পল্লী জননী কবিতা – পল্লীকবি জসীম উদ্দীন | বাংলা কবিতা বিশ্লেষণ
পল্লী জননী কবিতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ
পল্লী জননী কবিতা বাংলা কাব্যসাহিত্যের একটি কালজয়ী ও হৃদয়স্পর্শী গ্রামীণ মহাকাব্য। পল্লীকবি জসীম উদ্দীন রচিত এই কবিতাটি বাংলার মাটি, মানুষ ও মায়ের অকৃত্রিম ভালবাসার এক অনবদ্য কাব্যিক চিত্রায়ণ। “রাত থম থম স্তব্ধ নিঝুম, ঘোর-ঘোর-আন্ধার, নিশ্বাস ফেলি, তাও শোনা যায়, নাই কোথা সাড়া কার” – এই গভীর রজনীর বর্ণনা দিয়ে শুরু হওয়া পল্লী জননী কবিতা পাঠককে সরাসরি বাংলার পল্লীজীবনের অন্তরঙ্গ ও মর্মস্পর্শী এক দৃশ্যের কেন্দ্রে নিয়ে যায়। পল্লী জননী কবিতা পড়লে মনে হয় যেন কবি শুধু কবিতা লিখেননি, সমগ্র বাংলার মাতৃরূপকে শব্দের মাধ্যমে অমর করে রেখেছেন। জসীম উদ্দীনের পল্লী জননী কবিতা বাংলা সাহিত্যে পল্লী কবিতার ধারায় একটি অমর সৃষ্টি হিসেবে স্বীকৃত।
পল্লী জননী কবিতার কাব্যিক বৈশিষ্ট্য
পল্লী জননী কবিতা একটি মহাকাব্যিক গাম্ভীর্য ও লোকজ সুরের অপূর্ব সমন্বয়ে রচিত অনন্য গ্রামীণ কবিতা। জসীম উদ্দীন এই কবিতায় প্রকৃতির সাথে মানবীয় আবেগের মিশ্রণ, মাতৃস্নেহের অতলস্পর্শী গভীরতা এবং গ্রাম বাংলার দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব চিত্র অঙ্কন করেছেন। “রুগ্ন ছেলের শিয়রে বসিয়া একেলা জাগিছে মাতা, করুণ চাহনি ঘুম ঘুম যেন ঢুলিছে চোখের পাতা” – পল্লী জননী কবিতাতে এই পংক্তির মাধ্যমে কবি মাতৃস্নেহের চিরন্তন রূপটিকে অবিস্মরণীয়ভাবে চিত্রিত করেছেন। জসীম উদ্দীনের পল্লী জননী কবিতাতে ভাষা অত্যন্ত মধুর ও ছন্দোময়, লোকজ শব্দের সাথে সাহিত্যিক ভাষার অপূর্ব সংমিশ্রণ। পল্লী জননী কবিতা পড়ার সময় প্রতিটি ছত্রে গ্রাম বাংলার প্রাণ, প্রকৃতি ও মানুষের জীবনের নতুন মাত্রার উন্মোচন দেখা যায়। জসীম উদ্দীনের পল্লী জননী কবিতা বাংলা কবিতার লোকজ চেতনা ও মানবিক আবেগের অনন্য প্রকাশ।
পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের কবিতার বৈশিষ্ট্য
পল্লীকবি জসীম উদ্দীন বাংলা সাহিত্যের এক কিংবদন্তি কবি যিনি তাঁর গ্রামীণ জীবনচিত্রণ, লোকজ উপাদানের ব্যবহার এবং মাতৃভূমির প্রতি গভীর অনুরাগের জন্য বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছেন। তাঁর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো বাংলার পল্লীজীবনের স্বাভাবিক চিত্রায়ণ, মাটি ও মানুষের সাথে আত্মিক সংযোগ এবং লোকসাহিত্যের ধারাকে আধুনিক কবিতায় সমন্বয় করা। জসীম উদ্দীনের পল্লী জননী কবিতা এই সকল গুণের পূর্ণ প্রকাশ। জসীম উদ্দীনের কবিতায় সাধারণ জীবন অসাধারণ কবিতায় রূপান্তরিত হয়, পল্লীর সরল মানুষ মহাকাব্যের নায়ক হয়ে ওঠে। জসীম উদ্দীনের পল্লী জননী কবিতাতে মাতৃস্নেহের এই কাব্যিক রূপায়ণ অসাধারণ দক্ষতায় অঙ্কিত হয়েছে। জসীম উদ্দীনের কবিতা বাংলা সাহিত্যকে নতুন লোকজ প্রাণশক্তি দান করেছে।
পল্লী জননী কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
পল্লী জননী কবিতার লেখক কে?
পল্লী জননী কবিতার লেখক পল্লীকবি জসীম উদ্দীন।
পল্লী জননী কবিতার মূল বিষয় কী?
পল্লী জননী কবিতার মূল বিষয় গ্রাম বাংলার এক গরীব মায়ের রুগ্ন সন্তানের শিয়রে জাগরণ, মাতৃস্নেহের চিরন্তন রূপ, দারিদ্র্যের মধ্যে মানবিক সম্পর্কের গভীরতা এবং গ্রামীণ জীবনের বাস্তব চিত্র।
পল্লীকবি জসীম উদ্দীন কে?
পল্লীকবি জসীম উদ্দীন বাংলা সাহিত্যের একজন প্রখ্যাত কবি ও লেখক যিনি তাঁর গ্রামীণ জীবনভিত্তিক কবিতা, লোকজ উপাদানের ব্যবহার এবং বাংলার পল্লীপ্রাণের চিত্রণের জন্য বাংলা সাহিত্যে অত্যন্ত সম্মানিত।
পল্লী জননী কবিতা কেন বিশেষ?
পল্লী জননী কবিতা বিশেষ কারণ এটি বাংলার পল্লীজীবনের হৃদয়গ্রাহী এক দৃশ্যকে এমন শিল্পিতভাবে চিত্রিত করেছে যে পাঠক সরাসরি সেই রাতের নির্জনতা, মায়ের চিন্তা ও রুগ্ন শিশুর কাতরতা অনুভব করতে পারে।
জসীম উদ্দীনের কবিতার বৈশিষ্ট্য কী?
জসীম উদ্দীনের কবিতার বৈশিষ্ট্য হলো গ্রাম বাংলার জীবনের স্বাভাবিক চিত্রণ, লোকজ ভাষা ও ছন্দের ব্যবহার, মাটি ও মানুষের প্রতি গভীর মমতা এবং সরল জীবনদর্শনের কাব্যিক প্রকাশ।
পল্লী জননী কবিতা কোন কাব্যগ্রন্থের অংশ?
পল্লী জননী কবিতা জসীম উদ্দীনের “সোজন বাদিয়ার ঘাট” বা তাঁর অন্যান্য কাব্যগ্রন্থের অংশ, যা বাংলার গ্রামীণ জীবন নিয়ে তাঁর কবিতাগুলি সংকলিত হয়েছে।
পল্লী জননী কবিতা থেকে কী শিক্ষা পাওয়া যায়?
পল্লী জননী কবিতা থেকে মাতৃস্নেহের গভীরতা, দারিদ্র্যের মধ্যেও মানবিক মূল্যবোধের অস্তিত্ব, ধর্মীয় বিশ্বাসের সহজ স্বরূপ এবং গ্রামীণ জীবনের সহজ-সরল সম্পর্কের শিক্ষা পাওয়া যায়।
জসীম উদ্দীনের অন্যান্য বিখ্যাত কবিতা কী কী?
জসীম উদ্দীনের অন্যান্য বিখ্যাত কবিতার মধ্যে রয়েছে “কবর”, “সোজন বাদিয়ার ঘাট”, “নকশী কাঁথার মাঠ”, “বালু চর”, “হাসু” প্রভৃতি।
পল্লী জননী কবিতা পড়ার সেরা সময় কখন?
পল্লী জননী কবিতা পড়ার সেরা সময় হলো যখন গ্রামীণ জীবন, মাতৃস্নেহের গভীরতা এবং বাংলার প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার ইচ্ছা থাকে।
পল্লী জননী কবিতা আধুনিক প্রেক্ষাপটে কতটা প্রাসঙ্গিক?
পল্লী জননী কবিতা আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, কারণ মাতৃস্নেহের চিরন্তন আবেদন, দারিদ্র্যের মধ্যে মানবিক সম্পর্কের মূল্য এবং গ্রামীণ জীবনের সরল সৌন্দর্য সকল যুগেই সমানভাবে প্রাসঙ্গিক থেকে যায়।
পল্লী জননী কবিতার গুরুত্বপূর্ণ লাইন বিশ্লেষণ
“রাত থম থম স্তব্ধ নিঝুম, ঘোর-ঘোর-আন্ধার” – কবিতার শুরুতে রাতের গভীর নির্জনতা ও অন্ধকারের শক্তিশালী চিত্রায়ণ যা সমগ্র কবিতার মর্মস্পর্শী পরিবেশ তৈরি করে।
“রুগ্ন ছেলের শিয়রে বসিয়া একেলা জাগিছে মাতা” – কবিতার কেন্দ্রীয় চিত্র ও মাতৃস্নেহের চিরন্তন দৃশ্য।
“তারি সাথে সাথে বিরহী মায়ের একেলা পরাণ দোলে” – মায়ের একাকীত্ব ও চিন্তার অন্তর্নিহিত ছন্দ।
“শিয়রে বসিয়া মনে মনে মাতা গণিছে ছেলের আয়ু” – মায়ের গভীর উদ্বেগ ও আশঙ্কার মর্মস্পর্শী প্রকাশ।
“ছেলে কয়, ‘মারে, কত রাত আছে? কখন সকাল হবে'” – রুগ্ন শিশুর কাতরতা ও ধৈর্যের সীমা সম্পর্কে প্রশ্ন।
“নামাজের ঘরে মোমবাতি মানে, দরগায় মানে দান, ছেলেরে তাহার ভাল কোরেদাও” – গ্রামীণ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রার্থনার সরল রূপ।
“আল্লা রছুল। ভাল কোরে দাও পীর” – ইসলামী সমাজের ধর্মীয় আবেগ ও বিশ্বাসের প্রকাশ।
“বালাই, বালাই, ভালো হবে যাদু মনে মনে জালবোনে” – লোকজ বিশ্বাস ও অশুভ শক্তির ভয়।
“ছেলে চুপ করে, মাও ধীরে ধীরে মাথায় বুলায় হাত” – মাতৃস্নেহের নিঃশব্দ ও মর্মস্পর্শী প্রকাশ।
“রুগ্ন ছেলের শিয়রে বসিয়া কত কথা পড়ে মনে” – মায়ের স্মৃতিচারণ ও অতীতের দিকে মনোযোগ।
“আজও রোগে তার পথ্য জোটেনি, ওষুধ হয়নি আনা” – দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতা ও গরীব পরিবারের সংগ্রাম।
“ঝড়ে কাঁপে যেন নীড়ের পাখিটি জড়ায়ে মায়ের ডানা” – মায়ের সুরক্ষা ও আশ্রয়ের সুন্দর রূপক।
“আঁধারের সাথে যুঝিয়া তাহার ফুরায়ে এসেছে তেল” – কবিতার সমাপ্তিতে প্রদীপের তেল ফুরানোর মাধ্যমে জীবন ও আশার ক্ষয়িষ্ণু অবস্থার রূপক।
পল্লী জননী কবিতার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য
পল্লী জননী কবিতা শুধু একটি কবিতা নয়, এটি বাংলার গ্রামীণ জীবন, সংস্কৃতি ও সমাজের একটি জীবন্ত দলিল। জসীম উদ্দীন এই কবিতায় বাংলার পল্লীজীবনের চারটি মৌলিক দিক উপস্থাপন করেছেন: ১) দারিদ্র্যের মধ্যেও অটুট মানবিক সম্পর্ক, ২) ধর্মীয় বিশ্বাস ও লোকজ সংস্কৃতির সমন্বয়, ৩) মাতৃস্নেহের চিরন্তন ও সর্বজনীন রূপ, ৪) প্রকৃতি ও মানুষের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। পল্লী জননী কবিতা পড়লে বোঝা যায় যে জসীম উদ্দীনের দৃষ্টিতে বাংলার পল্লীজীবন দারিদ্র্যে পূর্ণ হলেও মানবিকতায় সমৃদ্ধ। কবিতায় “রুগ্ন ছেলে” শুধু একটি শিশু নয়, তিনি বাংলার সমস্ত দরিদ্র শিশুর প্রতিনিধি। “মাটির প্রদীপ” শুধু আলোর উৎস নয়, তিনি দারিদ্র্যের মধ্যে টিকে থাকা আশা ও জীবনশক্তির প্রতীক। কবিতার ধর্মীয় প্রার্থনা “আল্লা রছুল। ভাল কোরে দাও পীর” শুধু ইসলামী বিশ্বাস নয়, তিনি দরিদ্র মানুষের ঈশ্বরের উপর নির্ভরতা ও আশার প্রতীক। কবিতার শেষে “আঁধারের সাথে যুঝিয়া তাহার ফুরায়ে এসেছে তেল” এই শক্তিশালী রূপক গভীর সাংস্কৃতিক তাৎপর্য বহন করে – এটি জীবন সংগ্রাম, আশার ক্ষয় ও অস্তিত্বের লড়াইয়ের প্রতীক। জসীম উদ্দীনের পল্লী জননী কবিতাতে বাংলার গ্রামীণ সমাজের এই মৌলিক সত্যগুলি অসাধারণভাবে ফুটে উঠেছে।
পল্লী জননী কবিতায় প্রতীক ও রূপকের ব্যবহার
জসীম উদ্দীনের পল্লী জননী কবিতাতে বিভিন্ন শক্তিশালী প্রতীক ও লোকজ রূপক ব্যবহৃত হয়েছে। “পল্লী জননী” শুধু একজন মা নয়, তিনি সমগ্র বাংলার মাতৃরূপ, গ্রামীণ জীবন ও লোকসংস্কৃতির প্রতীক। “ঘোর-ঘোর-আন্ধার” শুধু রাতের অন্ধকার নয়, তিনি দারিদ্র্য, অসুস্থতা ও অনিশ্চয়তার প্রতীক। “মাটির প্রদীপ” দারিদ্র্যের মধ্যে আশা, জীবনশক্তি ও সংগ্রামের প্রতীক। “বুনো মশক” প্রকৃতির কণ্টক, অসুবিধা ও গ্রামীণ জীবনের চ্যালেঞ্জের প্রতীক। “জোনাকী আলো” ক্ষীণ আশা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও অন্ধকারে আলোর প্রতীক। “নিবু নিবু দীপ” ক্ষয়িষ্ণু জীবন, ফুরিয়ে আসা শক্তি ও লুপ্তপ্রায় আশার প্রতীক। “ভুতুম পাখি” অশুভ সংকেত, মৃত্যুর আগমনী ও লোকজ ভীতির প্রতীক। “মায়ের ডানা” সুরক্ষা, আশ্রয় ও মাতৃস্নেহের প্রতীক। “আঁধারের সাথে যুঝিয়া” জীবন সংগ্রাম, অস্তিত্বের লড়াই ও প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রতীক। এই সকল প্রতীক ও রূপক পল্লী জননী কবিতাকে একটি সরল বর্ণনামূলক কবিতার স্তর অতিক্রম করে গভীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অর্থময়তা দান করেছে।
পল্লী জননী কবিতা পড়ার সঠিক পদ্ধতি
- পল্লী জননী কবিতা প্রথমে সম্পূর্ণভাবে একবার পড়ুন
- কবিতার পরিবেশ বর্ণনা ও মর্মস্পর্শী দৃশ্যচিত্রণের দিকে মনোযোগ দিন
- কবিতার লোকজ ভাষা, ছন্দ ও গ্রামীণ শব্দের ব্যবহার লক্ষ্য করুন
- মাতা ও পুত্রের সংলাপের মাধ্যমে প্রকাশিত আবেগ বিশ্লেষণ করুন
- কবিতার প্রতীকী অর্থ ও রূপকগুলো বুঝতে চেষ্টা করুন
- বাংলার গ্রামীণ জীবনের নিজের অভিজ্ঞতা বা জ্ঞানের সাথে কবিতার বিষয়বস্তুর সংযোগ খুঁজুন
- মাতৃস্নেহের সর্বজনীন রূপের সাথে কবিতার বিষয়বস্তুর সংযোগ খুঁজুন
- কবিতার শেষের শক্তিশালী রূপকের দার্শনিক ও জীবনদর্শনগত তাৎপর্য নিয়ে চিন্তা করুন
- কবিতাটি নিয়ে অন্যদের সাথে গভীর আলোচনা করুন
জসীম উদ্দীনের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কবিতা
- কবর
- সোজন বাদিয়ার ঘাট
- নকশী কাঁথার মাঠ
- বালু চর
- হাসু
- ধানক্ষেত
- পল্লী জননী
- মা
- গ্রাম বাংলা
- লোকজ কবিতা
পল্লী জননী কবিতা নিয়ে শেষ কথা
পল্লী জননী কবিতা বাংলা সাহিত্যের একটি অমর ও হৃদয়স্পর্শী রত্ন। পল্লীকবি জসীম উদ্দীন রচিত এই কবিতাটি গ্রামীণ কবিতা ও মাতৃস্নেহের কবিতার ইতিহাসে একটি স্বর্ণাক্ষরে লিখিত সৃষ্টি। পল্লী জননী কবিতা পড়লে পাঠক বুঝতে পারেন কিভাবে কবিতা শুধু শিল্প নয়, একটি সম্পূর্ণ সভ্যতা ও সংস্কৃতির দর্পণ হতে পারে। জসীম উদ্দীনের পল্লী জননী কবিতা বিশেষভাবে সকল যুগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মাতৃস্নেহ, দারিদ্র্যের মধ্যে মানবিকতা এবং গ্রামীণ জীবনের সরল সৌন্দর্য চিরন্তন মূল্যবোধ। পল্লী জননী কবিতা সকলের পড়া উচিত যারা কবিতার মাধ্যমে বাংলার মাটি, মানুষ ও সংস্কৃতির গভীরে প্রবেশ করতে চান। জসীম উদ্দীনের পল্লী জননী কবিতা timeless, এর আবেদন চিরন্তন ও সর্বজনীন।
ট্যাগস: পল্লী জননী কবিতা, পল্লী জননী কবিতা বিশ্লেষণ, পল্লীকবি জসীম উদ্দীন, জসীম উদ্দীনের কবিতা, বাংলা পল্লী কবিতা, গ্রামীণ কবিতা, লোকজ কবিতা, মাতৃস্নেহের কবিতা, বাংলা সাহিত্য, গ্রাম বাংলার কবিতা
রাত থম থম স্তব্ধ নিঝুম, ঘোর-ঘোর-আন্ধার,
নিশ্বাস ফেলি, তাও শোনা যায়, নাই কোথা সাড়া কার।
রুগ্ন ছেলের শিয়রে বসিয়া একেলা জাগিছে মাতা,
করুণ চাহনি ঘুম ঘুম যেন ঢুলিছে চোখের পাতা।
শিয়রের কাছে নিবু নিবু দীপ ঘুরিয়া ঘুরিয়া জ্বলে,
তারি সাথে সাথে বিরহী মায়ের একেলা পরাণ দোলে।
ভন্ ভন্ ভন্ জমাট বেঁধেছে বুনো মশকের গান,
এঁদো ডোবা হতে বহিছে কঠোর পচান পাতার ঘ্রাণ?
ছোট কুঁড়ে ঘর, বেড়ার ফাঁকেতে আসিছে শীতের বায়ু,
শিয়রে বসিয়া মনে মনে মাতা গণিছে ছেলের আয়ু।
ছেলে কয়, “মারে, কত রাত আছে? কখন সকাল হবে,
ভাল যে লাগে না, এমনি করিয়া কেবা শুয়ে থাকে কবে?”
মা কয়“বাছারে ! চুপটি করিয়া ঘুমা ত একটি বার, ”
ছেলে রেগে কয় “ঘুম যেআসে না কি করিব আমি তার ?”
পান্ডুর গালে চুমো খায় মাতা, সারা গায়ে দেয় হাত,
পারে যদি বুকে যত স্নেহ আছে ঢেলে দেয় তারি সাথ।
নামাজের ঘরে মোমবাতি মানে, দরগায় মানে দান,
ছেলেরে তাহার ভাল কোরেদাও, কাঁদে জননীর প্রাণ।
ভাল করে দাও আল্লা রছুল। ভাল কোরে দাও পীর।
কহিতে কহিতে মুখখানি ভাসে বহিয়া নয়ন নীর।
বাঁশবনে বসি ডাকে কানা কুয়ো,রাতের আঁধার ঠেলি,
বাদুড় পাখার বাতাসেতে পড়ে সুপারীর বন হেলি।
চলে বুনোপথে জোনাকী মেয়েরা কুয়াশা কাফন ধরি,
দুর ছাই। কিবা শঙ্কায় মার পরাণ উঠিছে ভরি।
যে কথা ভাবিতে পরাণ শিহরে তাই ভাসে হিয়া কোণে,
বালাই, বালাই, ভালো হবে যাদু মনে মনে জালবোনে।
ছেলে কয়, “মাগো! পায়ে পড়ি বলো ভাল যদি হই কাল,
করিমের সাথে খেলিবারে গেলে দিবে না ত তুমি গাল?
আচ্ছা মা বলো, এমন হয় না রহিম চাচার ঝাড়া
এখনি আমারে এত রোগ হোতে করিতে পারি ত খাড়া ?”
মা কেবল বসি রুগ্ন ছেলের মুখ পানে আঁখি মেলে,
ভাসাভাসা তার যত কথা যেন সারা প্রাণ দিয়ে গেলে।
“শোন মা! আমার লাটাই কিন্তু রাখিও যতন করে,
রাখিও ঢ্যাঁপের মোয়া বেঁধে তুমি সাত-নরি শিকা পরে।
খেজুরে-গুড়ের নয়া পাটালিতে হুড়ুমের কোলা ভরে,
ফুলঝুরি সিকা সাজাইয়া রেখো আমার সমুখ পরে।”
ছেলে চুপ করে, মাও ধীরে ধীরে মাথায় বুলায় হাত,
বাহিরেতে নাচে জোনাকী আলোয় থম থম কাল রাত।
রুগ্ন ছেলের শিয়রে বসিয়া কত কথা পড়ে মনে,
কোন দিন সে যে মায়েরে না বলে গিয়াছিল দুর বনে।
সাঁঝ হোয়ে গেল আসেনাকো আই-ঢাই মার প্রাণ,
হঠাৎ শুনিল আসিতেছে ছেলেহর্ষে করিয়া গান।
এক কোঁচ ভরা বেথুল তাহার ঝামুর ঝুমুর বাজে,
ওরে মুখপোড়া কোথা গিয়াছিলি এমনি এ কালি-সাঁঝে?
কত কথা আজ মনে পড়ে মার, গরীবের ঘর তার,
ছোট খাট কত বায়না ছেলের পারে নাই মিটাবার।
আড়ঙের দিনে পুতুল কিনিতে পয়সা জোটেনি তাই,
বলেছে আমরা মুসলমানের আড়ঙ দেখিতে নাই।
করিম যে গেল? রহিম চলিল? এমনি প্রশ্ন-মালা;
উত্তর দিতে দুখিনী মায়ের দ্বিগুণ বাড়িত জ্বালা।
আজও রোগে তার পথ্য জোটেনি, ওষুধ হয়নি আনা,
ঝড়ে কাঁপে যেন নীড়ের পাখিটি জড়ায়ে মায়ের ডানা।
ঘরের চালেতে ভুতুম ডাকিছে, অকল্যাণ এ সুর,
মরণের দুত এল বুঝি হায়। হাঁকে মায়, দুর-দুর।
পচা ডোবা হতে বিরহিনী ডা’ক ডাকিতেছে ঝুরি ঝুরি,
কৃষাণ ছেলেরা কালকে তাহার বাচ্চা করেছে চুরি।
ফেরে ভন্ ভন্ মশা দলে দলে বুড়ো পাতা ঝরে বনে,
ফোঁটায় ফোঁটায় পাতা-চোঁয়াজল গড়াইছে তার সনে।
রুগ্ন ছেলের শিয়রে বসিয়া একেলা জাগিছে মাতা।
সম্মুখে তার ঘোর কুজঝটি মহা-কাল-রাত পাতা।
পার্শ্বে জ্বলিয়া মাটির প্রদীপ বাতাসে জমায় খেল,
আঁধারের সাথে যুঝিয়া তাহার ফুরায়ে এসেছে তেল।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। পল্লীকবি জসীমউদ্দীন।