কবিতার খাতা
ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা – শামসুর রাহমান।
ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা,
এবার আমি গোলাপ নেবো।
গুলবাগিচা বিরান ব’লে, হর-হামেশা
ফিরে যাবো,
তা’ হবে না দিচ্ছি ব’লে।
ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা,
এবার আমি গোলাপ নেবো।
ফিরতে হ’লে বেলাবেলি হাঁটতে হবে
অনেকখানি।
বুক-পাঁজরের ঘেরাটোপে ফুর্কি মারে
আজব পাখি।
পক্ষী তুমি সবুর করো,
শ্যাম-প্রহরে ডোবার আগে, একটু শুধু
মেওয়া খাবো।
শিরায় শিরায় এখনো তো রক্ত করে
অসভ্যতা।
বাচাল কণা খিস্তি করে হাফ গেরস্ত
প্রেমের টানে;
হঠাৎ দেখি চক্ষু টেপে
গন্ধবণিক কালাচাঁদের মিষ্টি মিষ্টি
হ্রস্ব পরী।
বিষ ছড়ালো কালনাগিনী বুকের ভেতর
কোন্ সকালে।
হচ্ছি কালো ক্রমাগত, অলক্ষুণে
বেলা বাড়ে।
সর্পিণী তুই কেমনতরো?
বিষ-ঝাড়ানো ওঝা ডেকে রক্ষা পাওয়া
কঠিন হলো।
ছিলাম প’ড়ে কাঁটাতারে বিদ্ধ হ’য়ে
দিন-দুপুরে,
রাত-দুপুরে, মানে আমি সব দুপুরে
ছিলাম প’ড়ে।
বাঁচতে গিয়ে চেটেছিলাম
রুক্ষ ধুলো; জব্দ নিজের কষ-গড়ানো
রক্তধারায়।
ইতিমধ্যে এই মগজে, ক’খানা হাড়
জমা হলো?
ইতিমধ্যে এই হৃদয়ে, ক’খানা ঘর
ধ্বংস হলো?
শক্ত পাক্কা হিশাব পাওয়া।
টোক-ফর্দের পাতাগুলো কোন্ পাতালে
নিমজ্জিত?
তাল-সুপুরি গাছের নিচে, সন্ধ্যা নদীর
উদাস তীরে,
শান-বাঁধানো পথে পথে, বাস ডিপোতে,
টার্মিনালে,
কেমন একটা গন্ধ ঘোরে।
আর পারি না, দাও ছড়িয়ে পদ্মকেশর
বাংলাদেশে।
ঘাতক তুমি সরে দাঁড়াও, এবার আমি
লাশ নেবো না।
নইতো আমি মুদ্দোফরাস। জীবন থেকে
সোনার মেডেল, শিউলি-ফোটা সকাল নেবো।
ঘাতক তুমি বাদ সেধো না, এবার আমি গোলাপ নেবো।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। শামসুর রাহমান।
ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা – শামসুর রাহমান | ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা কবিতা শামসুর রাহমান | শামসুর রাহমানের কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা | স্বৈরাচার বিরোধী কবিতা | প্রতিরোধের কবিতা | পুনর্জন্মের কবিতা
ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা: শামসুর রাহমানের প্রতিরোধ, পুনর্জন্ম ও গোলাপের অসাধারণ কাব্যভাষা
শামসুর রাহমানের “ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য ও শক্তিশালী প্রতিরোধের কবিতা। “ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, / এবার আমি গোলাপ নেবো। / গুলবাগিচা বিরান ব’লে, হর-হামেশা / ফিরে যাবো, / তা’ হবে না দিচ্ছি ব’লে। / ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, / এবার আমি গোলাপ নেবো।” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে পুনর্জন্মের ঘোষণা, এবং শেষ পর্যন্ত গোলাপ (সুন্দর, শান্তি, স্বাধীনতা) গ্রহণের এক গভীর ও বহুমাত্রিক কাব্যচিত্র। শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬) ছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃত। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় নিজস্ব ভাষাভঙ্গি ও বিষয়বৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত। “ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা” তাঁর সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ডাক দিয়েছেন, মৃত্যুকে মেনে নিতে অস্বীকার করেছেন, এবং পুনর্জন্মের মাধ্যমে নতুন জীবন, নতুন সকাল, নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছেন।
