কবিতার খাতা
- 26 mins
সুখটান – সুভাষ মুখোপাধ্যায়।
বাঁচার গর্বে
মাটিতে তার পা পড়ছিল না ব’লে
গান গাইতে গাইতে
আমরা তাকে সপাটে তুলে দিয়ে এলাম
আগুনের দোরগোড়ায়
লোকটার জানা ছিল কায়কল্পের জাদু
ধুলোকে সোনা করার
ছুঁ-মন্তর
তাঁর ঝুলিতে থাকত
যত রাজ্যের ফেলে-দেওয়া
রকমারি পুরনো জিনিস
যখন হাত ঢুকিয়ে বার করত
কী আশ্চর্য
একেবারে ঝকঝকে নতুন
লোকটা ছিল নিদারুণ রসিক
পাড়-ভাঙ্গা নদীর মতন রাস্তায়
বরবেশে যখন তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল
ফুলশয্যার গাড়িতে
তখনও ঠোটের কোনে লাগিয়ে রেখেছিল
জীবনের সুখটান
যাবার সময় আমরা ঢেকে দিয়েছিলাম
তাঁর হাতের শেকল-ভাঙ্গার দাগ
সারা গায়ের হাজারটা কালশিটে
মালায় টান পড়ায়
ঢাকা যায়নি শুধু
ক’দিন আগে মার খাওয়ার
একটা দগদগে চিহ্ন
সেটা ঢাকবার জন্য মালা একটা এসেছিল বটে
কিন্তু আগুনের আবার ফুল সয় না ব’লে
সব মালাই তখন খুলে ফেলা হয়েছিল
মালা একটা এসেছিল বটে
কিন্তু
খুব দেরিতে
মালা এসেছিল
কিন্তু
মানুষ আসেনি
মানুষটা নাকি অন্ধকারে কলম ডুবিয়ে
‘বাঙালীর ইতিহাসঃ অন্তিমপর্ব’
লেখায় অসম্ভব ব্যস্ত ছিল।।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। সুভাষ মুখোপাধ্যায়।
সুখটান – সুভাষ মুখোপাধ্যায় | সুখটান কবিতা | সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা | বাংলা কবিতা
সুখটান: সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের জীবন, মৃত্যু ও সামাজিক দ্বন্দ্বের অসাধারণ কাব্যভাষা
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের “সুখটান” কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের একটি অনন্য সৃষ্টি, যা জীবন, মৃত্যু, শিল্পী-সমাজের দ্বন্দ্ব ও মানবিক মূল্যবোধের এক গভীর কাব্যিক অন্বেষণ। “বাঁচার গর্বে / মাটিতে তার পা পড়ছিল না ব’লে” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক শিল্পীর জীবন ও মৃত্যুর করুণ চিত্র, যাকে সমাজ একদিন আগুনের দোরগোড়ায় তুলে দেয়, আর শেষে মালা দেয়, কিন্তু দেয় দেরিতে। সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১৯১৯-২০০৩) ‘পদাতিক’ নামে পরিচিত এই কবি তাঁর কবিতায় সমাজের প্রান্তিক মানুষের কথা, নারীর অধিকার ও মানবিক মূল্যবোধের কথা বলেছেন। “সুখটান” তাঁর সেই বৈশিষ্ট্যের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এই কবিতায় তিনি একজন শিল্পীর জীবন, তাঁর সৃষ্টি ও সমাজের নির্মমতার এক অসাধারণ চিত্র এঁকেছেন।
সুভাষ মুখোপাধ্যায়: পদাতিক কবি
সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১৯১৯-২০০৩) বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি কবি, যিনি ‘পদাতিক’ নামে সমধিক পরিচিত। তিনি ১৯১৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগরে জন্মগ্রহণ করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন এবং সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চায় জীবন কাটান। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘পদাতিক’ (১৯৪০) তাঁকে খ্যাতি এনে দেয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ঘুমিয়ে পড়ার আগে’, ‘চিরকুট’, ‘যত দূরেই যাও’, ‘বাংলা দেশে’, ‘কোন এক গাঁয়ে’ প্রভৃতি। তিনি ১৯৬৪ সালে ‘যত দূরেই যাও’ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর কবিতার মূল বৈশিষ্ট্য হলো সহজ-সরল ভাষায় গভীর জীবনবোধ, সমাজের প্রান্তিক মানুষের প্রতি দরদ ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকার। “সুখটান” তাঁর একটি বহুপঠিত কবিতা যা শিল্পী ও সমাজের দ্বন্দ্বকে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
সুখটান কবিতার বিস্তারিত বিশ্লেষণ
