কবিতার খাতা
সেই মানুষটি যে ফসল ফলিয়েছিল – বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
“সেই বিরাট খামারটাতে কখনো বৃষ্টি হয় না
আমারই কপালের ঘাম দিয়ে গাছগুলোকে
তৃষ্ণা মেটাতে হয়
সেখানে যে কফি ফলে, আর চেরি গাছে
যে টুকটুকে লাল রঙের বাহার ধরে
তা আমারই ফোঁটা ফোঁটা রক্ত, যা জমে কঠিন হয়েছে
কফিগুলোকে ভাজা হবে, রোদে শুকোতে হবে,
তারপর গুড়ো করতে হবে
যতক্ষণ না পর্যন্ত তাদের গায়ের রঙ হবে
আফ্রিকার কুলির গায়ের রঙের ঘোর কৃষ্ণবর্ণ
আফ্রিকার কুলির জমাট রক্তে ঘোর কৃষ্ণবর্ণ
কে ভোর না হতেই ওঠে?
কে তখন থেকেই খেটে মরে?
কে লাঙ্গল কাঁধে দীর্ঘ রাস্তা কুঁজো হয়ে হাঁটে?
আর কেই বা শস্যের বোঝা বইতে বইতে ক্লান্ত হয়?
কে বীজ বপন করে?
আর তার বিনিময়ে যা পায়, তা হ’লো
ঘৃণা, বাসি রুটি, পঁচা মাছের টুকরো,
শতচ্ছিন্ন নোংরা পোশাক, কয়েকটা নয়া পয়সা?
আর এরপরেও তাকে পুরস্কৃত করা হয়
চাবুক আর বুটের ঠোক্কর দিয়ে
কে সেই মানুষ?
কে ক্ষেতগুলোতে গম আর ভূট্টা ফলায়?
আর সারি বাধা কমলা গাছগুলোতে
ফুলের উৎসব আনে?
কে সেই মানুষ?
কে উপর ওয়ালাকে গাড়ি, যন্ত্রপাতি,
মেয়ে মানুষ কেনার টাকা আর
মোটরের নিচে চাপা পড়ার জন্য
নিগ্রদের মুন্ডুগলি যোগান দেয়?
কে সাদা আদমিকে বড়লোক তৈরি করে
তাকে রাতারাতি ফাঁপিয়ে তোলে
পকেটে টাকা যোগায়?
-কে সেই মানুষ?
তাদের জিজ্ঞাসা করো
যে পাখিরা গান গায়
যে ঝর্ণারা নিশ্চিত মনে
এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে
যে বাতাস এই মহাদেশের মধ্যকার
মানচিত্র থেকে মর্মরিত হচ্ছে
তারা সকলেই উত্তর দেবে
ঐ কালো রঙের মানুষটা-
যে দিনরাত গাধার খাটুনি খাটছে।
আহা!
আমাকে অন্তত ঐ তালগাছটার চূড়োয় উঠতে দাও
সেখানে বসে আমি মদ খাবো
তালগাছ থেকে যে মদ চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ে;
আর মাতলামোর মধ্যে আমি নিশ্চয়ই ভুলে যাব
আমি একজন কালো রঙের মানুষ
আমার জন্যেই এই সব।
মূল রচনা: আন্তোরিও হাসিন্টে
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
সেই মানুষটি যে ফসল ফলিয়েছিল – বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় | সেই মানুষটি যে ফসল ফলিয়েছিল কবিতা বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় | বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা | শ্রমিকের কবিতা | উপনিবেশবাদ বিরোধী কবিতা | কালো মানুষের কবিতা
সেই মানুষটি যে ফসল ফলিয়েছিল: বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শ্রম, শোষণ ও প্রতিবাদের অসাধারণ কাব্যভাষা
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের “সেই মানুষটি যে ফসল ফলিয়েছিল” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য ও শক্তিশালী শ্রমিক-শোষণবিরোধী কবিতা। “সেই বিরাট খামারটাতে কখনো বৃষ্টি হয় না / আমারই কপালের ঘাম দিয়ে গাছগুলোকে / তৃষ্ণা মেটাতে হয় / সেখানে যে কফি ফলে, আর চেরি গাছে / যে টুকটুকে লাল রঙের বাহার ধরে / তা আমারই ফোঁটা ফোঁটা রক্ত, যা জমে কঠিন হয়েছে” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে কালো শ্রমিকের কঠোর পরিশ্রম, তার ঘাম ও রক্তে ফসল ফলানো, তার প্রাপ্ত শোষণ, এবং শেষ পর্যন্ত মাতাল হয়ে নিজের পরিচয় ভুলে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার এক গভীর ও বহুমাত্রিক কাব্যচিত্র। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৯২০-২০০৫) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের একজন প্রধান বাংলা কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় নিজস্ব ভাষাভঙ্গি ও বিষয়বৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত। তাঁর কবিতায় প্রতিবাদ, বিদ্রোহ, শোষণের বিরুদ্ধে তীক্ষ্ণ ভাষা, এবং শ্রমজীবী মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ ফুটে উঠেছে। “সেই মানুষটি যে ফসল ফলিয়েছিল” তাঁর সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি আন্তোনিও হাসিন্তের মূল রচনা অনুবাদ করে কালো শ্রমিকের শোষণের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন।
