এ যে আমার সাড়ে তিন হাতের মস্ত জমিদারি
এর নাই কোনও শরিক, নাইকো দখলদারি।
দুইখান বাতি জ্বলে আর নেভে, ব্যস্ত সেরেস্তাখানা
আসা যাওয়ার দরজা খোলা, তবু ভিতরে যেতে মানা।
দুনিয়া যখন হাতছানি দেয়, এক নয়নে কান্দি
যে আমারে দূরে ঠেলেছে, তারেই দু’ হাতে বান্ধি।
দুই কান ধরে সদা টান মারে স্বর্গ-নরকের দ্বারী
তবু এ আমারই সাড়ে তিন হাতের মস্ত জমিদারি।
এ জমিদারির নাই কোনও খাজনা, শুধুই বাজনা বাজে
কাজের সময় ঘুমাই আমি, ধুন্ধুমার হয় অকাজে।
অতিথিশালায় একখান ঘর, দিবা রাত্তির খালি
খালির খালি, বাতাস ভরা, শুকনো ফুলের ডালি।
ক্ষুধার সময় নিজেকেই খাই, তৃষ্ণায় চক্ষের পানি
আমিই ব্যাঘ্র, আমিই প্রেত, হৃদয়ে রাজধানী।
ভুলভুলাইয়া যত ব্যথা, সুখের কথা, সমান হলো ভাইরে
আর সুনীল ক্ষ্যাপা কয়রে আমি তাইরে নাইরে নাইরে।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা।
কবিতার কথা-
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সাড়ে তিন হাতের মস্ত জমিদারি’ কবিতাটি মানুষের নশ্বর দেহ, তার অন্তর্জগতের অনন্ত দ্বন্দ্ব, অহংকার এবং আত্মোপলব্ধির এক গভীর ও দর্শনসমৃদ্ধ সৃষ্টি। মানবদেহকে মাত্র ‘সাড়ে তিন হাত’ পরিমাপের সাথে তুলনা করে তাকে এক বিশাল ‘জমিদারি’ হিসেবে অভিহিত করার মধ্য দিয়ে কবি জীবনের এক পরম ও চিরন্তন সত্যকে অত্যন্ত লৌকিক ও স্বচ্ছন্দ ঢঙে ফুটিয়ে তুলেছেন।
কবিতার প্রথমাংশে মানুষের শরীরের রূপকটি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে। এই ছোট্ট সাড়ে তিন হাতের শরীরে কোনো শরিক বা জবরদখলকারী নেই; মানুষ নিজেই এর সর্বময় কর্তা। চোখের দুটি বাতি জ্বলে ও নেভে, আর মন নামক ব্যস্ত সেরেস্তাখানায় চলে অনুভূতির অন্তহীন হিসাব-নিকাশ। বাহ্যিক জগৎ যতই হাতছানি দিক, জন্ম-মৃত্যুর মাঝের এই দেহসীমানায় প্রবেশের ও প্রস্থানের দরজা সবার জন্যই নির্দিষ্ট। সুখের মুহূর্তে এক চোখে কান্না আবার জীবনের বৈপরীত্যে দূরে ঠেলে দেওয়া প্রিয়জনকে দু’হাতে আঁকড়ে ধরার যে মানসিক টানাপোড়েন, তা এই দেহের জমিদারিকেই শাণিত করে। স্বর্গের বা নরকের দ্বারী প্রতিনিয়ত কান ধরে টানলেও এই ক্ষুদ্র দেহ নিয়েই মানুষের সমস্ত অহংকার ও অস্তিত্ব।
কবিতাটির মধ্যভাগে মানবজীবনের বৈপরীত্য ও পরার্থপরতার এক অদ্ভুত চালচিত্র অঙ্কিত হয়েছে। এই জমিদারির কোনো বস্তুগত খাজনা নেই, রয়েছে কেবল নিরন্তর বাজনা বা অনুভূতির স্পন্দন। কাজের সময়ে মানুষের ঘুম বা অলসতা আর অকাজের সময়ে হুলুস্থুল কাণ্ড—মানুষের স্বভাবের এই ধোঁয়াশাকে কবি দারুণভাবে ধরেছেন। শরীরের ভেতরের অতিথিশালা বা হৃদয় সবসময় খালি; সেখানে বাতাস আর ঝরে পড়া শুকনো ফুলের ডালি ছাড়া আর কিছু নেই। চরম ক্ষুধা বা বিপদে মানুষ নিজেই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে; সে নিজেই যেমন হিংস্র বাঘ, তেমনি নিজেই আবার সর্বহারা প্রেতাত্মা। হৃদয়ের এই রাজধানী জুড়েই আবর্তিত হয় তার জীবন।
কবিতার শেষাংশে এসে সমস্ত দ্বান্দ্বিকতা এক পরম প্রশান্তির মহাসমুদ্রে গিয়ে মেশে। জীবনের ভুলভুলাইয়ায় জমে থাকা যতো ব্যথা আর সুখের স্মৃতি, সব একাকার হয়ে সমান হয়ে যায়। সমস্ত প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি ও দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে গিয়ে কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এক উদাসীন ও লৌকিক মুক্তির সুরে পৌঁছে যান—যেখানে সব হিসাব চুকিয়ে আত্মমগ্ন এক আনন্দের প্রকাশ ঘটে: “আর সুনীল ক্ষ্যাপা কয়রে আমি তাইরে নাইরে নাইরে।” দেহসর্বস্ব এই জীবনকে পরম উদাসীনতায় গ্রহণ করার এক অনন্য কাব্যিক দলিল এই কবিতাটি।
সাড়ে তিন হাতের মস্ত জমিদারি – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় | শরীর, রাজধানী ও ক্ষ্যাপার কবিতা
সাড়ে তিন হাতের জমিদারি: কেন এই কবিতা শরীরের রূপক?
