স্ত্রীর পত্র – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

শ্রীচরণকমলেষু,
আজ পনেরো বছর আমাদের বিবাহ হয়েছে, আজ
পর্যন্ত তোমাকে চিঠি লিখি নি। চিরদিন কাছেই
পড়ে আছি— মুখের কথা অনেক শুনেছ, আমিও
শুনেছি, চিঠি লেখবার মতো ফাঁকটুকু পাওয়া যায়
নি।
আজ আমি এসেছি তীর্থ করতে শ্রীক্ষেত্রে,
তুমি আছ তোমার আপিসের কাজে। শামুকের
সঙ্গে খোলসের যে সম্বন্ধ কলকাতার
সঙ্গে তোমার তাই, সে তোমার দেহমনের
সঙ্গে এঁটে গিয়েছে; তাই তুমি আপিসে ছুটির
দরখাস্ত করলে না। বিধাতার তাই অভিপ্রায় ছিল;
তিনি আমার ছুটির দরখাস্ত মঞ্জুর করেছেন।
আমি তোমাদের মেজোবউ। আজ পনেরো বছরের
পরে এই সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে জানতে পেরেছি,
আমার জগৎ এবং জগদীশ্বরের সঙ্গে আমার অন্য
সম্বন্ধও আছে। তাই আজ সাহস করে এই
চিঠিখানি লিখছি, এ তোমাদের মেজোবউয়ের
চিঠি নয়।
তোমাদের সঙ্গে আমার সম্বন্ধ
কপালে যিনি লিখেছিলেন তিনি ছাড়া যখন সেই
সম্ভাবনার কথা আর কেউ জানত না, সেই
শিশুবয়সে আমি আর আমার ভাই একসঙ্গেই
সান্নিপাতিক জ্বরে পড়ি। আমার
ভাইটি মারা গেল, আমি বেঁচে উঠলুম। পাড়ার সব
মেয়েরাই বলতে লাগল , “মৃণাল মেয়ে কি না, তাই
ও বাঁচল,বেটাছেলে হলে কি আর রক্ষা পেত?”
চুরিবিদ্যাতে যম পাকা, দামি জিনিসের ’পরেই
তার লোভ।
আমার মরণ নেই। সেই কথাটাই
ভালো করে বুঝিয়ে বলবার জন্যে এই
চিঠিখানি লিখতে বসেছি।
যেদিন তোমাদের দূরসম্পর্কের মামা তোমার বন্ধু
নীরদকে নিয়ে কনে দেখতে এলেন তখন আমার বয়স
বারো। দুর্গম পাড়াগাঁয়ে আমাদের বাড়ি,
সেখানে দিনের বেলা শেয়াল ডাকে। স্টেশন
থেকে সাত ক্রোশ
স্যক্রা গাড়িতে এসে বাকি তিন মাইল
কাঁচা রাস্তায় পালকি করে তবে আমাদের
গাঁয়ে পৌঁছনো যায়। সেদিন তোমাদের
কী হয়রানি। তার উপরে আমাদের বাঙাল দেশের
রান্না— সেই রান্নার প্রহসন আজও মামা ভোলেন
নি।
তোমাদের বড়োবউয়ের রূপের অভাব
মেজবউকে দিয়ে পূরণ করবার জন্যে তোমার মায়ের
একান্ত জিদ ছিল। নইলে এত কষ্ট করে আমাদের
সে গাঁয়ে তোমরা যাবে কেন?
বাংলা দেশে পিলে যকৃত অম্লশূল এবং ক’নের
জন্যে তো কাউকে খোঁজ করতে হয় না-
তারা আপনি এসে চেপে ধরে, কিছুতে ছাড়তে চায়
না।
বাবার বুক দুর্দুর্ করতে লাগল, মা দুর্গানাম জপ
করতে লাগলেন। শহরের দেবতাকে পাড়াগাঁয়ের
পূজারি কী দিয়ে সন্তুষ্ট করবে। মেয়ের রূপের উপর
ভরসা; কিন্তু, সেই রূপের গুমর তো মেয়ের
মধ্যে নেই,
যে ব্যক্তি দেখতে এসেছে সে তাকে যে-দামই
দেবে সেই তার দাম। তাই তো হাজার রূপে গুণেও
মেয়েমানুষের সংকোচ কিছুতে ঘোচে না।
সমস্ত বাড়ির, এমন-কি সমস্ত পাড়ার এই আতঙ্ক
আমার বুকের মধ্যে পাথরের মতো চেপে বসল।
সেদিনকার আকাশের যত আলো এবং জগতের সকল
শক্তি যেন বারো বছরের
একটি পাড়াগেঁয়ে মেয়েকে দুইজন পরীক্ষকের
দুইজোড়া চোখের সামনে শক্ত করে তুলে ধরবার
জন্যে পেয়াদাগিরি করছিল— আমার কোথাও
লুকোবার জায়গা ছিল না।
সমস্ত
আকাশকে কাঁদিয়ে দিয়ে বাঁশি বাজাতে লাগল—
তোমাদের বাড়িতে এসে উঠলুম। আমার
