কবিতার খাতা
- 30 mins
দিন আসবেই – শিমুল মুস্তাফা।
আজ আমাদের হোক বা না হোক,
কাল আমাদের হবে।
আমার ভেতর সেই তুমিটা
চিরকালই রবে
আজকের এই তপ্ত দিনে
রিক্ত যদি হয় রে,
আসবে সময় তোমার আমার
ঘুচবে সকল ভয় রে।
শুকনো মাটি তৃষ্ণাতে আজ
শালিখ পাখি জোড়া,
কালকে তো এই মাটি হবে
সোনা রূপায় মোড়া।
আজকের এ দিন হার যদি হয়
হোক না মিছে ক্ষতি,
আকাশ ভরা সূর্য তারা
কাল ছড়াবে জ্যোতি।
আজ আমাদের হোক বা না হোক,
কাল আমাদের হবে।
আমার ভেতর সেই তুমিটা
চিরকালই রবে
পথের ধুলোয় লুটাক যদি
রক্ত-রাঙা ঋন
বুকের ভেতর পুষছি যে আজ
আগুন ঝরা দিন।
শত্রু হাসুক বন্ধু বলুক
ফুরিয়ে গেছে দিন তো,
জানি আবার আসবে সুদিন
শুধে সকল ঋণ তো।
আঁধার কালো মেঘের পরে
আসবে আলো চিরে,
পাখিরা সব ফিরবে দেখো
আপন আপন নীড়ে।
আজ আমাদের না হলে হোক
কাল তো হবে কাম্যের,
বিজয় নিশান উড়িয়ে আকাশ
জয় হবে এই সাম্যের।
দুঃখ নদী পাড়ি দিয়ে
পৌঁছাব ওই তীরে,
উচ্চশিরে দাঁড়াব ঠিক
এই পৃথিবীর ভীড়ে।
ধৈর্য ধরো আসছে দেখো
বজ্র সাধা রবে,
আজ আমাদের হোক বা না হোক,
কাল আমাদের হবে।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। শিমুল মুস্তাফা।
দিন আসবেই – শিমুল মুস্তাফা | দিন আসবেই কবিতা শিমুল মুস্তাফা | শিমুল মুস্তাফার কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা
দিন আসবেই: শিমুল মুস্তাফার আশা, প্রত্যয় ও আত্মবিশ্বাসের অসাধারণ কাব্যভাষা
শিমুল মুস্তাফার “দিন আসবেই” একটি অনন্য সৃষ্টি, যা প্রতিকূলতার মাঝেও আশা, প্রত্যয় ও আত্মবিশ্বাসের এক গভীর কাব্যিক অন্বেষণ। “আজ আমাদের হোক বা না হোক, / কাল আমাদের হবে। / আমার ভেতর সেই তুমিটা / চিরকালই রবে” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক গভীর চেতনা — আজ না হলেও কাল হবে, এই বিশ্বাস নিয়েই এগিয়ে চলা। শিমুল মুস্তাফা (জন্ম: ১৭ অক্টোবর ১৯৬৪) একজন বাংলাদেশী আবৃত্তিশিল্পী এবং কবি । তিনি ২০২৪ সালে একুশে পদকপ্রাপ্ত হিসেবে ভূষিত হন [citation:1]। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোল ও পরিবেশ বিষয়ে মাস্টার্স করেছেন [citation:1]। আশির দশকের শুরুতে স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় কবিতা আবৃত্তি এবং থিয়েটার বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সে সময় থেকেই আবৃত্তি শুরু [citation:3]। তিনি শিল্পমনা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখান থেকেই তিনি অনুপ্রাণিত এবং শিল্প হিসেবে তিনি বেছে নেন কবিতা আবৃত্তিকে [citation:1]। “দিন আসবেই” তাঁর একটি বহুপঠিত কবিতা যা আশা ও প্রত্যয়ের এক অনন্য দলিল।
শিমুল মুস্তাফা: আবৃত্তিশিল্পী ও কবি
শিমুল মুস্তাফা ১৯৬৪ সালের ১৭ অক্টোবর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন [citation:1]। তাঁর বাবা প্রয়াত খান মোহম্মদ গোলাম মুস্তাফা ও মা আফরোজ মুস্তাফা [citation:1]। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোল ও পরিবেশ বিষয়ে মাস্টার্স করেছেন [citation:1]।