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাড়ে তিন হাতের মস্ত জমিদারি কবিতাটি বাংলা কবিতায় অনন্য — কারণ এটি মানবশরীরকে এক জমিদারি হিসেবে দেখায়। “এ যে আমার সাড়ে তিন হাতের মস্ত জমিদারি, এর নাই কোনও শরিক, নাইকো দখলদারি।” সাড়ে তিন হাত — অর্থাৎ প্রায় সাড়ে পাঁচ ফুট লম্বা একটি মানবদেহ। এই শরীরই কবির জমিদারি — যেখানে কোনো শরিক নেই, কোনো দখলদার নেই। কবি নিজেই এই জমিদারির একমাত্র মালিক। এই রূপকটি অসাধারণ — কারণ প্রত্যেক মানুষই তার নিজের শরীরের একমাত্র জমিদার, এবং সেই জমিদারি কোনোদিন কেউ দখল করতে পারে না।
দুইখান বাতি, ব্যস্ত সেরেস্তাখানা: চোখ ও মস্তিষ্কের রূপক
“দুইখান বাতি জ্বলে আর নেভে, ব্যস্ত সেরেস্তাখানা।” দুইখান বাতি — সম্ভবত দুই চোখ, যা জ্বলে ও নেভে (খোলে ও বন্ধ হয়)। সেরেস্তাখানা — অর্থাৎ অফিস, যেখানে সব হিসাব রাখা হয়। এখানে সেরেস্তাখানা মানে মস্তিষ্ক — যেখানে সারাক্ষণ ভাবনা চলছে, হিসাব হচ্ছে। “আসা যাওয়ার দরজা খোলা, তবু ভিতরে যেতে মানা।” — দরজা খোলা মানে শরীরের রোমকূপ, ইন্দ্রিয়; ভিতরে যেতে মানা মানে আত্মার গভীরে কেউ প্রবেশ করতে পারে না। এই রূপকটি সুনীলের অনন্য কৌশল — শরীরের প্রতিটি অঙ্গকে একটি করে সাম্রাজ্যের উপাদান হিসেবে দেখা।
দুনিয়া যখন হাতছানি দেয়: দ্বৈততার দর্শন
“দুনিয়া যখন হাতছানি দেয়, এক নয়নে কান্দি, যে আমারে দূরে ঠেলেছে, তারেই দু’ হাতে বান্ধি।” এই দুই লাইনই কবিতার সবচেয়ে ব্যথিত অংশ। পাশাপাশি দুটি বিপরীত কাজ — দুনিয়া হাতছানি দিলে এক চোখে কাঁদা, আর যে দূরে ঠেলেছে তাকে দুই হাতে বাঁধা। এখানে মানবমনের এক চিরন্তন দ্বৈততা ধরা পড়ে — আমরা যা চাই, তা পাই না; যা পাই, তা চাই না। যে আমাদের দূরে ঠেলে, তাকেই আমরা আঁকড়ে ধরি। এই দ্বৈততাই মানবহৃদয়ের সবচেয়ে বড় রহস্য।
স্বর্গ-নরকের দ্বারী: দুই কান ধরে টান
“দুই কান ধরে সদা টান মারে স্বর্গ-নরকের দ্বারী।” স্বর্গ-নরকের দ্বারী মানে সেই শক্তি, যা মানুষকে ভালো-মন্দের মধ্যে টানে। দুই কান ধরে টানা — অর্থাৎ বাইরের জগতের নানা প্রলোভন দুই কান দিয়ে ঢুকে মানুষকে টানে — কখনও স্বর্গের দিকে, কখনও নরকের দিকে। তবু সেই জমিদারি কবিরই — কেউ দখল করতে পারে না। এই কারণেই লাইনটি শেষ হয় — “তবু এ আমারই সাড়ে তিন হাতের মস্ত জমিদারি।”
খাজনা নেই, শুধু বাজনা: শরীরের অর্থনীতি