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়: প্রতিবাদ, বিদ্রোহ ও শ্রমজীবীর কবি
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৯২০ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি কবিতা চর্চা শুরু করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম পুরোধা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘আমার সন্তান যাক প্রত্যহ নরকে’ (১৯৬৫), ‘নির্বাচিত কবিতা’ (১৯৭৫), ‘প্রতিবাদের কবিতা’ (১৯৮৫), ‘সেই মানুষটি যে ফসল ফলিয়েছিল’ (১৯৯০), ‘আমার কবিতা’ (১৯৯৫) সহ আরও অসংখ্য গ্রন্থ। তিনি ২০০৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো প্রতিবাদ ও বিদ্রোহের তীক্ষ্ণ ভাষা, শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার অবস্থান, শ্রমজীবী মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ, এবং আন্তর্জাতিক উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান। ‘সেই মানুষটি যে ফসল ফলিয়েছিল’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি পর্তুগিজ কবি আন্তোনিও হাসিন্তের রচনা অনুবাদ করে কালো শ্রমিকের শোষণের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন।
সেই মানুষটি যে ফসল ফলিয়েছিল: ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পটভূমি
কবিতাটি পর্তুগিজ কবি আন্তোনিও হাসিন্তের (António Jacinto) রচনার অনুবাদ। আন্তোনিও হাসিন্ত ছিলেন আঙ্গোলার একজন কবি, যিনি পর্তুগিজ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। তাঁর কবিতায় আফ্রিকার কালো শ্রমিকদের শোষণ, পরিশ্রম, এবং প্রতিবাদ ফুটে উঠেছে। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এই কবিতাটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন এবং বাংলা কবিতার ভাণ্ডারে একটি অনন্য সংযোজন করেছেন।
কবিতার কেন্দ্রীয় চরিত্র একজন কালো শ্রমিক। তিনি বলেন — সেই বিরাট খামারটাতে কখনো বৃষ্টি হয় না। তাঁর কপালের ঘাম দিয়ে গাছগুলোকে তৃষ্ণা মেটাতে হয়। যে কফি ফলে, চেরি গাছে যে টুকটুকে লাল রঙের বাহার ধরে — তা তাঁর ফোঁটা ফোঁটা রক্ত, যা জমে কঠিন হয়েছে। কফিগুলোকে ভাজা হবে, রোদে শুকোতে হবে, তারপর গুঁড়ো করতে হবে — যতক্ষণ না পর্যন্ত তাদের গায়ের রঙ হবে আফ্রিকার কুলির গায়ের রঙের ঘোর কৃষ্ণবর্ণ। আফ্রিকার কুলির জমাট রক্তে ঘোর কৃষ্ণবর্ণ।
কে ভোর না হতেই ওঠে? কে তখন থেকেই খেটে মরে? কে লাঙ্গল কাঁধে দীর্ঘ রাস্তা কুঁজো হয়ে হাঁটে? আর কেই বা শস্যের বোঝা বইতে বইতে ক্লান্ত হয়? কে বীজ বপন করে? আর তার বিনিময়ে যা পায়, তা হলো ঘৃণা, বাসি রুটি, পঁচা মাছের টুকরো, শতচ্ছিন্ন নোংরা পোশাক, কয়েকটা নয়া পয়সা? আর এরপরেও তাকে পুরস্কৃত করা হয় চাবুক আর বুটের ঠোক্কর দিয়ে।
কে সেই মানুষ? কে ক্ষেতগুলোতে গম আর ভুট্টা ফলায়? আর সারি বাধা কমলা গাছগুলোতে ফুলের উৎসব আনে? কে সেই মানুষ? কে উপর ওয়ালাকে গাড়ি, যন্ত্রপাতি, মেয়ে মানুষ কেনার টাকা আর মোটরের নিচে চাপা পড়ার জন্য নিগ্রদের মুণ্ডুগলি যোগান দেয়? কে সাদা আদমিকে বড়লোক তৈরি করে, তাকে রাতারাতি ফাঁপিয়ে তোলে, পকেটে টাকা যোগায়? — কে সেই মানুষ?
