কবিতার শুরুতে কবি এক চমৎকার রূপক ব্যবহার করেছেন—‘শব্দ দিয়ে তৈরি বাড়ি’। একজন কবির জীবন তো তাঁর সৃষ্টিরই সমাহার। মৃত্যুর পর সেই শব্দের বাড়ি ভেঙে পড়া মানে কবির জাগতিক অস্তিত্বের বিলোপ, কিন্তু কবি সেখানে আটকে থাকতে চান না। তিনি দেয়াল পছন্দ করতেন না, তাই মৃত্যুর পর অসীম আকাশই হয় তাঁর দেয়াল আর লেখার টেবিল। চাঁদ ও তারাদের নিসর্গে নিজের অস্তিত্বকে ছড়িয়ে দেওয়ার এই কল্পনা মৃত্যুভীতিকে জয় করার এক শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ।
ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে কবি এখানে অত্যন্ত উদার ও আধুনিক। নিজের স্ত্রীকে তিনি কেবল ‘প্রেয়সী’ হিসেবে নয়, বরং ‘কমরেড’ বা জীবনসংগ্রামী সাথী হিসেবে দেখেছেন। তাঁর স্মৃতি যেন স্ত্রীর এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা না হয়, বরং সঙ্গী হয়—এই বার্তাটি অত্যন্ত শক্তিশালী। এমনকি তাঁর অনুপস্থিতিতে স্ত্রী যদি পুনরায় কাউকে ভালোবাসেন, তবে সেই নতুন সম্পর্কের মাঝেও নিজের স্মৃতিকে ‘কমরেড’ হিসেবে বিলীন করে দেওয়ার যে মানসিকতা কবি দেখিয়েছেন, তা অতুলনীয়।
পরবর্তী প্রজন্মের প্রতি কবির দায়বদ্ধতা ফুটে উঠেছে তাঁর ছেলের উদ্দেশ্যে রাখা বার্তার মাধ্যমে। তিনি চান না তাঁর সন্তান কেবল যান্ত্রিক শিক্ষা গ্রহণ করুক; বরং সে যেন মানুষ, রোদ্দুর আর তারাদের ভালোবাসতে শেখে। ‘বিপ্লবের অ্যালজেব্রা’ শব্দবন্ধটি দিয়ে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, মুক্তির লড়াইয়ের হিসাব-নিকাশ যেন তাঁর সন্তান আরও নিপুণভাবে রপ্ত করে। নিজের দোষগুলো স্বীকার করার অকপটতা এবং সন্তানের হাত ধরে মিছিলে হাঁটার স্বপ্ন—সবই এক বৈপ্লবিক চেতনার অংশ।
পরিশেষে, কবি মৃত্যুকে তুচ্ছজ্ঞান করেছেন তাঁর আদর্শের কাছে। ব্যক্তিগত শরীরের মৃত্যু হলেও তাঁর বিশ্বাস ও স্বপ্নগুলো অমর। ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হয়েছে, বিপ্লব চিরজীবী হয়েছে’—এই অমোঘ ঘোষণার মাধ্যমে কবি ব্যক্তিগত শোককে সমষ্টিগত লড়াইয়ের সাথে একীভূত করে দিয়েছেন। সৃষ্টির সার্থকতা লৌকিক হাততালিতে নয়, বরং স্রষ্টার নিজের মানসিক মুক্তি এবং অস্তিত্বের তাগিদে—যা এই কবিতার প্রতিটি পঙক্তিতে এক অবিনশ্বর আশাবাদ আর দ্রোহের আগুন হয়ে জ্বলে উঠেছে।
শেষ ইচ্ছে – নবারুণ ভট্টাচার্য | নবারুণ ভট্টাচার্যের মৃত্যুচেতনার কবিতা | মৃত্যুর পর স্মৃতি, প্রেম ও আদর্শের চিরন্তনতা | ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হয়েছে, বিপ্লব চিরজীবী হয়েছে’