“এ জমিদারির নাই কোনও খাজনা, শুধুই বাজনা বাজে।” এখানে জমিদারি শব্দটির সঙ্গে খাজনা শব্দটি মিলিয়ে সুনীল একটি সুক্ষ্ম রাজনৈতিক ব্যঙ্গ করছেন। সাধারণত জমিদারি মানে খাজনা তোলা, প্রজা শোষণ। কিন্তু এই জমিদারিতে খাজনা নেই — শুধু বাজনা আছে। অর্থাৎ শরীর কোনো শোষণ করে না, শরীর শুধু সুর তৈরি করে। “কাজের সময় ঘুমাই আমি, ধুন্ধুমার হয় অকাজে।” — কাজের সময় ঘুম, অকাজে ধুন্ধুমার — এটি মানবমনের এক চিরন্তন প্রবণতা।
অতিথিশালা, ক্ষুধা ও তৃষ্ণা: শরীরের ভেতরের জগৎ
“অতিথিশালায় একখান ঘর, দিবা রাত্তির খালি, খালির খালি, বাতাস ভরা, শুকনো ফুলের ডালি।” অতিথিশালা মানে শরীর, ঘর মানে হৃদয় — যা খালি, বাতাস ভরা, শুকনো ফুলের ডালি। হৃদয় এখানে শূন্য, কিন্তু সুন্দর — কারণ শুকনো ফুলও ফুল। “ক্ষুধার সময় নিজেকেই খাই, তৃষ্ণায় চক্ষের পানি।” — ক্ষুধায় নিজেকেই খাওয়া মানে আত্মভক্ষণ, তৃষ্ণায় চোখের জল পান করা মানে নিজের কান্না দিয়ে নিজের তৃষ্ণা মেটানো। আত্মনির্ভরতার চরম রূপ।
ব্যাঘ্র, প্রেত ও রাজধানী: আত্মপরিচয়ের সংকট
“আমিই ব্যাঘ্র, আমিই প্রেত, হৃদয়ে রাজধানী।” — এই লাইনটিই কবিতার শীর্ষবিন্দু। একই মানুষ একইসঙ্গে ব্যাঘ্র (হিংস্র, শক্তিশালী), প্রেত (ভয়ংকর, অস্পষ্ট) এবং রাজধানী (সুন্দর, সমৃদ্ধ)। এখানে সুনীল দেখান — প্রত্যেক মানুষের ভেতরে একাধিক সত্তা বাস করে, এবং সেই সত্তাগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্বই মানুষকে মানুষ করে তোলে। “ভুলভুলাইয়া যত ব্যথা, সুখের কথা, সমান হলো ভাইরে।” — সমস্ত ব্যথা ও সুখ একসঙ্গে মিলে যায়, আলাদা করা যায় না। শেষে আত্মপরিচয়ের ঘোষণা — “আর সুনীল ক্ষ্যাপা কয়রে আমি তাইরে নাইরে নাইরে।”
‘সুনীল ক্ষ্যাপা’: আত্মসম্বোধনের কৌশল
শেষ লাইনে কবি নিজেকে ‘সুনীল ক্ষ্যাপা’ বলে সম্বোধন করেন — যা আত্ম-বিদ্রূপ ও আত্ম-স্বীকৃতির মিশ্রণ। ‘ক্ষ্যাপা’ মানে পাগল, উন্মাদ। কবি স্বীকার করেন — তিনি পাগল, কিন্তু সেই পাগলামিই তার জমিদারির প্রকৃত শাসক। ‘তাইরে নাইরে নাইরে’ — সম্ভবত তালে তালে বলা একটি শব্দ, যা কবিতাকে গানের সুরে শেষ করে।
ট্যাগস: সাড়ে তিন হাতের মস্ত জমিদারি, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শরীরের কবিতা, আত্মপরিচয়ের কবিতা, হৃদয়ের রাজধানী, সুনীল ক্ষ্যাপা, আধুনিক বাংলা কবিতা
© Kobitarkhata.com – কবি: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় | “এ যে আমার সাড়ে তিন হাতের মস্ত জমিদারি” | শরীর, রাজধানী ও ক্ষ্যাপার অনবদ্য কাব্য