তাদের জিজ্ঞাসা করো — যে পাখিরা গান গায়, যে ঝর্ণারা নিশ্চিত মনে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে, যে বাতাস এই মহাদেশের মধ্যকার মানচিত্র থেকে মর্মরিত হচ্ছে — তারা সকলেই উত্তর দেবে — ঐ কালো রঙের মানুষটা — যে দিনরাত গাধার খাটুনি খাটছে।
শেষে তিনি বলেন — আহা! আমাকে অন্তত ঐ তালগাছটার চূড়োয় উঠতে দাও। সেখানে বসে আমি মদ খাবো — তালগাছ থেকে যে মদ চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ে। আর মাতলামোর মধ্যে আমি নিশ্চয়ই ভুলে যাব — আমি একজন কালো রঙের মানুষ — আমার জন্যেই এই সব।
সেই মানুষটি যে ফসল ফলিয়েছিল: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: কপালের ঘাম ও ফোঁটা ফোঁটা রক্তে ফসল ফলানো
“সেই বিরাট খামারটাতে কখনো বৃষ্টি হয় না / আমারই কপালের ঘাম দিয়ে গাছগুলোকে / তৃষ্ণা মেটাতে হয় / সেখানে যে কফি ফলে, আর চেরি গাছে / যে টুকটুকে লাল রঙের বাহার ধরে / তা আমারই ফোঁটা ফোঁটা রক্ত, যা জমে কঠিন হয়েছে / কফিগুলোকে ভাজা হবে, রোদে শুকোতে হবে, / তারপর গুড়ো করতে হবে / যতক্ষণ না পর্যন্ত তাদের গায়ের রঙ হবে / আফ্রিকার কুলির গায়ের রঙের ঘোর কৃষ্ণবর্ণ / আফ্রিকার কুলির জমাট রক্তে ঘোর কৃষ্ণবর্ণ”
প্রথম স্তবকে কালো শ্রমিকের পরিশ্রম ও শোষণের চিত্র ফুটে উঠেছে। ‘সেই বিরাট খামারটাতে কখনো বৃষ্টি হয় না’ — খামারে প্রাকৃতিক বৃষ্টি নেই। ‘আমারই কপালের ঘাম দিয়ে গাছগুলোকে তৃষ্ণা মেটাতে হয়’ — তাঁর কপালের ঘাম দিয়ে গাছের তৃষ্ণা মেটাতে হয়। ‘সেখানে যে কফি ফলে, আর চেরি গাছে যে টুকটুকে লাল রঙের বাহার ধরে তা আমারই ফোঁটা ফোঁটা রক্ত, যা জমে কঠিন হয়েছে’ — কফি ও চেরির লাল রঙ তাঁর রক্তে তৈরি। ‘কফিগুলোকে ভাজা হবে, রোদে শুকোতে হবে, তারপর গুড়ো করতে হবে যতক্ষণ না পর্যন্ত তাদের গায়ের রঙ হবে আফ্রিকার কুলির গায়ের রঙের ঘোর কৃষ্ণবর্ণ’ — কফির গুঁড়োর রঙ হবে কালো শ্রমিকের ত্বকের মতো। ‘আফ্রিকার কুলির জমাট রক্তে ঘোর কৃষ্ণবর্ণ’ — পুনরাবৃত্তি শ্রমিকের রক্ত ও ত্বকের রঙের সংযোগ নির্দেশ করে।
দ্বিতীয় স্তবক: শ্রমিকের পরিচয় ও প্রাপ্য শোষণ
“কে ভোর না হতেই ওঠে? / কে তখন থেকেই খেটে মরে? / কে লাঙ্গল কাঁধে দীর্ঘ রাস্তা কুঁজো হয়ে হাঁটে? / আর কেই বা শস্যের বোঝা বইতে বইতে ক্লান্ত হয়? / কে বীজ বপন করে? / আর তার বিনিময়ে যা পায়, তা হ’লো / ঘৃণা, বাসি রুটি, পঁচা মাছের টুকরো, / শতচ্ছিন্ন নোংরা পোশাক, কয়েকটা নয়া পয়সা? / আর এরপরেও তাকে পুরস্কৃত করা হয় / চাবুক আর বুটের ঠোক্কর দিয়ে”
দ্বিতীয় স্তবকে শ্রমিকের পরিচয় ও তার প্রাপ্য শোষণের কথা বলা হয়েছে। ‘কে ভোর না হতেই ওঠে? কে তখন থেকেই খেটে মরে?’ — ভোরে ওঠে, খেটে মরে। ‘কে লাঙ্গল কাঁধে দীর্ঘ রাস্তা কুঁজো হয়ে হাঁটে?’ — লাঙ্গল কাঁধে কুঁজো হয়ে হাঁটে। ‘আর কেই বা শস্যের বোঝা বইতে বইতে ক্লান্ত হয়?’ — শস্যের বোঝা বইতে বইতে ক্লান্ত হয়। ‘কে বীজ বপন করে?’ — বীজ বপন করে। ‘আর তার বিনিময়ে যা পায়, তা হ’লো ঘৃণা, বাসি রুটি, পঁচা মাছের টুকরো, শতচ্ছিন্ন নোংরা পোশাক, কয়েকটা নয়া পয়সা?’ — বিনিময়ে পায় ঘৃণা, বাসি রুটি, পঁচা মাছ, নোংরা পোশাক, সামান্য টাকা। ‘আর এরপরেও তাকে পুরস্কৃত করা হয় চাবুক আর বুটের ঠোক্কর দিয়ে’ — পুরস্কার হিসেবে পায় চাবুক ও বুটের ঠোক্কর।
তৃতীয় স্তবক: সেই মানুষের পরিচয়ের প্রশ্ন
“কে সেই মানুষ? / কে ক্ষেতগুলোতে গম আর ভূট্টা ফলায়? / আর সারি বাধা কমলা গাছগুলোতে / ফুলের উৎসব আনে? / কে সেই মানুষ? / কে উপর ওয়ালাকে গাড়ি, যন্ত্রপাতি, / মেয়ে মানুষ কেনার টাকা আর / মোটরের নিচে চাপা পড়ার জন্য / নিগ্রদের মুন্ডুগলি যোগান দেয়? / কে সাদা আদমিকে বড়লোক তৈরি করে / তাকে রাতারাতি ফাঁপিয়ে তোলে / পকেটে টাকা যোগায়? / -কে সেই মানুষ?”
