মোহিনী চোখ / কত খুবলে ছিঁড়ে নিয়ে গেছে / বুকের ভেতর থেকে রক্তমাখা গান, / অশ্রুময় কবিতা, ব্যথার নীল ছবি / বেচেছে চাঁদের হাটে। / খ্যাতি, অর্থ, সম্মানের নীলাজ মোচ্ছবে / আমি চন্দন গাছ হতে চেয়েছিলাম। / কিন্তু আমি হতে পারিনি। / ডালে ডালে পাতায় পাতায় তীব্র বিষ, / বড় জ্বালা।” তৃতীয় স্তবকে কবি চন্দনগাছ হওয়ার আদর্শ ও তাঁর ব্যর্থতার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — মা, তুমি বলেছিলে — খোকন, চন্দনগাছ হবি, তবে বড় হতে পারবি। কাটলে, ছিঁড়লে, কোপালে শব্দ করবি না, কাঁদবি না, তবে বড় হবি। চন্দনের গন্ধ শুধু ছড়াবি বাতাসে, অকৃপণ অকাতর কাঠুরিয়া সময়কে দিবি অমূল্য সুবাস। মা, আমি পারিনি মা। চন্দনগাছ হতে পারিনি মা। কথা দিয়ে কথা না রাখা মোহিনী চোখ কত খুবলে ছিঁড়ে নিয়েছে বুকের ভেতর থেকে রক্তমাখা গান, অশ্রুময় কবিতা, ব্যথার নীল ছবি — বেচেছে চাঁদের হাটে। খ্যাতি, অর্থ, সম্মানের মোচ্ছবে আমি চন্দনগাছ হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমি হতে পারিনি। ডালে ডালে পাতায় পাতায় তীব্র বিষ, বড় জ্বালা ।
‘কাটলে ছিড়লে, কোপালে শব্দ করবি না, কাঁদবি না’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
মায়ের আদর্শ — চন্দনগাছের মতো নীরবে সহ্য করতে হবে জীবনের সব আঘাত। কষ্ট পেলেও কাঁদতে নেই, অভিযোগ করতে নেই।
‘চন্দনের গন্ধ শুধু ছড়াবি বাতাসে অকৃপণ অকাতর কাঠুরিয়া সময়কে দিবি অমুল্য সুবাস’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
নীরবে সহ্য করলেও, আঘাত পেলেও চন্দনের গন্ধের মতো নিজের গুণ, নিজের ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতে হবে। কাঠুরিয়া সময় — যে আমাদের কাটে, তাকেও সুবাস দিতে হবে।
‘কথ দিয়ে কথা না রাখা মোহিনী চোখ কত খুবলে ছিঁড়ে নিয়ে গেছে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
শহরের এই মোহিনী চোখ — প্রতিশ্রুতি দিয়ে কথা না রাখা মানুষ। তারা কবির বুকের ভেতর থেকে রক্তমাখা গান, অশ্রুময় কবিতা কেড়ে নিয়েছে — বেচেছে চাঁদের হাটে। অর্থাৎ তাঁর সৃষ্টি, তাঁর আবেগকে পণ্য বানিয়েছে।
‘ডালে ডালে পাতায় পাতায় তীব্র বিষ, বড় জ্বালা’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
চন্দনগাছ হতে না পেরে তিনি হয়ে গেছেন বিষাক্ত কাঁটাগাছ। তাঁর ভেতর জ্বালা, যন্ত্রণা, বিষ জমেছে। এই আত্ম-উপলব্ধিই কবিতার কেন্দ্রীয় বেদনা।
চতুর্থ স্তবকের বিশ্লেষণ: কলকাতার প্রান্তিক মানুষ
“কলকাতার বেশ্যারা, কলকাতার / বাউন্ডুলে ভিক্ষুকেরা, / কলকাতার বেপরোয়া মাতালেরা / চাদরের খুঁট থেকে বের করে দিতে / চেয়েছে কিছু স্নেহ কিছু মমতা। / আমি তাও নিতে পারিনি অঞ্জলি ভরে। / এ দু হাত সময়ের পদসেবায় ক্ষতবিক্ষত, / অনেক আলোর লোভে / অনেক আলোর জৌলুসে / ছুটে গেছি বার বার । / মরিয়া পতঙ্গের মতো পুরে গেছে ডানা / আলোর মানুষেরা আলোই চেয়েছে / পাঁজর দিয়েছি খুলে। / সেই হাড়ের হাসিমুখে আগুন জ্বেলেছে। / সেই আঁচে ঝলসে ঠিক নিয়েছে / সাজিয়ে মহার্ঘ আহার। / খ্যাতি, অর্থ, প্রতিষ্ঠার মোগলাই খানা।” চতুর্থ স্তবকে কবি কলকাতার প্রান্তিক মানুষ ও তাঁর নিজের ক্ষতের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — কলকাতার বেশ্যারা, কলকাতার বাউন্ডুলে ভিক্ষুকেরা, কলকাতার বেপরোয়া মাতালেরা চাদরের খুঁট থেকে বের করে দিতে চেয়েছে কিছু স্নেহ, কিছু মমতা। আমিও তা নিতে পারিনি অঞ্জলি ভরে। এই দুই হাত সময়ের পদসেবায় ক্ষতবিক্ষত। অনেক আলোর লোভে, অনেক আলোর জৌলুসে ছুটে গেছি বারবার। মরিয়া পতঙ্গের মতো পুড়ে গেছে ডানা। আলোর মানুষেরা আলোই চেয়েছে, পাঁজর দিয়েছি খুলে। সেই হাড়ের হাসিমুখে আগুন জ্বেলেছে। সেই আঁচে ঝলসে ঠিক নিয়েছে — সাজিয়ে মহার্ঘ আহার। খ্যাতি, অর্থ, প্রতিষ্ঠার মোগলাই খানা ।
‘কলকাতার বেশ্যারা, কলকাতার বাউন্ডুলে ভিক্ষুকেরা, কলকাতার বেপরোয়া মাতালেরা চাদরের খুঁট থেকে বের করে দিতে চেয়েছে কিছু স্নেহ কিছু মমতা’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
শহরের এই প্রান্তিক মানুষগুলো, যাদের সমাজ তুচ্ছ করে, তারাও কিছু স্নেহ-মমতা চেয়েছে কবির কাছে। কিন্তু কবি তা দিতে পারেননি — কারণ তিনি নিজেও সেসব পাননি।
‘মরিয়া পতঙ্গের মতো পুরে গেছে ডানা / আলোর মানুষেরা আলোই চেয়েছে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
কবি পতঙ্গের মতো আলোর পেছনে ছুটেছেন। কিন্তু আলোর মানুষেরা — যারা সফল, প্রতিষ্ঠিত — তারা শুধু তাঁর আলো চেয়েছেন, তাঁকে পুড়িয়ে নিয়েছেন।
‘পাঁজর দিয়েছি খুলে। সেই হাড়ের হাসিমুখে আগুন জ্বেলেছে। সেই আঁচে ঝলসে ঠিক নিয়েছে — সাজিয়ে মহার্ঘ আহার’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
কবি নিজের বুক পেতে দিয়েছেন, নিজের সত্তা উজাড় করে দিয়েছেন। আলোর মানুষেরা সেই পোড়া হাড়ের আগুনে নিজেদের খাবার সাজিয়েছে — খ্যাতি, অর্থ, প্রতিষ্ঠা।
পঞ্চম স্তবকের বিশ্লেষণ: ফেরার শেষ আবেদন
“এবার আমি ফিরতে চাই মা। / দগ্ধ, ধ্বস্ত, শ্রান্ত আমি একটু ঘুমোতে চাই। / মা, তুমি কি এখনো আছো? / ঝিঁ ঝিঁ ডাক সন্ধ্যায় লন্ঠনের দীন আলো হাতে, / এখনো কি দরজায় ক্ষীণ চোখে পথ চেয়ে থাকো? / এখনো কি খোকনের জন্য দাও রেখে, / নিজেকে অভুক্ত রেখে ভাত ডাল রুটি? / এবার আমায় ডেকে নাও মা। / চন্দনগাছ হয়ে ওঠা আমার হল না জীবনে। / বিষাক্ত কাঁটা গাছ, / তুমি তো মা, তুমি নাও ডেকে। / আমি জানি সারা পৃথিবীর বুকে একমাত্র / চন্দনগাছ তুমি। / তোমার আশ্রয়ের সুগন্ধে ফেরাও আমাকে মা।” পঞ্চম স্তবকে কবি শেষ আবেদন জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন — এবার আমি ফিরতে চাই মা। দগ্ধ, ধ্বস্ত, শ্রান্ত আমি একটু ঘুমোতে চাই। মা, তুমি কি এখনও আছো? ঝিঁঝিঁ ডাক সন্ধ্যায়, লন্ঠনের দীন আলো হাতে, এখনও কি দরজায় ক্ষীণ চোখে পথ চেয়ে থাকো? এখনও কি খোকনের জন্য রেখে দাও, নিজেকে অভুক্ত রেখে ভাত-ডাল-রুটি? এবার আমায় ডেকে নাও মা। চন্দনগাছ হয়ে ওঠা আমার হল না জীবনে। বিষাক্ত কাঁটাগাছ, তুমি তো মা, তুমি নাও ডেকে। আমি জানি সারা পৃথিবীর বুকে একমাত্র চন্দনগাছ তুমি। তোমার আশ্রয়ের সুগন্ধে ফেরাও আমাকে মা ।
‘দগ্ধ, ধ্বস্ত, শ্রান্ত আমি একটু ঘুমোতে চাই’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
শহরের জীবন তাঁকে দগ্ধ করেছে, ধ্বস্ত করেছে, শ্রান্ত করেছে। তিনি এখন শুধু একটু শান্তি চান, মায়ের কোলে ঘুমোতে চান।
‘ঝিঁ ঝিঁ ডাক সন্ধ্যায় লন্ঠনের দীন আলো হাতে, এখনো কি দরজায় ক্ষীণ চোখে পথ চেয়ে থাকো?’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
মা এখনও কি তাঁর জন্য অপেক্ষা করেন? সন্ধ্যার ঝিঁঝিঁ ডাকে, লন্ঠনের ক্ষীণ আলোয়, দরজায় দাঁড়িয়ে কি তিনি এখনও পথ চেয়ে থাকেন? এই প্রশ্নের মধ্যেই কবির সব আকাঙ্ক্ষা নিহিত।
‘চন্দনগাছ হয়ে ওঠা আমার হল না জীবনে। বিষাক্ত কাঁটা গাছ’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
কবি স্বীকার করেন — তিনি চন্দনগাছ হতে পারেননি। তিনি হয়ে গেছেন বিষাক্ত কাঁটাগাছ। এই আত্ম-উপলব্ধি তাঁর ব্যর্থতার স্বীকৃতি।
‘সারা পৃথিবীর বুকে একমাত্র চন্দনগাছ তুমি’ — শেষ পঙ্ক্তির তাৎপর্য
এটি কবিতার চূড়ান্ত বাণী। পৃথিবীর সব চন্দনগাছের উৎস মা। মা-ই একমাত্র চন্দনগাছ, যিনি সব আঘাত নীরবে সহ্য করেন, শুধু সুগন্ধ ছড়ান। কবি তাঁর কাছে ফিরতে চান, তাঁর আশ্রয়ের সুগন্ধে ফিরতে চান।
কবিতার গঠনশৈলী ও শিল্পরূপ
কবিতাটি পাঁচটি স্তবকে বিভক্ত। প্রথম স্তবকে গ্রামের স্মৃতি ও ফেরার আকুতি, দ্বিতীয় স্তবকে শহরের নির্মমতা, তৃতীয় স্তবকে চন্দনগাছ হওয়ার আদর্শ ও ব্যর্থতা, চতুর্থ স্তবকে কলকাতার প্রান্তিক মানুষ ও নিজের ক্ষত, পঞ্চম স্তবকে ফেরার শেষ আবেদন — এই ক্রমিক কাঠামো কবিতাটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনীর রূপ দিয়েছে। শেষের পঙ্ক্তিতে ‘চন্দনগাছ তুমি’ বলে কবিতা সম্পূর্ণ হয়েছে।
শব্দচয়ন ও শৈলীগত বিশেষত্ব
শুভ দাশগুপ্তের ভাষা সহজ, সরল কিন্তু গভীর আবেগময়। এখানে তিনি ব্যবহার করেছেন — ‘রোদ্দুর ঢলা’, ‘কলকাকলির পাখি’, ‘সিঁদুর মাখা’, ‘কাঁসার গ্লাস’, ‘বাতাসা’, ‘খিচুড়ির মহাপ্রসাদ’, ‘ঠাণ্ডা হাতের বরাভয়’, ‘উদ্বিগ্ন চোখের জল’, ‘মহার্ঘ আবহ’, ‘তুলসীর মঞ্চ’, ‘শান্ত বেড়াল ছানা’, ‘লাল পিঁপড়ে’, ‘মৌমাছি’, ‘বৃত্তাকার জলছবি’, ‘টুপটাপ পাতাঝরা’, ‘বাঁশঝাড়’, ‘শৈশবের রাক্ষসী’, ‘পেত্নী’, ‘ব্রহ্মদত্যি’, ‘সোনার খনি’, ‘এঁটো থালা’, ‘মাটির ভাঁড়’, ‘ইলিশ রান্নার ঘ্রাণ’, ‘কাজের মেয়ে’, ‘অতৃপ্ত দুপুর’, ‘অভুক্ত রাত’, ‘বিনিদ্র পথ’, ‘মোহিনী মুখোশ’, ‘চন্দনগাছ’, ‘কাটলে ছিঁড়লে’, ‘কাঠুরিয়া সময়’, ‘অমূল্য সুবাস’, ‘রক্তমাখা গান’, ‘অশ্রুময় কবিতা’, ‘ব্যথার নীল ছবি’, ‘চাঁদের হাট’, ‘নীলাজ মোচ্ছব’, ‘তীব্র বিষ’, ‘বিষাক্ত কাঁটা গাছ’, ‘কলকাতার বেশ্যা’, ‘বাউন্ডুলে ভিক্ষুক’, ‘বেপরোয়া মাতাল’, ‘চাদরের খুঁট’, ‘স্নেহ-মমতা’, ‘সময়ের পদসেবা’, ‘মরিয়া পতঙ্গ’, ‘পুড়ে যাওয়া ডানা’, ‘পাঁজর খুলে দেওয়া’, ‘হাড়ের হাসিমুখ’, ‘মোগলাই খানা’, ‘দগ্ধ-ধ্বস্ত-শ্রান্ত’, ‘ঝিঁঝিঁ ডাক’, ‘লন্ঠনের দীন আলো’, ‘ক্ষীণ চোখে পথ চেয়ে থাকা’। এই শব্দগুলো গ্রাম-শহরের দ্বন্দ্ব, মাতৃস্নেহ ও আত্ম-উপলব্ধির অপূর্ব চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য
“চন্দনগাছ কবিতা” শুভ দাশগুপ্তের এক অসাধারণ সৃষ্টি। কবি প্রথমে গ্রামের শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করেছেন — কাঁসার গ্লাসে ঠাণ্ডা জল, বাতাসা, খিচুড়ির মহাপ্রসাদ, মায়ের হাতের স্পর্শ, তুলসীর মঞ্চ, বেড়াল ছানা, কাঠচাঁপার ডালে লাল পিঁপড়ে, কুয়োর জলে পাতার প্রতিবিম্ব, বাঁশঝাড়ের রাক্ষসী-পেত্নী — এই সব সোনার খনিতে তিনি ফিরে যেতে চান। তারপর তিনি শহরের নির্মমতা বর্ণনা করেছেন — এঁটো থালার মতো উপেক্ষিত জীবন, ইলিশের ঘ্রাণে বিভোর কাজের মেয়ের মতো অতৃপ্তি, মোহিনী মুখোশের সামনে নত হওয়া। তিনি তাঁর মায়ের আদর্শের কথা মনে করেছেন — চন্দনগাছ হওয়ার কথা, যে কাটলে ছিঁড়লে শব্দ করে না, কাঁদে না, শুধু সুগন্ধ ছড়ায়। কিন্তু তিনি পারেননি — ডালে ডালে পাতায় পাতায় তাঁর জমেছে তীব্র বিষ। কলকাতার প্রান্তিক মানুষগুলো — বেশ্যা, ভিক্ষুক, মাতাল — তাঁর কাছে কিছু স্নেহ-মমতা চেয়েছিল, তিনিও তা দিতে পারেননি। তিনি পতঙ্গের মতো আলোর পেছনে ছুটেছেন, পুড়ে গেছে ডানা। শেষে তিনি ফিরতে চান — মা, তুমি কি এখনও আছো? লন্ঠনের দীন আলোয় দরজায় পথ চেয়ে থাকো? তিনি জানেন, সারা পৃথিবীর বুকে একমাত্র চন্দনগাছ মা। তাঁর আশ্রয়ের সুগন্ধে ফিরতে চান তিনি।
এই কবিতা আমাদের শেখায় — মায়ের আদর্শে পৌঁছানো কঠিন। চন্দনগাছ হওয়া সহজ নয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মা-ই একমাত্র আশ্রয়, যিনি আমাদের বিষাক্ত কাঁটাগাছ হয়েও ডেকে নেন, তাঁর সুগন্ধে ফিরিয়ে নেন।
চন্দনগাছ কবিতায় ব্যবহৃত প্রতীক ও চিহ্নের গভীর বিশ্লেষণ
চন্দনগাছের প্রতীকী তাৎপর্য
চন্দনগাছ এখানে আদর্শ মানবের প্রতীক — যে কষ্ট নীরবে সহ্য করে, আঘাতে আহত হয়েও শুধু সুগন্ধ ছড়ায়। মা-ই সেই আদর্শের উৎস।
কাঁসার গ্লাসের ঠাণ্ডা জলের প্রতীকী তাৎপর্য
গ্রামীণ সরলতার প্রতীক। শহরের জটিলতায় ক্লান্ত কবি এই সরলতার দিকে ফিরে যেতে চান।
তুলসীর মঞ্চের প্রতীকী তাৎপর্য
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক। গ্রামীণ জীবনের আধ্যাত্মিক ভিত্তির প্রতিনিধি।
কুয়োর জলে পাতার প্রতিবিম্বের প্রতীকী তাৎপর্য
সময়ের প্রবাহ ও স্থিরতার দ্বৈত প্রতীক। পাতা ঝরে, কিন্তু জল স্থির থাকে — জীবনের ধারা অব্যাহত।
বাঁশঝাড়ের রাক্ষসী-পেত্নী-ব্রহ্মদত্যির প্রতীকী তাৎপর্য
শৈশবের কল্পনা ও ভয়ের জগতের প্রতীক। সেই জগৎও এখন কবির কাছে সোনার খনি।
এঁটো থালা ও মাটির ভাঁড়ের প্রতীকী তাৎপর্য
শহরের জীবনে মানুষের মূল্যহীনতার প্রতীক। মানুষ ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া হয়, তাঁর কোনো দাম নেই।
কাজের মেয়ের স্বপ্নের প্রতীকী তাৎপর্য
শ্রেণী বৈষম্যের প্রতীক। বাবুদের বাড়িতে ইলিশ রান্না হয়, কাজের মেয়ে শুধু স্বপ্ন দেখে।
মোহিনী মুখোশের প্রতীকী তাৎপর্য
শহরের সাফল্য, খ্যাতি, অর্থ, প্রতিষ্ঠার কৃত্রিমতার প্রতীক। এই মুখোশের সামনে সবাই নত হয়।
কাঠুরিয়া সময়ের প্রতীকী তাৎপর্য
যে সময় আমাদের কাটে, ক্ষত-বিক্ষত করে। তাকেও চন্দনের সুগন্ধ দিতে হয়।
চাঁদের হাটের প্রতীকী তাৎপর্য
যেখানে আবেগ, অনুভূতি, সৃষ্টি পণ্য হয়ে বেচাকেনা হয়। কবির রক্তমাখা গান, অশ্রুময় কবিতা সেখানেই বিক্রি হয়েছে।
কলকাতার বেশ্যা, ভিক্ষুক, মাতালের প্রতীকী তাৎপর্য
শহরের প্রান্তিক মানুষের প্রতীক। তারাও কিছু স্নেহ-মমতা চায়, কিন্তু সমাজ তাদের তুচ্ছ করে।
মরিয়া পতঙ্গের প্রতীকী তাৎপর্য
যে আলোর পেছনে ছুটে পুড়ে যায়। কবিও খ্যাতি-প্রতিষ্ঠার আলোয় পুড়েছেন।
লন্ঠনের দীন আলোর প্রতীকী তাৎপর্য
মায়ের অপেক্ষার প্রতীক। সন্ধ্যার লন্ঠনের ক্ষীণ আলোয় তিনি দরজায় পথ চেয়ে থাকেন।
মা-চন্দনগাছের রূপক
কবিতার শেষ পঙ্ক্তিতে কবি জানিয়েছেন — সারা পৃথিবীর বুকে একমাত্র চন্দনগাছ মা। এই উপলব্ধি কবিতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। মা-ই সেই চন্দনগাছ, যিনি সন্তানের সব আঘাত নীরবে সহ্য করেন, সব কষ্ট হাসিমুখে বরণ করেন। তিনি নিজে পুড়েও শুধু সুগন্ধ ছড়ান। সন্তান চন্দনগাছ হতে পারেনি, হয়েছে বিষাক্ত কাঁটাগাছ — কিন্তু মা তবু ডেকে নেন। তাঁর আশ্রয়ের সুগন্ধেই সন্তান ফিরে পেতে চায় নিজেকে।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের পাঠ্যক্রমে এই কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্য। এটি শিক্ষার্থীদের শুভ দাশগুপ্তের কবিতার বিশেষত্ব, মাতৃভক্তি, শহর-গ্রামের দ্বন্দ্ব ও আত্ম-উপলব্ধির গভীরতা সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে।
সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা
আজকের পৃথিবীতেও এই কবিতাটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। শহরের কৃত্রিমতা, প্রতিযোগিতা, নিষ্ঠুরতা থেকে মানুষ এখনও মায়ের কাছে ফিরতে চায়। চন্দনগাছ হওয়ার আদর্শ আজও অমলিন। মায়ের আশ্রয়ের সুগন্ধ আজও মানুষকে টানে।
চন্দনগাছ কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: চন্দনগাছ কবিতাটির লেখক কে?
এই কবিতাটির লেখক শুভ দাশগুপ্ত। তিনি বাংলা সাহিত্যের একজন প্রতিশ্রুতিমান কবি। তাঁর কবিতায় মাতৃভক্তি, শহর-গ্রামের দ্বন্দ্ব ও আত্ম-উপলব্ধির অসাধারণ প্রকাশ ঘটে।
প্রশ্ন ২: চন্দনগাছ কবিতাটির মূল বিষয়বস্তু কী?
এই কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো মায়ের কাছে ফিরে আসার আকুতি ও চন্দনগাছ হওয়ার আদর্শে পৌঁছতে না পারার বেদনা। কবি দেখিয়েছেন — শহরের নির্মমতায় ক্লান্ত তিনি গ্রামের শৈশবে ফিরে যেতে চান। মা তাঁকে চন্দনগাছ হতে বলেছিলেন, যিনি আঘাত নীরবে সহ্য করেন। কিন্তু তিনি চন্দনগাছ হতে পারেননি, হয়েছেন বিষাক্ত কাঁটাগাছ। শেষে তিনি জানেন — সারা পৃথিবীর বুকে একমাত্র চন্দনগাছ মা।
প্রশ্ন ৩: ‘চন্দনগাছ’ বলতে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
চন্দনগাছ এখানে আদর্শ মানবের প্রতীক — যে কষ্ট নীরবে সহ্য করে, আঘাতে আহত হয়েও শুধু সুগন্ধ ছড়ায়। মা-ই সেই আদর্শের উৎস।
প্রশ্ন ৪: ‘কাটলে ছিড়লে, কোপালে শব্দ করবি না, কাঁদবি না’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
মায়ের আদর্শ — চন্দনগাছের মতো নীরবে সহ্য করতে হবে জীবনের সব আঘাত। কষ্ট পেলেও কাঁদতে নেই, অভিযোগ করতে নেই।
প্রশ্ন ৫: ‘কলকাতায় এঁটো থালা ফেলে দেওয়া মাটির ভাঁড়ের মতো বড় বেশী উপেক্ষায় ফুরোল জীবন’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
শহরের জীবনে মানুষ অপদস্থ, উপেক্ষিত, অবহেলিত। এঁটো থালার মতো তাঁকে ফেলে দেওয়া হয়, মাটির ভাঁড়ের মতো তাঁর কোনো মূল্য নেই।
প্রশ্ন ৬: ‘সারা পৃথিবীর বুকে একমাত্র চন্দনগাছ তুমি’ — শেষ পঙ্ক্তির তাৎপর্য কী?
এটি কবিতার চূড়ান্ত বাণী। পৃথিবীর সব চন্দনগাছের উৎস মা। মা-ই একমাত্র চন্দনগাছ, যিনি সব আঘাত নীরবে সহ্য করেন, শুধু সুগন্ধ ছড়ান। কবি তাঁর কাছে ফিরতে চান, তাঁর আশ্রয়ের সুগন্ধে ফিরতে চান।
ট্যাগস: চন্দনগাছ কবিতা, শুভ দাশগুপ্ত, শুভ দাশগুপ্তের কবিতা, চন্দনগাছ কবিতা শুভ দাশগুপ্ত, আধুনিক বাংলা কবিতা, মায়ের কবিতা, চন্দনগাছের রূপক, কলকাতার কবিতা, গ্রাম-শহরের দ্বন্দ্ব
© Kobitarkhata.com – কবি: শুভ দাশগুপ্ত | কবিতার প্রথম লাইন: “বেলা হল অনেক, / রোদ্দুর ঢলেছে পশ্চিমে / কলকাকলির পাখিরা ডানায় মেখেছে সিঁদুর। / মা, আমি এবার ফিরতে চাই মা।” | বাংলা মাতৃভক্তির কবিতা বিশ্লেষণ





