দেখুন- গণতন্ত্রে সংখ্যাগুরুর মতটাই মত
সংখ্যাগুরুর পথটাই পথ
দু’চারজন কি ভাবল কি বললো সেটা ধরলে
চলবেনা।
আফটার অল গণতন্ত্র তো বটে!
সবাই মিলে -মানে বেশির ভাগ লোক মিলে
শেষমেশ যদি কোনো ডাকাতকে ভোট দিয়ে মন্ত্রী বানিয়ে দেয়ই
আপনাকে কিন্তু গণতন্ত্রের সম্মানার্থে সেই ডাকাতকে স্যার বলে হেঁ হেঁ করতেই হবে।
আফটার অল
গণতন্ত্র ইজ গণতন্ত্র
বেশির ভাগ লোক যদি একজোট হয়ে
ধুম ধাম চেঁচামেচি হৈ-চৈ চিৎকারকে মধুর সঙ্গীত বলে মেনে নেয়-
আপনাকেও মানতে হবে।
রেডিওয় টিভিতে মঞ্চে সে সবই শুনতে হবে।
বেশির ভাগ লোক যদি দুর্বোধ্য শব্দজব্দ বা
ভাষার মার প্যাঁচকেই কবিতা বলে ধন্য ধন্য করে
আপনাকে মেনে নিতেই হবে।
আফটার অল This is গণতন্ত্র।
দেশটা গণতন্ত্রের।
বেশির ভাগ লোক পছন্দ করেনা বলে
রবীন্দ্রনাথের গান – জীবনানন্দের কবিতা সত্যজিতের ছবি
ধীরে ধীরে ভুলে যেতে হবে –
বেশির ভাগ লোক হামলে পড়ে বলেই
পাড়ায় পাড়ায় বিউটি পার্লার আর ভিডিও হল খুলতে হবে।
কেননা দেশটাতো আর স্বৈরতন্ত্রের নয়।
This is গণতন্ত্র।
বেশির ভাগ লোক চায় বলেই এমন সব লোকেরা মাতব্বর হবে- হয়ে মাথায় চড়বে-
যাদের একটাই কর্মসূচী -কামিয়ে নাও। লুটে নাও
তা এরা মাতব্বর হবে-
আপনি চটে গেলে তো চলবে না
This is গণতন্ত্র।
লাখে লাখে লোক ভোলে বাবা পার করেগা বলে
তারকেশ্বরে ছোটে –
তার সিকির সিকি ভাগ লোকও
রক্তদান শিবিরের ছায়া মাড়ায় না – যদিও
রক্তের অভাবে হাজার হাজার বিপন্ন মানুষ
এদেশে প্রাণ হারায়
তা হারাক।
গণতন্ত্র বলে কথা?
ভোলেবাবার কাছে যাবার জন্য ফ্রি’তে সরকার থেকে
কলসী আর বাঁক সরবরাহ করা উচিৎ
আর মন্দির পৌঁছনোর পথটাও
অবিলম্বে রেড রোডের মত ঝকঝক করে
তোলা উচিৎ।
কারণ after অল
গণতন্ত্র ইজ গণতন্ত্র।
বেশির ভাগ লোক যা বলবে – যা চাইবে-
তাতে তো আপনাকে সায় দিতেই হবে
নইলে যে লোক আপনাকে একলা ষাঁড় স্বৈরতান্ত্রিক বলবে!
একটা কথা এই সুযোগে
আপনাদের কানে কানে বলি
আপনারা বেশির ভাগ লোক চাইছেন বলেই তো
আমি সাহস করে এইসব
ছাইভস্ম লিখছি।
আর আপনাদের শোনাচ্ছি নইলে
আপনাদের মত বিদগ্ধজনের আসরে
আমাকে কি মানায়?
কি আর করা যাবে! After all
গণতন্ত্র is গণতন্ত্র।দেখুন- গণতন্ত্রে সংখ্যাগুরুর মতটাই মত
সংখ্যাগুরুর পথটাই পথ
দু’চারজন কি ভাবল কি বললো সেটা ধরলে
চলবেনা।
আফটার অল গণতন্ত্র তো বটে!
সবাই মিলে -মানে বেশির ভাগ লোক মিলে
শেষমেশ যদি কোনো ডাকাতকে ভোট দিয়ে মন্ত্রী বানিয়ে দেয়ই
আপনাকে কিন্তু গণতন্ত্রের সম্মানার্থে সেই ডাকাতকে স্যার বলে হেঁ হেঁ করতেই হবে।
আফটার অল
গণতন্ত্র ইজ গণতন্ত্র
বেশির ভাগ লোক যদি একজোট হয়ে
ধুম ধাম চেঁচামেচি হৈ-চৈ চিৎকারকে মধুর সঙ্গীত বলে মেনে নেয়-
আপনাকেও মানতে হবে।
রেডিওয় টিভিতে মঞ্চে সে সবই শুনতে হবে।
বেশির ভাগ লোক যদি দুর্বোধ্য শব্দজব্দ বা
ভাষার মার প্যাঁচকেই কবিতা বলে ধন্য ধন্য করে
আপনাকে মেনে নিতেই হবে।
আফটার অল This is গণতন্ত্র।
দেশটা গণতন্ত্রের।
বেশির ভাগ লোক পছন্দ করেনা বলে
রবীন্দ্রনাথের গান – জীবনানন্দের কবিতা সত্যজিতের ছবি
ধীরে ধীরে ভুলে যেতে হবে –
বেশির ভাগ লোক হামলে পড়ে বলেই
পাড়ায় পাড়ায় বিউটি পার্লার আর ভিডিও হল খুলতে হবে।
কেননা দেশটাতো আর স্বৈরতন্ত্রের নয়।
This is গণতন্ত্র।
বেশির ভাগ লোক চায় বলেই এমন সব লোকেরা মাতব্বর হবে- হয়ে মাথায় চড়বে-
যাদের একটাই কর্মসূচী -কামিয়ে নাও। লুটে নাও
তা এরা মাতব্বর হবে-
আপনি চটে গেলে তো চলবে না
This is গণতন্ত্র।
লাখে লাখে লোক ভোলে বাবা পার করেগা বলে
তারকেশ্বরে ছোটে –
তার সিকির সিকি ভাগ লোকও
রক্তদান শিবিরের ছায়া মাড়ায় না – যদিও
রক্তের অভাবে হাজার হাজার বিপন্ন মানুষ
এদেশে প্রাণ হারায়
তা হারাক।
গণতন্ত্র বলে কথা?
ভোলেবাবার কাছে যাবার জন্য ফ্রি’তে সরকার থেকে
কলসী আর বাঁক সরবরাহ করা উচিৎ
আর মন্দির পৌঁছনোর পথটাও
অবিলম্বে রেড রোডের মত ঝকঝক করে
তোলা উচিৎ।
কারণ after অল
গণতন্ত্র ইজ গণতন্ত্র।
বেশির ভাগ লোক যা বলবে – যা চাইবে-
তাতে তো আপনাকে সায় দিতেই হবে
নইলে যে লোক আপনাকে একলা ষাঁড় স্বৈরতান্ত্রিক বলবে!
একটা কথা এই সুযোগে
আপনাদের কানে কানে বলি
আপনারা বেশির ভাগ লোক চাইছেন বলেই তো
আমি সাহস করে এইসব
ছাইভস্ম লিখছি।
আর আপনাদের শোনাচ্ছি নইলে
আপনাদের মত বিদগ্ধজনের আসরে
আমাকে কি মানায়?
কি আর করা যাবে! After all
গণতন্ত্র is গণতন্ত্র।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। শুভ দাশগুপ্তের কবিতা।
কবিতার কথা –
শুভ দাশগুপ্তের ‘গণতন্ত্র’ কবিতাটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার মেকি রূপ, সংখ্যাগুরুর নামে চলা মূর্খতা ও অবক্ষয় এবং আধুনিক সমাজের ভণ্ডামির ওপর আঁকা এক নির্মম ও তীব্র ব্যঙ্গাত্মক আখ্যান। কবি তাঁর স্বভাবসুলভ ধারালো কৌতুকবোধ ও শ্লেষাত্মক (satirical) বাচনভঙ্গির মাধ্যমে ‘সংখ্যাগুরুর শাসন’ বা তথাকথিত গণতন্ত্র কীভাবে সমাজের রুচি, নীতি ও মূল্যবোধকে ধ্বংস করছে তা উন্মোচিত করেছেন।
কবিতার শুরুতেই কবি ‘আফটার অল গণতন্ত্র ইজ গণতন্ত্র’ বাক্যটিকে এক অদ্ভুত উপহাসের প্রলেপ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। গণতন্ত্রের মূল নীতি অনুযায়ী যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতই চূড়ান্ত, তাই সমাজের অধিকাংশ লোক মিলে যদি কোনো চিহ্নিত অপরাধী বা ডাকাতকেও ভোট দিয়ে নেতা বানিয়ে দেয়, তবে নাগরিক হিসেবে তাকেই ‘স্যার’ বলে তোষামোদ করতে হয়। একইভাবে, বেশির ভাগ লোক যদি হৈ-চৈ ও কোলাহলকে সঙ্গীত বলে ধরে নেয়, কিংবা অস্পষ্ট ভাষার মারপ্যাঁচকে মহৎ কবিতা বলে ধন্য ধন্য করে, তবে সেই বিকৃত রুচিকেই সমাজের প্রামাণ্য মানদণ্ড হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হতে হয়।
কবিতাটিতে উঠে এসেছে অপসংস্কৃতির দাপটে উচ্চাঙ্গ শিল্প ও সংস্কৃতির কোণঠাসা হয়ে পড়ার এক করুণ চিত্র। কবি ক্ষোভের সাথে দেখিয়েছেন যে, সংখ্যাগরিষ্ঠের পছন্দের তোয়াক্কা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের গান, জীবনানন্দের কবিতা কিংবা সত্যজিতের চলচ্চিত্রের মতো ধ্রুপদী সৃষ্টিগুলো আজ অবহেলিত। এর বিপরীতে বিস্তার ঘটছে বস্তুবাদী বাণিজ্যিক চটক ও সস্তা বিনোদনের। এমনকি সামাজিক দায়বদ্ধতার চেয়ে অন্ধ বিশ্বাস ও কুসংস্কার কীভাবে প্রাধান্য পায়, কবি তা তারকেশ্বরের পদযাত্রা আর রক্তদান শিবিরের করুণ শূন্যতার তুলনা টেনে স্পষ্ট করেছেন। সহস্র মুমূর্ষু মানুষের রক্তের চাহিদাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সরকারও যখন জনতুষ্টির জন্য কুসংস্কারের পথ সহজ করে দেয়, তখন তা গণতন্ত্রের নামে এক চরম প্রহসনে পরিণত হয়।
কবিতার শেষাংশে কবি এক অদ্ভুত শ্লেষাত্মক আত্মঅতিক্রম বা সেলফ-ডেপ্রিকেশনের আশ্রয় নিয়েছেন। শ্রোতা ও পাঠকদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কবি বলেন, তিনিও কেবল বেশিরভাগ মানুষের পছন্দ ও চাহিদার দোহাই দিয়েই এই সব “ছাইভস্ম” লিখছেন এবং শুনিয়ে যাচ্ছেন। কারণ সমাজ যদি সস্তা জিনিসই গিলতে পছন্দ করে, তবে সেই স্রোতে ভেসে যাওয়া ছাড়া উপায় কী! এই চূড়ান্ত হাহাকার ও কটাক্ষের মাধ্যমে শুভ দাশগুপ্ত বোঝাতে চেয়েছেন যে, রুচি ও বিবেকের তোয়াক্কা না করে কেবল সংখ্যার জোরে চলা গণতন্ত্র অনেক সময়ই স্বৈরতন্ত্রের চেয়েও বিপজ্জনক ও হাস্যকর রূপ ধারণ করতে পারে।