কবিতার শিরোনামের তাৎপর্য
“সুখটান” শিরোনামটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘সুখটান’ — সুখের টান, জীবনের প্রতি টান। কবিতায় শেষ পর্যন্ত আমরা দেখি, মৃত্যুর সময়ও লোকটার ঠোঁটের কোণে জীবনের সুখটান লেগে ছিল। শিরোনামেই কবি ইঙ্গিত দিয়েছেন — এই কবিতা জীবন-মৃত্যুর সীমারেখায় দাঁড়িয়ে থাকা এক শিল্পীর গল্প, যিনি শেষ মুহূর্তেও সুখের টান অনুভব করেন।
প্রথম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“বাঁচার গর্বে / মাটিতে তার পা পড়ছিল না ব’লে / গান গাইতে গাইতে / আমরা তাকে সপাটে তুলে দিয়ে এলাম / আগুনের দোরগোড়ায়” প্রথম স্তবকে কবি একজন মানুষের (সম্ভবত শিল্পী) জীবন ও মৃত্যুর সূচনা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন — বাঁচার গর্বে মাটিতে তার পা পড়ছিল না বলে, গান গাইতে গাইতে আমরা তাকে সপাটে তুলে দিয়ে এলাম আগুনের দোরগোড়ায়।
‘বাঁচার গর্বে মাটিতে তার পা পড়ছিল না’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
এই পঙ্ক্তিতে কবি লোকটির জীবনের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা ও আত্মবিশ্বাসের কথা বলেছেন। তিনি এত উচ্ছ্বাসে, এত গর্বে বাঁচতেন যে তাঁর পা মাটিতে পড়ত না। তিনি যেন আকাশে উড়ে বেড়াতেন, জীবনকে উদযাপন করতেন।
‘গান গাইতে গাইতে আমরা তাকে সপাটে তুলে দিয়ে এলাম আগুনের দোরগোড়ায়’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
এটি একটি নিষ্ঠুর, ব্যঙ্গাত্মক চিত্র। যে মানুষটি এত গর্বে বাঁচতেন, তাঁকে আমরা গান গাইতে গাইতে আগুনের দোরগোড়ায় তুলে দিয়েছি। অর্থাৎ সমাজ, মানুষ, প্রতিষ্ঠান — সবাই মিলে তাঁকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। ‘গান গাইতে গাইতে’ বলার মাধ্যমে কবি সমাজের উদাসীনতা ও নির্মমতা তুলে ধরেছেন। তাঁরা শোক করেনি, কাঁদেনি, বরং গান গাইতে গাইতে তাঁকে মৃত্যুর দিকে পাঠিয়েছে।
দ্বিতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“লোকটার জানা ছিল কায়কল্পের জাদু / ধুলোকে সোনা করার / ছুঁ-মন্তর” দ্বিতীয় স্তবকে কবি লোকটির বিশেষ ক্ষমতার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — লোকটার জানা ছিল কায়কল্পের জাদু, ধুলোকে সোনা করার ছুঁ-মন্তর।
কায়কল্পের জাদু ও ধুলোকে সোনা করার ছুঁ-মন্তরের তাৎপর্য
কায়কল্প — রূপান্তর, পুনর্জীবন। লোকটির জানা ছিল কায়কল্পের জাদু। তিনি ধুলোকে সোনা করতে পারতেন। অর্থাৎ তিনি একজন শিল্পী, যিনি নগণ্য বস্তুকেও মূল্যবান করে তুলতে পারেন। তাঁর স্পর্শে ধুলোও সোনা হয়ে যেত। এটি শিল্পীর সৃষ্টিশীলতার প্রতীক।
তৃতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“তাঁর ঝুলিতে থাকত / যত রাজ্যের ফেলে-দেওয়া / রকমারি পুরনো জিনিস / যখন হাত ঢুকিয়ে বার করত / কী আশ্চর্য / একেবারে ঝকঝকে নতুন” তৃতীয় স্তবকে কবি লোকটির সৃষ্টিশীলতার আরও বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন — তাঁর ঝুলিতে থাকত যত রাজ্যের ফেলে-দেওয়া রকমারি পুরনো জিনিস। যখন হাত ঢুকিয়ে বার করত, কী আশ্চর্য, একেবারে ঝকঝকে নতুন।
ফেলে-দেওয়া পুরনো জিনিসকে নতুন করে তোলার তাৎপর্য
এটি শিল্পীর আরেকটি গুণ। তিনি পুরনো, ফেলে-দেওয়া জিনিসকেও নতুন করে তুলতে পারেন। তাঁর স্পর্শে জীর্ণ বস্তুও ঝকঝকে নতুন হয়ে ওঠে। এটি শিল্পের পুনর্জীবনদানকারী শক্তির প্রতীক।
চতুর্থ স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“লোকটা ছিল নিদারুণ রসিক / পাড়-ভাঙ্গা নদীর মতন রাস্তায় / বরবেশে যখন তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল / ফুলশয্যার গাড়িতে / তখনও ঠোটের কোনে লাগিয়ে রেখেছিল / জীবনের সুখটান” চতুর্থ স্তবকে কবি লোকটির মৃত্যুযাত্রার চিত্র এঁকেছেন। তিনি বলেছেন — লোকটা ছিল নিদারুণ রসিক। পাড়-ভাঙা নদীর মতো রাস্তায় বরবেশে যখন তাঁকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল ফুলশয্যার গাড়িতে, তখনও ঠোঁটের কোণে লাগিয়ে রেখেছিল জীবনের সুখটান।