শেষ ইচ্ছে: নবারুণ ভট্টাচার্যের মৃত্যু, স্মৃতি ও বিপ্লবের অসাধারণ কাব্য, ‘শব্দ দিয়ে তৈরি বাড়ি কান্নায় ভেঙে পড়বে’ বলে স্মৃতির ভঙ্গুরতা, ‘আকাশ আমার দেওয়াল, চাঁদ ঠাণ্ডা পেপারওয়েট’ বলে মৃত্যুপরবর্তী অসীম প্রকৃতি, ‘প্রথম হাত ধরার সময় কাঁপা’ বলে প্রেমের প্রথম স্পর্শ, ‘ছেলেকে মানুষ, রোদ্দুর আর তারাদের ভালোবাসতে শেখানো’ বলে পিতার শেষ শিক্ষা, ও ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হয়েছে, বিপ্লব চিরজীবী হয়েছে’ বলে চূড়ান্ত ঘোষণার অমর সৃষ্টি
নবারুণ ভট্টাচার্যের “শেষ ইচ্ছে” বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য, মর্মস্পর্শী ও দার্শনিক সৃষ্টি। “আমি মরে গেলে আমি শব্দ দিয়ে যে বাড়িটা তৈরি করেছি সেটা কান্নায় ভেঙে পড়বে” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে মৃত্যুর পর স্মৃতি, প্রেম ও আদর্শের চিরন্তনতার কাহিনি; ‘শব্দ দিয়ে তৈরি বাড়ি’ অর্থাৎ কবিতার মাধ্যমে গড়া স্মৃতির জগৎ; ‘কান্নায় ভেঙে পড়বে’ বলে শোকে ভাঙনের কথা; ‘বাড়ির আয়না আমাকে মুছে ফেলবে, দেওয়ালে আমার ছবি রাখবে না’ বলে বাস্তবের বিস্মৃতি; ‘আকাশ আমার দেওয়াল, চিমনির ধোঁয়ায় পাখিরা আমার নাম লিখবে’ বলে মৃত্যুপরবর্তী অসীম প্রকৃতির চিত্র; ‘ঠাণ্ডা পেপারওয়েট হবে চাঁদ, কালো ভেলভেটের পিনকুশনে ফোটানো থাকবে তারা’ বলে রোমান্টিক প্রতীকায়ন; ‘প্রথম হাত ধরার সময় থরথর করে কাঁপা’ বলে প্রেমের প্রথম স্পর্শের স্মৃতি; ‘স্মৃতি তোমার কমরেড’ বলে স্মৃতিকে সঙ্গী করার আহ্বান; ‘ছেলেকে মানুষ, রোদ্দুর আর তারাদের ভালোবাসতে শেখানো’ বলে পিতার শেষ শিক্ষা; ‘ওকে বিপ্লবের অ্যালজেব্রাও শেখাবে’ বলে আদর্শের বীজ বপন; ‘আমার দোষগুলোর কথা ওকে বোলো, ও যেন আমাকে না বকে’ বলে পিতার বিনয়; এবং শেষ পর্যন্ত ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হয়েছে, বিপ্লব চিরজীবী হয়েছে’ বলে চূড়ান্ত ঘোষণার অসাধারণ কাব্যচিত্র। নবারুণ ভট্টাচার্য (১৯৪৮-২০১৪) একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি ও ঔপন্যাসিক। তিনি প্রগতিশীল ও রাজনৈতিক কবিতার জন্য পরিচিত। তাঁর কবিতায় মৃত্যু, প্রেম, স্মৃতি ও বিপ্লবের চেতনা গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। “শেষ ইচ্ছে” সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি নিজের শেষ ইচ্ছে লিখে গেছেন।
নবারুণ ভট্টাচার্য: মৃত্যু, প্রেম ও বিপ্লবের কবি
নবারুণ ভট্টাচার্য ১৯৪৮ সালের ২৩ জুন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন বিশিষ্ট বাঙালি কবি ও ঔপন্যাসিক ছিলেন। তিনি প্রগতিশীল ও রাজনৈতিক কবিতার জন্য পরিচিত। তাঁর রচনায় মৃত্যু, প্রেম, স্মৃতি, দূর্নীতি, যুদ্ধ, সহিংসতা ও বিপ্লবের চেতনা গভীরভাবে ফুটে উঠেছে।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘শেষ ইচ্ছে’, ‘কিছু একটা পুড়ছে’, ‘ডানাওলা কবিতা’, ‘নির্বাচিত কবিতা’, ‘অন্য নামে ডাকো’ ইত্যাদি। তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