শামসুর রাহমান: আধুনিক বাংলা কবিতার পুরোধা ও জাতীয় কবি
শামসুর রাহমান ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি কবিতা চর্চা শুরু করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম পুরোধা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ (১৯৬০), ‘রৌদ্র করোটিতে’ (১৯৬৩), ‘বিপুল বায়ুতে পারে’ (১৯৬৯), ‘আসাদের শার্ট’ (১৯৭০), ‘বাংলা আমার বাংলা’ (১৯৭২), ‘স্বপ্ন ও অন্যান্য’ (১৯৭৮), ‘আমার প্রেমের কবিতা’ (১৯৮৫), ‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা’ (১৯৯০) সহ আরও অসংখ্য গ্রন্থ। তিনি ২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন।
শামসুর রাহমানের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো প্রেম ও রাজনীতির অনন্য মিশ্রণ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার গভীর উপলব্ধি, প্রতীক ব্যবহারের দক্ষতা, এবং সরল-প্রাঞ্জল ভাষায় গভীর অর্থ সৃষ্টির ক্ষমতা। ‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ডাক দিয়েছেন।
ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা: ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পটভূমি
কবিতাটি ১৯৯০ সালের দিকে রচিত — একটি সময় যখন বাংলাদেশে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন চরমে উঠেছিল। ১৯৮২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে এরশাদ সরকার। তার বিরুদ্ধে ১৯৮০-এর দশকের শেষভাগে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে ওঠে। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে এরশাদ সরকারের পতন হয়।
কবিতার শিরোনাম ‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘ঘাতক কাঁটা’ — স্বৈরাচার, নির্যাতন, মৃত্যু। কবি বলছেন — ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, এবার আমি গোলাপ নেবো। গুলবাগিচা (ফুলের বাগান) বিরান বলে হর-হামেশা (সবসময়) ফিরে যাবো, তা হবে না দিচ্ছি বলে। ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, এবার আমি গোলাপ নেবো।
কবি বলছেন — ফিরতে হলে বেলাবেলি (সময়মতো) হাঁটতে হবে অনেকখানি। বুক-পাঁজরের ঘেরাটোপে ফুর্কি মারে আজব পাখি। পক্ষী তুমি সবুর করো, শ্যাম-প্রহরে ডোবার আগে, একটু শুধু মেওয়া খাবো।
শিরায় শিরায় এখনো তো রক্ত করে অসভ্যতা। বাচাল কণা খিস্তি করে হাফ গেরস্ত প্রেমের টানে। হঠাৎ দেখি চক্ষু টেপে গন্ধবণিক কালাচাঁদের মিষ্টি মিষ্টি হ্রস্ব পরী। বিষ ছড়ালো কালনাগিনী বুকের ভেতর কোন্ সকালে। হচ্ছে কালো ক্রমাগত, অলক্ষুণে বেলা বাড়ে। সর্পিণী তুই কেমনতরো? বিষ-ঝাড়ানো ওঝা ডেকে রক্ষা পাওয়া কঠিন হলো।
ছিলাম পড়ে কাঁটাতারে বিদ্ধ হয়ে দিন-দুপুরে, রাত-দুপুরে, মানে আমি সব দুপুরে ছিলাম পড়ে। বাঁচতে গিয়ে চেটেছিলাম রুক্ষ ধুলো; জব্দ নিজের কষ-গড়ানো রক্তধারায়।
ইতিমধ্যে এই মগজে, ক’খানা হাড় জমা হলো? ইতিমধ্যে এই হৃদয়ে, ক’খানা ঘর ধ্বংস হলো? শক্ত পাক্কা হিশাব পাওয়া। টোক-ফর্দের পাতাগুলো কোন্ পাতালে নিমজ্জিত?
