কবিতার খাতা
সেই কবে থেকে – হুমায়ুন আজাদ।
সেই কবে থেকে জ্বলছি
জ্ব’লে জ্ব’লে নিভে গেছি ব’লে
তুমি দেখতে পাও নি ।
সেই কবে থেকে দাঁড়িয়ে রয়েছি
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাতিস্তম্ভের মতো ভেঙে পড়েছি ব’লে
তুমি লক্ষ্য করো নি ।
সেই কবে থেকে ডাকছি
ডাকতে ডাকতে স্বরতন্ত্রি ছিঁড়ে বোবা হয়ে গেছি ব’লে
তুমি শুনতে পাও নি ‘।
সেই কবে থেকে ফুটে আছি
ফুটে ফুটে শাখা থেকে ঝ’রে গেছি ব’লে
তুমি কখনো তোলো নি ।
সেই কবে থেকে তাকিয়ে রয়েছি
তাকিয়ে তাকিয়ে অন্ধ হয়ে গেছি ব’লে
একবারো তোমাকে দেখি নি ।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। হুমায়ুন আজাদের কবিতা।
কবিতার কথা-
প্রথাবিরোধী ও মননশীল লেখক হুমায়ুন আজাদের ‘সেই কবে থেকে’ কবিতাটি মানবহৃদয়ের এক চরম একাকীত্ব, নীরব অবহেলা, না-পাওয়ার হাহাকার এবং একতরফা ভালোবাসার তীব্র আত্মদহনের এক অসামান্য মনস্তাত্ত্বিক দলিল। চিরাচরিত প্রেমের কবিতায় যেখানে মিলন কিংবা বিরহের প্রকাশ চড়া সুরে বা কান্নায় প্রকাশ পায়, হুমায়ুন আজাদ এখানে দেখিয়েছেন এক অলক্ষ্যে ঘটে যাওয়া নিঃশব্দ ধ্বংসলীলা। প্রিয় মানুষের উদাসীনতা ও অবহেলার কারণে একটি হৃদয় কীভাবে তিল তিল করে ক্ষয়ে যায় এবং একসময় সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যায়, কবিতাটি মূলত সেই চরম বাস্তবতাকে ধারণ করে আছে।
কবিতার প্রারম্ভেই কবি এক দীর্ঘস্থায়ী যন্ত্রণার কথা ব্যক্ত করেছেন। কবি তাঁর ভালোবাসার তীব্রতায় জ্বলছেন আজ দীর্ঘকাল ধরে। কিন্তু এই জ্বলাটা প্রিয়তমার চোখে পড়েনি; কারণ জ্বলতে জ্বলতে কবি একসময় সম্পূর্ণ নিভে গেছেন। মানুষ জ্বলন্ত আগুন দেখতে পায়, কিন্তু নিভে যাওয়া ছাইয়ের ভেতরের দহনকে লক্ষ্য করে না। ঠিক একইভাবে, কবি এক নিশ্চল বাতিস্তম্ভের মতো দীর্ঘকাল ধরে দাঁড়িয়েছিলেন প্রিয়তমার অপেক্ষায়। কিন্তু সেই বাতিস্তম্ভটি যখন একসময় জীর্ণ হয়ে ভেঙে পড়ল, প্রিয়তমা তখনো তা লক্ষ্য করেনি। এখানে বাতিস্তম্ভ প্রতীকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ; যা অন্যকে আলো দিলেও নিজে এক জায়গায় স্থবির ও একা দাঁড়িয়ে থাকে।
কবিতার মধ্যভাগে অবহেলার গভীরতা আরও তীব্র ও শারীরিক যন্ত্রণায় রূপ নিয়েছে। কবি প্রিয়তমাকে ভালোবেসে, ডেকে ডেকে আজ ক্লান্ত। ডাকতে ডাকতে একসময় তাঁর গলার স্বরতন্ত্রী ছিঁড়ে তিনি সম্পূর্ণ বোবা হয়ে গেছেন, আর এই বোবা হয়ে যাওয়ার কারণেই প্রিয়তমা তাঁর নীরব আর্তনাদ কখনো শুনতেই পায়নি। কবি নিজেকে প্রকৃতির একটি ফুলের সাথে তুলনা করে বলেছেন, তিনি বহু আগে থেকেই প্রিয়তমার জন্য ফুটেছিলেন। কিন্তু ফুটন্ত ফুলকে অবহেলা করায় তা একসময় শাখা থেকে ঝরে মাটির বুকে মিশে গেছে, তাই প্রিয়তমা তাকে আর কোনোদিন নিজের খোঁপা বা সাজের জন্য পরম যত্নে তুলে নেয়নি।
শেষাংশে এসে কবিতাটি এক পরম এবং ট্র্যাজিক সত্যে উপনীত হয়। কবি প্রিয়তমার পথের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন দীর্ঘকাল। কিন্তু দেখতে দেখতে তাঁর চোখের জ্যোতি একসময় ফুরিয়ে গেছে, তিনি অন্ধ হয়ে গেছেন। আর এই অন্ধত্বের ট্র্যাজেডি এটাই যে, যখন হয়তো প্রিয়তমা সামনে এসেছে বা কবিকে লক্ষ্য করেছে, ততক্ষণে কবি নিজেই চাক্ষুষভাবে তাকে দেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন।
সামগ্রিকভাবে, ‘সেই কবে থেকে’ কবিতাটি প্রেমের এক চরম নিঃসঙ্গ রূপকে উন্মোচন করে। কবি দেখাতে চেয়েছেন যে, ভালোবাসায় অবহেলার একটা শেষ সীমা থাকে। মানুষ যখন কারো জন্য অপেক্ষা করতে করতে, ডাকতে ডাকতে নিজের অস্তিত্বকে সম্পূর্ণ বিনাশ করে ফেলে, তখন অপরপক্ষের ফিরে আসা বা সাড়া দেওয়াটাও অর্থহীন হয়ে পড়ে। অত্যন্ত সহজ, সমান্তরাল এবং পুনরাবৃত্তিমূলক পঙ্ক্তির বুননে কবি এখানে অবহেলার শিকার হওয়া এক প্রেমিকের নীরব আত্মাহুতির গল্প ফুটিয়ে তুলেছেন।