নবারুণ ভট্টাচার্যের মৃত্যুচেতনার কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘শব্দ দিয়ে তৈরি বাড়ি’র প্রতীক, ‘কান্নায় ভেঙে পড়া’, ‘আকাশ দেওয়াল’, ‘চাঁদ পেপারওয়েট’, ‘প্রথম হাত ধরার কাঁপা’, ‘স্মৃতি কমরেড’, ‘ছেলেকে মানুষ-রোদ্দুর-তারার ভালোবাসা শেখানো’, ‘বিপ্লবের অ্যালজেব্রা’, ‘মিছিলে হাঁটতে শেখানো’, এবং ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী, চিরজীবী’ ঘোষণা। ‘শেষ ইচ্ছে’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি নিজের শেষ ইচ্ছে লিখে গেছেন।
শেষ ইচ্ছে: শিরোনামের তাৎপর্য ও কবিতার পটভূমি
শিরোনাম ‘শেষ ইচ্ছে’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘শেষ ইচ্ছে’ মানে মৃত্যুর আগে শেষ অভিলাষ। কবি এখানে নিজের শেষ ইচ্ছে লিখে গেছেন — স্ত্রী ও ছেলের উদ্দেশ্যে।
কবিতাটি মৃত্যু ও স্মৃতির পটভূমিতে রচিত। কবি জানেন তিনি খুব বেশিদিন বাঁচবেন না। তাই তিনি শেষ ইচ্ছে লিখে যাচ্ছেন।
কবি শুরুতে বলছেন — আমি মরে গেলে, আমি শব্দ দিয়ে যে বাড়িটা তৈরি করেছি সেটা কান্নায় ভেঙে পড়বে। তাতে অবাক হবার কিছু নেই। বাড়ির আয়না আমাকে মুছে ফেলবে, দেওয়ালে আমার ছবি রাখবে না। দেওয়াল আমার ভালো লাগত না। তখন আকাশ আমার দেওয়াল, তাতে চিমনির ধোঁয়া দিয়ে পাখিরা আমার নাম লিখবে। অথবা আকাশ তখন আমার লেখার টেবিল। ঠাণ্ডা পেপারওয়েট হবে চাঁদ। কালো ভেলভেটের পিনকুশনে ফোটানো থাকবে তারা।
আমাকে মনে করে তোমার দুঃখ করার কিছু নেই। এই কথাগুলো লেখার সময় আমার হাত কাঁপছে না। কিন্তু যখন প্রথম তোমার হাত ধরেছিলাম, তখন আমার হাত থরথর করে কেঁপেছিল — কিছুটা আবেগে, কিছুটা আড়ষ্টতায়।
আমার সুন্দরী স্ত্রী, আমার প্রেয়সী, আমার স্মৃতি তোমাকে ঘিরে থাকবে। তোমার তাকে আঁকড়ে থাকার কিছু নেই। তুমি নিজের জীবন গড়ে নিও। আমার স্মৃতি তোমার কমরেড। তুমি যদি কাউকে ভালোবাস, তাকে এই স্মৃতিগুলো দিয়ে দিও। তাকে কমরেড করে নিও। অবশ্য আমি সবটা তোমার ওপরে ছেড়ে দিচ্ছি। আমি বিশ্বাস করি তুমি ভুল করবে না।
তুমি আমার ছেলেকে প্রথম অক্ষর শেখাবার সময়ে ওকে মানুষ, রোদ্দুর আর তারাদের ভালোবাসতে শিখিও। ও অনেক কঠিন কঠিন অঙ্ক করতে পারবে, বিপ্লবের অ্যালজেব্রাও। আমার চেয়ে অনেক ভালো করে বুঝবে। আমাকে হাঁটতে শেখাবে মিছিলে, পাথুরে জমিতে আর ঘাসে। আমার দোষগুলোর কথা ওকে বোলো। ও যেন আমাকে না বকে।
আমার মরে যাওয়াটা কোনো বড় কথা নয়। খুব বেশিদিন আমি বাঁচব না — এটা আমি জানতাম। কিন্তু আমার বিশ্বাস কখনও হটে যায়নি সমস্ত। মৃত্যুকে অতিক্রম করে সমস্ত অন্ধকারকে অস্বীকার করে — বিপ্লব দীর্ঘজীবী হয়েছে, বিপ্লব চিরজীবী হয়েছে।
