কবিতার খাতা
রুটি দাও – বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
হোক পোড়া বাসি ভ্যাজাল মেশানো রুটি
তবু তো জঠরে, বহ্নি নেবানো খাঁটি
এ এক মন্ত্র ! রুটি দাও, রুটি দাও ;
বদলে বন্ধু যা ইচ্ছে নিয়ে যাও :
সমরখণ্ড বা বোখারা তুচ্ছ কথা
হেসে দিতে পারি স্বদেশেরও স্বাধীনতা ।
শুধু দুই বেলা দু’টুকড়ো পোড়া রুটি
পাই যদি তবে সূর্যেরও আগে উঠি,
ঝড়ো সাগরের ঝুটি ধরে দিই নাড়া
উপড়িয়ে আনি কারাকোরামের চূড়া :
হৃদয় বিষাদ চেতনা তুচ্ছ গণি
রুটি পেলে দিই প্রিয়ার চোখের মণি ।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
রুটি দাও – বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় | রুটি দাও কবিতা | বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা | বাংলা কবিতা
রুটি দাও: বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও মৌলিক চাহিদার অসাধারণ কাব্যভাষা
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের “রুটি দাও” কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের একটি অনন্য সৃষ্টি, যা ক্ষুধা, দারিদ্র্য, মৌলিক চাহিদা ও মানবিক মূল্যবোধের এক গভীর কাব্যিক অন্বেষণ। “হোক পোড়া বাসি ভ্যাজাল মেশানো রুটি / তবু তো জঠরে, বহ্নি নেবানো খাঁটি” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক ক্ষুধার্ত মানুষের আকুতি, যার কাছে রুটিই সবচেয়ে বড় চাহিদা, এমনকি স্বাধীনতার চেয়েও বড়। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৯২০-১৯৮৫) বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তাঁর কবিতায় সমাজের প্রান্তিক মানুষের কথা, দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও মানবিক মূল্যবোধের গভীর প্রকাশ ঘটে। “রুটি দাও” তাঁর একটি বহুপঠিত কবিতা যা ক্ষুধার যন্ত্রণা ও মৌলিক চাহিদার গুরুত্বকে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়: প্রান্তিক মানুষের কবি
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৯২০-১৯৮৫) বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তিনি ১৯২০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর বর্তমান বাংলাদেশের বিক্রমপুরে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তিনি দারিদ্র্য ও অবহেলার সঙ্গে পরিচিত হন। কলকাতায় এসে তিনি বিভিন্ন পেশায় কাজ করেছেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘মাটির ঘর’ (১৯৪৭) তাঁকে খ্যাতি এনে দেয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘কালো বস্তির পাঁচালি’, ‘রাত্রির রৌদ্র’, ‘দুঃখের দেশে’, ‘শ্মশানের ফুল’, ‘রুটি দাও’, ‘নির্বাচিত কবিতা’ প্রভৃতি। তাঁর কবিতায় সমাজের প্রান্তিক মানুষের কথা, দারিদ্র্য, ক্ষুধা, বস্তি জীবন ও মানবিক মূল্যবোধের গভীর প্রকাশ ঘটে। তিনি ১৯৮৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন। “রুটি দাও” তাঁর একটি বহুপঠিত কবিতা যা ক্ষুধার যন্ত্রণা ও মৌলিক চাহিদার গুরুত্বকে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
রুটি দাও কবিতার বিস্তারিত বিশ্লেষণ
কবিতার শিরোনামের তাৎপর্য
“রুটি দাও” শিরোনামটি অত্যন্ত সরল অথচ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। এটি একটি দাবি, একটি আকুতি, একটি চিৎকার। ‘রুটি’ — খাদ্য, জীবিকার মূল ভিত্তি। ‘দাও’ — চাওয়া, দাবি করা। শিরোনামেই কবি ইঙ্গিত দিয়েছেন — এই কবিতা ক্ষুধার, অভাবের, মৌলিক চাহিদার কবিতা।