তাল-সুপুরি গাছের নিচে, সন্ধ্যা নদীর উদাস তীরে, শান-বাঁধানো পথে পথে, বাস ডিপোতে, টার্মিনালে, কেমন একটা গন্ধ ঘোরে। আর পারি না, দাও ছড়িয়ে পদ্মকেশর বাংলাদেশে।
শেষে কবি বলছেন — ঘাতক তুমি সরে দাঁড়াও, এবার আমি লাশ নেবো না। নইতো আমি মুদ্দোফরাস। জীবন থেকে সোনার মেডেল, শিউলি-ফোটা সকাল নেবো। ঘাতক তুমি বাদ সেধো না, এবার আমি গোলাপ নেবো।
ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: ঘাতক কাঁটা ফিরিয়ে নেওয়ার আহ্বান
“ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, / এবার আমি গোলাপ নেবো। / গুলবাগিচা বিরান ব’লে, হর-হামেশা / ফিরে যাবো, / তা’ হবে না দিচ্ছি ব’লে। / ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, / এবার আমি গোলাপ নেবো।”
প্রথম স্তবকে কবি ঘাতক কাঁটা ফিরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। ‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা’ — ঘাতক কাঁটা (স্বৈরাচার, নির্যাতন, মৃত্যু) ফিরিয়ে নাও। ‘এবার আমি গোলাপ নেবো’ — এবার আমি গোলাপ (সুন্দর, শান্তি, স্বাধীনতা) নেবো। ‘গুলবাগিচা বিরান বলে, হর-হামেশা ফিরে যাবো, তা হবে না দিচ্ছি বলে’ — ফুলের বাগান বিরান বলে সবসময় ফিরে যাবো, তা হবে না দিচ্ছি বলে।
দ্বিতীয় স্তবক: ফিরতে হলে পথ চলা ও অপেক্ষা
“ফিরতে হ’লে বেলাবেলি হাঁটতে হবে / অনেকখানি। / বুক-পাঁজরের ঘেরাটোপে ফুর্কি মারে / আজব পাখি। / পক্ষী তুমি সবুর করো, / শ্যাম-প্রহরে ডোবার আগে, একটু শুধু / মেওয়া খাবো।”
দ্বিতীয় স্তবকে কবি ফিরতে হলে পথ চলা ও অপেক্ষার কথা বলছেন। ‘ফিরতে হলে বেলাবেলি হাঁটতে হবে অনেকখানি’ — ফিরতে হলে সময়মতো অনেক পথ হাঁটতে হবে। ‘বুক-পাঁজরের ঘেরাটোপে ফুর্কি মারে আজব পাখি’ — বুক-পাঁজরের ঘেরাটোপে (বুকের ভেতর) আজব পাখি ফুর্কি মারে (ফড়ফড় করে, ডানা ঝাপটায়)। ‘পক্ষী তুমি সবুর করো, শ্যাম-প্রহরে ডোবার আগে, একটু শুধু মেওয়া খাবো’ — পাখি তুমি সবুর করো, শ্যাম-প্রহরে (সন্ধ্যার সময়) ডোবার (ডুব দেওয়ার, মরার) আগে, একটু শুধু মেওয়া (ফল) খাবো।
তৃতীয় স্তবক: অসভ্যতা, প্রেম ও কালনাগিনীর বিষ
“শিরায় শিরায় এখনো তো রক্ত করে / অসভ্যতা। / বাচাল কণা খিস্তি করে হাফ গেরস্ত / প্রেমের টানে; / হঠাৎ দেখি চক্ষু টেপে / গন্ধবণিক কালাচাঁদের মিষ্টি মিষ্টি / হ্রস্ব পরী। / বিষ ছড়ালো কালনাগিনী বুকের ভেতর / কোন্ সকালে। / হচ্ছি কালো ক্রমাগত, অলক্ষুণে / বেলা বাড়ে। / সর্পিণী তুই কেমনতরো? / বিষ-ঝাড়ানো ওঝা ডেকে রক্ষা পাওয়া / কঠিন হলো।”
