কবিতার খাতা
পণ্ডশ্রম – শামসুর রহমান।
এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,
চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।
কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতারবিলে,
আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।
দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা গেল উড়ে,
কান না পেলে চার দেয়ালে মরব মাথা খুঁড়ে।
কান গেলে আর মুখের পাড়ায় থাকল কি-হে বল?
কানের শোকে আজকে সবাই মিটিং করি চল।
যাচ্ছে, গেল সবই গেল, জাত মেরেছে চিলে,
পাঁজি চিলের ভূত ছাড়াব লাথি-জুতো কিলে।
সুধী সমাজ! শুনুন বলি, এই রেখেছি বাজি,
যে-জন সাধের কান নিয়েছে জান নেব তার আজই।
মিটিং হল ফিটিং হল, কান মেলে না তবু,
ডানে-বাঁয়ে ছুটে বেড়াই মেলান যদি প্রভু!
ছুটতে দেখে ছোট ছেলে বলল, কেন মিছে
কানের খোঁজে মরছ ঘুরে সোনার চিলের পিছে?
নেইকো খালে, নেইকো বিলে, নেইকো মাঠে গাছে;
কান যেখানে ছিল আগে সেখানটাতেই আছে।
ঠিক বলেছে, চিল তবে কি নয়কো কানের যম?
বৃথাই মাথার ঘাম ফেলেছি, পণ্ড হল শ্রম।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। শামসুর রহমান।
পণ্ডশ্রম – শামসুর রাহমান | পণ্ডশ্রম কবিতা শামসুর রাহমান | শামসুর রাহমানের কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা | বিদ্রূপাত্মক কবিতা | সামাজিক সমালোচনার কবিতা
পণ্ডশ্রম: শামসুর রাহমানের বিদ্রূপ, বাস্তবতা ও বৃথা চেষ্টার অসাধারণ কাব্যভাষা
শামসুর রাহমানের “পণ্ডশ্রম” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য ও বিদ্রূপাত্মক রম্য কবিতা। “এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে, / চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে। / কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতারবিলে, / আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে একটি চিলের কাছে কান হারানোর ঘটনা, সেই কানের খোঁজে সমাজের সব স্তরের মানুষের বৃথা চেষ্টা, এবং শেষ পর্যন্ত এক ছোট ছেলের বুদ্ধিতে সব ভুল ভাঙার এক গভীর ও বহুমাত্রিক কাব্যচিত্র। শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬) ছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃত। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় নিজস্ব ভাষাভঙ্গি ও বিষয়বৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত। “পণ্ডশ্রম” তাঁর সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি একটি হাস্যরসাত্মক ঘটনার মধ্য দিয়ে সমাজের অন্ধ অনুকরণ, বৃথা চেষ্টা, এবং বাস্তবতা থেকে পালানোর প্রবণতাকে বিদ্রূপাত্মকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
শামসুর রাহমান: আধুনিক বাংলা কবিতার পুরোধা ও জাতীয় কবি
শামসুর রাহমান ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি কবিতা চর্চা শুরু করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম পুরোধা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ (১৯৬০), ‘রৌদ্র করোটিতে’ (১৯৬৩), ‘বিপুল বায়ুতে পারে’ (১৯৬৯), ‘আসাদের শার্ট’ (১৯৭০), ‘বাংলা আমার বাংলা’ (১৯৭২), ‘স্বপ্ন ও অন্যান্য’ (১৯৭৮), ‘আমার প্রেমের কবিতা’ (১৯৮৫), ‘পণ্ডশ্রম’ (১৯৯০) সহ আরও অসংখ্য গ্রন্থ। তিনি ২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন।
শামসুর রাহমানের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো প্রেম ও রাজনীতির অনন্য মিশ্রণ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার গভীর উপলব্ধি, প্রতীক ব্যবহারের দক্ষতা, এবং সরল-প্রাঞ্জল ভাষায় গভীর অর্থ সৃষ্টির ক্ষমতা। ‘পণ্ডশ্রম’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি হাস্যরসাত্মক আখ্যানের মধ্য দিয়ে সামাজিক বিদ্রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন।
পণ্ডশ্রম: শিরোনামের তাৎপর্য ও কবিতার পটভূমি
শিরোনাম ‘পণ্ডশ্রম’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘পণ্ডশ্রম’ অর্থ বৃথা শ্রম, নিষ্ফল চেষ্টা। কবি এই কবিতায় একটি চিলের কাছে কান হারানোর ঘটনা এবং সেই কানের খোঁজে সমাজের সব স্তরের মানুষের বৃথা চেষ্টার কথা বলেছেন। শেষ পর্যন্ত এক ছোট ছেলে বলে দেয় — কান যেখানে ছিল সেখানটাতেই আছে। অর্থাৎ তারা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানেই কান আছে। কিন্তু তারা তা দেখতে পায়নি।
কবি শুরুতে বলছেন — এই নিয়েছে ঐ নিল যা! কান নিয়েছে চিলে। চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে। কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতারবিলে। আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।
দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা গেল উড়ে। কান না পেলে চার দেয়ালে মরব মাথা খুঁড়ে। কান গেলে আর মুখের পাড়ায় থাকল কি-হে বল? কানের শোকে আজকে সবাই মিটিং করি চল।
যাচ্ছে, গেল সবই গেল, জাত মেরেছে চিলে। পাঁজি চিলের ভূত ছাড়াব লাথি-জুতো কিলে। সুধী সমাজ! শুনুন বলি, এই রেখেছি বাজি। যে-জন সাধের কান নিয়েছে জান নেব তার আজই।
মিটিং হল ফিটিং হল, কান মেলে না তবু। ডানে-বাঁয়ে ছুটে বেড়াই মেলান যদি প্রভু! ছুটতে দেখে ছোট ছেলে বলল, কেন মিছে কানের খোঁজে মরছ ঘুরে সোনার চিলের পিছে? নেইকো খালে, নেইকো বিলে, নেইকো মাঠে গাছে; কান যেখানে ছিল আগে সেখানটাতেই আছে।
শেষে কবি বলছেন — ঠিক বলেছে, চিল তবে কি নয়কো কানের যম? বৃথাই মাথার ঘাম ফেলেছি, পণ্ড হল শ্রম।
পণ্ডশ্রম: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: কান নিয়ে যাওয়া চিলের পিছনে ছুটোছুটি
“এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে, / চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে। / কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতারবিলে, / আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।”
প্রথম স্তবকে কবি কান নিয়ে যাওয়া চিলের পিছনে ছুটোছুটির কথা বলছেন। ‘এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে’ — এই নিল, ওই নিল, কান নিয়ে গেল চিলে। ‘চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে’ — চিলের পিছে আমরা সবাই মিলে ঘুরে মরছি। ‘কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতারবিলে’ — কানের খোঁজে মাঠে ছুটছি, সাঁতারবিলে কাটছি। ‘আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে’ — আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ঢিল মেরে ফেলব।
দ্বিতীয় স্তবক: কানের শোকে মিটিং ও কান না পেলে মাথা খুঁড়ে মরা
“দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা গেল উড়ে, / কান না পেলে চার দেয়ালে মরব মাথা খুঁড়ে। / কান গেলে আর মুখের পাড়ায় থাকল কি-হে বল? / কানের শোকে আজকে সবাই মিটিং করি চল।”
দ্বিতীয় স্তবকে কবি কানের শোকে মিটিং ও কান না পেলে মাথা খুঁড়ে মরার কথা বলছেন। ‘দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা গেল উড়ে’ — দিন-দুপুরে জীবন্ত কানটা উড়ে গেল। ‘কান না পেলে চার দেয়ালে মরব মাথা খুঁড়ে’ — কান না পেলে চার দেয়ালে মাথা খুঁড়ে মরব। ‘কান গেলে আর মুখের পাড়ায় থাকল কি-হে বল?’ — কান গেলে আর মুখের পাড়ায় (মুখের কাছে) কী থাকে বলো? ‘কানের শোকে আজকে সবাই মিটিং করি চল’ — কানের শোকে আজকে সবাই মিটিং করি চল।
তৃতীয় স্তবক: চিলের ভূত ছাড়ানো ও সুধী সমাজের কাছে বাজি
“যাচ্ছে, গেল সবই গেল, জাত মেরেছে চিলে, / পাঁজি চিলের ভূত ছাড়াব লাথি-জুতো কিলে। / সুধী সমাজ! শুনুন বলি, এই রেখেছি বাজি, / যে-জন সাধের কান নিয়েছে জান নেব তার আজই।”
তৃতীয় স্তবকে কবি চিলের ভূত ছাড়ানো ও সুধী সমাজের কাছে বাজির কথা বলছেন। ‘যাচ্ছে, গেল সবই গেল, জাত মেরেছে চিলে’ — যাচ্ছে, গেল সবই গেল, জাত মেরেছে চিলে। ‘পাঁজি চিলের ভূত ছাড়াব লাথি-জুতো কিলে’ — পাঁজি (চিলের নাম?) চিলের ভূত ছাড়াব লাথি-জুতো কিলে। ‘সুধী সমাজ! শুনুন বলি, এই রেখেছি বাজি’ — সুধী সমাজ! শুনুন বলি, এই রেখেছি বাজি। ‘যে-জন সাধের কান নিয়েছে জান নেব তার আজই’ — যে-জন সাধের কান নিয়েছে, জান নেব তার আজই।
চতুর্থ স্তবক: মিটিং-ফিটিং হলেও কান মেলে না ও ছোট ছেলের বুদ্ধি
“মিটিং হল ফিটিং হল, কান মেলে না তবু, / ডানে-বাঁয়ে ছুটে বেড়াই মেলান যদি প্রভু! / ছুটতে দেখে ছোট ছেলে বলল, কেন মিছে / কানের খোঁজে মরছ ঘুরে সোনার চিলের পিছে? / নেইকো খালে, নেইকো বিলে, নেইকো মাঠে গাছে; / কান যেখানে ছিল আগে সেখানটাতেই আছে।”
চতুর্থ স্তবকে কবি মিটিং-ফিটিং হলেও কান মেলে না ও ছোট ছেলের বুদ্ধির কথা বলছেন। ‘মিটিং হল ফিটিং হল, কান মেলে না তবু’ — মিটিং হল, ফিটিং হল, তবু কান মেলে না। ‘ডানে-বাঁয়ে ছুটে বেড়াই মেলান যদি প্রভু!’ — ডানে-বাঁয়ে ছুটে বেড়াই, মেলান যদি প্রভু! ‘ছুটতে দেখে ছোট ছেলে বলল, কেন মিছে কানের খোঁজে মরছ ঘুরে সোনার চিলের পিছে?’ — ছুটতে দেখে ছোট ছেলে বলল, কেন মিছে কানের খোঁজে মরছ ঘুরে সোনার চিলের পিছে? ‘নেইকো খালে, নেইকো বিলে, নেইকো মাঠে গাছে; কান যেখানে ছিল আগে সেখানটাতেই আছে’ — নেইকো খালে, নেইকো বিলে, নেইকো মাঠে গাছে; কান যেখানে ছিল আগে সেখানটাতেই আছে।
পঞ্চম স্তবক: বৃথা শ্রমের স্বীকারোক্তি
“ঠিক বলেছে, চিল তবে কি নয়কো কানের যম? / বৃথাই মাথার ঘাম ফেলেছি, পণ্ড হল শ্রম।”
পঞ্চম স্তবকে কবি বৃথা শ্রমের স্বীকারোক্তি দিচ্ছেন। ‘ঠিক বলেছে, চিল তবে কি নয়কো কানের যম?’ — ঠিক বলেছে, চিল তবে কি কানের যম (মৃত্যু) নয়? ‘বৃথাই মাথার ঘাম ফেলেছি, পণ্ড হল শ্রম’ — বৃথাই মাথার ঘাম ফেলেছি, পণ্ড হল শ্রম (শ্রম বৃথা গেল)।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি পাঁচটি স্তবকে বিভক্ত। প্রথম স্তবকে কান নিয়ে যাওয়া চিলের পিছনে ছুটোছুটি, দ্বিতীয় স্তবকে কানের শোকে মিটিং, তৃতীয় স্তবকে চিলের ভূত ছাড়ানো ও সুধী সমাজের কাছে বাজি, চতুর্থ স্তবকে মিটিং-ফিটিং হলেও কান মেলে না ও ছোট ছেলের বুদ্ধি, পঞ্চম স্তবকে বৃথা শ্রমের স্বীকারোক্তি।
ভাষা সরল, প্রাঞ্জল, ছন্দোময়, গেয়তার সাথে স্মরণীয়। তিনি ব্যবহার করেছেন — ‘কান নিয়েছে চিলে’, ‘চিলের পিছে মরছি ঘুরে’, ‘সাঁতারবিল’, ‘পেড়ে ঢিলে’, ‘মাথা খুঁড়ে’, ‘মিটিং করি চল’, ‘জাত মেরেছে’, ‘পাঁজি চিলের ভূত’, ‘লাথি-জুতো কিলে’, ‘সুধী সমাজ’, ‘বাজি’, ‘জান নেব’, ‘মিটিং ফিটিং’, ‘সোনার চিল’, ‘কানের যম’, ‘পণ্ড শ্রম’।
প্রতীক ব্যবহারে তিনি দক্ষ। ‘কান’ — শ্রবণশক্তি, বুদ্ধি, সত্য জানার ক্ষমতা, দিকনির্দেশনা। ‘চিল’ — বিপদ, বিভ্রম, ভুল পথে নিয়ে যাওয়া শক্তি। ‘মাঠে-বিলে-খালে ছুটোছুটি’ — বৃথা চেষ্টা, অন্ধ অনুকরণ। ‘মিটিং’ — আনুষ্ঠানিকতা, বাস্তব সমাধান নয়। ‘ছোট ছেলে’ — সরল বুদ্ধি, বাস্তব সত্য। ‘সোনার চিল’ — বিভ্রম, মায়া। ‘কানের যম’ — মৃত্যুর মতো বিপদ।
পুনরাবৃত্তি শৈলী কবিতার সুর তৈরি করেছে। ‘নেইকো খালে, নেইকো বিলে, নেইকো মাঠে গাছে’ — এই পুনরাবৃত্তি বৃথা চেষ্টার ব্যাপকতা নির্দেশ করে।
শেষের ‘বৃথাই মাথার ঘাম ফেলেছি, পণ্ড হল শ্রম’ — এটি অত্যন্ত শক্তিশালী সমাপ্তি। সমস্ত বৃথা চেষ্টার স্বীকারোক্তি।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“পণ্ডশ্রম” শামসুর রাহমানের এক অসাধারণ সৃষ্টি। কবি একটি হাস্যরসাত্মক ঘটনার মধ্য দিয়ে সমাজের অন্ধ অনুকরণ, বৃথা চেষ্টা, এবং বাস্তবতা থেকে পালানোর প্রবণতাকে বিদ্রূপাত্মকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। একটি চিল কান নিয়ে উড়ে গেছে। সবাই মিলে চিলের পিছনে ছুটছে — মাঠে, বিলে, খালে। তারা মিটিং করছে, বাজি রাখছে, চিলের ভূত ছাড়াতে লাথি-জুতো কিলে প্রস্তুত। কিন্তু কান মেলে না।
শেষ পর্যন্ত এক ছোট ছেলে বলে — কেন মিছে কানের খোঁজে মরছ ঘুরে সোনার চিলের পিছে? নেইকো খালে, নেইকো বিলে, নেইকো মাঠে গাছে; কান যেখানে ছিল আগে সেখানটাতেই আছে। অর্থাৎ তারা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানেই কান আছে। কিন্তু তারা তা দেখতে পায়নি।
এই কবিতা আমাদের শেখায় — আমরা প্রায়ই অন্ধভাবে অন্যের পিছনে ছুটে বৃথা শ্রম করি। আমরা বাইরে কোথাও সমাধান খুঁজি, অথচ সমাধান আমাদের কাছেই থাকে। ছোট ছেলেটির মতো সরল বুদ্ধি আমাদের শেখায় — আমরা যেখানে আছি, সেখানেই উত্তর আছে। বৃথা পণ্ডশ্রম না করে নিজের দিকে তাকানো উচিত।
শামসুর রাহমানের কবিতায় বিদ্রূপ, রম্যরস ও সামাজিক সমালোচনা
শামসুর রাহমানের কবিতায় বিদ্রূপ ও রম্যরস একটি পুনরাবৃত্ত বিষয়। তিনি ‘পণ্ডশ্রম’ কবিতায় একটি হাস্যরসাত্মক আখ্যানের মধ্য দিয়ে সমাজের অন্ধ অনুকরণ ও বৃথা চেষ্টার বিরুদ্ধে তীক্ষ্ণ বিদ্রূপ করেছেন।
তাঁর কবিতায় ‘ছোট ছেলে’ একটি কেন্দ্রীয় চরিত্র — যা সরল বুদ্ধি, বাস্তব সত্য, এবং জটিলতার বিরুদ্ধে সরলতার প্রতীক।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের পাঠ্যক্রমে শামসুর রাহমানের ‘পণ্ডশ্রম’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের বিদ্রূপাত্মক ভাষা, রম্যরস, প্রতীক ব্যবহারের কৌশল, এবং আধুনিক বাংলা কবিতার ধারা সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে।
পণ্ডশ্রম সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: পণ্ডশ্রম কবিতাটির লেখক কে?
এই কবিতাটির লেখক শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬)। তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃত। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’, ‘রৌদ্র করোটিতে’, ‘বিপুল বায়ুতে পারে’, ‘আসাদের শার্ট’, ‘বাংলা আমার বাংলা’, ‘পণ্ডশ্রম’।
প্রশ্ন ২: ‘পণ্ডশ্রম’ শিরোনামের অর্থ কী?
‘পণ্ডশ্রম’ অর্থ বৃথা শ্রম, নিষ্ফল চেষ্টা। কবি এই কবিতায় একটি চিলের কাছে কান হারানোর ঘটনা এবং সেই কানের খোঁজে সমাজের সব স্তরের মানুষের বৃথা চেষ্টার কথা বলেছেন।
প্রশ্ন ৩: ‘কান নিয়েছে চিলে’ — এখানে ‘কান’ কী প্রতীক?
‘কান’ — শ্রবণশক্তি, বুদ্ধি, সত্য জানার ক্ষমতা, দিকনির্দেশনা, নিজের অস্তিত্বের চিহ্ন। কান হারানোর অর্থ হলো নিজের বুদ্ধি হারানো, সত্য থেকে বিচ্যুত হওয়া।
প্রশ্ন ৪: ‘চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
সবাই মিলে চিলের পিছনে ছুটছে — এটি অন্ধ অনুকরণের প্রতীক। একটি ঘটনার পরে সবাই মিলে অন্ধভাবে সেই পথে ছুটছে, যেখানে আসলে কোনো লাভ নেই।
প্রশ্ন ৫: ‘কানের শোকে আজকে সবাই মিটিং করি চল’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
কানের শোকে মিটিং করা — এটি আনুষ্ঠানিকতার বিদ্রূপ। প্রকৃত সমস্যার সমাধান না করে কেবল মিটিং-ম্যারাথন করাই আমাদের অভ্যাস।
প্রশ্ন ৬: ‘পাঁজি চিলের ভূত ছাড়াব লাথি-জুতো কিলে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
চিলের ভূত ছাড়াতে লাথি-জুতো কিলে প্রস্তুত — এটি বৃথা চেষ্টার আরেকটি উদাহরণ। যেখানে আসলে কোনো ভূত নেই, সেখানে ভূত ছাড়ানোর আয়োজন।
প্রশ্ন ৭: ‘ছোট ছেলে’ এখানে কী ভূমিকা পালন করে?
ছোট ছেলে সরল বুদ্ধির প্রতীক। জটিলতা, আনুষ্ঠানিকতা, অন্ধ অনুকরণের মধ্যে ডুবে থাকা বড়দের সে সহজ সত্য বলে দেয় — কান যেখানে ছিল আগে সেখানটাতেই আছে।
প্রশ্ন ৮: ‘নেইকো খালে, নেইকো বিলে, নেইকো মাঠে গাছে; / কান যেখানে ছিল আগে সেখানটাতেই আছে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
ছোট ছেলের এই কথার অর্থ — তারা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানেই কান আছে। বাইরে কোথাও নয়। সমাধান তাদের কাছেই আছে, কিন্তু তারা তা দেখতে পাচ্ছে না।
প্রশ্ন ৯: ‘বৃথাই মাথার ঘাম ফেলেছি, পণ্ড হল শ্রম’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
এটি বৃথা চেষ্টার স্বীকারোক্তি। তারা সব বৃথা চেষ্টা করেছে, মাথার ঘাম ফেলেছে, কিন্তু শ্রম বৃথা গেছে।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
কবিতাটি আমাদের শেখায় — আমরা প্রায়ই অন্ধভাবে অন্যের পিছনে ছুটে বৃথা শ্রম করি। আমরা বাইরে কোথাও সমাধান খুঁজি, অথচ সমাধান আমাদের কাছেই থাকে। ছোট ছেলেটির মতো সরল বুদ্ধি আমাদের শেখায় — আমরা যেখানে আছি, সেখানেই উত্তর আছে। বৃথা পণ্ডশ্রম না করে নিজের দিকে তাকানো উচিত। এটি অন্ধ অনুকরণ, আনুষ্ঠানিকতা, এবং বাস্তবতা থেকে পালানোর প্রবণতার বিরুদ্ধে এক তীক্ষ্ণ বিদ্রূপ।
ট্যাগস: পণ্ডশ্রম, শামসুর রাহমান, শামসুর রাহমানের কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, বিদ্রূপাত্মক কবিতা, রম্য কবিতা, সামাজিক সমালোচনার কবিতা, বাংলা কবিতা বিশ্লেষণ
© Kobitarkhata.com – কবি: শামসুর রাহমান | কবিতার প্রথম লাইন: “এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে, / চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।” | বৃথা শ্রম ও বিদ্রূপের কবিতা বিশ্লেষণ | আধুনিক বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন






