কবিতার খাতা
- 43 mins
শহীদ স্মরণে – মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান।
কবিতায় আর কি লিখব?
যখন বুকের রক্তে লিখেছি
একটি নাম বাংলাদেশ।
গানে আর ভিন্ন কি সুখের ব্যঞ্জনা?
যখন হানাদার বধ সংগীতে
ঘৃণার প্রবল মন্ত্রে জাগ্রত
স্বদেশের তরুণ হাতে
নিত্য বেজেছে অবিরাম
মেশিনগান, মর্টার, গ্রেনেড।
কবিতায় কি বলব?
যখন আসাদ
মনিরামপুরের প্রবল শ্যামল
হৃদয়ের তপ্ত রুধিরে করেছে রঞ্জিত
সারা বাংলায় আজ উড্ডীন
সেই রক্তাক্ত পতাকা।
আসাদের মৃত্যুতে আমি
অশ্রুহীন, অশোক; কেননা
নয়ন কেবল বজ্রবর্ষী; কেননা
আমার বৃদ্ধ পিতার শরীরে
এখনো পশুদের প্রহারের চিহ্ন;
কেননা আমার বৃদ্ধা মাতার
কণ্ঠে নেই আর্ত-হাহাকার, নেই-
অভিসম্পাত-কেবল
দুর্মর ঘৃণার আগুন; কোন
সান্ত্বনা বাক্য নয়, নয় কোন
বিমর্ষ বিলাপ; তাকে বলিনি
তোমার ছেলে আসল ফিরে
হাজার ছেলে হয়ে আর কেঁদো না মা; কেননা
মা তো কাঁদে না;
মার চোখে নেই অশ্রু, কেবল
অনল জ্বালা, দু’চোখে তার
শত্রু হননের আহ্বান।
আসাদের রক্ত ধারায় মহৎ
কবিতার, সব মহাকাব্যের
আদি অনাদি আবেগে
বাংলাদেশ-জাগ্রত।
আমি কবিতায় নতুন আর
কি বলব? যখন মতিউর
করাচীর খাঁচা ছিঁড়ে ছুটে গেল
মহাশূন্যে টি-৩৩ বিমানের
দুর্দম পাখায় তার স্বপ্নের
স্বাধীন স্বদেশ মনে করে
ফেরে তার মাহিন তুহিন মিলি
সর্বস্ব সম্পদ; পরম আশ্চর্য এক
কবিতার ইন্দ্রজাল সৃষ্টি হল…
তার অধিক কবিতা আর
কোন বঙ্গভাষী কবে লিখেছে কোথায়?
আমি কোন্ শহীদের স্মরণে লিখব?
বায়ান্ন, বাষট্টি, উনসত্তর, একাত্তর;
বাংলার লক্ষ লক্ষ আসাদ মতিউর আজ
বুকের শোণিতে উর্বর করেছে এই
প্রগাঢ় শ্যামল!
শহীদের পূণ্য রক্তে শতকোটি
বাঙালির প্রাণের আবেগ আজ
পুষ্পিত সৌরভ। বাংলা নগর বন্দর গঞ্জ
বাষট্টি হাজার গ্রাম
ধ্বংস স্তূপের থেকে সাত কোটি ফুল
হয়ে ফুটে! প্রাণময় মহৎ কবিতা
আর কোথাও দেখি না এর চেয়ে।
শব্দভুক পদ্য ব্যবসায়ী ভীরু বংগজ পুংগব সব
এই মহাকাব্যের কাননে খোঁজে
নতুন বিশ্বয়। কলমের সাথে আজ
কবির দুর্জয় হাতে নির্ভুল স্টেনগান কথা বলে।
কবিতায় আর নতুন কি লিখব
যখন বুকের রক্তে
লিখেছি একটি নাম
বাংলাদেশ।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান।
শহীদ স্মরণে – মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান | শহীদ স্মরণে কবিতা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান | মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা | মুক্তিযুদ্ধের কবিতা | শহীদের কবিতা | ভাষা আন্দোলনের কবিতা
শহীদ স্মরণে: মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের মুক্তিযুদ্ধ, শহীদ ও স্বাধীনতার অসাধারণ কাব্যভাষা
মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের “শহীদ স্মরণে” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য ও শক্তিশালী মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কবিতা। “কবিতায় আর কি লিখব? / যখন বুকের রক্তে লিখেছি / একটি নাম বাংলাদেশ।” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে ভাষা আন্দোলন (১৯৫২), শিক্ষা আন্দোলন (১৯৬২), গণঅভ্যুত্থান (১৯৬৯), এবং মুক্তিযুদ্ধ (১৯৭১) — এই চার দশকের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা, শহীদ আসাদ ও মতিউরের আত্মত্যাগ, এবং শেষ পর্যন্ত বুকের রক্তে লেখা বাংলাদেশ নামের এক গভীর ও বহুমাত্রিক কাব্যচিত্র। মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান (১৯৩৫-২০১৪) ছিলেন একজন বিশিষ্ট বাংলাদেশী কবি, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষাবিদ। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় নিজস্ব ভাষাভঙ্গি ও বিষয়বৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত। তাঁর কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি, শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা, এবং স্বাধীনতার গৌরব গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। “শহীদ স্মরণে” তাঁর সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বাংলার সংগ্রামের ইতিহাস, শহীদ আসাদ ও মতিউরের আত্মত্যাগ, এবং বুকের রক্তে লেখা বাংলাদেশ নামের চূড়ান্ত সত্যকে ফুটিয়ে তুলেছেন।
মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান: ভাষা, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার কবি
মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ১৯৩৫ সালের ২৯ এপ্রিল বাংলাদেশের চাঁদপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি কবিতা চর্চা শুরু করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই প্রতিবাদী কবিতার জন্য পরিচিত হয়ে ওঠেন। তিনি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সাথে যুক্ত ছিলেন।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘মাটির ডাক’ (১৯৬০), ‘বাংলার মুখ’ (১৯৭২), ‘শহীদ স্মরণে’ (১৯৭৫), ‘নির্বাচিত কবিতা’ (১৯৮৫) সহ আরও অসংখ্য গ্রন্থ। তিনি ২০১৪ সালের ১৬ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যু বাংলা সাহিত্যের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ভাষা আন্দোলনের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের গৌরব, শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা, এবং সরল-প্রাঞ্জল ভাষায় গভীর আবেগ প্রকাশের দক্ষতা। ‘শহীদ স্মরণে’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বাংলার সংগ্রামের ইতিহাস, শহীদ আসাদ ও মতিউরের আত্মত্যাগ, এবং বুকের রক্তে লেখা বাংলাদেশ নামের চূড়ান্ত সত্যকে ফুটিয়ে তুলেছেন।
শহীদ স্মরণে: শিরোনামের তাৎপর্য ও ঐতিহাসিক পটভূমি
শিরোনাম ‘শহীদ স্মরণে’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘শহীদ’ — যারা আত্মত্যাগ করেছেন, যারা মৃত্যুবরণ করেছেন। ‘স্মরণে’ — তাদের স্মরণে। কবি এই কবিতায় ভাষা আন্দোলনের শহীদ, গণঅভ্যুত্থানের শহীদ আসাদুজ্জামান, মুক্তিযুদ্ধের শহীদ মতিউর রহমান — সকল শহীদের স্মরণে এই কবিতা লিখেছেন।
কবি শুরুতে বলছেন — কবিতায় আর কি লিখব? যখন বুকের রক্তে লিখেছি একটি নাম বাংলাদেশ। গানে আর ভিন্ন কি সুখের ব্যঞ্জনা? যখন হানাদার বধ সংগীতে ঘৃণার প্রবল মন্ত্রে জাগ্রত স্বদেশের তরুণ হাতে নিত্য বেজেছে অবিরাম মেশিনগান, মর্টার, গ্রেনেড।
কবিতায় কি বলব? যখন আসাদ মনিরামপুরের প্রবল শ্যামল হৃদয়ের তপ্ত রুধিরে করেছে রঞ্জিত সারা বাংলায় আজ উড্ডীন সেই রক্তাক্ত পতাকা।
আসাদের মৃত্যুতে আমি অশ্রুহীন, অশোক; কেননা নয়ন কেবল বজ্রবর্ষী; কেননা আমার বৃদ্ধ পিতার শরীরে এখনো পশুদের প্রহারের চিহ্ন; কেননা আমার বৃদ্ধা মাতার কণ্ঠে নেই আর্ত-হাহাকার, নেই-অভিসম্পাত-কেবল দুর্মর ঘৃণার আগুন; কোন সান্ত্বনা বাক্য নয়, নয় কোন বিমর্ষ বিলাপ; তাকে বলিনি — তোমার ছেলে আসল ফিরে হাজার ছেলে হয়ে আর কেঁদো না মা; কেননা মা তো কাঁদে না; মার চোখে নেই অশ্রু, কেবল অনল জ্বালা, দু’চোখে তার শত্রু হননের আহ্বান।
আসাদের রক্ত ধারায় মহৎ কবিতার, সব মহাকাব্যের আদি অনাদি আবেগে বাংলাদেশ-জাগ্রত।
আমি কবিতায় নতুন আর কি বলব? যখন মতিউর করাচীর খাঁচা ছিঁড়ে ছুটে গেল মহাশূন্যে টি-৩৩ বিমানের দুর্দম পাখায় তার স্বপ্নের স্বাধীন স্বদেশ মনে করে ফেরে তার মাহিন তুহিন মিলি সর্বস্ব সম্পদ; পরম আশ্চর্য এক কবিতার ইন্দ্রজাল সৃষ্টি হল…
তার অধিক কবিতা আর কোন বঙ্গভাষী কবে লিখেছে কোথায়? আমি কোন্ শহীদের স্মরণে লিখব? বায়ান্ন, বাষট্টি, উনসত্তর, একাত্তর; বাংলার লক্ষ লক্ষ আসাদ মতিউর আজ বুকের শোণিতে উর্বর করেছে এই প্রগাঢ় শ্যামল!
শহীদের পূণ্য রক্তে শতকটি বাঙালির প্রাণের আবেগ আজ পুষ্পিত সৌরভ। বাংলা নগর বন্দর গঞ্জ বাষট্টি হাজার গ্রাম ধ্বংস স্তূপের থেকে সাত কোটি ফুল হয়ে ফুটে! প্রাণময় মহৎ কবিতা আর কোথাও দেখি না এর চেয়ে।
শব্দভুক পদ্য ব্যবসায়ী ভীরু বংগজ পুংগব সব এই মহাকাব্যের কাননে খোঁজে নতুন বিশ্বয়। কলমের সাথে আজ কবির দুর্জয় হাতে নির্ভুল স্টেনগান কথা বলে।
কবিতায় আর নতুন কি লিখব যখন বুকের রক্তে লিখেছি একটি নাম বাংলাদেশ।
শহীদ স্মরণে: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: বুকের রক্তে লেখা বাংলাদেশ
“কবিতায় আর কি লিখব? / যখন বুকের রক্তে লিখেছি / একটি নাম বাংলাদেশ। / গানে আর ভিন্ন কি সুখের ব্যঞ্জনা? / যখন হানাদার বধ সংগীতে / ঘৃণার প্রবল মন্ত্রে জাগ্রত / স্বদেশের তরুণ হাতে / নিত্য বেজেছে অবিরাম / মেশিনগান, মর্টার, গ্রেনেড।”
প্রথম স্তবকে বুকের রক্তে লেখা বাংলাদেশের কথা বলা হয়েছে। ‘কবিতায় আর কি লিখব? যখন বুকের রক্তে লিখেছি একটি নাম বাংলাদেশ’ — কবিতায় আর কী লিখব? যখন বুকের রক্তে লিখেছি একটি নাম বাংলাদেশ। ‘গানে আর ভিন্ন কি সুখের ব্যঞ্জনা? যখন হানাদার বধ সংগীতে ঘৃণার প্রবল মন্ত্রে জাগ্রত স্বদেশের তরুণ হাতে নিত্য বেজেছে অবিরাম মেশিনগান, মর্টার, গ্রেনেড’ — গানে আর ভিন্ন কী সুখের ব্যঞ্জনা? যখন হানাদার বধের সংগীতে ঘৃণার প্রবল মন্ত্রে জাগ্রত স্বদেশের তরুণ হাতে নিত্য বেজেছে অবিরাম মেশিনগান, মর্টার, গ্রেনেড।
দ্বিতীয় স্তবক: আসাদের রক্তে রঞ্জিত পতাকা
“কবিতায় কি বলব? / যখন আসাদ / মনিরামপুরের প্রবল শ্যামল / হৃদয়ের তপ্ত রুধিরে করেছে রঞ্জিত / সারা বাংলায় আজ উড্ডীন / সেই রক্তাক্ত পতাকা।”
দ্বিতীয় স্তবকে আসাদের রক্তে রঞ্জিত পতাকার কথা বলা হয়েছে। ‘কবিতায় কি বলব? যখন আসাদ মনিরামপুরের প্রবল শ্যামল হৃদয়ের তপ্ত রুধিরে করেছে রঞ্জিত সারা বাংলায় আজ উড্ডীন সেই রক্তাক্ত পতাকা’ — কবিতায় কী বলব? যখন আসাদ (আসাদুজ্জামান, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের শহীদ) মনিরামপুরের প্রবল শ্যামল (সবুজ) হৃদয়ের তপ্ত রুধিরে (রক্তে) করেছে রঞ্জিত, সারা বাংলায় আজ উড্ডীন সেই রক্তাক্ত পতাকা।
তৃতীয় স্তবক: পিতা-মাতার ক্ষত ও ঘৃণার আগুন
“আসাদের মৃত্যুতে আমি / অশ্রুহীন, অশোক; কেননা / নয়ন কেবল বজ্রবর্ষী; কেননা / আমার বৃদ্ধ পিতার শরীরে / এখনো পশুদের প্রহারের চিহ্ন; / কেননা আমার বৃদ্ধা মাতার / কণ্ঠে নেই আর্ত-হাহাকার, নেই- / অভিসম্পাত-কেবল / দুর্মর ঘৃণার আগুন; কোন / সান্ত্বনা বাক্য নয়, নয় কোন / বিমর্ষ বিলাপ; তাকে বলিনি / তোমার ছেলে আসল ফিরে / হাজার ছেলে হয়ে আর কেঁদো না মা; কেননা / মা তো কাঁদে না; / মার চোখে নেই অশ্রু, কেবল / অনল জ্বালা, দু’চোখে তার / শত্রু হননের আহ্বান।”
তৃতীয় স্তবকে পিতা-মাতার ক্ষত ও ঘৃণার আগুনের কথা বলা হয়েছে। ‘আসাদের মৃত্যুতে আমি অশ্রুহীন, অশোক; কেননা নয়ন কেবল বজ্রবর্ষী’ — আসাদের মৃত্যুতে আমি অশ্রুহীন, অশোক (অশ্রু নেই); কেননা চোখ কেবল বজ্রবর্ষী। ‘কেননা আমার বৃদ্ধ পিতার শরীরে এখনো পশুদের প্রহারের চিহ্ন’ — কেননা আমার বৃদ্ধ পিতার শরীরে এখনো পশুদের প্রহারের চিহ্ন। ‘কেননা আমার বৃদ্ধা মাতার কণ্ঠে নেই আর্ত-হাহাকার, নেই-অভিসম্পাত-কেবল দুর্মর ঘৃণার আগুন’ — কেননা আমার বৃদ্ধা মাতার কণ্ঠে নেই আর্ত-হাহাকার, নেই অভিসম্পাত — কেবল দুর্মর (দুর্মর — মৃত্যুঞ্জয়ী, অমর) ঘৃণার আগুন। ‘কোন সান্ত্বনা বাক্য নয়, নয় কোন বিমর্ষ বিলাপ; তাকে বলিনি — তোমার ছেলে আসল ফিরে হাজার ছেলে হয়ে আর কেঁদো না মা; কেননা মা তো কাঁদে না; মার চোখে নেই অশ্রু, কেবল অনল জ্বালা, দু’চোখে তার শত্রু হননের আহ্বান’ — কোন সান্ত্বনা বাক্য নয়, কোন বিমর্ষ বিলাপ নয়; তাকে বলিনি — তোমার ছেলে আসল ফিরে হাজার ছেলে হয়ে আর কেঁদো না মা; কেননা মা তো কাঁদে না; মার চোখে নেই অশ্রু, কেবল অনল জ্বালা, দু’চোখে তার শত্রু হননের আহ্বান।
চতুর্থ স্তবক: আসাদের রক্তে বাংলাদেশ-জাগ্রত
“আসাদের রক্ত ধারায় মহৎ / কবিতার, সব মহাকাব্যের / আদি অনাদি আবেগে / বাংলাদেশ-জাগ্রত।”
চতুর্থ স্তবকে আসাদের রক্তে বাংলাদেশ-জাগ্রত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। ‘আসাদের রক্ত ধারায় মহৎ কবিতার, সব মহাকাব্যের আদি অনাদি আবেগে বাংলাদেশ-জাগ্রত’ — আসাদের রক্তধারায় মহৎ কবিতার, সব মহাকাব্যের আদি অনাদি (অনন্ত) আবেগে বাংলাদেশ-জাগ্রত।
পঞ্চম স্তবক: মতিউরের করাচীর খাঁচা ছিঁড়ে ছুটে যাওয়া
“আমি কবিতায় নতুন আর / কি বলব? যখন মতিউর / করাচীর খাঁচা ছিঁড়ে ছুটে গেল / মহাশূন্যে টি-৩৩ বিমানের / দুর্দম পাখায় তার স্বপ্নের / স্বাধীন স্বদেশ মনে করে / ফেরে তার মাহিন তুহিন মিলি / সর্বস্ব সম্পদ; পরম আশ্চর্য এক / কবিতার ইন্দ্রজাল সৃষ্টি হল…”
পঞ্চম স্তবকে মতিউরের করাচীর খাঁচা ছিঁড়ে ছুটে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। ‘আমি কবিতায় নতুন আর কি বলব? যখন মতিউর করাচীর খাঁচা ছিঁড়ে ছুটে গেল মহাশূন্যে টি-৩৩ বিমানের দুর্দম পাখায় তার স্বপ্নের স্বাধীন স্বদেশ মনে করে ফেরে তার মাহিন তুহিন মিলি সর্বস্ব সম্পদ; পরম আশ্চর্য এক কবিতার ইন্দ্রজাল সৃষ্টি হল…’ — আমি কবিতায় নতুন আর কী বলব? যখন মতিউর (মতিউর রহমান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শহীদ, পাকিস্তানি বিমানবাহিনীর পাইলট যিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন) করাচীর খাঁচা ছিঁড়ে ছুটে গেল মহাশূন্যে টি-৩৩ বিমানের দুর্দম পাখায় তার স্বপ্নের স্বাধীন স্বদেশ মনে করে ফেরে তার মাহিন তুহিন মিলি সর্বস্ব সম্পদ; পরম আশ্চর্য এক কবিতার ইন্দ্রজাল সৃষ্টি হল…
ষষ্ঠ স্তবক: লক্ষ লক্ষ শহীদের শোণিতে উর্বর শ্যামল বাংলা
“তার অধিক কবিতা আর / কোন বঙ্গভাষী কবে লিখেছে কোথায়? / আমি কোন্ শহীদের স্মরণে লিখব? / বায়ান্ন, বাষট্টি, উনসত্তর, একাত্তর; / বাংলার লক্ষ লক্ষ আসাদ মতিউর আজ / বুকের শোণিতে উর্বর করেছে এই / প্রগাঢ় শ্যামল!”
ষষ্ঠ স্তবকে লক্ষ লক্ষ শহীদের শোণিতে উর্বর শ্যামল বাংলার কথা বলা হয়েছে। ‘তার অধিক কবিতা আর কোন বঙ্গভাষী কবে লিখেছে কোথায়?’ — তার অধিক কবিতা আর কোন বঙ্গভাষী কবে লিখেছে কোথায়? ‘আমি কোন্ শহীদের স্মরণে লিখব? বায়ান্ন, বাষট্টি, উনসত্তর, একাত্তর; বাংলার লক্ষ লক্ষ আসাদ মতিউর আজ বুকের শোণিতে উর্বর করেছে এই প্রগাঢ় শ্যামল!’ — আমি কোন শহীদের স্মরণে লিখব? ১৯৫২, ১৯৬২, ১৯৬৯, ১৯৭১; বাংলার লক্ষ লক্ষ আসাদ-মতিউর আজ বুকের শোণিতে (রক্তে) উর্বর করেছে এই প্রগাঢ় শ্যামল (সবুজ বাংলা)।
সপ্তম স্তবক: শহীদের রক্তে পুষ্পিত সৌরভ ও সাত কোটি ফুল
“শহীদের পূণ্য রক্তে শতকোটি / বাঙালির প্রাণের আবেগ আজ / পুষ্পিত সৌরভ। বাংলা নগর বন্দর গঞ্জ / বাষট্টি হাজার গ্রাম / ধ্বংস স্তূপের থেকে সাত কোটি ফুল / হয়ে ফুটে! প্রাণময় মহৎ কবিতা / আর কোথাও দেখি না এর চেয়ে।”
সপ্তম স্তবকে শহীদের রক্তে পুষ্পিত সৌরভ ও সাত কোটি ফুলের কথা বলা হয়েছে। ‘শহীদের পূণ্য রক্তে শতকোটি বাঙালির প্রাণের আবেগ আজ পুষ্পিত সৌরভ’ — শহীদের পুণ্য রক্তে শতকোটি বাঙালির প্রাণের আবেগ আজ পুষ্পিত সৌরভ। ‘বাংলা নগর বন্দর গঞ্জ বাষট্টি হাজার গ্রাম ধ্বংস স্তূপের থেকে সাত কোটি ফুল হয়ে ফুটে! প্রাণময় মহৎ কবিতা আর কোথাও দেখি না এর চেয়ে’ — বাংলার নগর, বন্দর, গঞ্জ, বাষট্টি হাজার গ্রাম ধ্বংসস্তূপের থেকে সাত কোটি ফুল হয়ে ফুটে! প্রাণময় মহৎ কবিতা আর কোথাও দেখি না এর চেয়ে।
অষ্টম স্তবক: শব্দভুক পদ্য ব্যবসায়ী ও স্টেনগান কথা বলা
“শব্দভুক পদ্য ব্যবসায়ী ভীরু বংগজ পুংগব সব / এই মহাকাব্যের কাননে খোঁজে / নতুন বিশ্বয়। কলমের সাথে আজ / কবির দুর্জয় হাতে নির্ভুল স্টেনগান কথা বলে।”
অষ্টম স্তবকে শব্দভুক পদ্য ব্যবসায়ী ও স্টেনগান কথা বলার কথা বলা হয়েছে। ‘শব্দভুক পদ্য ব্যবসায়ী ভীরু বংগজ পুংগব সব এই মহাকাব্যের কাননে খোঁজে নতুন বিশ্বয়’ — শব্দভুক (শব্দভোজী) পদ্য ব্যবসায়ী ভীরু বংগজ (বঙ্গজ) পুংগব (শ্রেষ্ঠ পুরুষ) সব এই মহাকাব্যের কাননে খোঁজে নতুন বিশ্বয়। ‘কলমের সাথে আজ কবির দুর্জয় হাতে নির্ভুল স্টেনগান কথা বলে’ — কলমের সাথে আজ কবির দুর্জয় হাতে নির্ভুল স্টেনগান কথা বলে।
নবম স্তবক: বুকের রক্তে লেখা বাংলাদেশ
“কবিতায় আর নতুন কি লিখব / যখন বুকের রক্তে / লিখেছি একটি নাম / বাংলাদেশ।”
নবম স্তবকে প্রথম স্তবকের পুনরাবৃত্তি — বুকের রক্তে লেখা বাংলাদেশের কথা বলা হয়েছে। ‘কবিতায় আর নতুন কি লিখব যখন বুকের রক্তে লিখেছি একটি নাম বাংলাদেশ’ — কবিতায় আর নতুন কী লিখব যখন বুকের রক্তে লিখেছি একটি নাম বাংলাদেশ।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি নয়টি স্তবকে বিভক্ত। প্রথম স্তবকে বুকের রক্তে লেখা বাংলাদেশ, দ্বিতীয় স্তবকে আসাদের রক্তে রঞ্জিত পতাকা, তৃতীয় স্তবকে পিতা-মাতার ক্ষত ও ঘৃণার আগুন, চতুর্থ স্তবকে আসাদের রক্তে বাংলাদেশ-জাগ্রত, পঞ্চম স্তবকে মতিউরের করাচীর খাঁচা ছিঁড়ে ছুটে যাওয়া, ষষ্ঠ স্তবকে লক্ষ লক্ষ শহীদের শোণিতে উর্বর শ্যামল বাংলা, সপ্তম স্তবকে শহীদের রক্তে পুষ্পিত সৌরভ ও সাত কোটি ফুল, অষ্টম স্তবকে শব্দভুক পদ্য ব্যবসায়ী ও স্টেনগান কথা বলা, নবম স্তবকে প্রথম স্তবকের পুনরাবৃত্তি।
ভাষা সরল, প্রাঞ্জল, কিন্তু তীক্ষ্ণ ও প্রতীকাত্মক। তিনি ব্যবহার করেছেন — ‘বুকের রক্তে লিখেছি বাংলাদেশ’, ‘হানাদার বধ সংগীতে’, ‘ঘৃণার প্রবল মন্ত্র’, ‘মেশিনগান, মর্টার, গ্রেনেড’, ‘আসাদ’, ‘মনিরামপুরের প্রবল শ্যামল হৃদয়’, ‘তপ্ত রুধিরে রঞ্জিত’, ‘রক্তাক্ত পতাকা’, ‘অশ্রুহীন, অশোক’, ‘বজ্রবর্ষী’, ‘পশুদের প্রহারের চিহ্ন’, ‘দুর্মর ঘৃণার আগুন’, ‘শত্রু হননের আহ্বান’, ‘মতিউর’, ‘করাচীর খাঁচা ছিঁড়ে’, ‘টি-৩৩ বিমানের দুর্দম পাখা’, ‘পরম আশ্চর্য কবিতার ইন্দ্রজাল’, ‘বায়ান্ন, বাষট্টি, উনসত্তর, একাত্তর’, ‘লক্ষ লক্ষ আসাদ মতিউর’, ‘বুকের শোণিতে উর্বর’, ‘প্রগাঢ় শ্যামল’, ‘শহীদের পূণ্য রক্তে’, ‘পুষ্পিত সৌরভ’, ‘সাত কোটি ফুল’, ‘শব্দভুক পদ্য ব্যবসায়ী’, ‘নির্ভুল স্টেনগান কথা বলে’।
প্রতীক ব্যবহারে তিনি দক্ষ। ‘বুকের রক্তে লেখা বাংলাদেশ’ — আত্মত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার প্রতীক। ‘হানাদার বধ সংগীতে’ — মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক। ‘মেশিনগান, মর্টার, গ্রেনেড’ — যুদ্ধের অস্ত্রের প্রতীক। ‘আসাদ’ — ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের শহীদের প্রতীক। ‘রক্তাক্ত পতাকা’ — স্বাধীনতার পতাকার প্রতীক। ‘বজ্রবর্ষী’ — ক্রোধ, প্রতিশোধের প্রতীক। ‘পশুদের প্রহারের চিহ্ন’ — নির্যাতনের প্রতীক। ‘দুর্মর ঘৃণার আগুন’ — অমর ঘৃণার প্রতীক। ‘শত্রু হননের আহ্বান’ — প্রতিরোধের প্রতীক। ‘মতিউর’ — ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের শহীদের প্রতীক। ‘করাচীর খাঁচা ছিঁড়ে’ — পাকিস্তানি শাসনের বন্ধন ছিন্ন করার প্রতীক। ‘পরম আশ্চর্য কবিতার ইন্দ্রজাল’ — শহীদের আত্মত্যাগের মহাকাব্যের প্রতীক। ‘বায়ান্ন, বাষট্টি, উনসত্তর, একাত্তর’ — ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ — চার দশকের সংগ্রামের প্রতীক। ‘লক্ষ লক্ষ আসাদ মতিউর’ — অসংখ্য শহীদের প্রতীক। ‘বুকের শোণিতে উর্বর প্রগাঢ় শ্যামল’ — শহীদের রক্তে উর্বর বাংলার প্রতীক। ‘সাত কোটি ফুল’ — শহীদের রক্ত থেকে জাত সাত কোটি বাঙালির প্রতীক। ‘শব্দভুক পদ্য ব্যবসায়ী’ — প্রকৃত কবিতা না বুঝে শুধু শব্দের খোঁজে থাকা কবি-ব্যবসায়ীদের প্রতীক। ‘নির্ভুল স্টেনগান কথা বলে’ — প্রতিরোধের অস্ত্র ও কবিতার মিলনের প্রতীক।
পুনরাবৃত্তি শৈলী কবিতার সুর তৈরি করেছে। ‘কবিতায় আর কি লিখব?’ — প্রথম ও নবম স্তবকের পুনরাবৃত্তি কবিতার মূল সুরকে জোরালো করে। ‘বাংলাদেশ’ — প্রথম ও নবম স্তবকের পুনরাবৃত্তি স্বাধীনতার নামের জোরালোতা নির্দেশ করে।
শেষের ‘কবিতায় আর নতুন কি লিখব যখন বুকের রক্তে লিখেছি একটি নাম বাংলাদেশ’ — এটি অত্যন্ত শক্তিশালী সমাপ্তি। বুকের রক্তে লেখা বাংলাদেশ নামের চেয়ে বড় কোনো কবিতা নেই।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“শহীদ স্মরণে” মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের এক অসাধারণ সৃষ্টি। কবি বলছেন — কবিতায় আর কি লিখব? যখন বুকের রক্তে লিখেছি একটি নাম বাংলাদেশ। গানে আর ভিন্ন কি সুখের ব্যঞ্জনা? যখন হানাদার বধ সংগীতে ঘৃণার প্রবল মন্ত্রে জাগ্রত স্বদেশের তরুণ হাতে নিত্য বেজেছে অবিরাম মেশিনগান, মর্টার, গ্রেনেড।
কবিতায় কি বলব? যখন আসাদ মনিরামপুরের প্রবল শ্যামল হৃদয়ের তপ্ত রুধিরে করেছে রঞ্জিত সারা বাংলায় আজ উড্ডীন সেই রক্তাক্ত পতাকা। আসাদের মৃত্যুতে আমি অশ্রুহীন, অশোক; কেননা নয়ন কেবল বজ্রবর্ষী; কেননা আমার বৃদ্ধ পিতার শরীরে এখনো পশুদের প্রহারের চিহ্ন; কেননা আমার বৃদ্ধা মাতার কণ্ঠে নেই আর্ত-হাহাকার, নেই-অভিসম্পাত-কেবল দুর্মর ঘৃণার আগুন; কোন সান্ত্বনা বাক্য নয়, নয় কোন বিমর্ষ বিলাপ; তাকে বলিনি — তোমার ছেলে আসল ফিরে হাজার ছেলে হয়ে আর কেঁদো না মা; কেননা মা তো কাঁদে না; মার চোখে নেই অশ্রু, কেবল অনল জ্বালা, দু’চোখে তার শত্রু হননের আহ্বান।
আসাদের রক্ত ধারায় মহৎ কবিতার, সব মহাকাব্যের আদি অনাদি আবেগে বাংলাদেশ-জাগ্রত। আমি কবিতায় নতুন আর কি বলব? যখন মতিউর করাচীর খাঁচা ছিঁড়ে ছুটে গেল মহাশূন্যে টি-৩৩ বিমানের দুর্দম পাখায় তার স্বপ্নের স্বাধীন স্বদেশ মনে করে ফেরে তার মাহিন তুহিন মিলি সর্বস্ব সম্পদ; পরম আশ্চর্য এক কবিতার ইন্দ্রজাল সৃষ্টি হল…
তার অধিক কবিতা আর কোন বঙ্গভাষী কবে লিখেছে কোথায়? আমি কোন্ শহীদের স্মরণে লিখব? বায়ান্ন, বাষট্টি, উনসত্তর, একাত্তর; বাংলার লক্ষ লক্ষ আসাদ মতিউর আজ বুকের শোণিতে উর্বর করেছে এই প্রগাঢ় শ্যামল!
শহীদের পূণ্য রক্তে শতকোটি বাঙালির প্রাণের আবেগ আজ পুষ্পিত সৌরভ। বাংলা নগর বন্দর গঞ্জ বাষট্টি হাজার গ্রাম ধ্বংস স্তূপের থেকে সাত কোটি ফুল হয়ে ফুটে! প্রাণময় মহৎ কবিতা আর কোথাও দেখি না এর চেয়ে।
শব্দভুক পদ্য ব্যবসায়ী ভীরু বংগজ পুংগব সব এই মহাকাব্যের কাননে খোঁজে নতুন বিশ্বয়। কলমের সাথে আজ কবির দুর্জয় হাতে নির্ভুল স্টেনগান কথা বলে।
কবিতায় আর নতুন কি লিখব যখন বুকের রক্তে লিখেছি একটি নাম বাংলাদেশ।
এই কবিতা আমাদের শেখায় — বুকের রক্তে লেখা বাংলাদেশ নামের চেয়ে বড় কোনো কবিতা নেই। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ — চার দশকের সংগ্রাম, শহীদ আসাদ ও মতিউরের আত্মত্যাগ, লক্ষ লক্ষ শহীদের শোণিতে উর্বর বাংলা — এই সব মিলে তৈরি হয়েছে এক মহাকাব্য। কলমের সাথে আজ স্টেনগান কথা বলে। এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, শহীদের আত্মত্যাগ, এবং স্বাধীনতার গৌরবের এক অসাধারণ কাব্যচিত্র।
মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের কবিতায় ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা
মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের কবিতায় ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা একটি পুনরাবৃত্ত বিষয়। তিনি ‘শহীদ স্মরণে’ কবিতায় ভাষা আন্দোলন (১৯৫২), শিক্ষা আন্দোলন (১৯৬২), গণঅভ্যুত্থান (১৯৬৯), এবং মুক্তিযুদ্ধ (১৯৭১) — এই চার দশকের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা, শহীদ আসাদ ও মতিউরের আত্মত্যাগ, এবং শেষ পর্যন্ত বুকের রক্তে লেখা বাংলাদেশ নামের চূড়ান্ত সত্যকে ফুটিয়ে তুলেছেন।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের উচ্চতর পাঠ্যক্রমে মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের ‘শহীদ স্মরণে’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, শহীদের আত্মত্যাগ, স্বাধীনতার গৌরব, এবং আধুনিক বাংলা কবিতার ধারা সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে।
শহীদ স্মরণে সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: শহীদ স্মরণে কবিতাটির লেখক কে?
এই কবিতাটির লেখক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান (১৯৩৫-২০১৪)। তিনি একজন বিশিষ্ট বাংলাদেশী কবি, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষাবিদ। তিনি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সাথে যুক্ত ছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘মাটির ডাক’ (১৯৬০), ‘বাংলার মুখ’ (১৯৭২), ‘শহীদ স্মরণে’ (১৯৭৫), ‘নির্বাচিত কবিতা’ (১৯৮৫)।
প্রশ্ন ২: ‘কবিতায় আর কি লিখব? / যখন বুকের রক্তে লিখেছি / একটি নাম বাংলাদেশ’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
কবিতায় আর কী লিখব? যখন বুকের রক্তে লিখেছি একটি নাম বাংলাদেশ। বুকের রক্তে লেখা বাংলাদেশ নামের চেয়ে বড় কোনো কবিতা নেই।
প্রশ্ন ৩: ‘আসাদ’ কে?
‘আসাদ’ — আসাদুজ্জামান, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ছাত্রনেতা। ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় মিছিলে পুলিশের গুলিতে তিনি শহীদ হন।
প্রশ্ন ৪: ‘মতিউর’ কে?
‘মতিউর’ — মতিউর রহমান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শহীদ। তিনি পাকিস্তানি বিমানবাহিনীর পাইলট ছিলেন। তিনি করাচীতে অবস্থানকালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট তিনি টি-৩৩ বিমান নিয়ে করাচী থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে উড়ে এসে ভারতের কাছে বিমান অবতরণ করেন। পরে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
প্রশ্ন ৫: ‘আমার বৃদ্ধ পিতার শরীরে / এখনো পশুদের প্রহারের চিহ্ন’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্যাতনের চিহ্ন এখনো পিতার শরীরে রয়েছে। এটি মুক্তিযুদ্ধের সময়কার নির্যাতনের স্মৃতির প্রতীক।
প্রশ্ন ৬: ‘মার চোখে নেই অশ্রু, কেবল / অনল জ্বালা, দু’চোখে তার / শত্রু হননের আহ্বান’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
মায়ের চোখে অশ্রু নেই, কেবল অনল জ্বালা, শত্রু হননের আহ্বান। এটি শহীদের মায়ের ক্রোধ ও প্রতিশোধের প্রতীক।
প্রশ্ন ৭: ‘বায়ান্ন, বাষট্টি, উনসত্তর, একাত্তর’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
১৯৫২ — ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ — শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৯ — গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ — মুক্তিযুদ্ধ। এটি বাংলার সংগ্রামের চার দশকের প্রতীক।
প্রশ্ন ৮: ‘ধ্বংস স্তূপের থেকে সাত কোটি ফুল / হয়ে ফুটে!’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে সাত কোটি বাঙালি ফুল হয়ে ফুটেছে। এটি শহীদের রক্তে নতুন জীবনের জন্মের প্রতীক।
প্রশ্ন ৯: ‘কলমের সাথে আজ / কবির দুর্জয় হাতে নির্ভুল স্টেনগান কথা বলে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
কলমের সাথে আজ স্টেনগান কথা বলে। এটি কবিতা ও প্রতিরোধের মিলনের প্রতীক।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
কবিতাটি আমাদের শেখায় — বুকের রক্তে লেখা বাংলাদেশ নামের চেয়ে বড় কোনো কবিতা নেই। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ — চার দশকের সংগ্রাম, শহীদ আসাদ ও মতিউরের আত্মত্যাগ, লক্ষ লক্ষ শহীদের শোণিতে উর্বর বাংলা — এই সব মিলে তৈরি হয়েছে এক মহাকাব্য। কলমের সাথে আজ স্টেনগান কথা বলে। এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, শহীদের আত্মত্যাগ, এবং স্বাধীনতার গৌরবের এক অসাধারণ কাব্যচিত্র।
ট্যাগস: শহীদ স্মরণে, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, মুক্তিযুদ্ধের কবিতা, ভাষা আন্দোলনের কবিতা, শহীদের কবিতা, স্বাধীনতার কবিতা, আসাদুজ্জামান, মতিউর রহমান, বায়ান্ন, বাষট্টি, উনসত্তর, একাত্তর, বাংলা কবিতা বিশ্লেষণ
© Kobitarkhata.com – কবি: মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান | কবিতার প্রথম লাইন: “কবিতায় আর কি লিখব? / যখন বুকের রক্তে লিখেছি / একটি নাম বাংলাদেশ。” | মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদের কবিতা বিশ্লেষণ | আধুনিক বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন






