কবিতার খাতা
আনন্দ-ভৈরবী – শক্তি চট্টোপাধ্যায়।
আজ সেই ঘরে এলায়ে পড়েছে ছবি
এমন ছিলো না আষাঢ়-শেষের বেলা
উদ্যানে ছিলো বরষা-পীড়িত ফুল
আনন্দ-ভৈরবী
আজ সেই গোঠে আসে না রাখাল ছেলে
কাঁদে না মোহনবাঁশিতে বটের মূল
এখনো বরষা কোদালে মেঘের ফাঁকে
বিদ্যুৎ-রেখা মেলে
সে কি জানিত না এমনি দুঃসময়
লাফ মেরে ধরে মোরগের লাল ঝুঁটি
সে কি জানিত না হৃদয়ের অপচয়
কৃপণের বামমুঠি
সে কি জানিত না যত বড়ো রাজধানী
তত বিখ্যাত নয় এ-হৃদয়পুর
সে কি জানিত না আমি তারে যত জানি
আনন্দ সমুদ্দুর
আজ সেই ঘরে এলায়ে পড়েছে ছবি
অমন ছিলো না আষাঢ়-শেষের বেলা
উদ্যানে ছিল বরষা-পীড়িত ফুল
আনন্দ-ভৈরবী |
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা।
কবিতার কথা –
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দ-ভৈরবী’ কবিতাটি গভীর বিষাদ, স্মৃতিচারণ এবং এক চরম শূন্যতাবোধের প্রকাশ। কবিতার শিরোনামে ‘আনন্দ’ ও ‘ভৈরবী’ (যা মূলত একধরণের রাগ, যা বিরহ ও করুণ রসের সৃষ্টি করে) শব্দ দুটির যুগলবন্দী এক ধরণের বৈপরীত্য তৈরি করে, যা জীবনের আনন্দ হারিয়ে যাওয়ার পর অবশিষ্ট থাকা হাহাকারকে নির্দেশ করে। আষাঢ়ের শেষের এক মেঘলা দিনে কোনো এক প্রিয় মানুষের অনুপস্থিতি এবং তার ফলে চারপাশের চেনা জগতের যে রূপান্তর ঘটেছে, কবি এখানে তারই এক মায়াবী ও বিষণ্ণ চিত্র এঁকেছেন।
কবিতার শুরুতে এবং শেষে ফিরে আসা স্তবকটি ঘরের দেয়ালে ঝুলে থাকা কোনো এক ছবির দিকে ইঙ্গিত করে, যা এখন নির্জীব ও অবিন্যস্ত হয়ে পড়েছে। একসময় আষাঢ়ের শেষ বেলায় প্রকৃতিতে বরষা-পীড়িত ফুলের যে রূপ ছিল, আজ আর তা নেই—সেখানে এখন কেবলই শূন্যতা। রাখাল ছেলের অনুপস্থিতি, বটের মূলে মোহনবাঁশির সুরের স্তব্ধতা এবং মেঘের ফাঁকে বিদ্যুতের ক্ষণস্থায়ী রেখা যেন এক পরম প্রিয় সত্তার চলে যাওয়ার পরবর্তী স্থবির ও দুঃসহ সময়কে ফুটিয়ে তোলে। এই বিষণ্ণতা শুধু প্রকৃতির নয়, বরং কবির নিজের ভেতরের এক গভীর হাহাকারেরই প্রতিধ্বনি।
শেষাংশে কবি এক ধরণের অনুযোগ ও আত্মোপলব্ধির মুখোমুখি হয়েছেন। যে মানুষটি চলে গেছে, সে কি জানত না এই আকস্মিক দুঃসময়ের কথা, যা কোনো মোরগের লাল ঝুঁটি ছোঁ মেরে ধরার মতোই নিষ্ঠুর ও আকস্মিক? সে কি বোঝেনি হৃদয়ের এই বিপুল অপচয়, যা কোনো কৃপণের বন্ধ মুঠোর মতো সংকীর্ণ হয়ে যায়? বিশাল রাজধানীর চেয়েও যে এই ‘হৃদয়পুর’ অনেক বেশি বিখ্যাত ও গভীর ছিল, এবং কবির ভালোবাসার গভীরতা যে এক ‘আনন্দ সমুদ্দুর’ ছিল—তা অপর প্রান্তের মানুষটি বুঝতে পারেনি। এই বুঝতে না পারার আক্ষেপ আর হারিয়ে ফেলার তীব্র বেদনাই কবিতাটিকে এক পরম আর্তি ও বিষাদে রূপান্তর করেছে।