তৃতীয় স্তবকে সেই মানুষের পরিচয়ের প্রশ্ন করা হয়েছে। ‘কে সেই মানুষ? কে ক্ষেতগুলোতে গম আর ভূট্টা ফলায়? আর সারি বাধা কমলা গাছগুলোতে ফুলের উৎসব আনে?’ — যে গম, ভুট্টা, কমলা ফলায়। ‘কে সেই মানুষ? কে উপর ওয়ালাকে গাড়ি, যন্ত্রপাতি, মেয়ে মানুষ কেনার টাকা আর মোটরের নিচে চাপা পড়ার জন্য নিগ্রদের মুন্ডুগলি যোগান দেয়?’ — যে উপরওয়ালাকে (সাদা কর্তা) গাড়ি, যন্ত্রপাতি, মেয়ে কেনার টাকা, আর মোটরের নিচে চাপা পড়ার জন্য নিগ্রদের মাথা যোগান দেয়। ‘কে সাদা আদমিকে বড়লোক তৈরি করে তাকে রাতারাতি ফাঁপিয়ে তোলে পকেটে টাকা যোগায়? — কে সেই মানুষ?’ — যে সাদা আদমিকে বড়লোক তৈরি করে।
চতুর্থ স্তবক: প্রকৃতির উত্তর ও তালগাছের মদ
“তাদের জিজ্ঞাসা করো / যে পাখিরা গান গায় / যে ঝর্ণারা নিশ্চিত মনে / এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে / যে বাতাস এই মহাদেশের মধ্যকার / মানচিত্র থেকে মর্মরিত হচ্ছে / তারা সকলেই উত্তর দেবে / ঐ কালো রঙের মানুষটা- / যে দিনরাত গাধার খাটুনি খাটছে। / আহা! / আমাকে অন্তত ঐ তালগাছটার চূড়োয় উঠতে দাও / সেখানে বসে আমি মদ খাবো / তালগাছ থেকে যে মদ চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ে; / আর মাতলামোর মধ্যে আমি নিশ্চয়ই ভুলে যাব / আমি একজন কালো রঙের মানুষ / আমার জন্যেই এই সব।”
চতুর্থ স্তবকে প্রকৃতির উত্তর ও তালগাছের মদের কথা বলা হয়েছে। ‘তাদের জিজ্ঞাসা করো যে পাখিরা গান গায়, যে ঝর্ণারা নিশ্চিত মনে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে, যে বাতাস এই মহাদেশের মধ্যকার মানচিত্র থেকে মর্মরিত হচ্ছে — তারা সকলেই উত্তর দেবে ঐ কালো রঙের মানুষটা — যে দিনরাত গাধার খাটুনি খাটছে’ — প্রকৃতি সবাই উত্তর দেবে — সেই কালো মানুষটিই সব করে। ‘আহা! আমাকে অন্তত ঐ তালগাছটার চূড়োয় উঠতে দাও। সেখানে বসে আমি মদ খাবো — তালগাছ থেকে যে মদ চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ে; আর মাতলামোর মধ্যে আমি নিশ্চয়ই ভুলে যাব আমি একজন কালো রঙের মানুষ — আমার জন্যেই এই সব’ — তিনি তালগাছের চূড়োয় উঠে মদ খেতে চান, মাতাল হয়ে ভুলে যেতে চান তিনি একজন কালো মানুষ, তাঁর জন্যেই এই সব শোষণ।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি চারটি স্তবকে বিভক্ত। প্রথম স্তবকে কপালের ঘাম ও ফোঁটা ফোঁটা রক্তে ফসল ফলানো, দ্বিতীয় স্তবকে শ্রমিকের পরিচয় ও প্রাপ্য শোষণ, তৃতীয় স্তবকে সেই মানুষের পরিচয়ের প্রশ্ন, চতুর্থ স্তবকে প্রকৃতির উত্তর ও তালগাছের মদ।
ভাষা সরল, প্রাঞ্জল, কিন্তু তীক্ষ্ণ ও প্রতীকাত্মক। তিনি ব্যবহার করেছেন — ‘কপালের ঘাম’, ‘ফোঁটা ফোঁটা রক্ত’, ‘আফ্রিকার কুলির গায়ের রঙের ঘোর কৃষ্ণবর্ণ’, ‘ভোর না হতেই ওঠে’, ‘খেটে মরে’, ‘লাঙ্গল কাঁধে কুঁজো হয়ে হাঁটে’, ‘শস্যের বোঝা বইতে বইতে ক্লান্ত’, ‘বীজ বপন করে’, ‘ঘৃণা, বাসি রুটি, পঁচা মাছ, শতচ্ছিন্ন নোংরা পোশাক, কয়েকটা নয়া পয়সা’, ‘চাবুক আর বুটের ঠোক্কর’, ‘উপর ওয়ালাকে গাড়ি, যন্ত্রপাতি, মেয়ে মানুষ কেনার টাকা’, ‘নিগ্রদের মুন্ডুগলি’, ‘সাদা আদমিকে বড়লোক তৈরি’, ‘কালো রঙের মানুষটা’, ‘গাধার খাটুনি’, ‘তালগাছের চূড়োয় মদ’, ‘মাতলামোর মধ্যে ভুলে যাওয়া’।
প্রতীক ব্যবহারে তিনি দক্ষ। ‘কপালের ঘাম’ — শ্রম, পরিশ্রম। ‘ফোঁটা ফোঁটা রক্ত’ — জীবন, বলিদান। ‘আফ্রিকার কুলির গায়ের রঙ’ — কালো শ্রমিকের পরিচয়। ‘চাবুক আর বুটের ঠোক্কর’ — শোষণ, নির্যাতন। ‘উপর ওয়ালা’ — সাদা কর্তা, উপনিবেশিক শক্তি। ‘নিগ্রদের মুন্ডুগলি’ — কালো মানুষের মাথা, বলি। ‘সাদা আদমি’ — শোষণকারী, পুঁজিপতি। ‘কালো রঙের মানুষটা’ — শ্রমজীবী, শোষিত। ‘গাধার খাটুনি’ — কঠোর পরিশ্রম। ‘তালগাছের চূড়োয় মদ’ — আত্মবিস্মৃতি, পালানোর একমাত্র পথ।
পুনরাবৃত্তি শৈলী কবিতার সুর তৈরি করেছে। ‘কে সেই মানুষ?’ — তৃতীয় স্তবকের পুনরাবৃত্তি প্রশ্নের জোরালোতা নির্দেশ করে।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“সেই মানুষটি যে ফসল ফলিয়েছিল” বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এক অসাধারণ সৃষ্টি (আন্তোনিও হাসিন্তের অনুবাদ)। কবি কালো শ্রমিকের কণ্ঠে শোষণের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। সেই বিরাট খামারটাতে কখনো বৃষ্টি হয় না। তাঁর কপালের ঘাম দিয়ে গাছের তৃষ্ণা মেটাতে হয়। কফি ও চেরির লাল রঙ তাঁর ফোঁটা ফোঁটা রক্তে তৈরি। কফির গুঁড়োর রঙ হবে আফ্রিকার কুলির গায়ের রঙের ঘোর কৃষ্ণবর্ণ — তাঁর নিজের ত্বকের রঙ, তাঁর জমাট রক্তের রঙ।
কে ভোর না হতেই ওঠে? কে তখন থেকেই খেটে মরে? কে লাঙ্গল কাঁধে কুঁজো হয়ে হাঁটে? কে শস্যের বোঝা বইতে বইতে ক্লান্ত হয়? কে বীজ বপন করে? আর তার বিনিময়ে যা পায়, তা হলো ঘৃণা, বাসি রুটি, পঁচা মাছ, নোংরা পোশাক, কয়েকটা নয়া পয়সা। আর এরপরেও তাকে পুরস্কৃত করা হয় চাবুক আর বুটের ঠোক্কর দিয়ে।
কে সেই মানুষ? যে গম, ভুট্টা, কমলা ফলায়। যে উপরওয়ালাকে গাড়ি, যন্ত্রপাতি, মেয়ে কেনার টাকা আর মোটরের নিচে চাপা পড়ার জন্য নিগ্রদের মাথা যোগান দেয়। যে সাদা আদমিকে বড়লোক তৈরি করে। প্রকৃতি সবাই উত্তর দেয় — ঐ কালো রঙের মানুষটা — যে দিনরাত গাধার খাটুনি খাটছে।
শেষে তিনি বলেন — আহা! আমাকে অন্তত তালগাছটার চূড়োয় উঠতে দাও। সেখানে বসে আমি মদ খাবো — তালগাছ থেকে যে মদ চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ে। আর মাতলামোর মধ্যে আমি নিশ্চয়ই ভুলে যাব — আমি একজন কালো রঙের মানুষ — আমার জন্যেই এই সব।
এই কবিতা আমাদের শেখায় — কালো শ্রমিকের ঘাম ও রক্তে ফসল ফলানো হয়, কিন্তু তার প্রাপ্য শুধু ঘৃণা, বাসি রুটি, চাবুক। সে সাদা কর্তাকে বড়লোক বানায়, কিন্তু নিজে থাকে শোষিত। শেষ পর্যন্ত তার একমাত্র আশ্রয় মদ — তালগাছের চূড়োয় বসে মদ খেয়ে নিজের পরিচয় ভুলে যাওয়া। এটি উপনিবেশবাদ ও পুঁজিবাদী শোষণের এক অসাধারণ কাব্যচিত্র।