‘লোকটা ছিল নিদারুণ রসিক’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
লোকটি রসিক ছিলেন — জীবনকে উপভোগ করতে জানতেন, হাস্যরস বোঝেন, জীবনকে সহজভাবে নিতে জানতেন। এই রসিক মানুষটিকেই মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
‘পাড়-ভাঙ্গা নদীর মতন রাস্তায়’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
পাড়-ভাঙা নদী — যার তীর ভেঙে গেছে, যা অনিয়ন্ত্রিত, যা ধ্বংসাত্মক। রাস্তাটাও তেমন — বিশৃঙ্খল, অনিশ্চিত। সেই রাস্তা দিয়ে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মৃত্যুর দিকে।
‘বরবেশে যখন তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল ফুলশয্যার গাড়িতে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
বরবেশে — বরের সাজে। ফুলশয্যার গাড়ি — বিয়ের গাড়ি। কিন্তু এখানে বিয়ের গাড়িতে তাঁকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এটি এক তীব্র ব্যঙ্গ। বিয়ের গাড়ি মৃত্যুর গাড়িতে পরিণত হয়েছে।
‘তখনও ঠোটের কোনে লাগিয়ে রেখেছিল জীবনের সুখটান’ — শেষ পঙ্ক্তির তাৎপর্য
মৃত্যুর সময়েও তাঁর ঠোঁটের কোণে জীবনের সুখটান লেগে ছিল। তিনি জীবনকে ভালোবাসতেন, সুখকে ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। এই সুখটানই তাঁকে শেষ পর্যন্ত টেনে রেখেছিল।
পঞ্চম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“যাবার সময় আমরা ঢেকে দিয়েছিলাম / তাঁর হাতের শেকল-ভাঙ্গার দাগ / সারা গায়ের হাজারটা কালশিটে / মালায় টান পড়ায় / ঢাকা যায়নি শুধু / ক’দিন আগে মার খাওয়ার / একটা দগদগে চিহ্ন” পঞ্চম স্তবকে কবি মৃত্যুর পরের চিত্র বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন — যাবার সময় আমরা ঢেকে দিয়েছিলাম তাঁর হাতের শেকল-ভাঙ্গার দাগ, সারা গায়ের হাজারটা কালশিটে। মালায় টান পড়ায় ঢাকা যায়নি শুধু ক’দিন আগে মার খাওয়ার একটা দগদগে চিহ্ন।
শেকল-ভাঙ্গার দাগ ও কালশিটের তাৎপর্য
শেকল-ভাঙ্গার দাগ — তিনি হয়তো কোনো বন্ধন ভেঙেছিলেন, স্বাধীনতা অর্জন করেছিলেন। সেই দাগ তাঁর হাতে ছিল। আর সারা গায়ে হাজারটা কালশিটে — জীবনের সংগ্রামে তিনি আহত হয়েছিলেন বারবার। এই সব চিহ্ন মৃত্যুর পর ঢেকে দেওয়া হয়েছে।
‘ক’দিন আগে মার খাওয়ার একটা দগদগে চিহ্ন’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
মৃত্যুর ক’দিন আগে তিনি মার খেয়েছিলেন। তার একটা দগদগে চিহ্ন ছিল, যা ঢাকা যায়নি। এই চিহ্ন তাঁর সম্প্রতি হওয়া আঘাতের প্রতীক, যা এখনও শুকায়নি, এখনও পচে যাচ্ছে।
ষষ্ঠ স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“সেটা ঢাকবার জন্য মালা একটা এসেছিল বটে / কিন্তু আগুনের আবার ফুল সয় না ব’লে / সব মালাই তখন খুলে ফেলা হয়েছিল / মালা একটা এসেছিল বটে / কিন্তু / খুব দেরিতে” ষষ্ঠ স্তবকে কবি মালা আসার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — সেটা ঢাকবার জন্য মালা একটা এসেছিল বটে। কিন্তু আগুনের আবার ফুল সয় না বলে সব মালাই তখন খুলে ফেলা হয়েছিল। মালা একটা এসেছিল বটে, কিন্তু খুব দেরিতে।
মালা আসার তাৎপর্য
দগদগে চিহ্ন ঢাকতে মালা এসেছিল — অর্থাৎ সমাজ তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে চেয়েছিল, তাঁকে সম্মান জানাতে চেয়েছিল। কিন্তু মালা এসেছিল দেরিতে। যখন তিনি জীবিত ছিলেন, তখন কেউ খোঁজ নেয়নি। এখন মৃত, তারপর মালা দিয়ে কী হবে?
‘আগুনের আবার ফুল সয় না’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
আগুনে ফুল সয় না — আগুন ফুল পোড়ায়, ফুল আগুনে টিকে না। মৃতদেহ যখন আগুনে পোড়ানো হচ্ছে, তখন মালা দেওয়া অর্থহীন। আগুন সব মালা খুলে ফেলবে।
সপ্তম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“মালা এসেছিল / কিন্তু / মানুষ আসেনি / মানুষটা নাকি অন্ধকারে কলম ডুবিয়ে / ‘বাঙালীর ইতিহাসঃ অন্তিমপর্ব’ / লেখায় অসম্ভব ব্যস্ত ছিল।” সপ্তম স্তবকে কবি চূড়ান্ত ব্যঙ্গ করেছেন। তিনি বলেছেন — মালা এসেছিল, কিন্তু মানুষ আসেনি। মানুষটা নাকি অন্ধকারে কলম ডুবিয়ে ‘বাঙালীর ইতিহাস: অন্তিমপর্ব’ লেখায় অসম্ভব ব্যস্ত ছিল।
‘মালা এসেছিল, কিন্তু মানুষ আসেনি’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
সমাজ মালা পাঠিয়েছে, কিন্তু কেউ আসেনি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। মালা এসেছে, কিন্তু মানুষ অনুপস্থিত। এটি এক তীব্র ব্যঙ্গ।
‘বাঙালীর ইতিহাস: অন্তিমপর্ব’ লেখার ব্যস্ততার তাৎপর্য
যে মানুষটি আসেনি, তিনি ‘বাঙালীর ইতিহাস’ লিখতে ব্যস্ত ছিলেন। অর্থাৎ ইতিহাস লিখতে গিয়ে তিনি ইতিহাসের সাক্ষী হতে পারেননি। বাঙালির ইতিহাসের অন্তিমপর্ব লিখতে গিয়ে তিনি একজন সত্যিকারের মানুষকে, একজন শিল্পীকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আসেননি। এটি এক চরম ব্যঙ্গ — যারা ইতিহাস লেখেন, তারা ইতিহাস তৈরি হতে দেখেন না।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য
“সুখটান” কবিতাটি একজন শিল্পীর জীবন ও মৃত্যুর করুণ চিত্র। কবি দেখিয়েছেন — একজন মানুষ, যিনি বাঁচার গর্বে মাটিতে পা রাখতেন না, যিনি ধুলোকে সোনা করতে পারতেন, যিনি ফেলে-দেওয়া পুরনো জিনিসকে নতুন করে তুলতে পারতেন, যিনি নিদারুণ রসিক ছিলেন — তাঁকে একদিন সমাজ আগুনের দোরগোড়ায় তুলে দেয়। মৃত্যুর সময়ও তাঁর ঠোঁটের কোণে জীবনের সুখটান লেগে ছিল। মৃত্যুর পর সমাজ তাঁর ক্ষত ঢাকতে মালা দেয়, কিন্তু দেয় দেরিতে। আগুন ফুল সয় না বলে সেই মালা খুলে ফেলা হয়। শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, মালা এসেছিল, কিন্তু মানুষ আসেনি। যে মানুষটি আসেনি, সে ‘বাঙালীর ইতিহাস’ লেখায় ব্যস্ত ছিল। এটি শিল্পী-সমাজের সম্পর্কের এক নির্মম বাস্তবচিত্র — জীবিত অবস্থায় শিল্পীকে উপেক্ষা, মৃত্যুর পর দেরিতে শ্রদ্ধা।
সুখটান কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: সুখটান কবিতার লেখক কে?
সুখটান কবিতার লেখক সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১৯১৯-২০০৩)। তিনি বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি কবি, যিনি ‘পদাতিক’ নামে সমধিক পরিচিত। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘পদাতিক’ (১৯৪০) তাঁকে খ্যাতি এনে দেয়। তিনি ১৯৬৪ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন।
প্রশ্ন ২: সুখটান কবিতার মূল বিষয়বস্তু কী?
সুখটান কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো শিল্পী ও সমাজের দ্বন্দ্ব। কবি একজন শিল্পীর জীবন ও মৃত্যুর চিত্র এঁকেছেন — যিনি বাঁচার গর্বে মাটিতে পা রাখতেন না, যিনি ধুলোকে সোনা করতে পারতেন। তাঁকে একদিন সমাজ আগুনের দোরগোড়ায় তুলে দেয়। মৃত্যুর পর সমাজ মালা দেয়, কিন্তু দেয় দেরিতে। শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, মালা এসেছিল, কিন্তু মানুষ আসেনি।
প্রশ্ন ৩: ‘তখনও ঠোটের কোনে লাগিয়ে রেখেছিল / জীবনের সুখটান’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘তখনও ঠোটের কোনে লাগিয়ে রেখেছিল / জীবনের সুখটান’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি মৃত্যুর সময়ও লোকটির জীবনের প্রতি টানের কথা বলেছেন। তিনি জীবনকে ভালোবাসতেন, সুখকে ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। এই সুখটানই তাঁকে শেষ পর্যন্ত টেনে রেখেছিল।
প্রশ্ন ৪: ‘ক’দিন আগে মার খাওয়ার একটা দগদগে চিহ্ন’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘ক’দিন আগে মার খাওয়ার একটা দগদগে চিহ্ন’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি লোকটির সম্প্রতি হওয়া আঘাতের কথা বলেছেন। মৃত্যুর ক’দিন আগে তিনি মার খেয়েছিলেন। তার একটা দগদগে চিহ্ন ছিল, যা এখনও শুকায়নি। এই চিহ্ন তাঁর জীবনের শেষ সময়ের কষ্টের প্রতীক।
প্রশ্ন ৫: ‘মালা এসেছিল / কিন্তু / মানুষ আসেনি’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘মালা এসেছিল / কিন্তু / মানুষ আসেনি’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি সমাজের নির্মমতা তুলে ধরেছেন। সমাজ মালা পাঠিয়েছে, কিন্তু কেউ আসেনি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। মালা এসেছে, কিন্তু মানুষ অনুপস্থিত। এটি এক তীব্র ব্যঙ্গ।
প্রশ্ন ৬: ‘মানুষটা নাকি অন্ধকারে কলম ডুবিয়ে / ‘বাঙালীর ইতিহাসঃ অন্তিমপর্ব’ / লেখায় অসম্ভব ব্যস্ত ছিল’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘মানুষটা নাকি অন্ধকারে কলম ডুবিয়ে / ‘বাঙালীর ইতিহাসঃ অন্তিমপর্ব’ / লেখায় অসম্ভব ব্যস্ত ছিল’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি চূড়ান্ত ব্যঙ্গ করেছেন। যে মানুষটি আসেনি, তিনি ‘বাঙালীর ইতিহাস’ লিখতে ব্যস্ত ছিলেন। অর্থাৎ ইতিহাস লিখতে গিয়ে তিনি ইতিহাসের সাক্ষী হতে পারেননি। যারা ইতিহাস লেখেন, তারা ইতিহাস তৈরি হতে দেখেন না।
প্রশ্ন ৭: সুভাষ মুখোপাধ্যায় সম্পর্কে সংক্ষেপে বলুন।
সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১৯১৯-২০০৩) বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি কবি, ‘পদাতিক’ নামে সমধিক পরিচিত। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘পদাতিক’ (১৯৪০) তাঁকে খ্যাতি এনে দেয়। তিনি ১৯৬৪ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর কবিতায় সমাজের প্রান্তিক মানুষের প্রতি দরদ ও মানবিক মূল্যবোধের গভীর প্রকাশ ঘটে।
ট্যাগস: সুখটান, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা, সুখটান কবিতা, বাংলা কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, পদাতিক, শিল্পীর কবিতা, মৃত্যুর কবিতা