শেষ ইচ্ছে: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ (সংক্ষিপ্ত আকারে)
প্রথম স্তবক: শব্দ দিয়ে তৈরি বাড়ি ও কান্নায় ভেঙে পড়া
“আমি মরে گেলে / আমি শব্দ দিয়ে যে বাড়িটা তৈরি করেছি সেটা كান্নায় ভেঙে পড়বে / তাতে অবাক হবার কিছু নেই”
প্রথম স্তবকে ‘শব্দ দিয়ে তৈরি বাড়ি’ হলো কবিতার জগৎ। মৃত্যুর পর প্রিয়জনরা কাঁদবে, সেই কান্নায় বাড়ি ভেঙে পড়বে — এটি অনিবার্য।
দ্বিতীয় স্তবক: বাড়ির আয়না ও দেওয়াল মুছে ফেলা
“বাড়ির আয়نا আমাকে মুছে ফেলবে / দেওয়ালে আমার ছবি রাখবে না”
দ্বিতীয় স্তবকে বাস্তবের বিস্মৃতি। মৃত্যুর পর মানুষ ধীরে ধীরে ভুলে যায়। আয়না মুখ মুছে দেয়, দেওয়ালে ছবি থাকে না।
তৃতীয় স্তবক: আকাশ দেওয়াল ও পাখির লেখা নাম
“دেওয়াল আমার ভালو লাগত না / তখন আকাশ আমার দেওয়াল تাতে / চিমনির ধোঁয়া দিয়ে পাখিরা আমার নাম লিখবে”
তৃতীয় স্তবকে মৃত্যুপরবর্তী অসীম প্রকৃতির চিত্র। দেওয়াল ভালো লাগত না, তাই আকাশ হবে দেওয়াল। পাখিরা চিমনির ধোঁয়ায় নাম লিখবে — স্বাভাবিক, মুক্ত, চিরন্তন।
চতুর্থ স্তবক: আকাশ লেখার টেবিল, চাঁদ পেপারওয়েট, তারা পিনকুশনে ফোটানো
“অথবা আকাশ তখন আমার লেখার টেবিল / ঠাণ্ডা পেপারওয়েট হবে চাঁদ / কালো ভেলভেটের পিনকুশনে فوتানো থাকবে তারা”
চতুর্থ স্তবকে রোমান্টিক প্রতীকায়ন। আকাশ লেখার টেবিল, চাঁদ ঠাণ্ডা পেপারওয়েট, তারা কালো ভেলভেটের পিনকুশনে ফোটানো। এটি একটি চমৎকার, স্নিগ্ধ মৃত্যুচিত্র।
পঞ্চম স্তবক: দুঃখ করার কিছু নেই ও প্রথম হাত ধরার কাঁপা
“আমাকে মনে করে তোমার / দুঃখ করার কিছু নেই / এই কথাগুলো লেখার وقت আমার হাত কাঁপছে না / কিন্তু যখন প্রথম তোমার হাত ধরেছিলাম / তখন আমার হাত থরথর করে كেঁপেছিল কিছুটা আবেগে কিছুটা আড়ষ্টতায়”
পঞ্চম স্তবকে প্রথম প্রেমের স্মৃতি। এখন হাত কাঁপছে না, কিন্তু প্রথম হাত ধরার সময় থরথর করে কেঁপেছিল। এটি একটি চমৎকার বৈপরীত্য।
ষষ্ঠ ও সপ্তম স্তবক: স্মৃতি তোমার কমরেড ও তাকে কমরেড করে নেওয়া
“আমার সুন্দরী স্ত্রী আমার প্রেয়সী / আমার স্মৃতি তোমাকে ঘিরে থাকবে তোমার তাকে আঁকড়ে থাকার কিছু নেই / تومی নিজের জীবন গড়ে نিও / আমার স্মৃতি তোমার কমরেড / تومی যদি كাউকে ভালোবাস / তাকে এই স্মৃতিগুলো দিয়ে دিও / তাকে কমরেড করে نিও”
ষষ্ঠ ও সপ্তম স্তবকে স্ত্রীর উদ্দেশ্যে বার্তা। স্মৃতি তাকে ঘিরে থাকবে, কিন্তু তাকে আঁকড়ে থাকার কিছু নেই। নিজের জীবন গড়ে নিতে হবে। স্মৃতি তার ‘কমরেড’ — সঙ্গী, বোঝা নয়। নতুন প্রেম পেলে তাকে পুরনো স্মৃতি দিয়ে দিতে হবে।
অষ্টম ও নবম স্তবক: ছেলেকে মানুষ, রোদ্দুর ও তারার ভালোবাসা শেখানো
“تومی আমার ছেলেকে / প্রথম অক্ষر শেখাবার وقتে / ওকে মানুষ, রোদ্দুর আর তারাদের ভালোবাসতে শিখিও / ও অনেক كঠিন كঠين অঙ্ক করতে পারবে বিপ্লবের অ্যালজেব্রাও / আমার চেয়ে অনেক ভালো করে বুঝবে / আমাকে هাঁটতে শেখাবে মিছিলে / পাথুরে جমিতে আর ঘাসে”
অষ্টম ও নবম স্তবকে ছেলের উদ্দেশ্যে বার্তা। প্রথম অক্ষর শেখার সময় মানুষ, রোদ্দুর আর তারাদের ভালোবাসা শেখাতে হবে। সে বিপ্লবের অ্যালজেব্রাও শিখবে। সে কবিকে মিছিলে হাঁটতে শেখাবে।
দশম ও একাদশ স্তবক: দোষের কথা বলা ও না বকা
“আমার دوشগুলোর কথা ওকে بোলو / ও যেন আমাকে না بকে”
দশম ও একাদশ স্তবকে পিতার বিনয়। দোষগুলো বলতে হবে, কিন্তু ছেলে যেন তাকে না বকে। এটি এক চরম স্নেহ ও নম্রতা।
দ্বাদশ ও শেষ স্তবক: মরে যাওয়া বড় কথা নয় — বিপ্লব চিরজীবী
“আমার মরে যাওয়াটা কোনো بڑو কথা নয় খুব বেশিদিন আমি بাঁচব না / এটা আমি জানতাম / কিন্তু আমার বিশ্বাস كখনও هটে যায়নি সমস্ত / মৃত্যুকে অতিক্রম করে সমস্ত অন্ধকারকে অস্বীকার করে / বিপ্লব দীর্ঘজীবী হয়েছে / বিপ্লব চিরজীবী হয়েছে”
দ্বাদশ ও শেষ স্তবকে চূড়ান্ত ঘোষণা। মরে যাওয়া বড় কথা নয়, বেশি দিন বাঁচবেন না — জানতেন। কিন্তু বিশ্বাস কখনও হটেনি। মৃত্যু ও অন্ধকারকে অতিক্রম করে বিপ্লব দীর্ঘজীবী ও চিরজীবী হয়েছে।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি গদ্যছন্দে রচিত, কথোপকথনের সুরে। ‘আমি মরে গেলে’ — শুরু। ‘শব্দ দিয়ে তৈরি বাড়ি’ — চমৎকার প্রতীক। ‘আকাশ দেওয়াল, চাঁদ পেপারওয়েট, তারা পিনকুশনে ফোটানো’ — রোমান্টিক মৃত্যুচিত্র। ‘প্রথম হাত ধরার থরথর কাঁপা’ — স্পর্শকাতর স্মৃতি। ‘স্মৃতি তোমার কমরেড’ — আধুনিক সম্পর্কের ভাষা। ‘বিপ্লবের অ্যালজেব্রা’ — রাজনৈতিক চেতনার প্রতীক। ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী, চিরজীবী’ — চূড়ান্ত ঘোষণা।
প্রতীক ব্যবহার অত্যন্ত শক্তিশালী। ‘শব্দ দিয়ে তৈরি বাড়ি’ — কবিতার জগতের প্রতীক। ‘কান্নায় ভেঙে পড়া’ — শোকের প্রতীক। ‘আয়না মুছে ফেলা, দেওয়ালে ছবি না রাখা’ — বিস্মৃতির প্রতীক। ‘আকাশ দেওয়াল’ — অসীমতার প্রতীক। ‘চিমনির ধোঁয়ায় পাখির লেখা নাম’ — প্রকৃতির চিরন্তন স্মৃতির প্রতীক। ‘চাঁদ পেপারওয়েট’ — শীতল, নির্জন সৌন্দর্যের প্রতীক। ‘তারা পিনকুশনে ফোটানো’ — সূক্ষ্ম ও সুন্দর সাজানোর প্রতীক। ‘প্রথম হাত ধরার কাঁপা’ — প্রথম প্রেমের প্রতীক। ‘স্মৃতি কমরেড’ — স্মৃতিকে সঙ্গী করার প্রতীক। ‘বিপ্লবের অ্যালজেব্রা’ — আদর্শের গণিতের প্রতীক। ‘মিছিলে হাঁটতে শেখানো’ — সংগ্রামের প্রতীক। ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী, চিরজীবী’ — আদর্শের অমরত্বের প্রতীক।
বৈপরীত্য ব্যবহার অত্যন্ত দক্ষ। ‘হাত কাঁপছে না’ ও ‘প্রথম হাত ধরার সময় থরথর কাঁপা’ — সময়ের বৈপরীত্য। ‘দেওয়াল ভালো লাগত না’ ও ‘আকাশ দেওয়াল’ — সীমাবদ্ধতা ও অসীমতার বৈপরীত্য। ‘মরে যাওয়া বড় কথা নয়’ ও ‘বিপ্লব চিরজীবী’ — ব্যক্তির মৃত্যু ও আদর্শের অমরত্বের বৈপরীত্য।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“শেষ ইচ্ছে” নবারুণ ভট্টাচার্যের এক অসাধারণ সৃষ্টি। তিনি এখানে নিজের শেষ ইচ্ছে লিখে গেছেন — স্ত্রী ও ছেলের উদ্দেশ্যে।
প্রথম স্তবকে — শব্দ দিয়ে তৈরি বাড়ি ও কান্নায় ভেঙে পড়া। দ্বিতীয় স্তবকে — বাড়ির আয়না ও দেওয়াল মুছে ফেলা। তৃতীয় স্তবকে — আকাশ দেওয়াল ও পাখির লেখা নাম। চতুর্থ স্তবকে — আকাশ লেখার টেবিল, চাঁদ পেপারওয়েট, তারা পিনকুশনে ফোটানো। পঞ্চম স্তবকে — দুঃখ করার কিছু নেই ও প্রথম হাত ধরার কাঁপা। ষষ্ঠ ও সপ্তম স্তবকে — স্মৃতি তোমার কমরেড ও তাকে কমরেড করে নেওয়া। অষ্টম ও নবম স্তবকে — ছেলেকে মানুষ, রোদ্দুর ও তারার ভালোবাসা শেখানো। দশম ও একাদশ স্তবকে — দোষের কথা বলা ও না বকা। দ্বাদশ ও শেষ স্তবকে — মরে যাওয়া বড় কথা নয় — বিপ্লব চিরজীবী।
এই কবিতা আমাদের শেখায় — মৃত্যু অনিবার্য; ‘শব্দ দিয়ে তৈরি বাড়ি’ কান্নায় ভেঙে পড়বে; আয়না মুখ মুছে ফেলবে, দেওয়ালে ছবি থাকবে না; কিন্তু আকাশ দেওয়াল হবে, পাখিরা নাম লিখবে; চাঁদ পেপারওয়েট হবে, তারা পিনকুশনে ফোটানো থাকবে; প্রথম হাত ধরার কাঁপা স্মৃতি অমূল্য; ‘স্মৃতি তোমার কমরেড’ — তাকে আঁকড়ে না রেখে নিজের জীবন গড়ে নেওয়া; ছেলেকে মানুষ, রোদ্দুর ও তারাদের ভালোবাসা শেখানো; ‘বিপ্লবের অ্যালজেব্রা’ শেখানো; আর ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হয়েছে, বিপ্লব চিরজীবী হয়েছে’ — আদর্শের অমরত্ব।
নবারুণ ভট্টাচার্যের কবিতায় মৃত্যু, স্মৃতি ও বিপ্লবের চিরন্তনতা
নবারুণ ভট্টাচার্যের কবিতায় মৃত্যু, স্মৃতি ও বিপ্লবের চিরন্তনতা একটি পুনরাবৃত্ত বিষয়। তিনি ‘শেষ ইচ্ছে’ কবিতায় নিজের শেষ ইচ্ছে লিখে গেছেন। তিনি দেখিয়েছেন — কীভাবে ‘শব্দ দিয়ে তৈরি বাড়ি’ কান্নায় ভেঙে পড়ে; কীভাবে ‘আকাশ দেওয়াল’ ও ‘চাঁদ পেপারওয়েট’ হয়; কীভাবে ‘প্রথম হাত ধরার কাঁপা’ চিরকাল মনে থাকে; কীভাবে ‘স্মৃতি তোমার কমরেড’ হয়; কীভাবে ‘ছেলেকে মানুষ, রোদ্দুর আর তারার ভালোবাসা’ শেখাতে হয়; আর কীভাবে ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী, চিরজীবী’ হয়।