নিজের রবীন্দ্রনাথ- জয় গোস্বামী।

সেটা ছিল বাইশে শ্রাবণ,
একটি স্কুলে গেছি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কিছু বলতে।
ছোটরা তাদের উৎসুক চোখ নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে,
হঠাৎ মনে হলো, কি বলব –
যা বলব তাই যদি এদের কাছে ভুল প্রমাণিত হয় পরে –
রবীন্দ্রনাথ তো কোন স্কুলপাঠ্য অঙ্ক নন,
যে সবার খাতায় একই উত্তর হবে,
এক-এক জনের রবীন্দ্রনাথ এক-এক রকম ।
বাড়িতেও মেয়ে এক-আধবার জানতে চায়
তার ক্লাসের রবীন্দ্রনাথ নিয়ে –
হাত ছাড়িয়ে পালাই,
কারণ অনেক সময় যে নিজেই বুঝতে পারি নি রবীন্দ্রনাথকে।

ধরা যাক সোনার তরী,
এই একটা সব-গুলিয়ে দেওয়া লেখা আমার জীবনে,
হ্যাঁ, আমার জীবনে –
অন্যের জীবনে তা নাও হতে পারে।
প্রথম এই কবিতাকে আমি কিভাবে পাই?
পাই একটা বর্ষার বিকেলবেলার শেষে,
এক বারান্দায় বসে থাকার সময়,
কবিতাটি আমাকে দেখা দেয় ।
আমার বয়স তখন আট,
১৯৬২ সালের জুলাই মাস ছিল সেটা।
সারাদিন বৃষ্টি হয়ে সন্ধ্যেবেলা ধরে এসেছে,
আকাশ স্লেট-রঙের কালো থেকে একটু উজ্জ্বল,
সূর্য নেই –

আমার মা কবিতাটি পড়ছিল সঞ্চয়িতা থেকে,
উচ্চারণ করে করে।
আমার মায়ের কিন্তু কবিতা-টবিতা পড়ার ঝোঁক
একেবারেই ছিল না,
সারাদিন নানা কাজে ব্যস্ত থাকতে হত তাকে,
গল্পের বই পড়ত, কবিতা কক্ষণো নয়।
তবে সেদিন মা পড়ছিল কেন?
পড়ছিল আমার বাবার কথা মনে করে।

এপ্রিল মাসে বাবার মৃত্যু হয়েছে,
বাবার ছিল ওই কবিতা বলা-গান গাওয়ার স্বভাব।
এক-একটা মানুষ থাকে না, সারাদিন বাড়িতেই থাকে,
ফুলগাছ লাগায়, বই পড়ে, গান গায়, কবিতাও পড়ে –
কিন্তু কিছু করে না, বাবাও সেই রকমই ছিল।
প্রায় কালো হয়ে আসা আকাশের নীচে
গাছপালা যখন সারাদিনের বৃষ্টিতে ভেজা,
তখন সেই কবিতার শেষ লাইনগুলো শুনতে শুনতে
আমার মনে হয়েছিল –
এই কবিতাটি আমার বাবার মৃত্যু নিয়েই লেখা।
‘শ্রাবণ গগন ঘিরে,
ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে –
শূন্য নদীর তীরে
রহিনু পড়ি—
যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী’ –
বুকের মধ্যে কি একটা চাপা কষ্টের গুরুভার।

আমাদের ছোট ওই সংসারের মধ্যে
বাবা ছিল একটা আনন্দের উৎস।
সারাদিন ছোট-ছোট গান, মজা, কবিতা, বাগান –
এসব করে অভাবের কথা যেন ভুলিয়ে রাখত।
সেই লোকটা চলে গেছে, আর আসবে না –
এটাই যেন ওই কবিতার সার কথা।
স্নেহ হারানো, শোক পাবার কবিতা হয়েই
ওই সোনার তরী রইল আমার কাছে।

তারপর বয়স বাড়ল,
আস্তে আস্তে বইপত্র ওল্টাতে গিয়ে দেখি –
কি ভয়ানক সব তর্কাতর্কি হয়ে গেছে
ওই কবিতা নিয়ে।
বোকার মতো ওই সোনার তরীকে
আমি শোকের কবিতা ভেবেছি কেন?
না কক্ষনো আমি কাউকে বলি না
আর ওই কবিতা নিয়ে একটি কথাও।
কিন্তু আজও যদি চোখ বন্ধ করে মনে ভাবি
ওই ‘তরুছায়ামসীমাখা’ কথাটি –
তবে আমাদের সেই রানাঘাটের সিদ্ধেশ্বরীতলার
সেই পুকুরপাড়ের বাড়ি আর তার গাছ আর
চূর্ণী নদীর তীরই মনে পড়ে।

আরো আছে,
চূর্ণী নদী বললাম না –
তার ধারে একটা বটগাছের নীচে,
বাবার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছি।
বাবার মুখে একটা গান –
‘অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দ মধুর হাওয়া ।
দেখি নাই কভু দেখি নাই এমন তরণী-বাওয়া ।।’

তরণী কী? না, নৌকো।
নৌকো তো অনেক যায় আমাদের নদী দিয়ে,
যেমন যায় কচুরিপানারা।
অমলও জানি – অমলদা,
সব-পেয়েছির আসরে ড্রিল করায়, ড্রাম বাজায়।
কিন্তু ধবল কাকে বলে?
গানের পর বাবার উত্তর – ধবল হলো সাদা।
ওই যে বালির নৌকোটাকে দেখ, ওর তো পাল আছে,
সাদা পাল, ঐরকমই।
দেখলাম বড়ো একটা নৌকো ধীরে ধীরে ভেসে চলেছে,
একটা ছই রয়েছে,
ওইরকম নৌকো কতই দাঁড়িয়ে থাকে চূর্ণীর তীরে,
নৌকোর কাণা পর্যন্ত জল,
এই নৌকোটায় বড়ো একটা পাল লাগানো।
মনের ভেতরে থেকে গেল সেই নৌকো, আর তার পাল তুলে যাওয়া।
কিন্তু পাল মোটেই অতো কিছু সাদা ছিল না,
কেমন ময়লা-ময়লা, ত্রিপল-রঙের চাদর একটা –
তখন কত বড় আমি, বছর ছয়-সাত বড় জোর।

তিরিশ পেরিয়ে আলাপ হলো একটি মেয়ের সঙ্গে,
সে আসে, কথা বলে, চলে যায়।
পরে দেখছি – যখনি একা হয়ে যাই, তখনি
তারই কোনো না কোনো ছবি মনে পড়ছে।
হয়তো তার একটুকরো হাসি,
কথা বলতে বলতে হঠাৎ থেমে যাওয়া,
কপালের ওপর ঝুঁকে পড়া চুল সরানো-
একি হলো?
আরো কতজনের সঙ্গেই তো কথা বলি,
কারো ক্ষেত্রে তো এমন হয় না।
সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে তার তাকিয়ে থাকা-
ভোরে ঘুম ভেঙে মনে পড়ে,
দুপুরে ঝাঁ ঝাঁ রোদে হাঁটতে হাঁটতেও মনে পড়ে,
কেন পড়ে?
আর কোনো চোখ কী আমি দেখি নি কখনো?
বুঝলাম, আমি প্রেমে পড়েছি।

একদিন এক উঁচু বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছি,
সামনে নেমে চলা তার উড়ন্ত আঁচল,
কোথাও কারো বাড়ি থেকে গান বাজছে –
‘দেখি নাই কভু দেখি নাই এমন তরণী-বাওয়া ।’
থমকে আছি, পা চলছে না –
শৈশবের সেই পুরোনো গান কী
এক নতুন মানে নিয়ে আজ আমার সামনে দাঁড়াতে এলো?
এই তরুণীই তবে সেই আশ্চর্য নৌকো বেয়ে যাওয়া?
যখন এর পর থেকে ওই গান শুনেছি,
মনে পড়েছে তার চেয়ে থাকা।
কবরখানার মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বেরিয়ে আসছি দুজনে,
পিছনে রক্তিম সূর্যাস্ত-
একটা জলের বোতল ব্যাগ থেকে বার করে এগিয়ে দেওয়ার সময় তাকিয়ে আছে-
আমাদের সেই দেখাশুনোর ওপর ছেদ পড়তে
কয়েকমাসের বেশি সময় লাগল না,
কিন্তু ওই গানের মধ্যে থেকে গেলো মেয়েটি

তারপর আরো উনিশ বছর কেটে গেছে।
আমার মেয়েকে যে হস্টেলে দিয়েছি, তার পাশেই গঙ্গা।
এক রবিবার বিকেলে হস্টেলের ধারেই
বটগাছের নীচে সিমেন্ট-বাঁধানো বেদীতে
বসে আছি মেয়ের সঙ্গে।
সে এখন পনেরো পেরিয়ে ষোলোয় পড়েছে।
সেও বর্ষাকাল ভালোবাসে।
আজ সারাদিনের মেঘে ঢাকা ছিল আকাশ,
কিন্তু এখন একটু পরিষ্কার।
সূর্য আস্তে নামছেন, আলো বেরিয়ে আসছে।
মেয়ে বলল, ওই দেখো-
দেখি – ছোট একটা নৌকো,
তরতর করে চলে আসছে স্রোতের সঙ্গে,
তার উপরে একটা পাল লাগানো।
মেয়ে গাইতে শুরু করল –
‘অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দ মধুর হাওয়া ।
দেখি নাই কভু দেখি নাই এমন তরণী-বাওয়া ।। ‘

ও শেখে-টেখে না, শুধু শুনে শুনে জানে।
কিন্তু ওর গেয়ে চলবার সঙ্গে সঙ্গে সব ভুলে
ওই গান এসে দাঁড়াল আমার পঞ্চাশ বছরের দোরগোড়ায়,
তখন আমার চোখ ভেসে যায় চোখের জলে –
এই গানের কি মানে হল তবে আমার কাছে?
আমাকে এই প্রশ্নের মধ্যে রেখে সূর্য তাঁর অস্তে চললেন।

‘পিছনে ঝরিছে ঝরঝর জল, গুরুগুরু দেয়া ডাকে,
মুখে এসে পড়ে অরুণকিরণ ছিন্ন মেঘের ফাঁকে ।
ওগো কান্ডারী, কে গো তুমি, কার হাসিকান্নার ধন
ভেবে মরে মোর মন।’

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x