তৃতীয় স্তবকে কবি অসভ্যতা, প্রেম ও কালনাগিনীর বিষের কথা বলছেন। ‘শিরায় শিরায় এখনো তো রক্ত করে অসভ্যতা’ — শিরায় শিরায় এখনো অসভ্যতা রক্ত তৈরি করে। ‘বাচাল কণা খিস্তি করে হাফ গেরস্ত প্রেমের টানে’ — বাচাল কণা (কথা) খিস্তি (গালি) করে হাফ গেরস্ত (আধা-গেরস্থ, আধা-শিক্ষিত) প্রেমের টানে। ‘হঠাৎ দেখি চক্ষু টেপে গন্ধবণিক কালাচাঁদের মিষ্টি মিষ্টি হ্রস্ব পরী’ — হঠাৎ দেখি চোখ টিপে গন্ধবণিক (সুগন্ধি বিক্রেতা) কালাচাঁদের মিষ্টি মিষ্টি হ্রস্ব পরী (ছোট পরী)। ‘বিষ ছড়ালো কালনাগিনী বুকের ভেতর কোন্ সকালে’ — কালনাগিনী (কালো সাপ) বিষ ছড়ালো বুকের ভেতর কোন্ সকালে। ‘হচ্ছি কালো ক্রমাগত, অলক্ষুণে বেলা বাড়ে’ — হচ্ছি কালো ক্রমাগত, অলক্ষুণে (অমঙ্গল) বেলা বাড়ে। ‘সর্পিণী তুই কেমনতরো? বিষ-ঝাড়ানো ওঝা ডেকে রক্ষা পাওয়া কঠিন হলো’ — সর্পিণী তুই কেমনতরো? বিষ-ঝাড়ানো ওঝা ডেকে রক্ষা পাওয়া কঠিন হলো।
চতুর্থ স্তবক: কাঁটাতারে বিদ্ধ হওয়া ও রক্তধারায় জব্দ
“ছিলাম প’ড়ে কাঁটাতারে বিদ্ধ হ’য়ে / দিন-দুপুরে, / রাত-দুপুরে, মানে আমি সব দুপুরে / ছিলাম প’ড়ে। / বাঁচতে গিয়ে চেটেছিলাম / রুক্ষ ধুলো; জব্দ নিজের কষ-গড়ানো / রক্তধারায়।”
চতুর্থ স্তবকে কবি কাঁটাতারে বিদ্ধ হওয়ার কথা বলছেন। ‘ছিলাম প’ড়ে কांटাতারে বিদ্ধ হয়ে দিন-দুপুরে, রাত-দুপুরে, মানে আমি সব দুপুরে ছিলাম পড়ে’ — তিনি কাঁটাতারে বিদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন দিন-দুপুরে, রাত-দুপুরে, অর্থাৎ সব দুপুরে পড়েছিলেন। ‘বাঁচতে গিয়ে চেটেছিলাম রুক্ষ ধুলো; জব্দ নিজের কষ-গড়ানো রক্তধারায়’ — বাঁচতে গিয়ে চেটেছিলেন রুক্ষ ধুলো; জব্দ (অচল) নিজের কষ-গড়ানো (কষে গড়ানো, জমাট বাঁধা) রক্তধারায়।
পঞ্চম স্তবক: মগজে হাড় জমা, হৃদয়ে ঘর ধ্বংস
“ইতিমধ্যে এই মগজে, ক’খানা হাড় / জমা হলো? / ইতিমধ্যে এই হৃদয়ে, ক’খানা ঘর / ধ্বংস হলো? / শক্ত পাক্কা হিশাব পাওয়া। / টোক-ফর্দের পাতাগুলো কোন্ পাতালে / নিমজ্জিত?”
পঞ্চম স্তবকে কবি মগজে হাড় জমা ও হৃদয়ে ঘর ধ্বংসের কথা বলছেন। ‘ইতিমধ্যে এই মগজে, ক’খানা হাড় জমা হলো?’ — ইতিমধ্যে এই মগজে ক’খানা হাড় জমা হলো? ‘ইতিমধ্যে এই হৃদয়ে, ক’খানা ঘর ধ্বংস হলো?’ — ইতিমধ্যে এই হৃদয়ে ক’খানা ঘর ধ্বংস হলো? ‘শক্ত পাক্কা হিশাব পাওয়া’ — শক্ত পাকা হিসাব পাওয়া। ‘টোক-ফর্দের পাতাগুলো কোন্ পাতালে নিমজ্জিত?’ — টোক-ফর্দের (টোকা-ফর্দ, হিসাবের খাতা) পাতাগুলো কোন্ পাতালে নিমজ্জিত?
ষষ্ঠ স্তবক: গন্ধ ঘোরানো ও পদ্মকেশর ছড়ানোর আহ্বান
“তাল-সুপুরি গাছের নিচে, সন্ধ্যা নদীর / উদাস তীরে, / শান-বাঁধানো পথে পথে, বাস ডিপোতে, / টার্মিনালে, / কেমন একটা গন্ধ ঘোরে। / আর পারি না, দাও ছড়িয়ে পদ্মকেশর / বাংলাদেশে।”
ষষ্ঠ স্তবকে কবি গন্ধ ঘোরানো ও পদ্মকেশর ছড়ানোর কথা বলছেন। ‘তাল-সুপুরি গাছের নিচে, সন্ধ্যা নদীর উদাস তীরে, শান-বাঁধানো পথে পথে, বাস ডিপোতে, টার্মিনালে, কেমন একটা গন্ধ ঘোরে’ — সর্বত্র কেমন একটা গন্ধ ঘোরে। ‘আর পারি না, দাও ছড়িয়ে পদ্মকেশর বাংলাদেশে’ — আর পারি না, দাও ছড়িয়ে পদ্মকেশর (পদ্মের কেশর, সুন্দর ফুল) বাংলাদেশে।
সপ্তম স্তবক: ঘাতক সরে দাঁড়ানো ও গোলাপ নেওয়ার ঘোষণা
“ঘাতক তুমি সরে দাঁড়াও, এবার আমি / লাশ নেবো না। / নইতো আমি মুদ্দোফরাস। জীবন থেকে / সোনার মেডেল, শিউলি-ফোটা সকাল নেবো। / ঘাতক তুমি বাদ সেধো না, এবার আমি গোলাপ নেবো।”
সপ্তম স্তবকে কবি ঘাতক সরে দাঁড়ানো ও গোলাপ নেওয়ার ঘোষণা দিচ্ছেন। ‘ঘাতক তুমি সরে দাঁড়াও, এবার আমি লাশ নেবো না’ — ঘাতক তুমি সরে দাঁড়াও, এবার আমি লাশ নেবো না। ‘নইতো আমি মুদ্দোফরাস। জীবন থেকে সোনার মেডেল, শিউলি-ফোটা সকাল নেবো’ — নইলে আমি মুদ্দোফরাস (মামলা-মোকদ্দমা ফরাস, শেষ)। জীবন থেকে সোনার মেডেল, শিউলি-ফোটা সকাল নেবো। ‘ঘাতক তুমি বাদ সেধো না, এবার আমি গোলাপ নেবো’ — ঘাতক তুমি বাদ সেধো না (পাশে সরে যাও), এবার আমি গোলাপ নেবো।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি সাতটি স্তবকে বিভক্ত। প্রথম স্তবকে ঘাতক কাঁটা ফিরিয়ে নেওয়ার আহ্বান, দ্বিতীয় স্তবকে ফিরতে হলে পথ চলা ও অপেক্ষা, তৃতীয় স্তবকে অসভ্যতা, প্রেম ও কালনাগিনীর বিষ, চতুর্থ স্তবকে কাঁটাতারে বিদ্ধ হওয়া ও রক্তধারায় জব্দ, পঞ্চম স্তবকে মগজে হাড় জমা ও হৃদয়ে ঘর ধ্বংস, ষষ্ঠ স্তবকে গন্ধ ঘোরানো ও পদ্মকেশর ছড়ানোর আহ্বান, সপ্তম স্তবকে ঘাতক সরে দাঁড়ানো ও গোলাপ নেওয়ার ঘোষণা।
ভাষা সরল, প্রাঞ্জল, কিন্তু প্রতীকাত্মক ও বহুমাত্রিক। তিনি ব্যবহার করেছেন — ‘ঘাতক কাঁটা’, ‘গোলাপ’, ‘গুলবাগিচা’, ‘বুক-পাঁজরের ঘেরাটোপ’, ‘আজব পাখি’, ‘শ্যাম-প্রহর’, ‘মেওয়া’, ‘অসভ্যতা’, ‘বাচাল কণা’, ‘গন্ধবণিক কালাচাঁদ’, ‘হ্রস্ব পরী’, ‘কালনাগিনী’, ‘বিষ-ঝাড়ানো ওঝা’, ‘কাঁটাতারে বিদ্ধ’, ‘রক্তধারা’, ‘পদ্মকেশর’, ‘সোনার মেডেল’, ‘শিউলি-ফোটা সকাল’।
প্রতীক ব্যবহারে তিনি দক্ষ। ‘ঘাতক কাঁটা’ — স্বৈরাচার, নির্যাতন, মৃত্যু। ‘গোলাপ’ — সুন্দর, শান্তি, স্বাধীনতা। ‘গুলবাগিচা’ — ফুলের বাগান, শান্তির দেশ। ‘আজব পাখি’ — আশা, স্বপ্ন। ‘কালনাগিনী’ — স্বৈরাচার, বিষ, মৃত্যু। ‘বিষ-ঝাড়ানো ওঝা’ — মুক্তিদাতা, বিপ্লবী। ‘কাঁটাতারে বিদ্ধ’ — নির্যাতন, যন্ত্রণা। ‘পদ্মকেশর’ — সৌন্দর্য, শান্তি, বাংলাদেশের প্রতীক। ‘সোনার মেডেল’ — বিজয়, সাফল্য। ‘শিউলি-ফোটা সকাল’ — নতুন সকাল, নতুন শুরু।
পুনরাবৃত্তি শৈলী কবিতার সুর তৈরি করেছে। ‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, এবার আমি গোলাপ নেবো’ — প্রথম ও সপ্তম স্তবকের পুনরাবৃত্তি কবিতার মূল সুরকে জোরালো করেছে।
শেষের ‘ঘাতক তুমি বাদ সেধো না, এবার আমি গোলাপ নেবো’ — এটি অত্যন্ত শক্তিশালী সমাপ্তি। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ঘোষণা, মৃত্যুকে মেনে নিতে অস্বীকার, পুনর্জন্মের আহ্বান।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা” শামসুর রাহমানের এক অসাধারণ সৃষ্টি। কবি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ডাক দিয়েছেন। তিনি বলছেন — ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, এবার আমি গোলাপ নেবো। গুলবাগিচা বিরান বলে সবসময় ফিরে যাবো, তা হবে না। ফিরতে হলে সময়মতো অনেক পথ হাঁটতে হবে। বুকের ভেতর আজব পাখি ফুর্কি মারে, তাকে সবুর করতে হবে।
শিরায় শিরায় অসভ্যতা রক্ত তৈরি করে, বাচাল কণা খিস্তি করে প্রেমের টানে। কালনাগিনী বিষ ছড়ালো বুকের ভেতর। হচ্ছি কালো ক্রমাগত, অলক্ষুণে বেলা বাড়ে। বিষ-ঝাড়ানো ওঝা ডেকে রক্ষা পাওয়া কঠিন। তিনি কাঁটাতারে বিদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন সব দুপুরে। বাঁচতে গিয়ে চেটেছিলেন রুক্ষ ধুলো, জব্দ হয়েছিলেন নিজের রক্তধারায়।
ইতিমধ্যে মগজে ক’খানা হাড় জমা হলো, হৃদয়ে ক’খানা ঘর ধ্বংস হলো। শক্ত পাকা হিসাব পাওয়া। তাল-সুপুরি গাছের নিচে, সন্ধ্যা নদীর উদাস তীরে, সর্বত্র কেমন একটা গন্ধ ঘোরে। তিনি আর পারছেন না, দাও ছড়িয়ে পদ্মকেশর বাংলাদেশে।
শেষে তিনি ঘোষণা করছেন — ঘাতক তুমি সরে দাঁড়াও, এবার আমি লাশ নেবো না। নইলে আমি মুদ্দোফরাস। জীবন থেকে সোনার মেডেল, শিউলি-ফোটা সকাল নেবো। ঘাতক তুমি বাদ সেধো না, এবার আমি গোলাপ নেবো।
এই কবিতা আমাদের শেখায় — স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করতে হবে। মৃত্যুকে মেনে নিতে হবে না। ঘাতক কাঁটা ফিরিয়ে নিয়ে গোলাপ নিতে হবে। নতুন সকাল, নতুন জীবন, নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে হবে। এটি স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের এক অসাধারণ কাব্যচিত্র।
শামসুর রাহমানের কবিতায় স্বৈরাচার, প্রতিরোধ ও পুনর্জন্ম
শামসুর রাহমানের কবিতায় স্বৈরাচার ও প্রতিরোধ একটি পুনরাবৃত্ত বিষয়। তিনি ১৯৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সময় এই কবিতা রচনা করেছেন। ‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ।
তাঁর কবিতায় ‘গোলাপ’ একটি কেন্দ্রীয় প্রতীক — যা শান্তি, স্বাধীনতা, সৌন্দর্যের প্রতীক। ‘ঘাতক কাঁটা’ ফিরিয়ে নিয়ে গোলাপ নেওয়ার ঘোষণা — এটি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বিজয়ের ঘোষণা।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের উচ্চতর পাঠ্যক্রমে শামসুর রাহমানের ‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের স্বৈরাচার বিরোধী চেতনা, প্রতিরোধের ভাষা, প্রতীক ব্যবহারের কৌশল, এবং আধুনিক বাংলা কবিতার ধারা সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে।
ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা কবিতাটির লেখক কে?
এই কবিতাটির লেখক শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬)। তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃত। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’, ‘রৌদ্র করোটিতে’, ‘বিপুল বায়ুতে পারে’, ‘আসাদের শার্ট’, ‘বাংলা আমার বাংলা’, ‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা’।
প্রশ্ন ২: ‘ঘাতক কাঁটা’ ও ‘গোলাপ’ কী প্রতীক?
‘ঘাতক কাঁটা’ — স্বৈরাচার, নির্যাতন, মৃত্যু, শোষণ। ‘গোলাপ’ — সুন্দর, শান্তি, স্বাধীনতা, সৌন্দর্য, নতুন জীবন। কবি ঘাতক কাঁটা ফিরিয়ে নিয়ে গোলাপ নেওয়ার ঘোষণা দিচ্ছেন।
প্রশ্ন ৩: ‘বুক-পাঁজরের ঘেরাটোপে ফুর্কি মারে / আজব পাখি’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
বুকের ভেতর আজব পাখি ফুর্কি মারে (ফড়ফড় করে, ডানা ঝাপটায়) — এটি আশা, স্বপ্ন, প্রতিরোধের চেতনার প্রতীক।
প্রশ্ন ৪: ‘বিষ ছড়ালো কালনাগিনী বুকের ভেতর / কোন্ সকালে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
কালনাগিনী (কালো সাপ) — স্বৈরাচার, শোষণ, বিষ। তিনি কোন্ সকালে (কখন) বুকের ভেতর বিষ ছড়ালো — অর্থাৎ স্বৈরাচার কখন এসে দেশকে বিষাক্ত করলো।
প্রশ্ন ৫: ‘ছিলাম প’ড়ে কাঁটাতারে বিদ্ধ হ’য়ে / দিন-দুপুরে, / রাত-দুপুরে, মানে আমি সব দুপুরে / ছিলাম প’ড়ে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
কাঁটাতারে বিদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন — স্বৈরাচারের নির্যাতনে, যন্ত্রণায় পড়েছিলেন। সব দুপুরে — সব সময়, দিনরাত।
প্রশ্ন ৬: ‘দাও ছড়িয়ে পদ্মকেশর / বাংলাদেশে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
পদ্মকেশর — পদ্মের কেশর, সুন্দর ফুল, বাংলাদেশের প্রতীক। দাও ছড়িয়ে পদ্মকেশর বাংলাদেশে — অর্থাৎ বাংলাদেশে শান্তি, সৌন্দর্য, স্বাধীনতা ছড়িয়ে দাও।
প্রশ্ন ৭: ‘নইতো আমি মুদ্দোফরাস’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘মুদ্দোফরাস’ — মামলা-মোকদ্দমা ফরাস, শেষ, নিঃশেষ। তিনি বলছেন — নইলে আমি শেষ, আমি নিঃশেষ।
প্রশ্ন ৮: ‘জীবন থেকে / সোনার মেডেল, শিউলি-ফোটা সকাল নেবো’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
সোনার মেডেল — বিজয়, সাফল্য। শিউলি-ফোটা সকাল — নতুন সকাল, নতুন শুরু। তিনি জীবন থেকে বিজয় ও নতুন সকাল নেবেন।
প্রশ্ন ৯: ‘ঘাতক তুমি বাদ সেধো না, এবার আমি গোলাপ নেবো’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
ঘাতক তুমি পাশে সরে যাও, এবার আমি গোলাপ (শান্তি, স্বাধীনতা, সৌন্দর্য) নেবো। এটি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বিজয়ের ঘোষণা।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
কবিতাটি আমাদের শেখায় — স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করতে হবে। মৃত্যুকে মেনে নিতে হবে না। ঘাতক কাঁটা ফিরিয়ে নিয়ে গোলাপ নিতে হবে। নতুন সকাল, নতুন জীবন, নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে হবে। এটি স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের এক অসাধারণ কাব্যচিত্র।
ট্যাগস: ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, শামসুর রাহমান, শামসুর রাহমানের কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, স্বৈরাচার বিরোধী কবিতা, প্রতিরোধের কবিতা, পুনর্জন্মের কবিতা, ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের কবিতা, বাংলা কবিতা বিশ্লেষণ
© Kobitarkhata.com – কবি: শামসুর রাহমান | কবিতার প্রথম লাইন: “ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, / এবার আমি গোলাপ নেবো।” | স্বৈরাচার ও প্রতিরোধের কবিতা বিশ্লেষণ | আধুনিক বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন






