কবিতার খাতা
অবনী বাড়ি আছো – শক্তি চট্টোপাধ্যায়।
অবনী বাড়ি আছো
দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া
কেবল শুনি রাতের কড়ানাড়া
‘অবনী বাড়ি আছো?’
বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস
এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে
পরাঙ্মুখ সবুজ নালিঘাস
দুয়ার চেপে ধরে–
‘অবনী বাড়ি আছো?’
আধেকলীন হৃদয়ে দূরগামী
ব্যথার মাঝে ঘুমিয় পড়ি আমি
সহসা শুনি রাতের কড়ানাড়া
‘অবনী বাড়ি আছ?’
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা।
কবিতার কথা-
জীবনানন্দ-পরবর্তী বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান বোহেমিয়ান, উন্মুখ ও রূপসী কণ্ঠস্বর শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘অবনী বাড়ি আছো’ কবিতাটি মূলত মানুষের অন্তহীন অস্তিত্বের সংকট, এক তীব্র আধ্যাত্মিক ও জাগতিক একাকীত্ব, আত্মানুসন্ধানের ব্যাকুলতা এবং পরিশেষে এক অবিনশ্বর চেতনার কড়া নাড়ার এক মায়াবী ও কালজয়ী রূপক-আখ্যান। মাত্র কয়েকটি পঙ্ক্তির এই নাতিদীর্ঘ কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্ত মনস্তাত্ত্বিক জিজ্ঞাসার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কবিতার প্রথমাংশেই কবি এক নিঃসঙ্গ ও স্তব্ধ পরিবেশের চিত্র এঁকেছেন—‘দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া / কেবল শুনি রাতের কড়ানাড়া’। চারপাশের চেনা সমাজ ও মানুষ যখন নিস্পৃহ, অসচেতন বা এক গভীর অবশতায় ঘুমিয়ে আছে, ঠিক তখনই কবির সংবেদনশীল আত্মায় এক রহস্যময় ধাক্কা লাগে। এক অদৃশ্য সত্তা, এক অলৌকিক কণ্ঠস্বর রাতের অন্ধকারে বারবার ডেকে ওঠে—‘অবনী বাড়ি আছো?’ এই অবনী কে? অবনী শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘পৃথিবী’। কিন্তু এখানে অবনী আসলে কবির নিজের ভেতরের এক আদিম ও খাঁটি সত্তা, মানুষের ভেতরের সেই নিভৃত ঘরবাসী মন, যাকে চারপাশের জাগতিক কোলাহল আর মায়া দিনদিন আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। সেই ঘুমন্ত চেতনার দুয়ারে এসে বিবেক বা নিয়তি বারবার কড়া নেড়ে জানতে চাইছে—সে ঘরে আছে কি না, নাকি নিজের অস্তিত্বকে হারিয়ে ফেলেছে।
দ্বিতীয় স্তবকে এক চমৎকার পরাবাস্তব ও রূপকধর্মী প্রকৃতির ক্যানভাস ফুটে উঠেছে। ‘বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস / এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে’—এই অন্তহীন বৃষ্টি আর গাভীর মতো মেঘ চরে বেড়ানোর চিত্রকল্পটি আসলে মানুষের অবদমিত বিষণ্ণতা, একাকীত্ব এবং মেঘের মতো ভেসে বেড়ানো এক বোহেমিয়ান মানসিকতার রূপক। আর সেখানে ‘পরাঙ্মুখ সবুজ নালিঘাস’ যখন দুয়ার চেপে ধরে, তখন তা স্পষ্ট করে যে মানুষ তার নিজের আত্মিক ঘর থেকে কতদিন ধরে দূরে রয়েছে। প্রকৃতির সবুজ ঘাসও যেন আজ মানুষের এই অবহেলা আর দূরত্বের কারণে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে (পরাঙ্মুখ) এবং ঘরের দরজায় লতাপাতার মতো আগলে ধরে তাকে নিজের ভেতরে প্রবেশ করতে বাধা দিচ্ছে।
কবিতার শেষাংশে এসে এই বাহ্যিক জিজ্ঞাসাটি কবির নিজস্ব মনস্তাত্ত্বিক উপলব্ধির মোহনায় এসে থমকে দাঁড়ায়। কবি এক নিদারুণ ক্লান্তিতে এক আধেক-বিলীন (আধেকলীন) হৃদয়ে, এক দূরগামী গভীর ব্যথার সাগরে ডুবে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের ব্যর্থতা, হতাশা আর অস্তিত্বের দহন যখন তাকে ক্লান্ত করে তোলে, সে তখন এক অবশ ঘুমে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চায়। কিন্তু কবিকে সেই চিরন্তন ঘুমের অতলান্তেও শান্তিতে থাকতে দেয় না তাঁর ভেতরের জাগ্রত বিবেক। সহসা সেই নিঝুম রাতের অন্ধকারে আবার বেজে ওঠে সেই চেনা ও তীব্র আকুলতার কড়ানাড়া—‘অবনী বাড়ি আছো?’
এই কড়ানাড়া কোনো লৌকিক অতিথির নয়; এটি মানুষের আত্মাকে জাগিয়ে তোলার এক অবিনশ্বর আর্তি। মানুষ যতই জাগতিক মোহে নিজেকে লুকিয়ে রাখুক না কেন, তার ভেতরের আসল সত্তাটি বারবার তাকে খাঁটি জীবনের দিকে, নিজের আসল ঘরের দিকে ফিরে আসার জন্য তাগিদ দিয়ে যায়—কবিতাটি এই অনন্ত মনস্তাত্ত্বিক দোলাচলেই শেষ হয়।
সৃষ্টির সার্থকতা লৌকিক হাততালিতে নয়, বরং স্রষ্টার নিজের মানসিক মুক্তি এবং অস্তিত্বের তাগিদে—যা এই কবিতায় শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের নিজস্ব মিতবাক গদ্যছন্দ, মেঘ ও ঘাসের পরাবাস্তব চিত্রকল্প এবং ‘অবনী’ নামের এক অনন্য রূপকের মধ্য দিয়ে মানুষের চিরন্তন একাকীত্ব ও আত্মানুসন্ধানের এক অবিনশ্বর আখ্যান হিসেবে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য ও কালজয়ী ধ্রুপদী কবিতা হিসেবে অমর করে রেখেছে।