আশির দশকের শুরুতে স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় কবিতা আবৃত্তি এবং থিয়েটার বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সে সময় থেকেই আবৃত্তি শুরু [citation:3]। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন শিল্পমনা পরিবারে। সেখান থেকেই তিনি অনুপ্রাণিত এবং শিল্প হিসেবে তিনি বেছে নেন কবিতা আবৃত্তিকে। এরপর ধীরে ধীরে তিনি অনেক পরিচিত হয়ে ওঠেন এবং বর্তমানে তিনি একজন জনপ্রিয় আবৃত্তিকার বা আবৃত্তিশিল্পী হিসেবে পরিচিত [citation:1]।
তাঁর উল্লেখযোগ্য আবৃত্তি অ্যালবামের মধ্যে রয়েছে ‘চিঠি’ (১৯৯৬), ‘প্রিয়তা’ (২০১৬) এবং ‘তৃতীয় একজন’ (২০১৪) [citation:1]। তিনি ২০২৪ সালে একুশে পদকপ্রাপ্ত হিসেবে ভূষিত হন [citation:1]।
কবি হিসেবে তাঁর ‘তুমি আসবে বলে’ [citation:6] এবং ‘অবস্থান’ [citation:8] কবিতা দুটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ‘অবস্থান’ কবিতায় তিনি লিখেছেন — “এখন আমার ভীষণ খরা। / হাতের মুঠোয় লক্ষ তারা / একটি তারাও যায়না ধরা / কেউ বলে না, কেউ টলে না / কেমন আছ? কোথায় আছ?” [citation:8]। এই একাকীত্বের সুর তাঁর কবিতায় বারবার ফিরে এসেছে। ‘তুমি আসবে বলে’ কবিতায় তিনি প্রেমের প্রত্যাশায় এক ব্যাকুলতার চিত্র এঁকেছেন — “তুমি আজ আসবে বলে- / বহুক্ষণ আমি অবাক হয়েছি! / ঘরের চৌদিকের দেয়ালের ছুল গুলো পরিষ্কার করেছি / আমার ঘরটাকে আমি নিজেই আপন করে সাজিয়েছি” [citation:6]।
দিন আসবেই কবিতার বিস্তারিত বিশ্লেষণ
কবিতার শিরোনামের তাৎপর্য
“দিন আসবেই” শিরোনামটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘দিন আসবেই’ — এটি একটি দৃপ্ত প্রত্যয়, একটি অটল বিশ্বাস। আজ যতই খারাপ দিন হোক না কেন, একটা দিন আসবেই যখন সব ঠিক হয়ে যাবে। শিরোনামেই কবি ইঙ্গিত দিয়েছেন — এই কবিতা আশা ও প্রত্যয়ের গান, যা আমাদের শেখায় যে অন্ধকারের পরেই আলো আসে।
প্রথম স্তবকের বিশ্লেষণ: চিরন্তন বিশ্বাস
“আজ আমাদের হোক বা না হোক, / কাল আমাদের হবে। / আমার ভেতর সেই তুমিটা / চিরকালই রবে” প্রথম স্তবকে কবি চিরন্তন বিশ্বাসের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — আজ আমাদের হোক বা না হোক, কাল আমাদের হবে। আমার ভেতর সেই তুমিটা চিরকালই রবে ।
‘আজ আমাদের হোক বা না হোক, / কাল আমাদের হবে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
এটি কবিতার মূলমন্ত্র। আজ না হলেও কাল হবে — এই বিশ্বাসই কবিকে এগিয়ে নিয়ে চলে। এটি আত্মবিশ্বাস ও প্রত্যয়ের এক অসাধারণ উচ্চারণ।
‘আমার ভেতর সেই তুমিটা / চিরকালই রবে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘সেই তুমিটা’ বলতে প্রিয় মানুষ, আদর্শ, বা বিশ্বাস — যা চিরকাল কবির ভেতর থাকবে। বাহ্যিক পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, এই ভেতরের সত্তা অপরিবর্তিত থাকবে।
দ্বিতীয় স্তবকের বিশ্লেষণ: সময়ের প্রতীক্ষা
“আজকের এই তপ্ত দিনে / রিক্ত যদি হয় রে, / আসবে সময় তোমার আমার / ঘুচবে সকল ভয় রে।” দ্বিতীয় স্তবকে কবি সময়ের প্রতীক্ষার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — আজকের এই তপ্ত দিনে তুমি যদি রিক্তও হও, তবু আসবে সময় তোমার আমার, ঘুচবে সকল ভয় ।
‘তপ্ত দিনে রিক্ত যদি হয় রে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
তপ্ত দিন — কঠিন সময়, সংগ্রামের দিন। রিক্ত — শূন্য, নিঃস্ব। কবি বলছেন, এমনও দিন আসতে পারে যখন তুমি নিঃস্ব হয়ে যাবে। কিন্তু তবুও হতাশ হওয়ার কিছু নেই।
তৃতীয় স্তবকের বিশ্লেষণ: শুকনো মাটির রূপান্তর
“শুকনো মাটি তৃষ্ণাতে আজ / শালিখ পাখি জোড়া, / কালকে তো এই মাটি হবে / সোনা রূপায় মোড়া।” তৃতীয় স্তবকে কবি শুকনো মাটির রূপান্তরের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — শুকনো মাটি আজ তৃষ্ণায় ভুগছে, শালিখ পাখি জোড়া। কিন্তু কাল এই মাটিই হবে সোনা-রূপায় মোড়া ।
‘শুকনো মাটি তৃষ্ণাতে আজ / শালিখ পাখি জোড়া’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
শুকনো মাটি — অনুর্বর, প্রাণহীন অবস্থার প্রতীক। শালিখ পাখি জোড়া — সম্ভবত বিচ্ছেদের প্রতীক, বা একাকীত্বের প্রতীক। আজকের অবস্থা শুষ্ক ও একাকী।
‘কালকে তো এই মাটি হবে / সোনা রূপায় মোড়া’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
কাল এই শুকনো মাটিই হয়ে যাবে সোনা-রূপায় মোড়া — অর্থাৎ সম্পদে ভরা, সাফল্যমণ্ডিত। রূপান্তরের এই বিশ্বাস কবির আশার প্রতীক।
চতুর্থ স্তবকের বিশ্লেষণ: ক্ষতি ও জ্যোতি
“আজকের এ দিন হার যদি হয় / হোক না মিছে ক্ষতি, / আকাশ ভরা সূর্য তারা / কাল ছড়াবে জ্যোতি।” চতুর্থ স্তবকে কবি ক্ষতি ও জ্যোতির কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — আজকের দিন হার যদি হয়, হোক না মিথ্যে ক্ষতি। আকাশভরা সূর্য-তারা কাল ছড়াবে জ্যোতি ।
‘আজকের এ দিন হার যদি হয় / হোক না মিছে ক্ষতি’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
আজ যদি হারই হয়, তাতে কী? ক্ষতি মেনে নিতে হবে। কিন্তু এটাই শেষ কথা নয়।
‘আকাশ ভরা সূর্য তারা / কাল ছড়াবে জ্যোতি’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
কাল আবার নতুন সূর্য উঠবে, নতুন তারা জ্বলবে। আলো আসবেই। এটি চিরন্তন আশার কথা বলে।
পঞ্চম স্তবকের বিশ্লেষণ: প্রথম স্তবকের পুনরাবৃত্তি
“আজ আমাদের হোক বা না হোক, / কাল আমাদের হবে। / আমার ভেতর সেই তুমিটা / চিরকালই রবে” পঞ্চম স্তবকে প্রথম স্তবকের পুনরাবৃত্তি হয়েছে। এই পুনরাবৃত্তি কবিতাটির মূল সুরকে আরও জোরালো করেছে।
ষষ্ঠ স্তবকের বিশ্লেষণ: রক্ত-রাঙা ঋণ ও আগুনঝরা দিন
“পথের ধুলোয় লুটাক যদি / রক্ত-রাঙা ঋন / বুকের ভেতর পুষছি যে আজ / আগুন ঝরা দিন।” ষষ্ঠ স্তবকে কবি ঋণ ও আগুনঝরা দিনের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — পথের ধুলোয় যদি লুটোয় রক্ত-রাঙা ঋণ, বুকের ভেতর পুষছি যে আজ আগুনঝরা দিন ।
‘রক্ত-রাঙা ঋন’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
রক্ত দিয়ে শোধ করতে হয় এমন ঋণ — সম্ভবত দেশের জন্য, আদর্শের জন্য, ভালোবাসার জন্য দেওয়া ঋণ।
‘আগুন ঝরা দিন’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
আগুন ঝরা দিন — তীব্র সংগ্রামের দিন, কঠিন সময়ের দিন। কবি সেই দিনগুলো বুকের ভেতর পুষে রেখেছেন।
সপ্তম স্তবকের বিশ্লেষণ: শত্রুর হাসি ও সুদিনের আগমন
“শত্রু হাসুক বন্ধু বলুক / ফুরিয়ে গেছে দিন তো, / জানি আবার আসবে সুদিন / শুধে সকল ঋণ তো।” সপ্তম স্তবকে কবি শত্রুর হাসি ও সুদিনের আগমনের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — শত্রু হাসুক, বন্ধু বলুক ফুরিয়ে গেছে দিন। জানি আবার আসবে সুদিন, শুধে সকল ঋণ ।
‘শুধে সকল ঋণ’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
সেই রক্ত-রাঙা ঋণ শোধ করে — অর্থাৎ সব দায় মিটিয়ে, সব প্রতিশ্রুতি পূরণ করে আসবে সুদিন।
অষ্টম স্তবকের বিশ্লেষণ: অন্ধকার ভেদ করে আলো
“আঁধার কালো মেঘের পরে / আসবে আলো চিরে, / পাখিরা সব ফিরবে দেখো / আপন আপন নীড়ে।” অষ্টম স্তবকে কবি অন্ধকার ভেদ করে আলো আসার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — আঁধার কালো মেঘের পরে আসবে আলো চিরে। পাখিরা সব ফিরবে দেখো আপন আপন নীড়ে ।
‘আঁধার কালো মেঘের পরে / আসবে আলো চিরে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
ঘন কালো মেঘও একদিন সরে যাবে, আলো আসবে। এটি প্রকৃতির চিরন্তন নিয়ম — অন্ধকারের পরেই আলো।
নবম স্তবকের বিশ্লেষণ: কাম্য ও সাম্যের জয়
“আজ আমাদের না হলে হোক / কাল তো হবে কাম্যের, / বিজয় নিশান উড়িয়ে আকাশ / জয় হবে এই সাম্যের।” নবম স্তবকে কবি কাম্য ও সাম্যের জয়ের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — আজ আমাদের না হলে হোক, কাল তো হবে কাম্যের। বিজয় নিশান উড়িয়ে আকাশ, জয় হবে এই সাম্যের ।
‘কাল তো হবে কাম্যের’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
কাল হবে কাঙ্ক্ষিত দিন, যে দিনের জন্য আমরা অপেক্ষা করছি।
‘জয় হবে এই সাম্যের’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
সাম্যের জয় — সমতার জয়, ন্যায়ের জয়। এটি কবির রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্বাসের প্রতিফলন।
দশম স্তবকের বিশ্লেষণ: দুঃখ নদী পাড়ি দেওয়া
“দুঃখ নদী পাড়ি দিয়ে / পৌঁছাব ওই তীরে, / উচ্চশিরে দাঁড়াব ঠিক / এই পৃথিবীর ভীড়ে।” দশম স্তবকে কবি দুঃখ নদী পাড়ি দেওয়ার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — দুঃখ নদী পাড়ি দিয়ে পৌঁছাব ওই তীরে। উচ্চশিরে দাঁড়াব ঠিক এই পৃথিবীর ভীড়ে ।
‘দুঃখ নদী পাড়ি দিয়ে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
জীবনের দুঃখ-কষ্ট, বাধা-বিপত্তি সব পেরিয়ে — যেন নদী পার হওয়া।
‘উচ্চশিরে দাঁড়াব ঠিক / এই পৃথিবীর ভীড়ে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
অবশেষে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবেন, পৃথিবীর ভীড়ে নিজের জায়গা করে নেবেন।
একাদশ স্তবকের বিশ্লেষণ: ধৈর্যের আহ্বান
“ধৈর্য ধরো আসছে দেখো / বজ্র সাধা রবে, / আজ আমাদের হোক বা না হোক, / কাল আমাদের হবে।” একাদশ স্তবকে কবি ধৈর্যের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন — ধৈর্য ধরো, আসছে দেখো বজ্র সাধা রবে। আজ আমাদের হোক বা না হোক, কাল আমাদের হবে ।
‘বজ্র সাধা রবে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
বজ্রের মতো শক্তিশালী, অপ্রতিরোধ্য কিছু আসছে। এই সাধনা ব্যর্থ হবে না।
‘কাল আমাদের হবে’ — শেষ পঙ্ক্তির তাৎপর্য
শেষ পঙ্ক্তিতে প্রথম পঙ্ক্তির প্রত্যাবর্তন। এই বৃত্তাকার কাঠামো কবিতাটিকে সম্পূর্ণতা দিয়েছে এবং মূল বক্তব্যকে আরও জোরালো করেছে।
কবিতার গঠনশৈলী ও শিল্পরূপ
কবিতাটি এগারোটি স্তবকে বিভক্ত। প্রথম স্তবকে মূল সুর, দ্বিতীয় স্তবকে সময়ের প্রতীক্ষা, তৃতীয় স্তবকে শুকনো মাটির রূপান্তর, চতুর্থ স্তবকে ক্ষতি ও জ্যোতি, পঞ্চম স্তবকে প্রথম স্তবকের পুনরাবৃত্তি, ষষ্ঠ স্তবকে রক্ত-রাঙা ঋণ, সপ্তম স্তবকে শত্রুর হাসি ও সুদিন, অষ্টম স্তবকে অন্ধকার ভেদ করে আলো, নবম স্তবকে কাম্য ও সাম্যের জয়, দশম স্তবকে দুঃখ নদী পাড়ি দেওয়া, একাদশ স্তবকে ধৈর্যের আহ্বান ও প্রথম স্তবকের প্রত্যাবর্তন — এই ক্রমিক কাঠামো কবিতাটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ আশা-আকাঙ্ক্ষার গীতিকাব্যের রূপ দিয়েছে।
শব্দচয়ন ও শৈলীগত বিশেষত্ব
শিমুল মুস্তাফার ভাষা সহজ, প্রাঞ্জল কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী এবং তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে তিনি ব্যবহার করেছেন — ‘তপ্ত দিনে’, ‘রিক্ত’, ‘শুকনো মাটি’, ‘তৃষ্ণা’, ‘শালিখ পাখি’, ‘সোনা রূপা’, ‘হার’, ‘মিছে ক্ষতি’, ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’, ‘জ্যোতি’, ‘পথের ধুলো’, ‘রক্ত-রাঙা ঋণ’, ‘আগুন ঝরা দিন’, ‘শত্রু’, ‘বন্ধু’, ‘সুদিন’, ‘আঁধার কালো মেঘ’, ‘আলো চিরে’, ‘পাখি’, ‘নীড়’, ‘কাম্য’, ‘বিজয় নিশান’, ‘সাম্য’, ‘দুঃখ নদী’, ‘উচ্চশিরে’, ‘ধৈর্য’, ‘বজ্র সাধা’।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য
“দিন আসবেই” কবিতাটি শিমুল মুস্তাফার এক অসাধারণ সৃষ্টি। কবি প্রথমে মূল সুর বেঁধে দিয়েছেন — আজ না হোক কাল হবে, এই বিশ্বাস নিয়েই এগিয়ে চলা। তিনি বলেছেন, আজকের তপ্ত দিনে তুমি রিক্ত হলে কী হবে? সময় আসবেই, সকল ভয় ঘুচবে। শুকনো মাটি আজ তৃষ্ণাতুর, কিন্তু কাল সেই মাটিই হবে সোনা-রূপায় মোড়া। আজ হার হলেও ক্ষতি নেই, কাল আকাশভরা জ্যোতি ছড়াবে। তিনি স্মরণ করছেন তাঁর বুকের ভেতর আগুনঝরা দিনগুলোর কথা, রক্ত-রাঙা ঋণের কথা। শত্রু হাসুক, বন্ধু বলুক ফুরিয়ে গেছে দিন — কিন্তু তিনি জানেন, আবার আসবে সুদিন, শুধে যাবে সকল ঋণ। আঁধার কালো মেঘের পরেই আসবে আলো চিরে, পাখিরা ফিরবে আপন নীড়ে। আজ না হলেও কাল হবে কাম্যের দিন, বিজয় নিশান উড়িয়ে জয় হবে সাম্যের। দুঃখ নদী পাড়ি দিয়ে পৌঁছে যাব সেই তীরে, উচ্চশিরে দাঁড়াব এই পৃথিবীর ভীড়ে। শেষে তিনি ধৈর্যের আহ্বান জানান — ধৈর্য ধরো, আসছে বজ্র সাধা রবে। আজ আমাদের হোক বা না হোক, কাল আমাদের হবে ।
এই কবিতা আমাদের শেখায় — জীবনে যতই বাধা আসুক, যতই শত্রু হাসুক, দিন ফুরিয়ে গেছে বলুক — তবু আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে। একটা দিন আসবেই যখন সব ঠিক হয়ে যাবে। এই আশা নিয়েই আমাদের এগিয়ে চলা।
শিমুল মুস্তাফার কবিতায় আশা ও প্রত্যয়
শিমুল মুস্তাফার কবিতায় আশা ও প্রত্যয় বারবার ফিরে এসেছে। ‘অবস্থান’ কবিতায় তিনি একাকীত্ব ও খরার কথা বললেও শেষ পর্যন্ত আশার সুর ধ্বনিত হয়েছে — “এখন আমার ভীষণ খরা। / হাতের মুঠোয় লক্ষ তারা / একটি তারাও যায়না ধরা” [citation:8]। ‘তুমি আসবে বলে’ কবিতায় তিনি প্রেমের প্রত্যাশায় ব্যাকুল, কিন্তু সেই প্রত্যাশাই তাঁকে বাঁচিয়ে রাখে — “তুমি আজ আসবে বলে- / বহুক্ষণ আমি অবাক হয়েছি! / ঘরের চৌদিকের দেয়ালের ছুল গুলো পরিষ্কার করেছি” [citation:6]।
‘দিন আসবেই’ কবিতায় সেই আশা ও প্রত্যয় চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে। এখানে তিনি শুধু নিজের জন্য আশা করেন না, বরং সাম্যের জয়, সকলের সুদিন ফেরার কথা বলেন। এটি তাঁর ব্যক্তিগত প্রত্যয় থেকে সামষ্টিক আশায় উত্তরণের এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের উচ্চতর পাঠ্যক্রমে এই কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্য। এটি শিক্ষার্থীদের শিমুল মুস্তাফার কবিতার বিশেষত্ব, আশা ও প্রত্যয়ের শক্তি, এবং আধুনিক বাংলা কবিতার অনুপ্রেরণামূলক দিক সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে।
সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা
আজকের পৃথিবীতে এই কবিতাটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আমরা সবাই জীবনে নানা বাধার সম্মুখীন হই। শত্রুরা হাসে, বন্ধুরা বলে ফুরিয়ে গেছে দিন। কিন্তু এই কবিতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় — আজ না হোক, কাল হবে। এই বিশ্বাস নিয়েই এগিয়ে চলতে হয়। শিমুল মুস্তাফার এই কবিতা সেই চিরন্তন আশার এক অনন্য দলিল।
সম্পর্কিত কবিতা ও সাহিত্যকর্ম
শিমুল মুস্তাফার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কবিতার মধ্যে রয়েছে ‘অবস্থান’ [citation:8] এবং ‘তুমি আসবে বলে’ [citation:6] । ‘অবস্থান’ কবিতায় তিনি একাকীত্ব ও খরার চিত্র এঁকেছেন, আর ‘তুমি আসবে বলে’ কবিতায় তিনি প্রেমের প্রত্যাশায় ব্যাকুলতার কথা বলেছেন।
দিন আসবেই কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: দিন আসবেই কবিতাটির লেখক কে?
এই কবিতাটির লেখক শিমুল মুস্তাফা। তিনি ১৯৬৪ সালের ১৭ অক্টোবর ঢাকায় জন্মগ্রহণকারী একজন বাংলাদেশী আবৃত্তিশিল্পী ও কবি । তিনি ২০২৪ সালে একুশে পদকপ্রাপ্ত হিসেবে ভূষিত হন [citation:1]।
প্রশ্ন ২: দিন আসবেই কবিতাটির মূল বিষয়বস্তু কী?
এই কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো আশা, প্রত্যয় ও আত্মবিশ্বাসের গান। কবি দেখিয়েছেন — আজ যতই খারাপ দিন হোক না কেন, একটা দিন আসবেই যখন সব ঠিক হয়ে যাবে। আজ আমাদের না হলে কাল আমাদের হবে। এই বিশ্বাস নিয়েই এগিয়ে চলতে হবে ।
প্রশ্ন ৩: ‘আজ আমাদের হোক বা না হোক, / কাল আমাদের হবে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
এটি কবিতার মূলমন্ত্র। আজ না হলেও কাল হবে — এই বিশ্বাসই কবিকে এগিয়ে নিয়ে চলে। এটি আত্মবিশ্বাস ও প্রত্যয়ের এক অসাধারণ উচ্চারণ ।
প্রশ্ন ৪: ‘শুকনো মাটি তৃষ্ণাতে আজ / শালিখ পাখি জোড়া, / কালকে তো এই মাটি হবে / সোনা রূপায় মোড়া’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
শুকনো মাটি — অনুর্বর, প্রাণহীন অবস্থার প্রতীক। কাল এই শুকনো মাটিই হয়ে যাবে সোনা-রূপায় মোড়া — অর্থাৎ সম্পদে ভরা, সাফল্যমণ্ডিত। রূপান্তরের এই বিশ্বাস কবির আশার প্রতীক ।
প্রশ্ন ৫: ‘আঁধার কালো মেঘের পরে / আসবে আলো চিরে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
ঘন কালো মেঘও একদিন সরে যাবে, আলো আসবে। এটি প্রকৃতির চিরন্তন নিয়ম — অন্ধকারের পরেই আলো ।
প্রশ্ন ৬: ‘কাল আমাদের হবে’ — শেষ পঙ্ক্তির তাৎপর্য কী?
শেষ পঙ্ক্তিতে প্রথম পঙ্ক্তির প্রত্যাবর্তন। এই বৃত্তাকার কাঠামো কবিতাটিকে সম্পূর্ণতা দিয়েছে এবং মূল বক্তব্যকে আরও জোরালো করেছে ।
প্রশ্ন ৭: শিমুল মুস্তাফার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কবিতার নাম বলুন।
শিমুল মুস্তাফার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কবিতার মধ্যে রয়েছে ‘অবস্থান’ [citation:8] এবং ‘তুমি আসবে বলে’ [citation:6] ।
প্রশ্ন ৮: শিমুল মুস্তাফা কোন কোন পুরস্কার লাভ করেন?
শিমুল মুস্তাফা ২০২৪ সালে আবৃত্তি শিল্পে অবদানের জন্য একুশে পদকপ্রাপ্ত হিসেবে ভূষিত হন [citation:1]।
প্রশ্ন ৯: শিমুল মুস্তাফা সম্পর্কে সংক্ষেপে বলুন।
শিমুল মুস্তাফা (জন্ম: ১৯৬৪) একজন বাংলাদেশী আবৃত্তিশিল্পী ও কবি । তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোল ও পরিবেশ বিষয়ে মাস্টার্স করেছেন । আশির দশকের শুরুতে স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় আবৃত্তি শুরু করেন । তাঁর উল্লেখযোগ্য আবৃত্তি অ্যালবামের মধ্যে রয়েছে ‘চিঠি’ (১৯৯৬), ‘প্রিয়তা’ (২০১৬) এবং ‘তৃতীয় একজন’ (২০১৪)। তিনি ২০২৪ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন ।
ট্যাগস: দিন আসবেই, শিমুল মুস্তাফা, শিমুল মুস্তাফার কবিতা, দিন আসবেই কবিতা শিমুল মুস্তাফা, আধুনিক বাংলা কবিতা, আশার কবিতা, প্রত্যয়ের কবিতা, একুশে পদক
© Kobitarkhata.com – কবি: শিমুল মুস্তাফা | কবিতার প্রথম লাইন: “আজ আমাদের হোক বা না হোক, / কাল আমাদের হবে। / আমার ভেতর সেই তুমিটা / চিরকালই রবে” | বাংলা আশার কবিতা বিশ্লেষণ