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পাঠ্যক্রমে নবারুণ ভট্টাচার্যের ‘শেষ ইচ্ছে’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের মৃত্যুচেতনা, স্মৃতির মূল্য, প্রেমের প্রথম স্পর্শের স্মৃতি, পিতৃত্বের দায়িত্ব, এবং নবারুণ ভট্টাচার্যের প্রগতিশীল কাব্যভাষা সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে। বিশেষ করে ‘আমি মরে গেলে আমি শব্দ দিয়ে যে বাড়িটা তৈরি করেছি’, ‘আকাশ আমার দেওয়াল, চাঁদ ঠাণ্ডা পেপারওয়েট’, ‘প্রথম হাত ধরার সময় থরথর করে কাঁপা’, ‘স্মৃতি তোমার কমরেড’, ‘ছেলেকে মানুষ, রোদ্দুর আর তারাদের ভালোবাসতে শিখিও’, ‘বিপ্লবের অ্যালজেব্রা’, ‘মরে যাওয়াটা বড় কথা নয়’, এবং ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হয়েছে, বিপ্লব চিরজীবী হয়েছে’ — এসব বিষয় শিক্ষার্থীদের কাব্যবোধ, দার্শনিক চিন্তা ও আদর্শবোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শেষ ইচ্ছে সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: শেষ ইচ্ছে কবিতাটির রচয়িতা কে?
এই কবিতাটির রচয়িতা নবারুণ ভট্টাচার্য (১৯৪৮-২০১৪)। তিনি একজন বিশিষ্ট বাঙালি কবি ও ঔপন্যাসিক ছিলেন। তিনি প্রগতিশীল ও রাজনৈতিক কবিতার জন্য পরিচিত। তাঁর রচনায় মৃত্যু, প্রেম, স্মৃতি, দূর্নীতি, যুদ্ধ, সহিংসতা ও বিপ্লবের চেতনা গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘শেষ ইচ্ছে’, ‘কিছু একটা পুড়ছে’, ‘ডানাওলা কবিতা’, ‘নির্বাচিত কবিতা’, ‘অন্য নামে ডাকো’ ইত্যাদি।
প্রশ্ন ২: ‘আমি মরে গেলে আমি শব্দ দিয়ে যে বাড়িটা তৈরি করেছি সেটা কান্নায় ভেঙে পড়বে’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
‘শব্দ দিয়ে তৈরি বাড়ি’ মানে কবিতার জগৎ, স্মৃতির জগৎ। কবি মারা গেলে শোকে কান্না হবে, সেই কান্নায় স্মৃতির জগৎ ভেঙে পড়বে। এটি অনিবার্য।
প্রশ্ন ৩: ‘আকাশ আমার দেওয়াল, চিমনির ধোঁয়া দিয়ে পাখিরা আমার নাম লিখবে’ — লাইনটির সৌন্দর্য কী?
মৃত্যুর পর দেওয়াল ভালো লাগত না, তাই আকাশ হবে দেওয়াল। পাখিরা চিমনির ধোঁয়ায় নাম লিখবে — এটি একটি চমৎকার, স্বাভাবিক ও চিরন্তন স্মৃতিচারণের চিত্র।
প্রশ্ন ৪: ‘ঠাণ্ডা পেপারওয়েট হবে চাঁদ, কালো ভেলভেটের পিনকুশনে ফোটানো থাকবে তারা’ — লাইনটির রোমান্টিকতা কোথায়?
চাঁদ ঠাণ্ডা পেপারওয়েট — লেখার টেবিলে কাগজ চাপা দেওয়ার যন্ত্র। তারা কালো ভেলভেটের পিনকুশনে ফোটানো — সূচ ফোটানোর কুশনে তারা ফোটানো। এটি একটি অত্যন্ত রোমান্টিক ও স্নিগ্ধ মৃত্যুচিত্র।
প্রশ্ন ৫: ‘প্রথম তোমার হাত ধরেছিলাম, তখন আমার হাত থরথর করে কেঁপেছিল’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
প্রথম প্রেমের স্পর্শের স্মৃতি। আবেগে ও আড়ষ্টতায় হাত কেঁপেছিল। এটি একটি চরম স্পর্শকাতর ও বাস্তব স্মৃতি।
প্রশ্ন ৬: ‘আমার স্মৃতি তোমার কমরেড’ — ‘কমরেড’ শব্দটির প্রয়োগ কেন?
‘কমরেড’ মানে সহযোদ্ধা, সঙ্গী। স্মৃতি বোঝা নয়, সঙ্গী। এটি নবারুণ ভট্টাচার্যের রাজনৈতিক চেতনার প্রতীক। স্মৃতিকে আঁকড়ে না রেখে তাকে সঙ্গী করে এগিয়ে যেতে হবে।
প্রশ্ন ৭: ‘তুমি যদি কাউকে ভালোবাস, তাকে এই স্মৃতিগুলো দিয়ে দিও, তাকে কমরেড করে নিও’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
স্ত্রী যদি নতুন করে প্রেম করে, তাহলে তাকে পুরনো স্মৃতি দিয়ে দিতে হবে। নতুন প্রেমিককে ‘কমরেড’ করে নিতে হবে। এটি এক চরম উদারতা ও আধুনিক সম্পর্কের দর্শন।
প্রশ্ন ৮: ‘ওকে মানুষ, রোদ্দুর আর তারাদের ভালোবাসতে শিখিও’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
ছেলেকে প্রথম অক্ষর শেখার সময় মানুষ, রোদ্দুর ও তারাদের ভালোবাসা শেখাতে হবে। এটি প্রকৃতি, মানবতা ও সৌন্দর্যের প্রতি ভালোবাসার শিক্ষা।
প্রশ্ন ৯: ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হয়েছে, বিপ্লব চিরজীবী হয়েছে’ — লাইনটির চূড়ান্ত বার্তা কী?
মৃত্যুকে অতিক্রম করে, অন্ধকারকে অস্বীকার করে বিপ্লব বেঁচে আছে। ব্যক্তি মরে, কিন্তু আদর্শ, চিন্তা ও সংগ্রাম অমর। এটি নবারুণ ভট্টাচার্যের মার্কসবাদী চেতনার চূড়ান্ত ঘোষণা।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
কবিতাটি আমাদের শেখায় — মৃত্যু অনিবার্য; ‘শব্দ দিয়ে তৈরি বাড়ি’ কান্নায় ভেঙে পড়বে; আয়না মুখ মুছে ফেলবে, দেওয়ালে ছবি থাকবে না; কিন্তু আকাশ দেওয়াল হবে, পাখিরা নাম লিখবে; চাঁদ পেপারওয়েট হবে, তারা পিনকুশনে ফোটানো থাকবে; প্রথম হাত ধরার কাঁপা স্মৃতি অমূল্য; ‘স্মৃতি তোমার কমরেড’ — তাকে আঁকড়ে না রেখে নিজের জীবন গড়ে নেওয়া; ছেলেকে মানুষ, রোদ্দুর ও তারাদের ভালোবাসা শেখানো; ‘বিপ্লবের অ্যালজেব্রা’ শেখানো; আর ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হয়েছে, বিপ্লব চিরজীবী হয়েছে’ — আদর্শের অমরত্ব। এই কবিতাটি আজকের দিনে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক — মৃত্যুচেতনা, স্মৃতির মূল্য, উদার সম্পর্কের দর্শন, ও আদর্শের অমরত্ব — সবকিছুই চিরন্তন ও সময়োপযোগী বিষয়।
ট্যাগস: শেষ ইচ্ছে, নবারুণ ভট্টাচার্য, নবারুণ ভট্টাচার্যের মৃত্যুচেতনার কবিতা, শব্দ দিয়ে তৈরি বাড়ি, স্মৃতি তোমার কমরেড, বিপ্লব দীর্ঘজীবী, বিপ্লব চিরজীবী
© Kobitarkhata.com – কবি: নবারুণ ভট্টাচার্য | কবিতার প্রথম লাইন: “আমি মরে গেলে আমি শব্দ দিয়ে যে বাড়িটা তৈরি করেছি সেটা কান্নায় ভেঙে পড়বে” | মৃত্যু, স্মৃতি ও বিপ্লবের অমর কবিতা বিশ্লেষণ | নবারুণ ভট্টাচার্যের প্রগতিশীল কাব্যধারার অসাধারণ নিদর্শন