দুঃসময়ের নোটবই – জয়দেব বসু।

তুমি রাজপথ ধরে ফিরে যাচ্ছো, দু’পাশে খেত।
কিন্তু আলপথ আর তোমার অপেক্ষায় নেই।

চারপাশ দিয়ে হু-হু করে চলে যাচ্ছে গাড়ি
মজুতদারের ট্রাক, জমি খুঁজতে আসা শিল্পপতির ফোর্ড- আইকন,
মল- মালিকদের ল্যান্সার, হিমঘর মালিকের স্যান্ট্রো,
মাইনে বাড়া মধ্যবিত্তের অল্টো,আর
সদ্য তৃণমূলে যোগ দেওয়া বেনোজলদের ইন্ডিকা।
এর একটিও তোমার জন্য নয়।

ভেজা অ্যাসফল্টে আজ আর কেউ ধান শোঁকাতে দেয়নি।
বৃষ্টি পড়ছে গুঁড়ি- গুঁড়ি, তুমি রুমালে চশমা মুছছো, পরছো,
আর ভাবছো: কী করে এমন হলো?
দু’পাশে যতদূর চোখ যায় ধানক্ষেত; অথবা আদৌ ধান কি না
তুমি ঠিক মতো জানো না। শহর তোমাকে ধান চিনতে শেখায়নি।
অথচ বাতাস বইছে শোঁ-শোঁ এই বাতাস রাজপথ অতিক্রম করে
ছুটে যাচ্ছে গ্রামের দিকে: ছাত্র-আন্দোলন করা তুমি জানো:
গ্রাম আছে, এই বাংলাতেই আছে: কিন্তু
দু’পাশে কোনো গ্রামই আজ আর তুমি দেখতে পাচ্ছো না।
গ্রাম তোমার চোখ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে।
কেন? তুমি ভাবছো: কী করে এমন হলো?

(ইউনিট বা জোনাল সম্মেলন ছাড়া)
পিকনিক পার্টির সঙ্গে ছাড়া তুমি কখনো গ্রামে যাওনি।
আচমকা, একা-একা, লোকাল ট্রেন ধরে, রিকশা করে,
দাঁড়িপাল্লায় মাপা ছেঁড়া পরোটা চিবিয়ে,
রস মাখা মুড়ি খেয়ে, লাইন হোটেলের খাটিয়ায় শুয়ে,
একটি রাতও কাটেনি তোমার।
আজ আর হলফ করে বলা যাচ্ছে না,বৃষ্টি না অশ্রু— ঠিক কোনটা বারংবার
আবছা করে দিচ্ছে তোমার চোখ;
রাজপথ ধরে তুমি পিছিয়ে যাচ্ছোই তো যাচ্ছো…….
আর, ভাবছো: কেন? কী করে?

হতে পারে তুমি সৎ। কিন্তু,
তাতে আজ আর কিছু যায়-আসে না।
(কারণ, শুধুমাত্র ‘অনুগত সৈনিক’ থাকতে চেয়ে)
কারণ, শুধুমাত্র ‘ভালোমানুষ’ থাকতে চেয়ে
তুমি অসৎ-এর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়িয়ে গিয়েছো।
পার্টি তোমাকে প্রশ্ন করার অধিকার দিয়েছিলো,
আর তুমি স্বেচ্ছায় পার্টিকে দিয়েছিলে প্রশ্নাতীত থাকার অধিকার।
এখন নিতান্ত দয়াবশত তোমাকে চাপ না-দিয়ে
চারপাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে মজুতদার, শিল্পপতি,
মল- মালিক,আলুর বন্ড আর
বেনোজলদের গাড়ি। (বেনোজল এল-সি-এস-এর গাড়ি)
কোনো আমলেই যাদের কোনো ক্ষতি হয়নি,
হবেও না।

ডানা ভিজে যায় বলে বৃষ্টিতে পাখিরা ওড়ে না।
কিন্তু এখন একটি উড়ছে, দেখতে পাচ্ছো?

পা আর মাটির মাঝখানে ঢুকে গেছে একটা ভেজা পাতা,
হাঁটতে অসুবিধা হচ্ছে।
এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে বার করে নেওয়া যায়।
কিন্তু তুমি সেটাও পারছো না।
মনের মধ্যে ঝড় তোমায় ক্রমাগত পিছিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

পিছিয়ে যাচ্ছো, পালিয়ে যাচ্ছো, কাদের থেকে?
কাকে ভয়? কেউ তোমাকে তাড়া করছে না,
তোমার মতো অপ্রাসঙ্গিককে তাড়া করার মতো সময়
কারো হাতেই এখন নেই।
চুক্তিচাষ করতে করতে চাষি এখন ভাবছে কবে সে মরবে,
পাকা দেওয়ালের বস্তিবাসী চলে যাচ্ছে শহরের শেষ প্রান্তে,
পলিথিন ছাওয়া ঝোপড়া বানাবে বলে।
ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের শিকল জড়িয়ে যাচ্ছে
বসতবাড়ির গায়ে।
একই ছাদের নীচে তিন-পুরুষ বাস করা কোনো সংসার
আর কেউ কখনও খুঁজে পাবে না।
সময় নেই, কারো সময় নেই তোমার দিকে তাকাবার,
তোমাকে তাড়া করবার।

তুমি শুধু পালাচ্ছো নিজের থেকে,
নিজের অতীত থেকে:
তোমাকে করুণা করাও এখন অবান্তর।

আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। জয়দেব বসু।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x