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় উপনিবেশবাদ, শ্রম ও শোষণ
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় উপনিবেশবাদ, শ্রম ও শোষণ একটি পুনরাবৃত্ত বিষয়। তিনি ‘সেই মানুষটি যে ফসল ফলিয়েছিল’ কবিতায় আন্তোনিও হাসিন্তের রচনা অনুবাদ করে কালো শ্রমিকের শোষণের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি দেখিয়েছেন — কীভাবে কালো শ্রমিকের ঘাম ও রক্তে ফসল ফলানো হয়, কীভাবে তার প্রাপ্য শুধু ঘৃণা ও নির্যাতন, কীভাবে সে সাদা কর্তাকে বড়লোক বানায়, এবং কীভাবে শেষ পর্যন্ত তার একমাত্র আশ্রয় মদ।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের উচ্চতর পাঠ্যক্রমে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘সেই মানুষটি যে ফসল ফলিয়েছিল’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের উপনিবেশবাদ, শ্রমিক শোষণ, আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলন, এবং আধুনিক বাংলা কবিতার ধারা সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে।
সেই মানুষটি যে ফসল ফলিয়েছিল সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: সেই মানুষটি যে ফসল ফলিয়েছিল কবিতাটির লেখক কে?
এই কবিতাটির লেখক বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৯২০-২০০৫)। তিনি বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের একজন প্রধান বাংলা কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। কবিতাটি মূলত পর্তুগিজ কবি আন্তোনিও হাসিন্তের রচনার অনুবাদ।
প্রশ্ন ২: ‘সেই বিরাট খামারটাতে কখনো বৃষ্টি হয় না / আমারই কপালের ঘাম দিয়ে গাছগুলোকে / তৃষ্ণা মেটাতে হয়’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
খামারে প্রাকৃতিক বৃষ্টি নেই। কালো শ্রমিকের কপালের ঘাম দিয়ে গাছের তৃষ্ণা মেটাতে হয়। এটি শ্রমিকের পরিশ্রমের চিত্র — প্রকৃতি নয়, শ্রমিকের ঘামই ফসল ফলায়।
প্রশ্ন ৩: ‘সেখানে যে কফি ফলে, আর চেরি গাছে / যে টুকটুকে লাল রঙের বাহার ধরে / তা আমারই ফোঁটা ফোঁটা রক্ত’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
কফি ও চেরির লাল রঙ কালো শ্রমিকের ফোঁটা ফোঁটা রক্তে তৈরি। এটি শ্রমিকের জীবন-বলিদানের চিত্র।
প্রশ্ন ৪: ‘কফিগুলোকে ভাজা হবে, রোদে শুকোতে হবে, / তারপর গুড়ো করতে হবে / যতক্ষণ না পর্যন্ত তাদের গায়ের রঙ হবে / আফ্রিকার কুলির গায়ের রঙের ঘোর কৃষ্ণবর্ণ’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
কফির গুঁড়োর রঙ হবে কালো শ্রমিকের ত্বকের রঙের মতো। শ্রমিকের রক্ত ও ত্বকের রঙ ফসলের সঙ্গে মিশে যায়।
প্রশ্ন ৫: ‘কে ভোর না হতেই ওঠে? / কে তখন থেকেই খেটে মরে?’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
শ্রমিকই ভোরে ওঠে, খেটে মরে। প্রশ্নের মাধ্যমে শ্রমিকের পরিচয় চিহ্নিত করা হচ্ছে।
প্রশ্ন ৬: ‘আর তার বিনিময়ে যা পায়, তা হ’লো / ঘৃণা, বাসি রুটি, পঁচা মাছের টুকরো, / শতচ্ছিন্ন নোংরা পোশাক, কয়েকটা নয়া পয়সা?’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
শ্রমিকের পরিশ্রমের বিনিময়ে যা পায় — ঘৃণা, বাসি খাবার, নোংরা পোশাক, সামান্য টাকা। এটি শোষণের চিত্র।
প্রশ্ন ৭: ‘আর এরপরেও তাকে পুরস্কৃত করা হয় / চাবুক আর বুটের ঠোক্কর দিয়ে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
পুরস্কার হিসেবে পায় চাবুক ও বুটের ঠোক্কর — অর্থাৎ নির্যাতন। এটি শ্রমিকের প্রতি শোষণকারীর নির্মমতার চিত্র।
প্রশ্ন ৮: ‘কে উপর ওয়ালাকে গাড়ি, যন্ত্রপাতি, / মেয়ে মানুষ কেনার টাকা আর / মোটরের নিচে চাপা পড়ার জন্য / নিগ্রদের মুন্ডুগলি যোগান দেয়?’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
শ্রমিকই উপরওয়ালাকে (সাদা কর্তা) গাড়ি, যন্ত্রপাতি, মেয়ে কেনার টাকা, আর মোটরের নিচে চাপা পড়ার জন্য কালো মানুষের মাথা যোগান দেয়। এটি শোষণের চরম রূপ — শোষিত নিজেই শোষকের সম্পদ যোগায়।
প্রশ্ন ৯: ‘আহা! / আমাকে অন্তত ঐ তালগাছটার চূড়োয় উঠতে দাও / সেখানে বসে আমি মদ খাবো / তালগাছ থেকে যে মদ চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ে; / আর মাতলামোর মধ্যে আমি নিশ্চয়ই ভুলে যাব / আমি একজন কালো রঙের মানুষ / আমার জন্যেই এই সব’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
শ্রমিকের একমাত্র আশ্রয় মদ। তালগাছের চূড়োয় বসে মদ খেয়ে মাতাল হয়ে তিনি ভুলে যেতে চান তিনি একজন কালো মানুষ, ভুলে যেতে চান তাঁর জন্যেই এই সব শোষণ। এটি পালানোর চিত্র, প্রতিবাদ নয়।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
কবিতাটি আমাদের শেখায় — কালো শ্রমিকের ঘাম ও রক্তে ফসল ফলানো হয়, কিন্তু তার প্রাপ্য শুধু ঘৃণা, বাসি রুটি, চাবুক। সে সাদা কর্তাকে বড়লোক বানায়, কিন্তু নিজে থাকে শোষিত। শেষ পর্যন্ত তার একমাত্র আশ্রয় মদ — তালগাছের চূড়োয় বসে মদ খেয়ে নিজের পরিচয় ভুলে যাওয়া। এটি উপনিবেশবাদ ও পুঁজিবাদী শোষণের এক অসাধারণ কাব্যচিত্র। আজকের পৃথিবীতে — যেখানে শ্রমিক এখনও শোষিত, কালো মানুষ এখনও বৈষম্যের শিকার — এই কবিতার প্রাসঙ্গিকতা অপরিসীম।
ট্যাগস: সেই মানুষটি যে ফসল ফলিয়েছিল, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, শ্রমিকের কবিতা, উপনিবেশবাদ বিরোধী কবিতা, কালো মানুষের কবিতা, আন্তোনিও হাসিন্ত, বাংলা কবিতা বিশ্লেষণ
© Kobitarkhata.com – কবি: বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (মূল: আন্তোনিও হাসিন্ত) | কবিতার প্রথম লাইন: “সেই বিরাট খামারটাতে কখনো বৃষ্টি হয় না / আমারই কপালের ঘাম দিয়ে গাছগুলোকে / তৃষ্ণা মেটাতে হয়” | শ্রম ও শোষণের কবিতা বিশ্লেষণ | আধুনিক বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন






