মা, দিগন্তে তাকিয়ে দেখ
রক্তিম মেঘে সর্বনাশের আভাস,
ওই সর্বনাশের আগুন পেরিয়ে
আমার দুয়ারে এসে দাঁড়ায়নি কোনো আনন্দ,
অঞ্জলি পেতে কেউ বলেনি- ‘জল দাও’।
সারাজীবন আমাকেই তীব্র পিপাসায়
চিৎকার করতে হয়েছে- জল দাও, জল দাও।
চৈত্রের মধ্য দুপুরে পাখিরাও ডানা গুটিয়ে নেয়,
দূর শহরের রাস্তায় বাবুদের ভিড় নেই,
গাঁয়ের কুকুরগুলি ঢুকে যেতে চায় উঠোনের ছায়ায়;
আমাকে এখন যেতে হবে দূর নদীর চড়ায়,
বালি খুঁড়ে তুলে আনতে হবে ফোঁটা ফোঁটা জল,
তারপর ফিরে আসব খরায় ফাটা মাঠ, শুকনো পুকুর
আর টলটলে জলে ভরা নতুন ইঁদারার পাশ দিয়ে-
বাবুদের ইঁদারা ;
তৃষ্ণায় ডুবে যায় আমাদের গোটা গাঁ,
কুকুর আর মানুষের জিভ ঝুলে পড়ে,
আর বাবুদের ইঁদারায় বাবুদের ছেলেদের স্নান;
আমাদের শরীর জ্বলে যায় চৈত্রের খরায়।
মা, আমি এক চণ্ডালিকা;
বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, রাঢ়ের হা-হা করা মাঠ ফাটিয়ে,
বিহারের তপ্ত প্রান্তর চিরে আমি চিৎকার করছি
জল দাও।
কবিতার কথা-
সব্যসাচী দেবের ‘চণ্ডালিকা’ কবিতাটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত ‘চণ্ডালিকা’ নৃত্যনাট্যের আধুনিক, রুক্ষ ও রাজনৈতিক পুনর্পাঠ। রবীন্দ্রনাথ যেখানে জাতপ্রথার শৃঙ্খল ভেঙে প্রকৃতি নামের অস্পৃশ্য কন্যার ভেতরের মানবিক ও আত্মিক জাগরণকে দেখিয়েছিলেন, সব্যসাচী দেব সেখানে চণ্ডাল কন্যাকে দাঁড় করিয়েছেন শ্রেণীসংগ্রাম, তীব্র সামাজিক বৈষম্য এবং প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারের এক জলন্ত প্রতীক হিসেবে। কবিতাটি একাধারে সামাজিক শোষণ ও প্রকৃতির রুদ্র রূপের বিরুদ্ধে এক প্রান্তিক নারীর অবিনশ্বর ও তীব্র হাহাকারময় প্রতিবাদ।
কবিতার শুরুতেই এক অশুভ ও চরম সংকটের আবহ তৈরি হয়েছে—‘দিগন্তে তাকিয়ে দেখ / রক্তিম মেঘে সর্বনাশের আভাস’। এই রাঙা মেঘ কেবল ঝড়ের সংকেত নয়, এটি যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা শোষণের বিরুদ্ধে অবদমিত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। রবীন্দ্র-উপাখ্যানে যেখানে বৌদ্ধ ভিক্ষু আনন্দ এসে ‘জল দাও’ বলে প্রকৃতির আত্মাকে জাগিয়ে তুলেছিল, এই কবিতায় সেই রোমান্টিক বা অলৌকিক সান্ত্বনা অনুপস্থিত। এখানে কোনো ‘আনন্দ’ দুয়ারে এসে দাঁড়ায়নি, কেউ পরম মমতায় অঞ্জলি পাতেনি। উল্টো যুগ যুগ ধরে এই প্রান্তিক সমাজকেই তীব্র পিপাসায় ‘জল দাও, জল দাও’ বলে চিৎকার করতে হয়েছে।
কবিতার মধ্যভাগে চৈত্র মাসের খরতাপ এবং সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার এক নিষ্ঠুর ও বাস্তব চিত্রকল্প ফুটে উঠেছে। চৈত্রের মধ্যদুপুরে যখন প্রকৃতি নিস্তব্ধ, কুকুরগুলো ছায়ার খোঁজে ব্যাকুল, ঠিক তখন এই চণ্ডাল কন্যাকে যেতে হয় দূর নদীর চড়ায়—বালি খুঁড়ে ফোঁটা ফোঁটা জল সংগ্রহ করতে। তৃষ্ণায় যখন গোটা গ্রাম বুঁদ হয়ে আছে, মানুষ আর কুকুরের জিভ ঝুলে পড়েছে একই কাতারে, ঠিক তখনই পাশেই দেখা যায় এক বৈষম্যের দেয়াল। বাবুদের নতুন ইঁদারা টলটলে জলে ভরা, যেখানে বাবুদের ছেলেরা বিলাসী স্নান করছে। কুকুর জল পায়, বাবুদের সন্তানেরা জলে আমোদ করে, কিন্তু ব্রাত্য এই মানুষগুলোর জন্য এক ফোঁটা জলও নিষিদ্ধ। এই জলহীনতা কেবল তৃষ্ণা নয়, এটি আসলে ক্ষমতার অধিকারহীনতা।
পরবর্তী স্তবকে এসে কবিতাটি একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক ক্যানভাসে রূপ নেয়। কবি রাঢ় অঞ্চলের রুক্ষ মাটির রূপক টেনে এনেছেন—‘বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, রাঢ়ের হা-হা করা মাঠ ফাটিয়ে, / বিহারের তপ্ত প্রান্তর চিরে আমি চিৎকার করছি / জল দাও’। এই অঞ্চলগুলো ঐতিহাসিকভাবেই খরাপ্রবণ এবং প্রান্তিক ও আদিবাসী মানুষের লড়াইয়ের চারণভূমি। ‘আমি এক চণ্ডালিকা’—এই আত্মপরিচয় তখন আর শুধু এক ব্যক্তিকন্যার থাকে না, তা হয়ে ওঠে শোষিত, অস্পৃশ্য ও বঞ্চিত আপামর সর্বহারা শ্রেণীর সমষ্টিগত কণ্ঠস্বর। অপমানের আর বঞ্চনার তীব্রতায় সারা শরীরের রক্ত যখন মাথায় উঠে আসে, তখন তা এক আসন্ন বিদ্রোহের বারুদ তৈরি করে।
পরিশেষে, কবিতাটি এক অমোঘ ও নির্মম সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থমকে যায়—‘একফোঁটা জলের দাম আমাদের গোটা জীবন’। যে জল প্রকৃতির অকৃত্রিম দান, একটি সামন্ততান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় সেই সামান্য জলের অধিকার পেতেই প্রান্তিক মানুষকে নিজের পুরো জীবনটাই বাজি রাখতে হয়, সঁপে দিতে হয় আত্মসম্মান।
সৃষ্টির সার্থকতা লৌকিক হাততালিতে নয়, বরং স্রষ্টার নিজের মানসিক মুক্তি এবং অস্তিত্বের তাগিদে—যা এই কবিতায় হাজার বছরের সামাজিক লাঞ্ছনা, বর্ণবাদ এবং শ্রেণী-বৈষম্যের ক্ষতকে এক চণ্ডাল কন্যার জবানিতে অত্যন্ত তীব্র, জোরালো ও ক্ষমাহীন এক দ্রোহের ইশতেহার হিসেবে ফুটিয়ে তুলেছে।
চণ্ডালিকা – সব্যসাচী দেব
চণ্ডালিকা: সব্যসাচী দেবের জল, তৃষ্ণা ও বঞ্চনার অসাধারণ কাব্যদর্শন — “একফোঁটা জলের দাম আমাদের গোটা জীবন”
সব্যসাচী দেবের “চণ্ডালিকা” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য, তীব্র ও প্রতিবাদী সৃষ্টি। এই কবিতাটি জলের অভাব, নিম্নবর্গের তৃষ্ণা ও সামাজিক বঞ্চনার এক অসাধারণ চিত্রায়ণ। “মা, দিগন্তে তাকিয়ে দেখ রক্তিম মেঘে সর্বনাশের আভাস” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক অসহায় মানুষের আর্তনাদ — “জল দাও”। সব্যসাচী দেব একজন প্রখ্যাত বাঙালি কবি ও লেখক। তাঁর কবিতায় প্রতিবাদ, মানবিক বোধ ও সামাজিক সচেতনতা বিশেষভাবে ফুটে ওঠে। “চণ্ডালিকা” সেই ধারার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি বাবুদের ইঁদারায় জল থাকলেও চণ্ডালদের শরীর জ্বলে যায় চৈত্রের খরায়। শেষে তিনি বলেন — “একফোঁটা জলের দাম আমাদের গোটা জীবন”।
সব্যসাচী দেব: প্রতিবাদ, মানবতা ও সামাজিক সচেতনতার কবি
সব্যসাচী দেব একজন প্রখ্যাত বাঙালি কবি ও লেখক। তাঁর কবিতায় প্রতিবাদ, মানবিক বোধ ও সামাজিক সচেতনতা বিশেষভাবে ফুটে ওঠে। তিনি নিম্নবর্গের মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন। ‘চণ্ডালিকা’ সেই ধারার এক অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি জলের অভাব ও শ্রেণিগত বৈষম্যের চিত্র এঁকেছেন।
চণ্ডালিকা: শিরোনামের গূঢ়ার্থ ও কবিতার পটভূমি
শিরোনাম ‘চণ্ডালিকা’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘চণ্ডালিকা’ মানে অস্পৃশ্যা, নিম্নবর্গের নারী। কবি নিজেকে চণ্ডালিকা বলে পরিচয় দিয়েছেন — যে তৃষ্ণায় কাতর, যে বঞ্চিত।
কবিতার শুরুতে তিনি মাকে বলেন — দিগন্তে রক্তিম মেঘে সর্বনাশের আভাস। সেই সর্বনাশের আগুন পেরিয়ে তাঁর দুয়ারে এসে দাঁড়ায়নি কোনো আনন্দ। কেউ বলেনি — ‘জল দাও’। সারাজীবন তিনি তীব্র পিপাসায় চিৎকার করেছেন — জল দাও, জল দাও। চৈত্রের মধ্য দুপুরে পাখিরাও ডানা গুটিয়ে নেয়, বাবুদের ভিড় নেই, কুকুরগুলি উঠোনের ছায়ায় ঢুকতে চায়। তাঁকে এখন যেতে হবে দূর নদীর চড়ায়, বালি খুঁড়ে ফোঁটা ফোঁটা জল তুলতে হবে। তারপর ফিরে আসতে হবে খরায় ফাটা মাঠ, শুকনো পুকুর আর বাবুদের টলটলে জলে ভরা ইঁদারার পাশ দিয়ে। তাদের গোটা গাঁ তৃষ্ণায় ডুবে যায়, কুকুর আর মানুষের জিভ ঝুলে পড়ে, আর বাবুদের ইঁদারায় বাবুদের ছেলেদের স্নান। তিনি এক চণ্ডালিকা। বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, রাঢ়ের হা-হা করা মাঠ ফাটিয়ে, বিহারের তপ্ত প্রান্তর চিরে তিনি চিৎকার করছেন — জল দাও। আর তার সারা শরীরের রক্ত উঠে আসছে মাথায়। একফোঁটা জলের দাম তাদের গোটা জীবন।
চণ্ডালিকা: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: রক্তিম মেঘে সর্বনাশের আভাস, আগুন পেরিয়ে আনন্দ আসেনি, কেউ বলেনি জল দাও
“মা, দিগন্তে তাকিয়ে দেখ / রক্তিম মেঘে সর্বনাশের আভাস, / ওই সর্বনাশের আগুন পেরিয়ে / আমার দুয়ারে এসে দাঁড়ায়নি কোনো আনন্দ, / অঞ্জলি পেতে কেউ বলেনি- ‘জল দাও’۔”
প্রথম স্তবকের বিশ্লেষণ: ‘রক্তিম মেঘে সর্বনাশের আভাস’ — খরার পূর্বাভাস, বিপদের ইঙ্গিত। ‘সর্বনাশের আগুন পেরিয়ে আনন্দ আসেনি’ — সব ধ্বংস হয়ে গেছে, তবু কোনো আনন্দ নেই। ‘অঞ্জলি পেতে কেউ বলেনি জল দাও’ — কোনো স্নেহ বা সহানুভূতি নেই, কেউ জলের প্রস্তাব দেয়নি।
দ্বিতীয় স্তবক: তীব্র পিপাসায় চিৎকার — জল দাও, জল দাও
“সারাজীবন আমাকেই তীব্র পিপাসায় / চিৎকার করতে হয়েছে- জল দাও, জল দাও۔”
দ্বিতীয় স্তবকের বিশ্লেষণ: ‘তীব্র পিপাসায় চিৎকার’ — জলের অভাবের চরম বাস্তবতা। ‘জল দাও, জল দাও’ — পুনরাবৃত্তি আর্তনাদের তীব্রতা বাড়ায়।
তৃতীয় স্তবক: চৈত্রের দুপুরে পাখি ও কুকুরের অসহায়তা, দূর নদীর চড়ায় বালি খুঁড়ে জল আনা
“চৈত্রের মধ্য দুপুরে পাখিরাও ডানা গুটিয়ে নেয়, / দূর শহরের রাস্তায় বাবুদের ভিড় নেই, / গাঁয়ের কুকুরগুলি ঢুকে যেতে চায় উঠোনের ছায়ায়; / আমাকে এখন যেতে হবে দূর নদীর চড়ায়, / বালি খুঁড়ে তুলে আনতে হবে ফোঁটা ফোঁটা জল, / তারপর ফিরে আসব খরায় ফাটা মাঠ, শুকনো পুকুর / আর টলটলে জলে ভরা নতুন ইঁদারার পাশ দিয়ে- / বাবুদের ইঁদারা ;”
তৃতীয় স্তবকের বিশ্লেষণ: ‘পাখিরা ডানা গুটিয়ে নেয়’ — তীব্র গরমে পাখিও অচল। ‘বাবুদের ভিড় নেই’ — উচ্চবিত্তরা তখন ঘরের ভেতর। ‘কুকুরগুলি উঠোনের ছায়ায় ঢুকতে চায়’ — পশুরাও ছায়া খুঁজছে। ‘দূর নদীর চড়ায় বালি খুঁড়ে জল আনা’ — নদী শুকিয়ে গেছে, বালির নিচ থেকে জল তুলতে হবে। ‘বাবুদের ইঁদারা’ — বাবুদের কৃত্রিম জলাধারে প্রচুর জল, কিন্তু সেটা তাদের জন্য সংরক্ষিত।
চতুর্থ স্তবক: গোটা গাঁ তৃষ্ণায় ডুবে, বাবুদের ইঁদারায় বাবুদের ছেলেরা স্নান করে
“তৃষ্ণায় ডুবে যায় আমাদের গোটা গাঁ, / কুকুর আর মানুষের জিভ ঝুলে পড়ে, / আর বাবুদের ইঁদারায় বাবুদের ছেলেদের স্নান; / আমাদের শরীর জ্বলে যায় চৈত্রের খরায়۔”
চতুর্থ স্তবকের বিশ্লেষণ: ‘গোটা গাঁ তৃষ্ণায় ডুবে যায়’ — পুরো গ্রামের মানুষের কষ্ট। ‘কুকুর আর মানুষের জিভ ঝুলে পড়ে’ — তীব্র তৃষ্ণার প্রতীক। ‘বাবুদের ইঁদারায় বাবুদের ছেলেদের স্নান’ — সামাজিক বৈষম্যের চরম রূপ। ‘আমাদের শরীর জ্বলে যায় চৈত্রের খরায়’ — তাদের জন্য জল নেই।
পঞ্চম স্তবক: চণ্ডালিকা পরিচয়, বাঁকুড়া-পুরুলিয়া-রাঢ়ের মাঠ ফাটিয়ে, বিহারের প্রান্তর চিরে জল দাও চিৎকার
“মা, আমি এক চণ্ডালিকা; / বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, রাঢ়ের হা-হা করা মাঠ ফাটিয়ে, / বিহারের তপ্ত প্রান্তর চিরে আমি চিৎকার করছি / জল দাও۔ / আর আমার সারা শরীরের রক্ত উঠে আসছে মাথায়۔”
পঞ্চম স্তবকের বিশ্লেষণ: ‘আমি এক চণ্ডালিকা’ — অবহেলিত ও নিপীড়িত নারীর পরিচয়। ‘বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, রাঢ়ের হা-হা করা মাঠ’ — পশ্চিমবঙ্গের শুষ্ক অঞ্চল, খরাপ্রবণ এলাকা। ‘বিহারের তপ্ত প্রান্তর’ — প্রতিবেশী রাজ্যের শুষ্ক ভূমি। ‘জল দাও চিৎকার’ — আর্তনাদ সীমা ছাড়িয়েছে। ‘সারা শরীরের রক্ত উঠে আসছে মাথায়’ — ক্রোধ ও যন্ত্রণার চরম অবস্থা।
ষষ্ঠ স্তবক: একফোঁটা জলের দাম গোটা জীবন
“মা, একফোঁটা জলের দাম আমাদের গোটা জীবন۔”
ষষ্ঠ স্তবকটি সম্পূর্ণ কবিতার চূড়ান্ত বক্তব্য ও সবচেয়ে শক্তিশালী। ‘একফোঁটা জলের দাম আমাদের গোটা জীবন’ — সামান্য এক ফোঁটা জলের জন্য তারা গোটা জীবন দিতে পারে। এটি জলের অভাবের চরম বাস্তবতা ও মূল্য।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি ছয়টি স্তবকে বিভক্ত, গদ্যকবিতার ধারায় রচিত। ভাষা অত্যন্ত সরল, তীব্র ও প্রতিবাদী। প্রতীক ও চিহ্নের ব্যবহার অসাধারণ — ‘রক্তিম মেঘে সর্বনাশের আভাস’ (খরার পূর্বাভাস), ‘সর্বনাশের আগুন’ (প্রকৃতির রুদ্ররূপ), ‘অঞ্জলি পেতে কেউ বলেনি জল দাও’ (স্নেহের অভাব), ‘তীব্র পিপাসায় চিৎকার’ (চরম কাতরতা), ‘পাখিরা ডানা গুটিয়ে নেয়’ (গরমে সব স্থির), ‘বাবুদের ইঁদারা’ (সামাজিক বৈষম্যের প্রতীক), ‘কুকুর ও মানুষের জিভ ঝুলে পড়া’ (চরম তৃষ্ণা), ‘বাবুদের ছেলেদের স্নান’ (অন্যায় ও বঞ্চনার চরম রূপ), ‘চণ্ডালিকা’ (অবহেলিত নারীর পরিচয়), ‘বাঁকুড়া-পুরুলিয়া-রাঢ়ের মাঠ ফাটা’ (শুষ্ক ভূমি), ‘বিহারের তপ্ত প্রান্তর’ (শুষ্কতা ও বঞ্চনার বিস্তার), ‘সারা শরীরের রক্ত উঠে আসছে মাথায়’ (ক্রোধ ও যন্ত্রণা), ‘একফোঁটা জলের দাম গোটা জীবন’ (জলের মূল্য ও বঞ্চনার চূড়ান্ত রূপ)। ‘জল দাও’ ধ্বনির পুনরাবৃত্তি তৃষ্ণা ও আর্তনাদের তীব্রতা প্রকাশ করে।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“চণ্ডালিকা” সব্যসাচী দেবের এক অসাধারণ প্রতিবাদী ও সামাজিক কাব্য। তিনি এখানে জলের অভাব ও শ্রেণিগত বৈষম্যের চিত্র এঁকেছেন। ‘বাবুদের ইঁদারায় জল থাকলেও চণ্ডালদের শরীর জ্বলে যায়’ — এটি সামন্ততান্ত্রিক বৈষম্যের চরম রূপ। শেষের ‘একফোঁটা জলের দাম আমাদের গোটা জীবন’ বাংলা কবিতায় বঞ্চনার চূড়ান্ত ও অমর পঙ্ক্তি।
সব্যসাচী দেবের কবিতায় জল, তৃষ্ণা ও বঞ্চনা
সব্যসাচী দেবের ‘চণ্ডালিকা’ কবিতায় জলের অভাব ও সামাজিক বঞ্চনার অসাধারণ চিত্রায়ণ ঘটেছে। ‘একফোঁটা জলের দাম আমাদের গোটা জীবন’ বাংলা কবিতায় বঞ্চনার চূড়ান্ত স্বীকৃতি ও প্রতিবাদ।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক স্তরে সব্যসাচী দেবের ‘চণ্ডালিকা’ অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। কারণ — (১) আধুনিক ও প্রতিবাদী কাব্যধারার চমৎকার উদাহরণ, (২) জল ও তৃষ্ণার সমস্যার বাস্তব চিত্রায়ণ, (৩) শ্রেণি ও বর্ণগত বৈষম্যের তীব্র সমালোচনা, (৪) ‘চণ্ডালিকা’ চরিত্রের স্বকীয় কণ্ঠস্বর, (৫) ‘একফোঁটা জলের দাম গোটা জীবন’ — অমর ও শিক্ষণীয় পঙ্ক্তি।
চণ্ডালিকা সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: ‘চণ্ডালিকা’ কবিতাটির লেখক কে?
সব্যসাচী দেব — একজন প্রখ্যাত বাঙালি কবি ও লেখক।
প্রশ্ন ২: ‘বাবুদের ইঁদারায় বাবুদের ছেলেদের স্নান’ — লাইনটির সামাজিক তাৎপর্য কী?
উচ্চবর্গের কৃত্রিম জলাধারে তাদের ছেলেরা স্নান করে, অথচ নিম্নবর্গের মানুষের পানির জোগান নেই — এটি শ্রেণি ও বর্ণগত বৈষম্যের চরম রূপ।
প্রশ্ন ৩: ‘বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, রাঢ়ের হা-হা করা মাঠ ফাটিয়ে’ — কেন এই অঞ্চলগুলোর নাম উল্লেখ?
পশ্চিমবঙ্গের এই অঞ্চলগুলো খরাপ্রবণ, যেখানে জলের অভাব চরম আকার ধারণ করে।
প্রশ্ন ৪: ‘একফোঁটা জলের দাম আমাদের গোটা জীবন’ — লাইনটির চূড়ান্ত বক্তব্য কী?
সামান্য এক ফোঁটা জলের জন্য নিম্নবর্গের মানুষ তাদের গোটা জীবন দিতে পারে। এটি জলের অভাবের চরম মূল্য ও প্রতিবাদ।
ট্যাগস: চণ্ডালিকা, সব্যসাচী দেব, সব্যসাচী দেবের সেরা কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, জল ও তৃষ্ণা, বঞ্চনার কবিতা, চণ্ডালিকা ও ইঁদারা
© Kobitarkhata.com – কবি: সব্যসাচী দেব | কবিতার প্রথম লাইন: “মা, দিগন্তে তাকিয়ে দেখ” | জল, তৃষ্ণা ও বঞ্চনার অসাধারণ কাব্যদর্শন | আধুনিক বাংলা কবিতার অনন্য নিদর্শন