খুঁতগুলি সবিস্তারে খতিয়ে দেখেও গিন্নির দল
সকলে স্বীকার করলেন, মোটের
উপরে আমি সুন্দরী বটে। সে কথা শুনে আমার
বড়ো জায়ের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল । কিন্তু, আমার
রূপের দরকার কী ছিল তাই ভাবি। রূপ-
জিনিসটাকে যদি কোনো সেকেলে পন্ডিত
গঙ্গামৃত্তিকা দিয়ে গড়তেন তা হলে ওর আদর
থাকত; কিন্তু,ওটা যে কেবল বিধাতা নিজের
আনন্দে গড়েছেন, তাই তোমাদের ধর্মের
সংসারে ওর দাম নেই।
আমার যে রূপ আছে সে কথা ভুলতে তোমার
বেশিদিন লাগে নি। কিন্তু, আমার
যে বুদ্ধি আছে সেটা তোমাদের পদে পদে স্মরণ
করতে হয়েছে। ঐ বুদ্ধিটা আমার এতই স্বাভাবিক
যে তোমাদের ঘরকন্নার মধ্যে এতকাল কাটিয়েও
আজও সে টিকে আছে। মা আমার এই বুদ্ধিটার
জন্যে বিষম উদ্বিগ্ন ছিলেন, মেয়েমানুষের
পক্ষে এ এক বালাই ।
যাকে বাধা মেনে চলতে হবে,
সে যদি বুদ্ধিকে মেনে চলতে চায় তবে ঠোকর
খেয়ে খেয়ে তার কপাল ভাঙবেই। কিন্তু, কী করব
বলো। তোমাদের ঘরের বউয়ের যতটা বুদ্ধির দরকার
বিধাতা অসতর্ক হয়ে আমাকে তার
চেয়ে অনেকটা বেশি দিয়ে ফেলেছেন,
সে আমি এখন ফিরিয়ে দিই কাকে।
তোমরা আমাকে মেয়ে-জ্যাঠা বলে দুবেলা গাল
দিয়েছে। কটু কথাই হচ্ছে অক্ষমের সান্ত্বনা;
অতএব সে আমি ক্ষমা করলুম।
আমার একটা জিনিস তোমাদের ঘরকন্নার
বাইরে ছিল, সেটা কেউ তোমরা জান নি।
আমি লুকিয়ে কবিতা লিখতুম। সে ছাইপাঁশ যাই
হোক-না, সেখানে তোমাদের অন্দরমহলের পাঁচিল
ওঠে নি। সেইখানে আমার মুক্তি;
সেইখানে আমি আমি। আমার মধ্যে যা-কিছু
তোমাদের মেজোবউকে ছাড়িয়ে রয়েছে,
সে তোমরা পছন্দ কর নি,চিনতেও পার নি;
আমি যে কবি সে এই পনেরো বছরেও তোমাদের
কাছে ধরা পড়ে নি।
তোমাদের ঘরের প্রথম স্মৃতির মধ্যে সব
চেয়ে যেটা আমার মনে জাগছে সে তোমাদের
গোয়ালঘর। অন্দরমহলের সিঁড়িতে ওঠবার ঠিক
পাশের ঘরেই তোমাদের গোরু থাকে, সামনের
উঠোনটুকু ছাড়া তাদের আর নড়বার জায়গা নেই।
সেই উঠোনের কোণে তাদের জাব্না দেবার
কাঠের গামলা। সকালে বেহারার নানা কাজ;
উপবাসী গোরুগুলো ততক্ষণ সেই গামলার
ধারগুলো চেটে চেটে চিবিয়ে চিবিয়ে খাব্লা করে দিত।
আমার প্রাণ কাঁদত। আমি পাড়াগাঁয়ের মেয়ে—
তোমাদের বাড়িতে যেদিন নতুন এলুম সেদিন সেই
দুটি গোরু এবং তিনটি বাছুরই সমস্ত শহরের
মধ্যে আমার চিরপরিচিত আত্মীয়ের মতো আমার
চোখে ঠেকল। যতদিন নতুন বউ ছিলুম
নিজে না খেয়ে লুকিয়ে ওদের খাওয়াতুম; যখন
বড়ো হলুম তখন গোরুর প্রতি আমার প্রকাশ্য
মমতা লক্ষ করে আমার ঠাট্টার
সম্পর্কীয়েরা আমার গোত্র সম্বন্ধে সন্দেহ
প্রকাশ করতে লাগলেন।
আমার মেয়েটি জন্ম নিয়েই মারা গেল। আমাকেও
সে সঙ্গে যাবার সময় ডাক দিয়েছিল।
সে যদি বেঁচে থাকত তা হলে সেই আমার
জীবনে যা-কিছু বড়ো, যা-কিছু সত্য, সমস্ত
এনে দিত; তখন মেজোবউ
থেকে একেবারে মা হয়ে বসতুম। মা যে এক
সংসারের মধ্যে থেকেও বিশ্ব-সংসারের।
মা হবার দুঃখটুকু পেলুম কিন্তু মা হবার মুক্তিটুকু
পেলুম না ।

আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x