প্রথম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“হোক পোড়া বাসি ভ্যাজাল মেশানো রুটি / তবু তো জঠরে, বহ্নি নেবানো খাঁটি / এ এক মন্ত্র ! রুটি দাও, রুটি দাও ; / বদলে বন্ধু যা ইচ্ছে নিয়ে যাও : / সমরখণ্ড বা বোখারা তুচ্ছ কথা / হেসে দিতে পারি স্বদেশেরও স্বাধীনতা ।” প্রথম স্তবকে কবি রুটির প্রতি তাঁর আকুতি প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন — হোক পোড়া বাসি, ভেজাল মেশানো রুটি, তবু তো জঠরে (পেটে) বহ্নি নেভানো খাঁটি। এ এক মন্ত্র! রুটি দাও, রুটি দাও। বদলে বন্ধু যা ইচ্ছে নিয়ে যাও: সমরখণ্ড বা বোখারা তুচ্ছ কথা, হেসে দিতে পারি স্বদেশেরও স্বাধীনতা।
‘হোক পোড়া বাসি ভ্যাজাল মেশানো রুটি’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
রুটি যতই খারাপ হোক না কেন — পোড়া হোক, বাসি হোক, ভেজাল মেশানো হোক — তবুও তা রুটি। ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে রুটির মান গুরুত্বপূর্ণ নয়, রুটি থাকাটাই গুরুত্বপূর্ণ।
‘তবু তো জঠরে, বহ্নি নেবানো খাঁটি’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘জঠর’ — পেট। ‘বহ্নি’ — আগুন। পেটের আগুন নেভানো খাঁটি — অর্থাৎ ক্ষুধা নিবারণ করাটাই আসল। রুটি যতই খারাপ হোক, তা ক্ষুধা নিবারণ করে — এটাই খাঁটি কাজ।
‘এ এক মন্ত্র ! রুটি দাও, রুটি দাও’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
রুটির দাবি একটি মন্ত্রের মতো। তিনি বারবার বলছেন — রুটি দাও, রুটি দাও। এটি যেন এক জপ, এক ধ্যান।
‘বদলে বন্ধু যা ইচ্ছে নিয়ে যাও’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
রুটির বিনিময়ে বন্ধু যা খুশি নিয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ রুটির কাছে অন্য সব কিছু তুচ্ছ।
‘সমরখণ্ড বা বোখারা তুচ্ছ কথা / হেসে দিতে পারি স্বদেশেরও স্বাধীনতা’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
সমরখণ্ড ও বোখারা — ঐতিহাসিক স্থান, সম্ভবত যুদ্ধক্ষেত্র বা গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। স্বদেশের স্বাধীনতা — সর্বোচ্চ মূল্যবোধ। কিন্তু কবি বলছেন — রুটির বিনিময়ে তিনি হেসে দিয়ে দিতে পারেন এসব। ক্ষুধার কাছে এগুলো তুচ্ছ।
দ্বিতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“শুধু দুই বেলা দু’টুকড়ো পোড়া রুটি / পাই যদি তবে সূর্যেরও আগে উঠি, / ঝড়ো সাগরের ঝুটি ধরে দিই নাড়া / উপড়িয়ে আনি কারাকোরামের চূড়া : / হৃদয় বিষাদ চেতনা তুচ্ছ গণি / রুটি পেলে দিই প্রিয়ার চোখের মণি ।” দ্বিতীয় স্তবকে কবি রুটির জন্য তাঁর শ্রম ও ত্যাগের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — শুধু দুই বেলা দু’টুকরো পোড়া রুটি পাই যদি, তবে সূর্যেরও আগে উঠি। ঝড়ো সাগরের ঝুটি ধরে দিই নাড়া, উপড়িয়ে আনি কারাকোরামের চূড়া। হৃদয়, বিষাদ, চেতনা তুচ্ছ গণি — রুটি পেলে দিই প্রিয়ার চোখের মণি।
‘শুধু দুই বেলা দু’টুকড়ো পোড়া রুটি / পাই যদি তবে সূর্যেরও আগে উঠি’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
দুই বেলা দু’টুকরো রুটির জন্য তিনি সূর্যেরও আগে উঠতে রাজি। অর্থাৎ তিনি কঠোর পরিশ্রম করতে রাজি — শুধু রুটির জন্য।
‘ঝড়ো সাগরের ঝুটি ধরে দিই নাড়া / উপড়িয়ে আনি কারাকোরামের চূড়া’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
ঝড়ো সাগরের ঝুটি ধরে নাড়া দেওয়া — অর্থাৎ সবচেয়ে কঠিন কাজ করাও সম্ভব। কারাকোরামের চূড়া উপড়িয়ে আনা — হিমালয়ের অন্যতম উচ্চ শৃঙ্গ উপড়ে আনা, যা অসম্ভব। কিন্তু রুটির জন্য তিনি অসম্ভবকেও সম্ভব করতে রাজি।
‘হৃদয় বিষাদ চেতনা তুচ্ছ গণি / রুটি পেলে দিই প্রিয়ার চোখের মণি’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
হৃদয়, বিষাদ, চেতনা — এসব তুচ্ছ। রুটি পেলে তিনি দিয়ে দিতে পারেন প্রিয়ার চোখের মণিও। অর্থাৎ সবচেয়ে প্রিয় বস্তুও তিনি রুটির বিনিময়ে দিয়ে দিতে রাজি।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য
“রুটি দাও” কবিতাটি ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও মৌলিক চাহিদার এক অসাধারণ চিত্র। কবি প্রথমে বলেছেন — রুটি যতই খারাপ হোক না কেন, তা ক্ষুধা নিবারণ করে। তাই রুটির দাবি তাঁর কাছে মন্ত্রের মতো। রুটির বিনিময়ে তিনি সমরখণ্ড, বোখারা, এমনকি স্বাধীনতাও হেসে দিয়ে দিতে রাজি। দুই বেলা দু’টুকরো রুটির জন্য তিনি সূর্যেরও আগে উঠতে রাজি। ঝড়ো সাগরের ঝুটি ধরে নাড়া দিতে রাজি, কারাকোরামের চূড়া উপড়ে আনতে রাজি। হৃদয়, বিষাদ, চেতনা — সব তুচ্ছ। রুটি পেলে তিনি প্রিয়ার চোখের মণিও দিয়ে দিতে রাজি।
রুটি দাও কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: রুটি দাও কবিতার লেখক কে?
রুটি দাও কবিতার লেখক বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৯২০-১৯৮৫)। তিনি বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তাঁর কবিতায় সমাজের প্রান্তিক মানুষের কথা, দারিদ্র্য ও মানবিক মূল্যবোধের গভীর প্রকাশ ঘটে।
প্রশ্ন ২: রুটি দাও কবিতার মূল বিষয়বস্তু কী?
রুটি দাও কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও মৌলিক চাহিদার গুরুত্ব। কবি দেখিয়েছেন — ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে রুটি সবচেয়ে বড়। রুটির বিনিময়ে সে স্বাধীনতাও দিয়ে দিতে রাজি, প্রিয়ার চোখের মণিও দিয়ে দিতে রাজি।
প্রশ্ন ৩: ‘হেসে দিতে পারি স্বদেশেরও স্বাধীনতা’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘হেসে দিতে পারি স্বদেশেরও স্বাধীনতা’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি ক্ষুধার তীব্রতা বুঝিয়েছেন। স্বাধীনতা সর্বোচ্চ মূল্যবোধ, কিন্তু ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। রুটির বিনিময়ে সে স্বাধীনতাও হেসে দিয়ে দিতে রাজি।
প্রশ্ন ৪: ‘ঝড়ো সাগরের ঝুটি ধরে দিই নাড়া / উপড়িয়ে আনি কারাকোরামের চূড়া’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘ঝড়ো সাগরের ঝুটি ধরে দিই নাড়া / উপড়িয়ে আনি কারাকোরামের চূড়া’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি রুটির জন্য তাঁর কাজের তীব্রতা বুঝিয়েছেন। ঝড়ো সাগরের ঝুটি ধরে নাড়া দেওয়া, কারাকোরামের চূড়া উপড়ে আনা — এগুলো অসম্ভব কাজ। কিন্তু রুটির জন্য তিনি অসম্ভবকেও সম্ভব করতে রাজি।
প্রশ্ন ৫: ‘রুটি পেলে দিই প্রিয়ার চোখের মণি’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘রুটি পেলে দিই প্রিয়ার চোখের মণি’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি রুটির কাছে সব কিছু তুচ্ছ বলে মনে করেন। প্রিয়ার চোখের মণি — সবচেয়ে প্রিয় বস্তু। রুটি পেলে তিনি সেটাও দিয়ে দিতে রাজি।
প্রশ্ন ৬: বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কে সংক্ষেপে বলুন۔
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৯২০-১৯৮৫) বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তিনি ১৯২০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর বিক্রমপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর কবিতায় সমাজের প্রান্তিক মানুষের কথা, দারিদ্র্য ও মানবিক মূল্যবোধের গভীর প্রকাশ ঘটে। ‘কালো বস্তির পাঁচালি’, ‘রুটি দাও’ তাঁর উল্লেখযোগ্য কবিতা।
ট্যাগস: রুটি দাও, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা, রুটি দাও কবিতা, বাংলা কবিতা, ক্ষুধার কবিতা, দারিদ্র্যের কবিতা, মৌলিক চাহিদার কবিতা






