রোদে ভিজে বাড়ি ফেরা- মাকিদ হায়দার।

স্বজনের অভাবহেতু পালিয়ে ফিরি অশোকের
সুদৃশ্য নগর থেকে বিদিশার অন্ধকার নগরে।
কোথায়ও পাই না খুঁজে স্বজন পরিচিত মুখ
তুমি, তোমাকে, তাইতো পালিয়ে ফিরি
ট্রেনে, বাসে, প্লেনে।

ভেবেছিলাম প্লেনে হয়তো তেমন কোনো রানির মতো হোস্টেজ পাবো
যার কাছে রেখে যাবো বুকের গভীর ব্যথা, আমার স্বজনহীনতার কথা,
আমার অদৃষ্টের গান।

তেজগাঁ এয়ারপোর্টে একজন মহিলার
সাথে দেখা যাকে দেখতে ঠিক আমার মায়ের মতোন।
শোকের ছায়া সমস্ত শরীরে মেখে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন আমার দিকে চেয়ে।

আমি মা, মা, বলে চিৎকার করতে যেয়েই
কেমন যেন আড়ষ্ট হয়ে গেলুম,
মানুষের চেহারার সমিল মানুষ হতে পারে বলে
আমি মুখ ফেরালুম অন্যদিকে।

ইতোপূর্বে আরো দুইবার ভুল করেছি আমিই।
একবার ট্রেনে
একবার বাসে।
ট্রেনে চলতে চলতে হঠাৎ থেমে গেলো, এক নাম-না-জানা ইস্টিশানে-
কোথাও জল নেই
কোথাও আলো নেই।

চারদিকে আগুন
মাঝখানে আমাদের সেই অন্ধকার ট্রেন,
ট্রেন থেকে নেমে রোদে ভিজে আমি দৌড়ে আগুনের কাছে গিয়ে
নতজানু হতে চাইলুম, একটু আলোর জন্যে।

আমাকে দেখেই পিছন থেকে বয়স্ক একজন লোক
ইশরায় কাছে ডেকে বললেন,
আমরা তো সব পুড়েই গেছি আগুনের কঠোর স্বভাবের কাছে
পুনরায় আগুনে পুড়ে অনর্থক তুমি
নিশ্চিহ্ন কেন হতে চাও?

ঠিক তক্ষুনি, তাঁকে আমার অতীত পিতার মতো মনে হয়েছিল।
আমি আগুনকে ভুলে তার কাছে নতজানু হবো কি না ভাবছি।
এমন সময় অদৃশ্য হাওয়ায়
তিনি হাসতে হাসতে মিলিয়ে গেলেন দূরে।

আমি দৌড়ে এলুম ট্রেনের কামরায়,
লোকজন সব কাঁদছে আমার জন্যে।
আমি নাকি যার সাথে বলছিলুম কথা
তিনি নাকি ভয়ানক পাপী,
তিনি নাকি মানুষকে অন্ধকারে রেখে থাকেন আলো জ্বালা শহরে।

অথচ, লোকটিকে আমার হিতাকাঙ্ক্ষী বলেই মনে হয়েছিল,
আমরা তো সব পুড়েই গেছি আগুনের কাছে।
না তিনি পাপী নন,
ঐ দূরে, বহুদূরে, যে ইস্টিশান থেকে আলো দেখা যায়, আমরা যাবো সব তাঁর কাছে।
ঐ ইস্টিশনের ঠিকানায় কতবার কাঁদলুম
সহযাত্রীদের কাছে, আমার জন্য প্রসারিত ভালোবাসা নিয়ে
কেউ-ই-এলো না আমার অস্তিত্বহীন জীবনে।

কিন্তু আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে সেই সব অতীত।

একবার বাসে কন্ডাক্টর ভাড়া নিতে চায়নি, অথচ,
সে অন্যদের কাছ থেকে করায় গণ্ডায় ভাড়া,
বুঝে নিলে বার বার।
সে কি আমাকে চিনতো?

লাভলেনে বাস থামতেই, কন্ডাক্টর বাড়িয়ে দিলো মুখ আমার হৃদয়ের কাছে।
বললো, ভাই ভেবেছিলাম, আমার সেই ভাই, যাকে কোলে পিঠে মানুষ করলাম,
সে গেলো যুদ্ধে,সে গেলো আগুন নেভাতে,
অথচ আমারই ঘর ভর্তি আগুন রয়ে গেলো চিরকাল,
আমি তাড়াতাড়ি ভুল ভাঙিয়ে দিয়ে পালিয়ে এলুম নন্দনকাননে মানুষের খোঁজে।
অথচ, একটি মানুষও নেই,
এমনকি একজোড়া প্রেমিক প্রেমিকা।

পুনর্বার সেই বয়স্ক লোকের সাথে দেখা।
তিনি বললেন, এসো, এসো, কাছে এসো,
রেখে যাও তোমাদের
বুকের গভীর ব্যথা আমারই করতলে,
আমরা তো সব অনাদিকাল থেকে
বসেই আছি আর একটি উৎসবের আয়োজনে।

তবু তুমি স্বজনের অভাব হেতু কেন কেঁদে ফেরো
শহরে, শহরে, অন্ধকার ত্রিভুবনে,
তার চেয়ে জেনে রাখো তুমিতো জন্মেই মৃত
নিঃস্বতার অন্ধকারে।

আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। মাকিদ হায়দার।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x