গণতন্ত্র – শুভ দাশগুপ্ত | শুভ দাশগুপ্তের কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা | গণতন্ত্র, সংখ্যাগুরুত্ব ও সামাজিক বাস্তবতার অসাধারণ কাব্যভাষা
গণতন্ত্র: শুভ দাশগুপ্তের সংখ্যাগুরুত্ব, ডাকাত মন্ত্রী, ভোলে বাবা ও গণতন্ত্রের ব্যঙ্গের অসাধারণ কাব্যভাষা
শুভ দাশগুপ্তের “গণতন্ত্র” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য, ব্যঙ্গাত্মক ও তীক্ষ্ণ সৃষ্টি। এটি গণতন্ত্রের নামে সমাজের যে ভণ্ডামি, সংখ্যাগুরুত্বের অত্যাচার ও বুদ্ধির পরাজয় ঘটে, তার এক অসাধারণ কাব্যিক সমালোচনা। “দেখুন- গণতন্ত্রে সংখ্যাগুরুর মতটাই মত / সংখ্যাগুরুর পথটাই পথ / দু’চারজন কি ভাবল কি বললো সেটা ধরলে / চলবেনা। / আফটার অল গণতন্ত্র তো বটে!” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে গণতন্ত্রের নামে কীভাবে ডাকাত মন্ত্রী হয়, ধুমধাম চেঁচামেচি মধুর সঙ্গীত হয়, দুর্বোধ্য শব্দজব্দ কবিতা হয়, রবীন্দ্রনাথ-জীবনানন্দ-সত্যজিৎ ভুলে যেতে হয়, বিউটি পার্লার ও ভিডিও হল খুলতে হয়, ভোলে বাবা তারকেশ্বরে ছোটে। শেষ পর্যন্ত কবি বলছেন — ‘আপনারা বেশির ভাগ লোক চাইছেন বলেই তো আমি সাহস করে এইসব ছাইভস্ম লিখছি’। শুভ দাশগুপ্ত একজন সমসাময়িক ভারতীয় বাঙালি কবি। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় সহজ-সরল ভাষায় দৈনন্দিন জীবনের চিত্র, সামাজিক বাস্তবতা ও ব্যঙ্গাত্মক কাব্যভাষার জন্য পরিচিত। ‘গণতন্ত্র’ তাঁর সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যা গণতন্ত্রের নামে সমাজের সবচেয়ে বড় দ্বিচারিতাকে উন্মোচন করে।
শুভ দাশগুপ্ত: ব্যঙ্গ, সামাজিক বাস্তবতা ও গণতন্ত্রের কবি
শুভ দাশগুপ্ত একজন সমসাময়িক ভারতীয় বাঙালি কবি। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় সহজ-সরল ভাষায় দৈনন্দিন জীবনের চিত্র, সামাজিক বাস্তবতা ও ব্যঙ্গাত্মক কাব্যভাষার জন্য পরিচিত। ‘গণতন্ত্র’ তাঁর সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি গণতন্ত্রের নামে সমাজের সবচেয়ে বড় দ্বিচারিতাকে উন্মোচন করেছেন।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘জীবন’ (২০১৮), ‘গোধূলিতে’ (২০২০), ‘গণতন্ত্র’ (২০২১), ‘নির্বাচিত কবিতা’ (২০২২) ইত্যাদি।
শিরোনাম ও কেন্দ্রীয় ব্যঙ্গ
শিরোনাম ‘গণতন্ত্র’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গণতন্ত্র — যে শাসনব্যবস্থায় জনগণের মতই শেষ কথা। কিন্তু কবি দেখাচ্ছেন — এই জনগণের মতই যদি অন্যায়, অন্ধ, সংস্কৃতিহীন হয়, তাহলে কী হয়? পুরো কবিতাটি এই প্রশ্নের এক ব্যঙ্গাত্মক উত্তর।
কবিতার স্তরে স্তরে বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: সংখ্যাগুরুর মতই মত
“দেখুন- গণতন্ত্রে সংখ্যাগুরুর মতটাই মত / সংখ্যাগুরুর পথটাই পথ / দু’চারজন কি ভাবল কি বললো সেটা ধরলে / চলবেনা। / আফটার অল গণতন্ত্র তো বটে!” — প্রথম স্তবকে গণতন্ত্রের মৌলিক সূত্র। ‘সংখ্যাগুরুর মতটাই মত’ — অধিকাংশের মতই চূড়ান্ত। ‘দু’চারজন ভাবলে চলবে না’ — অল্প সংখ্যক মানুষ ভাবলেই হয় না। ‘আফটার অল গণতন্ত্র তো বটে’ — বিদ্রূপাত্মক সুর।
দ্বিতীয় স্তবক: ডাকাত মন্ত্রী
“সবাই মিলে -মানে বেশির ভাগ লোক মিলে / শেষমেশ যদি কোনো ডাকাতকে ভোট দিয়ে মন্ত্রী বানিয়ে দেয়ই / আপনাকে কিন্তু গণতন্ত্রের সম্মানার্থে সেই ডাকাতকে স্যার বলে হেঁ হেঁ করতেই হবে। / আফটার অল / গণতন্ত্র ইজ গণতন্ত্র” — দ্বিতীয় স্তবকে ডাকাত মন্ত্রীর চিত্র। ‘ডাকাতকে ভোট দিয়ে মন্ত্রী বানানো’ — অযোগ্য, অপরাধী মানুষকে ক্ষমতা দেওয়া। ‘স্যার বলে হেঁ হেঁ করতেই হবে’ — সম্মান দেখাতে হবে।
তৃতীয় স্তবক: চেঁচামেচি মধুর সঙ্গীত
“বেশির ভাগ লোক যদি একজোট হয়ে / ধুম ধাম চেঁচামেচি হৈ-চৈ চিৎকারকে মধুর সঙ্গীত বলে মেনে নেয়- / আপনাকেও মানতে হবে। / রেডিওয় টিভিতে মঞ্চে সে সবই শুনতে হবে।” — তৃতীয় স্তবকে সংস্কৃতির বিকৃতি। ‘চেঁচামেচিকে মধুর সঙ্গীত বলে মেনে নেওয়া’ — সৌন্দর্যের অনুভূতি হারানো। ‘আপনাকেও মানতে হবে’ — সংখ্যাগুরুত্বের জোরে মেনে নিতে বাধ্য হওয়া।
চতুর্থ স্তবক: দুর্বোধ্য শব্দজব্দকে কবিতা
“বেশির ভাগ লোক যদি দুর্বোধ্য শব্দজব্দ বা / ভাষার মার প্যাঁচকেই কবিতা বলে ধন্য ধন্য করে / আপনাকে মেনে নিতেই হবে।” — চতুর্থ স্তবকে সাহিত্যের বিকৃতি। ‘দুর্বোধ্য শব্দজব্দকে কবিতা বলে মেনে নেওয়া’ — প্রকৃত কবিতার বোধ হারানো।
পঞ্চম স্তবক: রবীন্দ্রনাথ-জীবনানন্দ-সত্যজিৎ ভুলে যাওয়া
“আফটার অল This is গণতন্ত্র। / দেশটা গণতন্ত্রের। / বেশির ভাগ লোক পছন্দ করেনা বলে / রবীন্দ্রনাথের গান – জীবনানন্দের কবিতা সত্যজিতের ছবি / ধীরে ধীরে ভুলে যেতে হবে -” — পঞ্চম স্তবকে সাংস্কৃতিক ধ্বংস। ‘বেশির ভাগ লোক পছন্দ করে না বলে’ — সংখ্যাগুরুত্বের অত্যাচার। ‘রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, সত্যজিৎ ভুলে যেতে হবে’ — বাঙালি সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ হারানো।
ষষ্ঠ স্তবক: বিউটি পার্লার ও ভিডিও হল
“বেশির ভাগ লোক হামলে পড়ে বলেই / পাড়ায় পাড়ায় বিউটি পার্লার আর ভিডিও হল খুলতে হবে। / কেননা দেশটাতো আর স্বৈরতন্ত্রের নয়।” — ষষ্ঠ স্তবকে বাণিজ্যের জয়। ‘বিউটি পার্লার ও ভিডিও হল’ — ভোগবাদী সংস্কৃতি। ‘দেশটা আর স্বৈরতন্ত্রের নয়’ — স্বৈরতন্ত্র ছিল খারাপ, কিন্তু গণতন্ত্রে এগুলো ভালো? — বিদ্রূপ।
সপ্তম স্তবক: লুটে নাও — মাতব্বর
“This is গণতন্ত্র। / বেশির ভাগ লোক চায় বলেই এমন সব লোকেরা মাতব্বর হবে- হয়ে মাথায় চড়বে- / যাদের একটাই কর্মসূচী -কামিয়ে নাও। লুটে নাও / তা এরা মাতব্বর হবে- / আপনি চটে গেলে তো চলবে না / This is গণতন্ত্র।” — সপ্তম স্তবকে দুর্নীতি ও লুটতরাজ। ‘কামিয়ে নাও, লুটে নাও’ — শোষণের কর্মসূচি। ‘আপনি চটে গেলে চলবে না’ — সংখ্যাগুরুত্বের জোরে প্রতিবাদ অচল।
অষ্টম স্তবক: ভোলে বাবা ও রক্তদান
“লাখে লাখে লোক ভোলে বাবা পার করেগা বলে / তারকেশ্বরে ছোটে – / তার সিকির সিকি ভাগ লোকও / রক্তদান শিবিরের ছায়া মাড়ায় না – যদিও / রক্তের অভাবে হাজার হাজার বিপন্ন মানুষ / এদেশে প্রাণ হারায় / তা হারাক। / গণতন্ত্র বলে কথা?” — অষ্টম স্তবকে ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাস ও উদাসীনতা। ‘ভোলে বাবা তারকেশ্বরে’ — ধর্মীয় গুরু। ‘রক্তদান শিবিরে যায় না’ — সামাজিক দায়িত্বহীনতা। ‘রক্তের অভাবে মানুষ মরে, তা হারাক’ — নির্মম উদাসীনতা। ‘গণতন্ত্র বলে কথা?’ — প্রশ্নটি বিদ্রূপাত্মক।
নবম স্তবক: ফ্রি কলসী ও রেড রোড
“ভোলেবাবার কাছে যাবার জন্য ফ্রি’তে সরকার থেকে / কলসী আর বাঁক সরবরাহ করা উচিৎ / আর মন্দির পৌঁছনোর পথটাও / অবিলম্বে রেড রোডের মত ঝকঝক করে / তোলা উচিৎ।” — নবম স্তবকে সরকারের ভূমিকা নিয়ে ব্যঙ্গ। ‘ফ্রি কলসী ও বাঁক’ — অন্ধবিশ্বাসকে উৎসাহিত করার ব্যঙ্গ। ‘রেড রোডের মতো ঝকঝকে পথ’ — বিলাসবহুল ব্যবস্থা।
দশম স্তবক: সায় দিতেই হবে
“কারণ after অল / গণতন্ত্র ইজ গণতন্ত্র। / বেশির ভাগ লোক যা বলবে – যা চাইবে- / তাতে তো আপনাকে সায় দিতেই হবে / নইলে যে লোক আপনাকে একলা ষাঁড় স্বৈরতান্ত্রিক বলবে!” — দশম স্তবকে সংখ্যাগুরুত্বের অত্যাচার। ‘সায় দিতেই হবে’ — কোনো বিকল্প নেই। ‘একলা ষাঁড় স্বৈরতান্ত্রিক’ — বিরোধিতাকারীকে স্বৈরাচারী লেবেল দেওয়া।
একাদশ স্তবক: শেষ কথা — ছাইভস্ম লিখছি
“একটা কথা এই সুযোগে / আপনাদের কানে কানে বলি / আপনারা বেশির ভাগ লোক চাইছেন বলেই তো / আমি সাহস করে এইসব / ছাইভস্ম লিখছি। / আর আপনাদের শোনাচ্ছি নইলে / আপনাদের মত বিদগ্ধজনের আসরে / আমাকে কি মানায়? / কি আর করা যাবে! After all / গণতন্ত্র is গণতন্ত্র।” — একাদশ স্তবক — শেষ স্তবক — পুরো কবিতার চূড়ান্ত ব্যঙ্গ। ‘আপনারা চাইছেন বলেই ছাইভস্ম লিখছি’ — জনগণই এর জন্য দায়ী। ‘বিদগ্ধজনের আসরে মানায়?’ — বিনয় ও বিদ্রূপ। ‘কি আর করা যাবে! After all গণতন্ত্র is গণতন্ত্র’ — চূড়ান্ত আত্মসমর্পণ ও বিদ্রূপ।
প্রশ্নোত্তর: গভীর পাঠের জন্য
প্রশ্ন ১: ‘গণতন্ত্র’ কবিতাটির লেখক কে?
উত্তর: এই কবিতাটির লেখক শুভ দাশগুপ্ত। তিনি একজন সমসাময়িক ভারতীয় বাঙালি কবি।
প্রশ্ন ২: ‘সংখ্যাগুরুর মতটাই মত’ — কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতই চূড়ান্ত — কিন্তু সেই মত যদি অযৌক্তিক হয়, তাহলে কী হয়?
প্রশ্ন ৩: ‘ডাকাতকে ভোট দিয়ে মন্ত্রী বানানো’ — কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: অযোগ্য, অপরাধী মানুষকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় আনা — এর সমালোচনা।
প্রশ্ন ৪: ‘ধুমধাম চেঁচামেচিকে মধুর সঙ্গীত বলে মেনে নেওয়া’ — কী?
উত্তর: সৌন্দর্যবোধের বিলোপ — কোলাহলকে সঙ্গীত মানা।
প্রশ্ন ৫: ‘রবীন্দ্রনাথ-জীবনানন্দ-সত্যজিৎ ভুলে যেতে হবে’ — কেন?
উত্তর: সংখ্যাগরিষ্ঠের রুচি যদি নিচু হয়, তবে শ্রেষ্ঠ সংস্কৃতি হারিয়ে যায়।
প্রশ্ন ৬: ‘পাড়ায় পাড়ায় বিউটি পার্লার আর ভিডিও হল খুলতে হবে’ — কেন?
উত্তর: ভোগবাদী সংস্কৃতির জয় — সংখ্যাগরিষ্ঠ যা চায়, তাই হয়।
প্রশ্ন ৭: ‘ভোলে বাবা তারকেশ্বরে ছোটে’ — কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: অন্ধ ধর্মীয় বিশ্বাস — জনগণের অযৌক্তিকতা।
প্রশ্ন ৮: ‘রক্তদান শিবিরের ছায়া মাড়ায় না’ — কী?
উত্তর: সামাজিক দায়িত্বহীনতা — অন্যদের জন্য কিছু না করা।
প্রশ্ন ৯: ‘আপনি চটে গেলে তো চলবে না’ — কেন?
উত্তর: সংখ্যাগরিষ্ঠের বিরুদ্ধে গেলে আপনাকে স্বৈরাচারী বলা হবে।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
উত্তর: কবিতাটি শেখায় — গণতন্ত্র শুধু সংখ্যাগুরুত্ব নয়, বুদ্ধি ও বিবেকও দরকার। সংখ্যাগরিষ্ঠ অন্ধ হলে, ডাকাত মন্ত্রী হয়, সংস্কৃতি হারায়, লুটতরাজ চলে, অন্ধবিশ্বাস বাড়ে। ‘গণতন্ত্র is গণতন্ত্র’ — এই পঙ্ক্তিটি সবচেয়ে বড় ব্যঙ্গ।
ট্যাগস: গণতন্ত্র, শুভ দাশগুপ্ত, শুভ দাশগুপ্তের কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, গণতন্ত্রের ব্যঙ্গ, সংখ্যাগুরুত্ব, সামাজিক সমালোচনা
© Kobitarkhata.com – কবি: শুভ দাশগুপ্ত | কবিতার প্রথম লাইন: “দেখুন- গণতন্ত্রে সংখ্যাগুরুর মতটাই মত” | গণতন্ত্র, সংখ্যাগুরুত্ব ও সামাজিক বাস্তবতার অসাধারণ কাব্যভাষা | আধুনিক বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন